Wednesday, December 02, 2009

দৈনিকদা

পাড়াতুতো চায়ের দোকানে অমন আড্ডা পেয়ে যাবো, ভাবিনি। গতকাল গলিতে ঢোকার মুখে ডালপুরির বাস্না এসে নাকে হাত বুলিয়ে গিয়েছিলো, তাই আজ গেলাম ডালপুরি চোখে দেখার পাশাপাশি চেখে দেখতে, ঘ্রাণেন অর্ধভোজনমের পাশাপাশি বাকি আধখানা একেবারে উপর্যুপরি চিবিয়ে গিলতে, সাথে দুধভাত হিসেবে এক কাপ খাটো চা, কে জানতো বোনাস হিসেবে ওরকম একখান আড্ডার সন্ধান পাবো?

আমার মধ্যে সঙ্কোচের বিহ্বলতা বরাবরই কম। উঠে গিয়ে গলা খাঁকরে বললাম, "তা ভায়েরা, বেশ লাগছে আপনাদের কথাগুলো শুনতে। বসতে পারি?"

ছোকরার দল সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আমাকে দেখে কেবল, আর নিজেদের মাঝে আড়ে আড়ে চায়। কিছু বলে না।

আমি ঠেলেঠুলে এক পাশে বসে পড়ি। বলি, "প্রেমেন্দ্র মিত্র নিয়ে কী যেন বলছিলেন?"

যার পাশে বসি, সে ছটফট করে ওঠে।

একজন গুরুগম্ভীর গলায় বলে, "লিটমাস! লিটমাস টেস্ট!"

উল্টোদিকে বসা টিংটিঙে ছোঁড়াটা নড়েচড়ে বসে বলে, "কে গো আপনি?"

আমি হাত বাড়িয়ে দিই। "আমার নাম কাদের। বজলুল কাদের।"

ছোকরা অতি সন্তর্পণে হাত মেলায়। তারপর নিজের হাতখানা প্যান্টের পাছায় মুছতে মুছতে বলে, "তা কী নামে লেখেন?"

আমি বিস্মিত হই। বলি, "কী নামে লিখি মানে?"

ছোকরা হাসে কিটিকিটি। বলে, "কোবতে লেখেন কী নামে?"

আমি বলি, "কোবতে?"

সবার মুখে একটা আশঙ্কার ছাপ পড়ে।

ছোকরা মুখ কালো করে বলে, "কবিতা লেখেন কী নামে?"

আমি মহাকাশ থেকে আছড়ে পড়ি উল্কাপিণ্ডের মতো। বলি, "কবিতা? কবিতা লিখবো কেন?"

ওভাবে উল্কাপাত ঘটাই বলেই হয়তো ডাইনোসরের মতো ছোকরাদের মুখের আশঙ্কার ভাবটা বিলুপ্ত হয়। লিটমাস লিটমাস বলে হেঁকে ওঠা ছোকরাটা বলে, "বাহ, লিটমাস তো নীলচেই আছে রে!"

আমার উল্টোবাগে বসা ছোকরা বলে, "চুপ দে। একদম ঝেড়েপুঁছে টেস্টাই কাদের ভাইকে। তা কাদের ভাই, কী লেখেন তাহলে?"

আমি সলজ্জ হেসে বলি, "আমি লিখতেটিখতে পারি না ভাই। শুধু পড়ি। প্রচুর পড়ি।"

ছোকরা মধুর হাসে। বলে, "কার কবিতা পড়েন?"

আমি কাঁচুমাচু হয়ে বলি, "ইয়ে ... মানে ... কবিতার প্রতি ওরকম আকর্ষণ আমার নেই। পড়ি মানে মাঝে মধ্যে এর ওর কবিতা পড়ি ... ।"

এবার সেই লিটমাসঅলা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সাশ্রুনয়নে বলে, "এ আমাদেরই লোক!"

সেই থেকে ভাব তাদের সাথে। উল্টোবাগে বসা মাইগ্রেনরোগী হাবিব ওরফে হেবো, লিটমাসঅলা লিটন ওরফে লেটো, আমার পার্শ্ববর্তী বিশালদেহী নান্টি ওরফে নেন্টো, ফকরুল ওরফে ফুকো, সোলায়মান ওরফে সলু, মোশাররফ ওরফে মশা। আর আমি হয়ে যাই কেদো। সবাই সবাইকে দাদা আর ভাই বলে ডাকি। আমাদের চায়ের দোকানের সাহিত্যিক আড্ডায় এটাই রেওয়াজ। লেটোদা বলে কেদো ভাই, আর কেদো ভাই বলে লেটোদা।

আর একটি মোক্ষম রেওয়াজ আছে বৈকি। কবিতা নিয়ে একদম স্পিক্টিনট। কবিতা প্রসঙ্গ এলেই জরিমানা, এক রাউন্ড করে চা। সেদিন যেমন কোবতে আর কবিতা উচ্চারণ করায় লেটোদাকে দুইবার আর আমাকে, এই সদ্য বাপ্তাইজ হওয়া কেদোভাইকে, একবার চায়ের বিল বহন করতে হয়েছিলো।

কারণ জানতে চাওয়ায় লেটো শুধু বলেছিলো, "আমরা ক-লেখাবিদ্বেষী!"

জানতে পারি, কবিতাকে ক-লেখা বলাই আড্ডার রেওয়াজ।

এরপর বেশ জমে ওঠে। কবিতা এড়িয়ে প্রায়শই আড্ডা চলতে থাকে গড়গড়িয়ে। লেখক, লেখিকা, পাঠক, পাঠিকা, লেখা, পাঠ ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলোচনা চলে পুরি আর চায়ের সাথে।

তবে ঘুরে ফিরে নারীকে ঘিরেই কথাবার্তা চলে বেশি। লেখিকার লেখা পাঠের পাশাপাশি লেখিকাকেও পাঠ নিয়ে মূল্যবান মতবিনিময় হয়। পাঠিকার জন্যে লেখার পাশাপাশি পাঠিকাকেই মাঝে মাঝে লিখে ফেলার নানা কায়দার সুলুকসন্ধান চলতে থাকে।

কয়েকদিন বেশ চলছিলো, আচমকা একদিন সন্ধ্যেবেলা কী যেন কী হলো, লেটো মশা ফুকো সলু হেবো এক বিকট আর্তনাদ করে "ওরে পালা পালা পালা" বলে বেঞ্চ উল্টে দোকান ছেড়ে ভাগলো। নেন্টো একটু শ্লথগতির বলে ভ্যাবলার মতো বসে রইলো আমার পাশে।

বাকিদের এই পালাৎকার বাতাসে মিলিয়ে যাবার আগেই দোকানে প্রবেশ করলেন তিনি।

উচ্চতায় মেরেকেটে সাড়ে চার ফুট হবেন। বিগলিত হাসি মুখে, চোখে এক প্রবল চশমা। নেন্টোকে দেখে তার মুখের হাসিটা চেশায়ারমার্জারের কিসিম ধারণ করলো, গুটি গুটি পায়ে সন্তর্পণে এগিয়ে এসে বসলেন তিনি আমাদের সামনে।

নেন্টো থরথর করে কাঁপতে লাগলো।

তাঁর কান-থেকে-কানে বিস্তৃত হাসিটা এবার আমার দিকে তাগ করে তিনি বললেন, "আড্ডায় নতুন বুঝি আপনি?"

নেন্টোর মুখ থেকে এবার এক রূদ্ধশ্বাস ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরিয়ে এলো, "দৈনিকদা!"

দৈনিক নাম হয় কি না কারো, জানি না, কিন্তু দৈনিকদা নামের লোকটি কিছু বলার আগেই নেন্টো এক হাইজাম্প দিয়ে আমাদের ডিঙিয়ে থপথপিয়ে অদৃশ্য হলো বাইরের অন্ধকারে!

আমি এক বিকট বুক ধুকধুক নিয়ে বসে রইলাম দৈনিকদার সামনে, জবুথবু হয়ে।

দৈনিকদা বললেন, "অধমের নাম দীনবন্ধু মোহাম্মদ। ফ্যাসিবাদী ছোকরাগুলি ইদানীং দৈনিকদা ডাকা শুরু করেছে। আপনার পরিচয়?"

ভয়ে ভয়ে বললাম, "আমার নাম কাদের। বজলুল কাদের।"

দীনবন্ধু মিটিমিটি হেসে বললেন, "নকল নাম। শুনেই বোঝা যায়।"

মেজাজটা চড়ে যায়, বলি, "কেন, অমন ভাবলেন কেন?"

দীনবন্ধু চোখ টিপে বললেন, "আরে আমাকেও তো বাজারে লোকে শুভাত্মা দয়াল নামে চেনে। আপনার আসল নামটা কী?"

ভ্যালা মুসিবতে পড়া গেলো! আমি বলি, "আমার বাজারের জন্যে উলবোনা কোনো নাম নেই। বজলুল কাদের আমার পিতামহদত্ত নাম। এ দিয়েই আমার হাটেমাঠেঘাটে কাজ চলে যায়।"

দীনবন্ধু কথা বাড়ান না আর, সট করে কাঁধের ঝোলা থেকে বার করেন এক তাড়া কাগজ। তারপর বলেন, "শুনুন!"

তারপর তিনি পাঠ করে যান, কবিতা। কবিতাই বটে!

দিন নাই, রাত নাই, আছে শুধু চুকচুকচুক
ফিডারেই দিন কাটে, ফিডারেই রাত কাটা সুখ
করাত ভেবেছো তাকে? সুখ কোনো শাঁখ নয় জেনো
বাজারে জাম্বুরা পেলে গোটা দুই চুরি করে এনো
এলো চুল নেড়েচেড়ে কেলো করে দোতালার ভাবী
রিকশাওয়ালা ছোঁড়া, থাম দিকি, নীলক্ষেত যাবি?
আষাঢ়ে পর্দা টেনে ছোঁড়াছুঁড়ি রিকশায় বসে
আনমনে দেরিদা কি ফুকো পাঠ করে যায় ক'ষে
নামে কী বা আসে যায়, নিকে তার যায় আসে বেশি
সুন্দরী ললনা এসে জামা খুলে টিপে দ্যাখে পেশী
মা-খালারা মার্কেটে কেন মিছে খুঁজে মরে খালু?
ওরে মন চেটে দ্যাখ ডালপুরি সিঙারার আলু

.
.
.
Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

.
.
.


এরপর তিনি দম ন্যান। আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসেন।

তারপর আমার আর কিচ্ছু মনে নেই।

জ্ঞান ফেরে হাসপাতালের বেডে। এক ভীষণদর্শন নার্স, তারপাশে ততোধিক ভীষণদর্শন ডাক্তার, আর একসারি উদ্বিগ্ন মুখ। লেটো, হেবো, মশাকে শনাক্ত করতে পারি।

রিলিজ পাওয়ার পর শুনি, অল্পের জন্যে জানে বেঁচে গেছি। দৈনিকদার পাল্লায় পড়ে নাকি অতীতে অগণিত সম্পাদক, সঞ্চালক, সংকলক, সংগঠন আর সংশপ্তকের অকালমৃত্যু ঘটেছে, কিম্বা তারা উন্মাদ হয়ে গাঁয়েগঞ্জে পাগলের চাকরি নিয়ে চলে গেছে।

আমি দুর্বল হরলিক্সমাঙা গলায় বলি, "কিন্তু এই লোককে তোরা দৈনিকদা ডাকিস কেন?"

হেবো ফিসফিস করে বলে, "রোজ একটা করে ক-লেখা লেখে! দৈনিক!"

শিউরে উঠি। বুঝি কত বড় বাঁচা বেঁচে গেছি।

দৈনিক কবির চেয়ে প্রাণঘাতী আর কিছু নাই।




বাংলাদেশের একমাত্র স্যাটায়ার ম্যাগাজিন "উন্মাদ" এর এপ্রিল, ২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।