Sunday, November 29, 2009

অন্যরকম



১.



ঢাকায় প্রচুর ভারতীয় টিভি চ্যানেল দেখা যায়, এ কোনো নতুন ব্যাপার না। আমরা আমদানিপ্রবণ জাতি, বিনোদনেরও প্রভূত অভাবে আমরা সবসময় ভুগি, তাই বিনোদনের উপাদান আমদানিতে আমরা উদার। শুনেছি ইন্দিরা গান্ধী তথ্যমন্ত্রী থাকার সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যেদিন ভারতে টেলিভিশন উৎপাদন শুরু হবে, সেদিন থেকে ভারতে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হবে, তার আগে নয়। এই সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা ভারতের মিডিয়াকে পিছিয়ে যে দেয়নি, তার প্রমাণ ঢাকা, কাঠমাণ্ডু, এমনকি তাশখন্দে গেলেও মিলবে।

আমাদের বাসায় হিন্দি সিরিয়ালের তেমন জনপ্রিয়তা না থাকলেও পশ্চিম বাংলার অনুষ্ঠানগুলি বেশ আগ্রহ করে দেখা হয়। একবার কী একটা চ্যানেল বিগড়ে গেলো, আম্মা আর ভাত খেয়ে মজা পায় না। আমি ফাইন টিউন করেও সেই চ্যানেলের হদিশ পেলাম না, আম্মা নিজেই ফোন করে ডিশঅলা ছোকরাকে অস্থির করে ছাড়লো। কী এক মেগা সিরিয়াল সেখানে চলছে, তার পাত্রপাত্রীদের কী হলো না হলো এই দুশ্চিন্তায় আম্মার আর দিন কাটে না। অবশেষে একদিন গায়েবি ইশারায় আবার সেই চ্যানেল সেই সিরিয়ালসমেত ফিরে এলো, আম্মারও ব্লাড প্রেশার স্বাভাবিক হলো।

আম্মার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আমিও পশ্চিম বাংলার কী একটা সিরিয়াল বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখতাম। মোনামি বলে এক অভিনেত্রী আছেন, তিনি বছর ছয়েক আগে আমার দিল বরাবর এক দারুণ চাকু মেরে দিয়েছিলেন, নিশ্চিতভাবেই আল্লা তাকে শনিবার রয়েসয়ে তৈরি করেছিলেন। "মিসেস দাশগুপ্তা"র সেই সিরিয়াল শুরু হলে আমিও আলগোছে দরজা খুলে অবলোকন করতাম একটু আধটু। সুন্দরী মেয়েদের রূপসুষমা উপভোগ করার সময় নাকি আমার চোখের ভাষা পাল্টে যায়, আম্মা এ কারণে আমাকে শান্তিমতো টিভি দেখতে দ্যায় না, খামাখাই ধমকাধমকি করে ভাগিয়ে দ্যায়। টারজানা খান নামে আমাদের দেশের এক সংবাদপাঠিকাও মোনামির মারা চাকুর ক্ষতের এক সেন্টিমিটার পাশেই আরেকটি ভোজালি প্রোথিত করেছিলেন, একটি বিশেষ চ্যানেলে তার সংবাদপাঠ শুরু হলেই আমি টিভির সামনে বসে পড়তাম। আম্মা একদিন এসে আমার গোলগোল চোখ দেখে বললো, এই মেয়েটাকে দেখে তো মনে হয় ওর দুইটা বাচ্চা আছে, তোর রুচি এইরকম কেন? আমি মুগ্ধচোখ না সরিয়ে বলেছিলাম, আমার সাথে বিয়ে হলে চারটা বাচ্চা থাকতো! এর পর থেকে ঐ চ্যানেল ধরলেই আম্মা কোত্থেকে এসে অন্য এক চ্যানেলে অন্য এক প্রোগ্রাম দেখার জন্য হুলুস্থুলু শুরু করে দিতো, আমার রুচির অবক্ষয় ঠ্যাকানোর আপ্রাণ চেষ্টায়।

যাই হোক, পশ্চিমবঙ্গের চ্যানেলগুলিতে বেশ মজার কিছু প্রোগ্রাম হতো, নাম মনে নেই, সেগুলো মাঝে মাঝে দেখা হতো। একটি প্রোগ্রাম এবং তার উপস্থাপককে পরিষ্কার মনে আছে, হাঁউমাউখাঁউ, উপস্থাপক মীর। একটা গেইম শো, সেখানে নানান কান্ডকারখানা হয়, গানবাজনা হুল্লোড় হাসাহাসি, আর মীরের উপস্থাপনার ঢংটা খুবই আকর্ষণীয়। নানা কথাবার্তার ফাঁকে সে বিভিন্ন চরিত্রকে অনুকরণ করে দেখায়, জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়র, বাপ্পী লাহিড়ি, লালুপ্রসাদ যাদব ... আরো অনেককে। ঐ অনুষ্ঠানে মীরের ভাঁড়ামো বেশ পরিমিত ছিলো, সীমার ব্যাপারটা বেশ চমৎকার সামলেসুমলে চলতো সে।


২.



আমাদের আত্মীয়বর্গে পুরুষরা বেশ পুরুষালি, একটা সিংহপুরুষ সিংহপুরুষ ভাব আছে সকলের মধ্যে। ছেলেদের মধ্যে কুসুমকোমল বা ললিত চারু-চারু ভাব দেখলে আমাদের আত্মীয়বর্গের পুরুষরা তো বটেই, মহিলারাও বিরক্ত হন। সেরকম আচরণ কোনো ছেলের মধ্যে দেখলে তার স্বভাবকে বলা হয়ে "মাইগ্যা স্বভাব।" কান্নাকেও তাচ্ছিল্য নিয়ে দেখে সবাই, আমার বাবাকে কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি, আমার ভাইয়েরা দুঃখ পেয়ে কাঁদলে সাধারণত আশেপাশে তিনফিট ব্যাসার্ধের মধ্যে যা কিছু আছে ভেঙে ফেলেন, দুই চারজন গিয়ে তাকে পরাস্ত করতে হয়। হযবরল-র ন্যাড়ার মতো "না না, আমায় গাইতে বোলো না" টাইপ মুদ্রা আমরা এই পারিবারিক সংস্কৃতির কারণেই শৈশব থেকে অপছন্দ করতে শিখেছি। এর ভালো মন্দ বিচার করা আমার জন্যে একটু কষ্টকরই বটে। যাদের এই বৈশিষ্ট্য আছে, আমি গায়ে পড়ে তাদের খোঁচাই না, কিন্তু বিরক্তিও চেপে রাখতে পারি না।

ঋতুপর্ণ ঘোষকে দেখলে এই কারণেই আমার একটু বিরক্ত লাগতো। তার গুণের কদর করতে আমি পশ্চাদপদ নই, কিন্তু তাকে কথা বলতে দেখলে আর শুনলেই অস্বস্তি লাগে। এই এফিমিনেইসি বা নারীসুলভতা সম্পর্কে সেই পারিবারিক পরোক্ষ শিক্ষার কারণেই একটা অবন্ধুতা মনের ভেতরে তৈরি হয়ে গেছে, তাই ঋতুপর্ণকে টিভিতে দেখলে ভুরু কুঁচকে যায়। বুঝতে পারি, তিনি এমনই, কিন্তু মানতে সময় বা প্রচেষ্টা লাগে।

গতকাল অচ্ছ্যুৎ বলাইয়ের বাসায় ঈদ সমাগমে বসে দেখছিলাম ঋতুপর্ণের "অন্তহীন"। এর "যাও পাখি বলো" আর "রাত জাগা তারা" গান দু'টি শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে, নায়িকা রাধিকা আপটেও যাকে বলে আই-ক্যান্ডি বা চোখচুষনি, গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত তাই বসে বসে ঢুলতে ঢুলতে দেখলাম সিনেমাটা। সদলে সিনেমা দেখলে নানারকম মন্তব্য বিনিময় হয়, সবচে "সিরিয়াস" সিনেমাও তার তোড়ে হাস্যরসাত্মক হয়ে ওঠে। ঘরে বসে এই যূথবদ্ধ সিনেমা শেষ পর্যন্ত সিনোমত্ব ছাপিয়ে অধিসিনেমা হয়ে ওঠে এই ফিডব্যাকের চাপে। যেমন এক জায়গায় নায়িকা নিশুতি রাতে চ্যাট করছে নায়কের সাথে, পরস্পরের বাস্তব পরিচয় জানে না তারা, নায়িকা মুখে পেলব সব আদুরে অভিব্যক্তি নিয়ে শুধাচ্ছে নায়ককে, সে হ্যাপিলি ম্যারিড কি না। আমার মনে প্রশ্ন খেললো, হ্যাপিলি ম্যারিড একটা লোক রাতবিরাতে অন্য মেয়ের সাথে চ্যাট করে কি? নায়কের হয়ে আমিই উত্তরটা দিয়ে দিলাম, তুমি কি আমাকে লুল্পুরুষ ভাবছো নাকি? আমাদের হা হা হো হো হি হি তে ঐ রোম্যান্টিক ইন্টারকোর্স ভেসে গেলো, সেইসাথে সিনেমার পরিসীমা ছিঁড়ে-ফেটে ব্যাপারটা যা দাঁড়ালো, সেটাকেই অধিসিনেমা বলছি।

যাই হোক, গোয়টিঙেন থেকে আগত দুই ভারতীয় বাঙালি ছাত্র ছিলেন সেই আসরে, তারা কথায় কথায় জানালেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ হ্যাজ কাম আউট অব দ্য ক্লোজেট, তিনি নিজেকে গে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

অন্তহীন দেখা শেষ করে ইউটিউবে ঋতুপর্ণ ঘোষ লিখে সার্চ করে দেখি প্রথমেই আসে ঋতুপর্ণ আর মীরের সাক্ষাৎকার। বাকিরা ততক্ষণে আরেকটা সিনেমা দেখার তোড়জোড় করছেন, ঠিক করলাম বাড়ি ফিরে দেখবো নাহয়।

বাড়ি ফিরে দেখি, মীর নতুন একটা প্রোগ্রাম শুরু করেছে কোনো একটা চ্যানেলে, তার বিভিন্ন পর্ব ইউটিউবে আপলোড করা আছে। কয়েকটা পর্ব দেখে বুঝলাম, সময়ের সাথে মীরের উপস্থাপন একটু লঘু হয়েছে, আর হাস্যরসের প্রকৃতিও একটু ঠেলছে ভব্যতার পরিধিকে। এবং সেখানেই দেখলাম, মীরের মিমিক্রির তালিকায় ঋতুপর্ণ ঘোষ উঠে এসেছেন। নিচে দু'টো উদাহরণ এমবেড করলাম।

১.

.
.
২.

.
.


এরপর দেখলাম ঋতুপর্ণের নিজস্ব টক শোতে মীরের সাথে তার আলাপচারিতা। পাঁচপর্বের এই সাক্ষাৎকারটা উপভোগ্য নানা কারণে। একজন এফেম রেডিও জকি থেকে কীভাবে মীর উপস্থাপনায় স্ট্যান্ড আপ কমেডির মিশেল দিয়ে নতুন একটা হাস্যরসের ধাঁচ তৈরির পায়োনিয়ার হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তা নিয়ে বেশ আগ্রহোদ্দীপক আলাপ আছে। একজন ব্লগারের সাথে একজন রেডিওরাখালের বেশ মিল আছে, দুটি মাধ্যমেই ফিডব্যাকের মাধ্যমে অডিয়েন্সের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ঘটে, আবার দুটি মাধ্যমেই কর্তা অডিয়েন্সের চোখের আড়ালে থাকেন। এই যে দৃষ্টির অন্তরালে থাকা দু'টি পক্ষ একজন আরেকজনকে প্রভাবিত করে চলছে, এই ব্যাপারটি আমার জন্যে বেশ আগ্রহজাগানিয়া। বাংলাদেশে এফেম রেডিও একটা তুলনামূলকভাবে নতুন ঘটনা, এবং আমাদের দেশে নিজস্ব ঘরানা তৈরির পরিবর্তে তৈরি সামগ্রী আমদানির মনোবৃত্তি যেহেতু অধিকতর শক্তিশালী, তাই এই মাধ্যমের রেডিওরাখালরাও প্রশিক্ষিত হয়েছেন ভারতীয় প্রশিক্ষকের হাতে, তাই মীরের মতো স্বশিক্ষিত রেডিওরাখাল দেশে এখনও তৈরি হয়নি, সাক্ষাৎকারটি আগ্রহোদ্দীপক সে কারণেও।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ মীরের অনুকরণচর্চা নিয়ে বেশ তীব্র বক্তব্য রেখেছেন, সেটা শুনে দেখার মতো। তার তর্কের ভঙ্গিটা বেশ ধারালো, গোটা সাক্ষাৎকারে মীর নিজেও বোঝেনি, কখন কীভাবে সে ঋতুপর্ণের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে। যদিও দু'জনের সাথেই দ্বিমত পোষণ করার মতো বেশ কিছু জিনিস পেলাম, কিন্তু সব মিলিয়ে সাক্ষাৎকারটি তথ্যবহুল, ভাবনাউদ্রেককারী এবং উপভোগ্য। প্রথম পর্বটা নিচে এমবেড করে দিলাম, বাকি চারটা আপনারা ইউটিউবেই পর পর পেয়ে যাবেন।




খেদের সাথে একটা জিনিস মাঝে মাঝেই অনুভব করি, দেশে আমরা যতটা বহির্বিশ্ব দিয়ে প্রভাবিত, ঠিক ততটাই যেন আত্মগুণবিমুখ। অন্যের ছাপ্পা মারা জিনিস ‌আপন করে নিয়ে আমরা যতটা উল্লসিত, ঠিক ততটাই রহিত নিজস্ব ব্র্যান্ডিঙে। আমাদের গজগামিনী তিশমারা নড়তে পারে না, কিন্তু শাকিরাকে অনুকরণের চেষ্টায় এতটুকু অনধ্যবসায়ের পরিচয় দেয় না। আমরা মূলরসটাকে অনুকরণ করতে চাই না, করি উপসর্গ আর প্রান্তিক মুদ্রা-লক্ষণগুলোকে। অথচ আমাদের কি কোনো নিজস্ব ভঙ্গিমা নেই, গ্ল্যামার নেই, আবেদন নেই, যা অন্যের জন্যে অনুকরণীয় হয়ে উঠবে? আছে, আমি নিশ্চিত, কিন্তু আমাদের মধ্যে তা খুঁজে বেছে সামনে তুলে ধরার চেষ্টাটা চোখে পড়ে না। শেষ বিচারে মনে হয় ভোক্তা খোঁজে মৌলিকত্ব, কারণ অনুকৃত পণ্য, হোক সে গান-নাটক-রেডিও-সিনেমা, আবেদন হারায় যখন মূল পণ্যটি পাশাপাশি চলমান ও সুপ্রাপ্য হয়। মূল ঋতুপর্ণ তাই প্রবল আত্মবিশ্বাস আর দম্ভ নিয়ে অনুকারী মীরের মিমিক্রিকে পিষে ফেলতে পারেন।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।