Wednesday, November 18, 2009

মেঘদলের শহরবন্দী


১.
জ্যারেড ডায়মন্ড তাঁর কোনো একটা বইতে [থার্ড শিম্পাঞ্জি সম্ভবত] পাপুয়া নিউগিনিতে এক অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছিলেন। বলে রাখা ভালো, "সভ্য" জগতের কাছে পাপুয়া নিউগিনি আবিষ্কৃত হয়েছে, একশো বছরও পেরোয়নি। বলা চলে, যন্ত্রসভ্যতা থেকে সুদীর্ঘ সময় দূরে থেকে পাপুয়া নিউগিনি একটা সময় আদিম মানব সমাজের একটা কপি হিসেবে বিবেচিত হতো দীর্ঘদিন। পাপুয়া নিউগিনির অনেক অঞ্চলে এখনও বহিরাগতদের পা পড়েনি, তাই ধরে নেয়া যায়, আজ থেকে তিন দশক আগে ডায়মন্ড যখন তাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তখন তারা অসংখ্য ছোটো ছোটো আদিম গোত্র হিসেবেই ছিলো। ডায়মন্ড দেখেছিলেন, এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের সমানসংখ্যক মানুষের দেখা হলে তারা সাধারণত বসে আলোচনা করে, উভয়পক্ষের পরিচিত কোনো লোক আদৌ আছে কি না। তা না হলে, পরিচিতদের পরিচিত কেউ। তা-ও না হলে, পরিচিতদের পরিচিতদের পরিচিত কেউ ...। এই আলাপে আসলে উঠে আসে একটা কারণ, কেন এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ধরে খুন করবে না। জ্যারেড ডায়মন্ড একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ধর্মের উদ্ভবও অনেকটা এমনই, যখন ঘনসন্নিবিষ্ট গোত্রগুলি পরস্পরের সাথে সংঘাত কমিয়ে আনার জন্যে অভিন্ন কোনো টোটেমের আশ্রয় নিতো। যেন ডক্টর ইইইভল বলছে অস্টিন পাওয়ারসকে, "উই আর নট সো ডিফরেন্ট .. ইউ অ্যান্ড আই!"

গান নিয়েও গানশোনা মানুষের স্পর্শকাতরতা বেশি, অনেকটা টোটেমের মতোই ব্যাপারটা। গানের রুচি ভিন্ন হবার কারণে এমন মানুষকেও অপরের সাথে রূঢ়তম আচরণ করতে দেখেছি, যে হয়তো পারতপক্ষে গলা চড়িয়ে কথাও বলে না। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এক একটা গান মানুষের স্মৃতির এক একটা বড় চাঙড়ের সাথে জড়িয়ে থাকে, সেই গান সম্পর্কে অপরের প্রতিক্রিয়া শুনলে মানুষের সেই স্মৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতায় আঘাত পড়ে। উদাহরণ দিই, একটা পুরনো দিনের হিন্দি গান আছে, হাম তুম ইয়ে বাহার, দেখো রং লায়া পেয়ার, বরসাত কি মাহিনে মে। এই গানটার সাথে আমার টিনটিন ইন টিবেট পাঠের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যখনই এই গানটা আমি শুনি, আমার সেই দিনটার কথা মনে পড়ে। শুধু ঐ একটা দিন নয়, আমি ঐ সময়টায় ফিরে যাই। আজ কেউ যদি বলেন, এই গানটা একটা বালের গান (গানটা খুব আহামরি ভালো কিছু নয়), তাহলে আমার ঐ স্মৃতিসংযোগটুকুতেও আঘাত লাগবে।

কিন্তু এই ছাড়টুকু আমাকে দিতে হবে, কারণ আমি আশা করতে পারি না, ঐ গানের সাথে অন্য কারো সুখস্মৃতি জড়িতে থাকবেই থাকবে। আমার প্রিয় বহু গান নিয়ে আমি বন্ধুদের মুখে কটূক্তি শুনেছি, কিন্তু আমার বলার কিছু নেই, কারণ গান সম্পর্কে ভালো লাগা বা মন্দ লাগার পূর্ণ অধিকার সকলে সংরক্ষণ করে। আহত হই বা বিরক্ত হই, যখন গান ভালো বা খারাপ লাগার ঔচিত্য নিয়ে কথা হয়। আমার কোনো গান ভালো লাগলে কেন তা আমার ভালো লাগলো, সেটা ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতা আমার নেই, তেমনি খারাপ লাগলেও কোথাও কৈফিয়ত জমা দেবার প্রয়োজন আমার হবে না। কিন্তু দেখেছি, এই ভালো লাগা আর খারাপ লাগা ব্যাপারটা নিয়ে পাশাপাশি থাকা একটা খুব কঠিন কাজ। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে বিদ্রুপ করেন, তারপর তিক্ততা শুরু হয়, এবং তা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া থামে না।

ধর্ম নিয়ে আমরা সংবেদনশীল, কিন্তু গানের ব্যাপারে আমাদের সংবেদনশীলতা প্রায় ধর্মবোধের কাছাকাছিই। পাপুয়া নিউগিনির ঐ লোকগুলি কিন্তু "অসভ্য" নয়, তারা খুনোখুনি করে জৈবভৌগলিক সংস্কৃতির কারণে, টেরিটোরিয়ালিজম বা অঞ্চলকাতরতা সেখানে টিকে থাকার জন্যে একটা অবশ্যপালনীয় শর্তের মতো। গানের ছুতোয় বকাবকি গালাগালি মারামারি পর্যন্ত দেখেছি, যদিও আমাদের এমন কোনো শর্ত মানতে হয় না।

২.
পাপুয়া নিউগিনি পর্যন্ত হাতড়ে লেখা দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার কারণ হচ্ছে, "মেঘদল" নামের গানের দলটার অ্যালবাম "শহরবন্দী" আমার কাছে ভালো লাগেনি। সচলায়তনে আমার পাঠকেরা আমাকে কিছু কড়া কথা শোনানোর আগে তাই ইস্পাতের অন্তর্বাস পরে নিলাম। অবশ্য বেহুলার বাসরও লৌহনির্মিত ছিলো, তাই খুব আশাবাদী থাকছি না।

আমার কাছে মনে হয়, গান ভালো লাগে চারটা কারণে। এক, যদি গানটা কোনো সুখময় ঘটনার সাথে গেঁথে যেতে সক্ষম হয়। দুই, যদি গানটা বিক্ষিপ্ত, আহত মনে পুল্টিশ লাগাতে পারে। পরবর্তীতে এই পুল্টিশের স্মৃতি শ্রোতার মনে টোটকার মতোই কাজ করে। তিন, যদি গানটার কথা ভালো লাগে। অধিকাংশ রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এই ক্যাটেগোরিতে রাখা যায়। চার, যদি গানটার সুর ভালো লাগে, যেমন এ আর রাহমানের বেশ কিছু গান, সেগুলির লিরিক্স নিতান্তই রান-অফ-আ-মিল (এর বাংলা কী করা যায়? কলের সেমাই?), সুরের গুণে উতরে গেছে এবং মনে ছাপ ফেলেছে। আর পরিস্থিতি ভেদে এই চার কারণের মধ্যে যে কোনো সংখ্যক কারণের মিশ্রণে বহু যৌগ কারণে কোনো গান ভালো লাগতে পারে।

মেঘদলের নাম আমি শোনার আগে কয়েক বছর আগে দেখেছি পোস্টারে, "বৃষ্টি ও মেঘদলের গান" শিরোনামে। সম্ভবত তারা সেই একই মেঘদল। ভিন্ন মেঘদল হলেও আমার আপত্তি নেই। মেঘদলের দুই কণ্ঠশিল্পীর মধ্যে একজনের কণ্ঠ দুর্ধর্ষ। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে আমি তাঁর নাম জানি না, তাই বাধ্য হয়ে তাঁকে সুকণ্ঠ বলে ডাকবো। দ্বিতীয় যিনি গাইছেন, তিনি দুষ্কণ্ঠ নন। সুকণ্ঠ থেকে তাঁকে আলাদা করার জন্যে তাঁকে ডাকছি অন্যস্বর।

সুকণ্ঠের গাওয়া গানগুলির মধ্যে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে "নির্বাণ" আর "রঙিন ফেরেশতা"। তাঁর কণ্ঠের সাথে এই দু'টির সুর আর কথার ত্রিবেণীসঙ্গম সবচেয়ে যথাযথ হয়েছে বলে মনে হয়েছে। গান দু'টির সাথে সহকণ্ঠ আর অর্কেস্ট্রেশন মিশেছে মসৃণভাবে। গান দু'টি সহজ, ছিমছাম, অনাড়ম্বর ... কাঁচের চুড়ির মতো।


নির্বাণ




কিছু বিষাদ হোক পাখি
নগরীর নোনা ধরা দেয়ালে
কাঁচপোকা সারি সারি
নির্বাণ, নির্বাণ ডেকে যায় ।।

কিছু ভুল রঙের ফুল
ফুটে আছে আজ পথে
কিছু মিথ্যে কথার রং
আমাদের হৃদয়ে ।।

এখনও এখানে নীরবে দাঁড়িয়ে
অগণিত প্রতিশোধ জাগে আত্মার ভেতরে
কিছু মাতাল হাওয়ার দল
শোনে ঝোড়ো সময়ের গান
এখানে শুরু হোক রোজকার রূপকথা

কিছু বিষাদগ্রস্ত দিন
ছিলো প্রেমিকার চোখে জমা
আলো নেই, রোদ নেই, কিছু বিপন্ন বিস্ময়
ক্ষমাহীন প্রান্তর জুড়ে আমাদের বেঁচে থাকা




রঙিন ফেরেশতা




মন গেছে মেঘের বাড়িতে
আকাশ দিয়েছে ডুব
মাতাল তারা রাতের সাথে
হেসেই হবে খুন।

আমার সারা গায়ে
তোমার শহরের ধূলো মেখে
জ্বলছি বিপুল অন্ধকারে
একই রাস্তায়, একই পৃথিবীর জলে
জ্বলছি বিপুল অন্ধকারে

শহরের কাছে রেখেছি জমা
ময়লা জামার দাগ
রঙিন ফেরেশতা উড়ে বসে ভাবনায়
চাঁদের ব্লেডে যাচ্ছে কেটে মুহূর্ত মুহূর্ত
রঙিন ফেরেশতা উড়ে বসে ভাবনায়



অন্যস্বরের গলায় খাপ খেয়েছে "চার চার চৌকো" গানটা। কিন্তু গানটার মধ্যে "কিক" নেই। মন্থর, গানের কথাও ঢিলেঢালা। কিন্তু শিল্পীর অন্য দু'টি গানের তুলনায় ("আবার শহর" আর "ঠিক ঠাক") এই গানের জন্যে তাঁর কণ্ঠ বেশি লাগসই মনে হয়েছে।



চার চার চৌকো জানালায়
আমায় দেখে হাতটা বাড়ায়
আকাশ দেখে দিচ্ছি ছুট
মাথার ভেতর শব্দজট
আমার চোখে লাগায়
চার চার চৌকো জানালায়

আকাশ আমার
আমি তোমার কাছে যাবো
আমার চৌকো আকাশ
আমি তোমার ... চার চার চৌকো জানালায়


ওপরের গানটার সাথে এটার তুলনা করলে বোঝা যাবে, গানটায় কেন "কিক" নেই।

শ্রোতার কানে "শহরবন্দী"র সম্পদ বোধহয় এর বাকি গানগুলিই। ফোনে, স্কাইপে, মেসেঞ্জারে, ফেসবুকে শুনছি আর দেখছি অন্য গানের পংক্তিগুলোই। কিন্তু গান হিসেবে আমার ভালো লাগেনি, মনে হয়েছে কবিতায় সুর দেয়া হয়েছে, কিন্তু তারা যেন একে অন্যের সাথে মেশেনি। সব কবিতা লিরিক্যাল হয় না বোধহয়। মেঘদলের এই অ্যালবামের বাকি গানগুলোতে হঠাৎ হঠাৎ চমৎকার কিছু পংক্তি ছিটকে বেরিয়ে এসেছে গান থেকে আলাদা হয়ে। তার কাব্যগুণের প্রশংসা না করে পারি না, কিন্তু সঙ্গীতগুণে স্পৃষ্ট হই না। তবে একটি বৈশিষ্ট্য প্রায় প্রতিটি গানেই স্পষ্ট, পারকাশন খুব চমৎকার। "মুঠোফোন" গানটি যেমন, অর্কেস্ট্রেশন চমৎকার, শিল্পীর স্পষ্ট, ভরাট উচ্চারণে গাওয়া গান, কিন্তু "হ্যালোজেন রোদ চিলতে বারান্দায় টিকটিকি তাই বলছে ভবিষ্যৎ" অংশে এসে গানটা তার শুরুর মাধুর্য হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হয়েছে। "রোদের ফোঁটা" গানটির অর্কেস্ট্রেশন এক কথায় চমৎকার, কিন্তু মন্থর লয়ে সুর ভালো লাগেনি। "দূর পৃথিবী" গানটি শুরু হয়েছে চমৎকারভাবে, কিন্তু সুর পড়ে গেছে কিছুদূর যেয়ে। "কুমারী" গানটিকে মনে হয়েছে "তোমাকে প্রেমের আগে তোমার প্রেমকেই ভালোবাসি" পংক্তিটিকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠা একটি গান। ভালো লাগেনি "পাথুরে দেবী"। "শহরবন্দী" গানটির কথা, সুর, পরিবেশন সবই সুন্দর, কিন্তু এই গানটিই হয়তো পরের প্যারায় যা বলতে চেয়েছি, তার সারাংশ ধারণ করে, তাই ভালো লাগে না, চাপ লাগে বুকে।

বিষাদ গানের অন্যতম উপকরণ, মানুষ সবসময় কাঁদতে পারে না বলেই গান শোনে বা গান গায়। কিন্তু এই গানগুলি একটু মন দিয়ে শুনলে টের পাওয়া যায়, দুয়েকটা বাদে বাকি গানগুলিতে বিষাদ নেই, একটা আশ্চর্য হাল-ছেড়ে-দেয়া নৈরাশ্যবাদিতা আছে। গানগুলোর চোখে অশ্রুর আভাস নেই, ঠোঁটের কষে মার খাওয়া রক্তের দাগ আছে। বেশির ভাগ গানের কথাই শহরের হাতে বন্দী, সেসব গানে শহর ভিলেন, সেসব গানে শহর প্রত্যাক্রান্ত হচ্ছে শিল্পীর হাতে। নাম না বললেও এই শহরকে চিনি খুব ভালো করেই, বাংলাদেশে এমন নিষ্ঠুর, এমন কদর্য শহর আর দু'টো নেই। এই শহর মানুষকে নষ্ট করে এখন কবির ওপর চড়াও হয়েছে। এই শহরের ওপর অভিমান-মাৎসর্য্যের সময় মনে হচ্ছে ফুরিয়ে এসেছে, এই শুয়োরের বাচ্চা শহরকে লাত্থি মেরে চূর্ণ করে দেয়া দরকার।

শহরবন্দী নামটি খুব মানানসই হয়েছে অ্যালবামের জন্যে, কিন্তু গান কি শহরবন্দী হওয়া উচিত? এই শহরের মানুষ কি তাহলে নিজের ঘরে, চলতে ফিরতে এমপিথ্রি প্লেয়ারে, খোলা আকাশের নিচে সমাবেশে এই নৈরাশ্যে মাখা গান শুনে যাবে? কবিতা অনেকরকম, কিন্তু গান কি আসলেই অনেকরকম? গান বিষাদের হোক, হর্ষের হোক, ক্রোধের হোক, কিন্তু নিরাশাশ্রয়ী না হোক। মেঘদলের কবিরা যখন গান লিখছেন, এই কথাটি অন্তত বিবেচনা করুন।

তাঁদের পরবর্তী অ্যালবামের গানগুলি আগ্রহভরে শুনবো।




গানগুলি শুনেছি রায়হান আবীরের সৌজন্যে। তাকে ধন্যবাদ জানাই।


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।