Wednesday, December 09, 2009

পিচ্চিতোষ গল্প ০১২: গুড্ডুর সাইকেল শেখা

গুড্ডুর বন্ধু বাবু মস্ত একটা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসে।

গুড্ডুরা স্কুল ছুটির পর অনেকক্ষণ খেলে। স্কুলের মাঠে মর্নিং শিফটের ছেলেরা খুব একটা খেলাধূলার সুযোগ পায় না, হেডমাস্টার তাদের মেরেবকে খেদিয়ে দ্যান। বাসায় গিয়ে আবার খেয়েদেয়ে পড়তে বসতে বলেন। অ্যাসেম্বলি মাঠের সবুজ ঘাসগুলি গুড্ডুদের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচায়।

অ্যাসেম্বলি মাঠে না হোক, জিমনেশিয়ামের সামনে ছোট্ট মাঠটুকুতে তো অন্তত খেলতে দেয়া উচিত হেডুর? হেডু মানে হেডস্যার। গুড্ডুরা সেখানেও খুব একটা খেলার সুযোগ পায় না, ইয়া মোটা বেত নিয়ে হেডু তেড়ে আসেন। তখন যে যেদিকে পারে চোঁ-চাঁ দৌড় মারতে হয়। ঝানুরা দেয়াল টপকায়, গুড্ডু একটু ছোটোখাটো বলে তাকে পেছনের গেটের দিকে ছুটতে হয়। সে প্রায় কয়েকশো মিটারের ধাক্কা। গুড্ডু ভালো ছুটতে পারে বলে এখনও পর্যন্ত তাকে হেডুর ধোলাই খেতে হয়নি।

বেশ কিছুদিন ধরে গুড্ডুরা তাই সার্কিট হাউসের প্যারেড গ্রাউন্ডে খেলছে। ওখানে কেউ তেমন একটা জ্বালাতন করে না। তারা একটা ছোটো বল দিয়ে ইচ্ছেমতো ফুটবল খেলে, তারপর একসময় যে যার বাসার দিকে চলে যায়।

বাবু বাসায় যায় পাহাড়ের মতো উঁচু সাইকেলটায় চড়ে। বাবু খুব একটা লম্বাচওড়া নয়, গুড্ডুর চেয়ে কয়েক ইঞ্চি উঁচুতে তার মাথা, কিন্তু ওরকম বড়সড় একটা সাইকেল সে নিপুণভাবে চালানো রপ্ত করে ফেলেছে। ওটা নাকি তার ভাইয়ের সাইকেল। আবার তার বাবারও সাইকেল। বাবুদের বাড়িতে সক্কলে ওটাতে চড়ে।

গুড্ডুর খুব শখ ঐ সাইকেলটা চালানোর, কিন্তু সাইকেল চালানো সে জানে না।

বাবু তাকে রোজই সাধে, "চালাবি তুই? এটা নিয়ে একটা চক্কর মেরে আয়। কিন্তু খবরদার রাস্তায় উঠবি না।"

গুড্ডু প্রথম দিনই ধড়াশ করে আছাড় খেয়ে কনুইয়ে চোট পেয়ে আর সাহস করেনি। বাসায় ফেরার পর মা চেঁচাচ্ছিল, "এতোখানি জায়গা ছড়ে গেলো কীভাবে রে শয়তান? কোথায় কী শয়তানি করতে গিয়ে চামড়া খুলে রেখে এলি?"

বিকেলে বাবু খেলতে আসে পিন্টুদের মাঠে। তার সেই ঐরাবতের মতো সাইকেলে চড়ে। পিন্টুদের মাঠে এন্তার ঘাস, গুড্ডু তাই একদিন সাহস করে বাবুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে সাইকেলটা নিয়ে ঠেলতে ঠেলতে ঘেসো জায়গায় চলে এলো। বাবু স্কুলের গল্প বকবক করে বকতে বকতে গুড্ডুর সাথে আসে।

"আমাকে ধরবি একটু?" গুড্ডু বাবুকে বলে।

বাবু মাথা নাড়ে। "ধরলে সাইকেল চালানো শেখা যায় না।"

গুড্ডু বলে, "আরে, আমি পড়ে যাবো তো!"

বাবু হাসে। বলে, "একবার দুইবার তো পড়বিই। তারপর আর পড়বি না।"

গুড্ডু আরো অনুরোধ করে বাবুকে, কিন্তু বাবু সাইকেলচালনশিক্ষায় অটল, সে একটা চুইংগাম বের করে চুপচাপ চিবায় আর হাত দিয়ে ইশারা করে।

গুড্ডু বহুকষ্টে সেই সাইকেলে চড়ে, কিন্তু সীটে বসতে পারে না, রডের ফাঁক দিয়ে পা ঢুকিয়ে কোনোমতে প্যাডেলে পা রাখে। এরপর চাপ দিয়ে একটু সামনে আগাতেই ... ধড়াশ! মাটি কাঁপিয়ে সে সাইকেল নিয়ে পড়ে, বাবু হো হো করে হাসে।

গুড্ডু উঠে পড়ে গোমড়ামুখে। বাবু আবার ইশারা করে। আবার চড়ে এগো।

বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও ওরকম পাহাড়ের মতো একটা সাইকেল কব্জা করতে পারে না গুড্ডু। সে একবার ডানে, তো আরেকবার বামে হেলে পড়ে যায়।

বাড়ি ফিরে সে সন্ধ্যেবেলা বাবাকে বলে, "বাবা জানো, আজকে সাইকেল চালানো শিখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না। পড়ে যাই শুধু।"

গুড্ডুর বাবা একটু গম্ভীর হয়ে কী যেন ভেবে বললেন, "কোথায় শিখতে গিয়েছিলে?"

গুড্ডু অনেক উৎসাহ নিয়ে খুলে বলে বাবাকে, কীভাবে বাবু রোজ সাইকেলে চড়ে স্কুলে আসে আর বাড়ি ফেরে, ওরকম বড় একটা সাইকেল চালাতে যে তার কোনো অসুবিধা হয় না, আর কীভাবে বাবু চালাতে গিয়ে কয়েক পা এগোতে না এগোতেই আছাড় খেয়ে পড়ে।

গুড্ডুর বাবা গম্ভীর মুখে বললেন, "খবরদার সাইকেল নিয়ে রাস্তায় যাবে না। মনে থাকবে তো? মাঠে চালাচ্ছো চালাও। শিখতে পারলে খারাপ কী!"

গুড্ডু আবারও পরদিন খেলার মাঠে বাবুকে পাকড়াও করে। বাবু সহাস্যে রাজি হয়। দুইজনে সাইকেল ঠেলে নিয়ে আসে ঘেসো জমির ওপর।

গুড্ডু আজ আছাড় খায়, কাল আছাড় খায়, কিন্তু একদিন সে ঠিকই শিখে ফেলে! বাবুর ঐ বিরাট সাইকেলটা নিয়েই সে গোটা মাঠে চক্কর খায়, ব্রেক কষে, নামে, আবার ওঠে, আবার চক্কর খায়। বাবু এসে পিঠ চাপড়ে দেয়। বলে, "শিখে গেছিস। এখন রাস্তায় চালিয়ে শিখতে হবে।"

গুড্ডু একটু ভয় পায়, মাথা নাড়ে। বলে, "না, বাবা নিষেধ করেছে। এখনও পারিনা পুরোপুরি।"

বাবু বলে, "একটা সাইকেল কিনে ফ্যাল। কয়েকদিন চালালেই দেখবি রাস্তায় চালাতে পারছিস। কঠিন না।"

গুড্ডু বাড়ি ফিরে মা-কে ধরে। "মা একটা সাইকেল কিনে দিতে বলো না বাবাকে। চালিয়ে স্কুলে যাবো আর আসবো। খেলতেও যাবো।"

গুড্ডুর মা বলেন, "তুই আবার কী সাইকেল চালাবি?"

গুড্ডু ঝুলোঝুলি করতে থাকেন, গুড্ডুর মা বিরক্ত হয়ে ধমক দ্যান।

সন্ধ্যের পর বাবা অফিস থেকে ফেরেন, গুড্ডু গিয়ে মায়ের কাছে ঘুরঘুর করতে থাকে। কিন্তু মা কিছু বলেন না।

শেষে অধৈর্য হয়ে গুড্ডুই বাবাকে বলে, "বাবা আমাকে একটা সাইকেল কিনে দাও না। স্কুলে যাবো। খেলতেও যাবো চালিয়ে।"

গুড্ডুর বাবা গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ গুড্ডুর দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, "না, সাইকেল চালাতে হবে না তোমাকে। স্কুলে রিকশায় করে যেও। আর খেলতে যেতে সাইকেল লাগে নাকি? হেঁটেই তো যেতে পারো।"

গুড্ডু বলে, "না বাবা, আমি সাইকেল চালানো শিখে গেছি! খেলার মাঠে সেদিন অনেকক্ষণ চালিয়েছি। স্কুলেও যেতে পারবো। রাস্তাতেও চালাতে পারবো, বাবু বলেছে।"

গুড্ডুর বাবা বলেন, "না!"

গুড্ডু বলে, "দাও না বাবা! তুমিও চালাতে পারবে তো মাঝে মাঝে!"

গুড্ডুর বাবা এবার কড়া গলায় ধমকে ওঠেন, "তোমাকে না বলেছি, এক কথা বারবার বলবে না? বললাম সাইকেল চালাবে না, বাস, চালাবে না!"

গুড্ডুর মা এসে গুড্ডুকে সরিয়ে নিয়ে যান।

গুড্ডুর চোখে পানি চলে আসে, সে চোখ ডলতে ডলতে মায়ের সাথে রান্নাঘরে চলে আসে। কান্নাজড়ানো গলায় বলে, "বাবাকে বলো না মা বুঝিয়ে ... আমি তো সাইকেল চালাতে পারি!"

গুড্ডুর মা মলিন মুখে বলেন, "বাবাকে সাইকেল সাইকেল করে বিরক্ত কোরো না গুড্ডু। তোমার বাবার কাছে এখন পয়সা নেই।"

গুড্ডুর মনটা খারাপ হয়ে যায়। কেন তারা গরীব? কেন বাবা হেঁটে হেঁটে অফিসে যায়? কেন বাবার কাছে একটা সাইকেল কেনার টাকা নেই? বাবাও তো মাঝে মাঝে চালাতে পারতো সেটা।

গুড্ডু ঘুমিয়ে পড়ে।

মাঝরাতে গুড্ডুর ঘুম ভেঙে যায়। সে শুনতে পায়, পাশের ঘরে তার বাবা হাউমাউ করে কাঁদছেন। সে শুনতে পায়, মা চাপা গলায় সান্ত্বনা দিচ্ছে বাবাকে, দিও, পরে কিনে দিও, একদিন না একদিন একটা সাইকেল তো কিনে দিতে পারবে ছেলেকে? কাঁদে না। কাঁদে না।

গুড্ডুর বুকের ভেতরটা ঠাণ্ডা হয়ে আসে, সে গুটিশুটি মেরে কাঁথার নিচে শুয়ে থাকে। বাবা কাঁদছে? বাবা তো কাঁদে না। বাবা তো বড় মানুষ, বাবা কেন কাঁদে?

পরদিন খেলার মাঠে খেলা শেষে বাবু ডাকে, গুড্ডু, সাইকেল চালাবি?

গুড্ডু মাথা নাড়ে। বলে, চল সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে যাই আমার বাসা পর্যন্ত, তারপর তুই চলে যাস।

বাবু আপত্তি করে না, তারা দু'জন সাইকেল নিয়ে হাঁটতে থাকে রাস্তা ধরে।

বাবা কাঁদুক, গুড্ডু চায় না। লাগবে না তার সাইকেল।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।