Monday, November 23, 2009

হিউস্টন, উই হ্যাভ আ প্রবলেম



১.


নাচ শেষ করে মঞ্চের আড়ালে ফিরবার পথে নাদিয়ার বুক দুরুদুরু করে ওঠে। বন্ধু শিবানীর হাত খামচে ধরে সে।

"শিবা, দেখরে নি!" কাঁপা গলায় বলে নাদিয়া।

শিবানী বেশ লম্বাচওড়া, নাদিয়ার মতো ছিপছিপে পল্লবিনীলতা নয়, তাছাড়া নাচ শেখার পাশাপাশি সে স্পোর্টসেও দক্ষ, শটপুটে প্রাইজ পেয়েছে কলেজ জীবনে, নাদিয়ার দৃষ্টি অনুসরণ করে লোকটাকে দেখে সে আপাদমস্তক।

"খেগু বে ইগু?" নিচু গলায় প্রশ্ন করে শিবানী, তার হাতের মুঠি পাকানো।

ছোটখাটো লোকটার মাথায় চুল কম, কিন্তু বড় জুলফি। চোখে চশমা। টিশার্টের আড়ালে ভুঁড়ির আভাস। হাতে একটা ডিজিটাল ক্যামেরা, মীর জুমলার কামানের মতো বিশাল তার লেন্স।

"ইগুর কতা কইসি নানি বে? খিতা জিগাইরে! লাগের ই বেটায় আমারে ফলো খরের!" নাদিয়ার গলা কেঁপে ওঠে অস্বস্তি আর আশঙ্কায়।

লোকটা নির্ণিমেষ নয়নে তাকিয়ে আছে নাদিয়ার দিকে।

শিবানী নাদিয়ার হাত ধরে টান দেয়। "আয় বে, জাইগি! ইস্টেজর মাজে উবাইয়া খিতা খরতে?"

নাদিয়া একটু লজ্জিত হয়ে দ্রুত পায়ে চলে আসে স্টেজের পেছনে। প্রোগ্রাম শেষ তার। বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছে না তার। তাড়াহুড়ো করে নূপুর খুলে ব্যাগে ভরে পার্কিঙের দিকে পা চালায় নাদিয়া, পাশে শিবানী, ইতিউতি চাইছে আশেপাশে। নাহ, সেই লোকটাকে আর দেখা যাচ্ছে না।

২.


লোকটাকে নাদিয়া প্রথম খেয়াল করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে। বন্ধুদের সাথে জোর আড্ডা হচ্ছিলো, হা হা হি হির ফাঁকে সে লক্ষ্য করে, একটা টেবিলে এক কাপ চা নিয়ে বসে আছে লোকটা, চেয়ারে হেলান দিয়ে, হাত দু'টো মাথার পেছনে। স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলো নাদিয়ার দিকে। কেমন অশুভ একটা ভাব তার মুখে, যেন চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে নাদিয়াকে! অসভ্য ছেলে সে কম দেখেনি ছেলেবেলা থেকে, কিন্তু এই লোকটা তো ছেলে নয়, দস্তুরমতো লোক! দেখলে তো মনে হয় বিয়েশাদিও করেছে, ছেলেপুলেও আছে! তারপরও কেন এইভাবে ইউনিভার্সিটিতে এসে জুলজুলিয়ে তাকিয়ে থাকবে সুন্দরী মেয়েদের দিকে?

নাদিয়ার দিকে চেয়ে থেকেই ধীরে ধীরে পকেট থেকে মোবাইল বার করে কী যেন বলছিলো লোকটা। নাদিয়া ত্রস্তপায়ে বেরিয়ে এসেছিলো ক্যান্টিন ছেড়ে।

পহেলা বৈশাখে কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইতে উঠেছিলো নাদিয়া, গানের গলা খারাপ নয় তার, বৃন্দসঙ্গীতে কাজ চালানোর মতো গাইতে সে জানে। সেই অনুষ্ঠানে গানের ফাঁকে নাদিয়া দেখতে পায়, সেই লোকটা! ক্যামেরা বাগিয়ে ছবি তুলে যাচ্ছে! অমঙ্গল আশঙ্কায় নাদিয়ার আত্মা কেঁপে উঠেছিলো। কী চায় লোকটা?

বাবাকে বলেনি সে কিছুই। কিন্তু আজ নাচ সেরে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে তার মনে হয়, বাবাকে সব খুলে বলা উচিত।

৩.


কয়েক দিন কাটে, লেখাপড়ার ব্যস্ততায় নাদিয়া আস্তে আস্তে ভুলে যায় লোকটার কথা।

কিন্তু একদিন "বইপত্র" থেকে আনোয়ার সাদাত শিমুলের "অথবা গল্পহীন সময়" কিনে বের হবার পথে নাদিয়া চমকে ওঠে ভীষণ। তার শ্যামলা মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে পলকে। সেই লোকটা! আজ তার পরনে ফতুয়া, গলায় মোটা রূপালি চেইন ... আর হাতে সেই ক্যামেরা।

নাদিয়া প্রায় ছুটতে থাকে ডানদিকে, মহিলা কলেজের দিকে। একবার পেছন ফিরে তাকায় সে, লোকটা পিছু নিচ্ছে কি না দেখতে। না, একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তার দিকে চেয়ে আছে লোকটা। ঐ তো! মোবাইল বার করলো! কাকে ফোন করে সে? কী চায় সে?

নাদিয়া ভীষণ ভয় পায়।

৪.


নিশুতি রাত।

দোতলায় নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছে নাদিয়া।

পানির পাইপ বেয়ে নিঃশব্দে ঘরে ঢোকে এক ছায়ামূর্তি। ছোটোখাটো, লম্বা জুলফি, ভুঁড়ি আছে। ঘরে ঢুকে প্রথমে নিঃসাড়ে কান পাতে সে, কোথাও কোনো শব্দ নেই।

পা টিপে টিপে নাদিয়ার খাটের দিকে এগোয় লোকটা। নাদিয়া কুঁকড়েমুকড়ে শুয়ে আছে এক পাশ ফিরে, গভীর ঘুমে অচেতন, কাঁথা সরে গেছে তার গা থেকে।

খুব সাবধানে নাদিয়ার গায়ে কাঁথা তুলে দেয় লোকটা। কাঁথার ওম পেয়ে নাদিয়া এবার চিৎপাত হয়ে টানটান শোয়।

কোমরের পাউচ থেকে এবার লোকটা বার করে একটা ফিতা!

ফিতা দিয়ে নাদিয়ার মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাপে সে।

তারপর মোবাইল তুলে আলগোছে ডায়াল করে একটা নাম্বারে। ফিসফিস করে বলে, "তেষট্টি ইঞ্চি, ওভার!"

ওপাশ থেকে জবাব আসে, "চেকিং! ওভার!"

লোকটা অপেক্ষা করে।

ওপাশ থেকে আবার কথা ভেসে আসে। "ঠিকাছে। গ্রেটার দ্যান পাঁচ ফুট, লেস দ্যান পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি। কম্পিউটার বলছে সব ওকে! ওভার!"

লোকটা ফিসফিস করে বলে, "অখন খিতা খরতাম তে?"

ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বর বলে, "রিট্রিট! ওভার!"

লোকটা বলে, "রজার দ্যাট! উইলকো! ওভার অ্যান্ড আউট!"

লোকটা ঘুরে দাঁড়ায় জানালার দিকে, এমন সময় নাদিয়ার ঘুম ভেঙে যায়! সে দেখতে পায়, ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে সেই লোকটা! এক দারুণ ত্রাস গ্রাস করে তাকে, সে প্রবল আর্তনাদ করে ওঠে, "ঈঈঈঈঈঈঈঈঈ! আব্বা গোওওওওও! মারি লাইলো!"

নিচে একটা হুটোপুটির শব্দ শোনা যায়, তারপর এক জোড়া পা ধুপধাপ করে উঠে আসতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে। লোকটা বুঝতে পারে, এই পায়ের মালিক অবব্রিগেডিয়ার সফদার জং বাহাদুর না হয়েই যায় না!

কাঁপা হাতে মোবাইল তুলে সে ডায়াল করে, তারপর বলে, "হিউস্টন, আলবাব খইরাম! উই হ্যাভ আ প্রবলেম!"




আজ নজমুল আলবাবের জন্মদিন। জন্মদিনে তাকে শুক্না কাঁথার শুভেচ্ছা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দেবো না। আমার ঘটকালির কাজে সে এক শতাংশও অগ্রসর হয় নাই। সুন্দরী সিলটি পাত্রীদের নিয়ে সে মাস্তি করে বেড়ায় এদিক সেদিক, কিন্তু আমি বিয়েশাদির প্রসঙ্গ তুললেই সে অসুস্থ থাকে, সুন্দরবন যায়, ব্যস্ত থাকে, ছেলের স্কুল থাকে, বৌয়ের অফিস থাকে, আর এইসব কিছু তামাদি হয়ে গেলে তার বাপজান তাকে জরুরি কাজে বাইরে পাঠান। এহেন একজন পাপাত্মাকে আর যাই হোক, শুক্না কাঁথার শুভেচ্ছা জানানো যায় না! আপনারা কেউ জানাতে চাইলে জানাতে পারেন, হিউস্টনের তাতে কোনো সমস্যা নাই!

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।