Sunday, December 06, 2009

জার্মানির ঠোলা



১.
আমার পৌলিশিক অভিজ্ঞতা অপ্রতুল। পুলিশের সাথে আমার সম্পর্ক লাজুক প্রেমার্থীর মতো, যে মানসপ্রিয়াকে দূর থেকে নির্ণিমেষ নয়নে চোখ দিয়ে গেলে, আর কাছে এলে চোখ সরিয়ে অন্য কিছু দেখতে থাকে বুক ঢিপঢিপ নিয়ে।

প্রথম পুলিশের পাল্লায় পড়ি ক্লাস সিক্সে থাকতে। আমি আর আমার বন্ধু ডাক্তার মোস্তফা (সেও ল্যাদাপ্যাদাগ্যাদা ছিলো তখন) স্কুল থেকে ফিরছি। স্কুলে আমাদের আরেক বন্ধু ইকবাল একটা সুইস নাইফ নিয়ে এসেছে আমাদের দেখাতে। আমরা এরকম একই অঙ্গে এত রূপ অলা ছুরি দেখে মহামুগ্ধ। ইকবালকে বলে মোস্তফা সেই ছুরিখানা আরো পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার জন্যে দিন কয়েকের জন্যে রিমান্ডে নিলো। স্কুল থেকে ফেরার পথে রিকশা পাই না, পাই না, পাই না, যে রিকশাঅলাকে জিজ্ঞাসা করি সে-ই অহঙ্কারভরে ফিরিয়ে দেয় রূপবতী রমণীর মতো। আমি হাঁটছি আর প্রশ্ন করছি, ওবা ড্রাইভার, যাইতায়নি বা (সিলেটে তখন রিকশাঅলাকে ড্রাইভার না বললে তারা মনক্ষুণ্ণ হতো, এখন পরিস্থিতি কী জানি না), আর মোস্তফা হারামীটা পেছনে সেই সুইস নাইফ পকেট থেকে বের করে সব ক'টা ফলা পদ্মকোরকের মতো ছাড়িয়ে মুগ্ধচোখে গিলতে গিলতে হাঁটছে। এক পর্যায়ে সে সেটা বাগিয়ে ধরে এক মহামহিমকে নিবেদন করে বসলো।

আর যায় কোথায়, এক পুলিশ এসে পাকড়ে ধরলো আমাদের দু'জনকে। সে আবার ভূমিপুত্র নয়, প্রমিত ভাষায় প্রশ্ন করলো, "কী করছো তোমরা?"

আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, "রিকশা ঠিক করি।"

"ছুরি হাতে রিকশা ঠিক করো? কোন ক্লাসে পড়ো?" আমাদের ইউনিফর্মেই আজান দিয়ে বলা আছে কোন স্কুলে পড়ি আমরা, কাজেই সে প্রশ্নে আর গেলো না সে।

আমরা ভয় পেলাম। নিজেদের কী হবে সেটা নিয়ে নয়। ছুরিখানা বাজেয়াপ্ত হলে ইকবালকে কী জবাব দেবো সেটা নিয়ে, বালকবয়সে প্রায়োরিটিগুলি অন্যরকম ছিলো, সবারই থাকে।

সৌভাগ্যক্রমে পুলিশের সেই সদস্য হৃদয়হীন ছিলেন না, তিনি ছুরিটা উল্টেপাল্টে দেখে সব ক'টা ফলা বুঁজিয়ে জানতে চাইলেন, কোত্থেকে পেয়েছি, কেন এটা হাতে নিয়ে ঘুরছি, আমরা কে কোথায় থাকি, বাবা কী করেন, ইত্যাদি। আমাদের স্কুলের সুনামের জোরে, কিংবা আমাদের নিষ্কলুষ হাবভাবের জোরে, কিংবা স্রেফ ভাগ্যের জোরেই ছুরিটা আর বাজেয়াপ্ত হলো না, তিনি সেটা হুকুম দিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে আমাদের ছেড়ে দিলেন।

সিলেটে পুলিশের কথ্য নাম ছিলো "খনাই"। সেটার উৎপত্তি "ঠোলা"র মতোই রহস্যঘেরা। সেই খনাই ভদ্রলোক বাস্তবিক একজন ভালো পুলিশ ছিলেন। হয়রানি করেননি, সাবধান করে ছেড়ে দিয়েছেন।

এরপর দীর্ঘদিন বিরহের পর পুলিশের সাথে সাক্ষাৎ পাসপোর্টের তথ্য যাচায়ের সময়। এক কড়া ভদ্রলোক এসে অনেক প্রশ্ন করলেন। পুলিশের "জিজ্ঞাসাবাদ" এর কায়দাটা অন্যরকম, টের পাই সেদিন।

অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় পুলিশ আমাকে উঠতে বসতে চেক করতো। আমার মাথায় কয়েক কেজি চুল ছিলো, মুখে গোঁফদাড়িও থাকতো মাঝে মাঝে, তারা পারলে আমাকে পথেঘাটে ন্যাংটা করে সার্চ করে। বুয়েটের আইডি দেখাই এফবিআইয়ের মতো করে, তারপরও তারা আগাপাস্তলা চেক করে। তবে যেদিন ব্যাগে বইপত্র থাকে, সেদিনই আমি ধরা পড়ি। একদিন মদের বোতল নিয়ে ফিরছিলাম, সেদিন তারা আমায় কিছু বলেনি। অপর্যাপ্ত পরিমাণে নেংটুশ চলচ্চিত্র লেনদেন হচ্ছিলো একদিন, ধরা পড়লে হয়তো আমাকে আর আমার সেই বন্ধুকে নেংটু ইন্ডাস্ট্রির ঢাকা রিজিওনাল ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবেই চালান করে দেয়া যেতো, পেপারে গলায় নামাঙ্কিত কার্ড নিয়ে আমাদের বিপ্লবী মুখচ্ছবি ছাপা হতো, কিন্তু না, সেদিনও পুলিশ আমাদের দেখে স্কুলবালিকার মতো অহঙ্কারী গ্রীবা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলো। সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম, ব্যাগের মধ্যে মীরমদনের কামান নিয়ে ঘোরাফেরা করলেও ঢাকার নাগরিক পুলিশ আমাকে কিছু বলবে না, কাক দেখবে, নক্ষত্র দেখবে, ভালোবাসবে চলিষ্ণু মেঘ আর আশ্চর্য মেঘদল। সে তালাশ করবে আর ঘাঁটবে আর হাঁটকাবে যখন ব্যাগে থাকবে নোটস, বই, প্রেমিকার জন্যে ছোট্ট তুলোট পাণ্ডা-ছানা।

পুলিশের সাথে আরো টুকিটাকি অভিজ্ঞতা আমার আছে, যেমনটা আছে ড়্যাব, মিলিটারি পুলিশ, সেনাবাহিনীর পার্বত্য ইউনিট, বিডিআর আর ডিজিএফআই নিয়ে, কিন্তু অলমিতি বিস্তারেণ।

২.
জার্মানিতে প্রথম পা দিয়েই ইমিগ্রেশন ঠোলার পাল্লায় পড়েছিলাম। শালা আমাকে দিয়ে দোভাষীর কাজ করিয়ে নিয়েছিলো।

দ্বিতীয় যাত্রায় পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়নি বছর দুয়েক। এই গত অক্টোবরফেস্ট শেষে তীরন্দাজ পরিবার আর পুতুল পরিবারকে জ্বালিয়ে একশেষ করে এক দুপুরে উশি ভাবীর রান্না করা মুরগির ঝোল আর গরম ভাত দিয়ে ঠেসে খেয়ে ফিরছি মিউনিখ থেকে, আমি-বদ্দা-হাছিব্বাই-মনিরোশেন, স্টেশনে দুই পাহাড়ের মতো সবুজ জামা পরা ঠোলা আমাদের পথরোধ করলো। হতভাগা মনির এমন ভাব করলো যেন সে শুনতেই পায়নি, দুই ঠোলা তাকে প্রায় কানে ধরে দাঁড় করায় আর কি!

মিউনিখে আমি দুই হাজার তিন সালে বাহান্ন দিন ছিলাম। স্টেশনে গিয়েছি কম করে হলেও কুড়িবার। পথেঘাটে একটিবারও কোনো পুলিশ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। অক্টোবরফেস্টর সময় সেদিন আবার ফেডারেল নির্বাচন, সে উপলক্ষ্যেই বোধহয় নিরাপত্তার কড়াকড়ি, আর আমরাও দেখতে সমর্থ দুষ্কৃতীর মতোই, অতএব থামাও ব্যাটাদের।

পাসপোর্ট নিয়ে এক ধলাপাহাড় চলে গেলো তথ্য যাচাই করতে, আরেকটা একাই আমাদের চারজনকে পাহারা দিতে লাগলো। সাথে টুকিটাকি আলাপ। কে কী করি, কই থাকি, কেন মিউনিখ এলাম, কেনই বা চলে যাচ্ছি, অক্টোবরফেস্ট কেমন লাগলো, সময় যখন আছে তখন আপনারা কি আপনাদের ব্যাগ খুলে দেখাবেন, ইত্যাদি। আমাদের চোখের সামনেই পেরিয়ে গেলো ঘরে ফেরার শেষ ট্রেনের সময়। তার মিনিট দশেক পর পাসপোর্ট ফেরত পেলাম, বাজখাঁই দুঃখ প্রকাশ আর বাকিটা দিন ভালো কাটার শুভকামনা জানিয়ে দুই ঠোলা আরেক অভাগার দিকে তেড়ে গেলো। আমরা অন্য আরেক ট্রেনে চড়ে মাঝামাঝি এক শহরের দিকে রওনা দিলাম, সেখান থেকে গাড়িতে লিফট নেয়ার একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলো বলাইয়ের ইন্টারনেট পরিষেবার কল্যাণে।

গতকাল ভুয়র্তসবুর্গে এক পশলা সচলাড্ডা হয়ে গেলো। এবার আর সাথে পাসপোর্ট আনিনি, সম্বল শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র, ছবিছাড়া। ভুয়র্তসবুর্গ স্টেশনে নেমে নিচে নেমে আসছি আমি, বদ্দা, বলাই-বলাইনী, এক ভীষণদর্শন মুখে-কাপাই-পরানো কুকুরের বল্গা হাতে এক পুলিশ পথরোধ করলেন।

"জার্মান বলতে পারেন কি?"

"পারি।"

"বাহ, বেশ! কোত্থেকে আসছেন?"

চলতে লাগলো জেরা। কোত্থেকে আসছি, কেন আসছি, কোথায় যাবো, কবে ফিরবো, বাহ এবার একটু পরিচয়পত্র দেখান দেখি, আচ্ছা আচ্ছা, আপনি নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে পড়েন? তো দেশে ফিরে গিয়ে কিছু করবেন এ ব্যাপারে? আপনাদের ওদিকে এই শক্তি নিয়ে কেমন কাজ হচ্ছে? আমাদের ভুয়র্তসবুর্গে কিন্তু আপনাদের দেশ থেকে অনেক লোকে আসে পড়তে (কে জানে সত্যি কি না!), উঁহুহু ম্যাডাম, কুকুর দেখে ওরকম সিঁটিয়ে যাবেন না, তাহলে কিন্তু ও ভুল বুঝবে, সবাই শান্ত থাকুন ... । ভ্যাজর ভ্যাজর চলতেই লাগলো, ওয়্যারলেসে কেন্দ্রীয় তথ্য পরিষেবায় আমাদের নাম আর জন্মতারিখ জানিয়ে জানতে চাওয়া হলো আমরা কি ঠিকঠাক নাকি। একটু দেরি হচ্ছিলো, আরেক মহিলা পুলিশ বিকট হাসি দিয়ে বললেন, "কম্পিউটারও তো মানুষ!"

আমি একটু ঝুঁকে জানতে চাইছিলাম, কুকুরটার জাতের নাম কী, অমনি ব্যাটা দুই পা পিছিয়ে গিয়ে ঝুঁকে ওঁত পাতলো। পুলিশ মহিলাটি বিরক্ত হয়ে বললেন, হঠাৎ নড়াচড়া করবেন না, ও ঝামেলা করবে। আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম তারপর, ডয়চার শেফারহুণ্ড (জার্মান শেপার্ড)। দারুণ একটা কুকুর, এক কামড়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারবে যে কাউকে। ছবি তুলতাম, কিন্তু জার্মান পুলিশ ফোটোবান্ধব নয়, আর কুকুরটাও পুলিশ।

হাছিব্বাই যোগ দিলেন এর মধ্যে এসে, তিনিও পাসপোর্ট দেখিয়ে খালাস হলেন। আমাদের আশপাশ দিয়ে যারা যাচ্ছিলো, তাদের অভিব্যক্তি দেখছিলাম মন দিয়ে, সবারই চোখেমুখে একটা ভয় পাওয়া ভাব, কারো কারো মুখে পাশাপাশি ক্ষীণ গর্ব, "হুঁ হুঁ বাবা, খুব তো চেষ্টা করছিলে, পড়লে তো ধরা" গোছের হাসি। আমাদের আটকে রেখে মহিলা পুলিশ সেই ভিড়ও মনোযোগ দিয়ে দেখছে, তবে অন্য কাউকে আটকায়নি।

কেন্দ্রীয় তথ্য পরিষেবায় কোনো খারাপ খবর ছিলো না আমাদের জন্যে, মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে এলাম বালছাল কুশল বিনিময় করে।

ফেরার পথে ট্রেনে আবার আরেক দফা চেক, তবে ভাগ্যভালো ট্রেনে চড়ার পর। ট্রেন মিস করে নিজেকে নিষ্পাপ প্রমাণ করার মতো ভোগান্তি আর হয় না। ভাগ্য খুব খারাপ থাকলে ট্রেন বদলানোর পথে কোনো স্টেশনে এই গিয়ানজামে পড়তে হতে পারে। ট্রেনে বদ্দা আর মনিরোশেনকে এমন বাঘা নজরে ছবি মিলিয়ে দেখতে লাগলো পুলিশ, যেন তারা পাসপোর্টে নিজের ছবির বদলে কোনো ইমোটিকন বসিয়ে এনেছে। এর দরকার ছিলো না হয়তো। আমাদের পাশে বসার কারণে তিন ধলা আদমীকেও তাদের পরিচয়পত্র দাখিল করতে হলো। তারা তাদের কাগজ ফেরত পেলো তৎক্ষণাৎ, আমাদের নামধামজন্মতারিখ আবার ওয়্যারলেস মারফত ভেসে গেলো কেন্দ্রীয় তথ্য পরিষেবা বরাবর, ডের ফোরনামে ইস্ট মিশায়েল আন্দ্রে হেক্টর বেয়ারলিন উনফাল বেয়ারলিন ... গেবোরেন আম ফুয়ন্ফ উন্ড ৎসোয়ানসিখটেন, নুল আখট ... । টুকটাক রসিকতা বিনিময়ও হলো।

আমরা নিঃসন্দেহ হলাম, মনিরোশেনের কারণেই আমাদের এই দুর্ভোগ, কারণ আমরা আগেও বাভারিয়ায় এসেছি তাকে ছাড়া, তখন এমনটা ঘটেনি। ব্যাটার হাবভাব এমনই সন্দেহজনক, এমনই পুলিশাকর্ষী, যে পরবর্তীতে তার সাথে এলে পথেঘাটে একসাথে না চলার প্রস্তাবও বাতাসে ঝুলে রইলো অনেকক্ষণ।

বগির বাকি যাত্রীদের সবাই জার্মান, সন্দেহের ঊর্ধ্বে রয়ে গেলো তারা, আমরা কাগজপত্র ফেরত পেলাম। না, কোনো ঝামেলা নাই।

জার্মানির আরো চারটা প্রদেশে ঘুরিফিরি প্রায়শ, সেখানেও এমন অভিজ্ঞতা হয়নি, কেবল বাভারিয়াতেই এমন অবস্থা। এই হুজ্জতটা যে গায়ের কালাচামড়ার জন্যে হয়েছে, এমনটা হয়তো নয়, কিংবা কে জানে, হয়তো তার জন্যেই। অনেকবার শুনেছি এবং একবার দেখেছি, বাভারিয়ার পুলিশ ধলাচামড়ার স্বদেশীদেরও উঠতে বসতেই চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু তারপরও, বিদেশের পুলিশ পথরোধ করলে মনটা খারাপ হয়। কেবলই মনে হয়, আমাকে নয়, চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে আমার গায়ের রঙটুকুকে, আমার জাতীয়তাকে, আমার গরীব দেশকে, যার সবুজ পাসপোর্ট দেখে দেখে দেশে দেশে পুলিশদের আঁখি না ভরে।


1 comment:

  1. apnar lekha pore apnar shonge dekha korar obhipray probol holo! apnake hotash korte baddho hochchi, e chirkut kono romoni hoste likhito noy!^^

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।