Sunday, November 01, 2009

ফুটোস্কোপিক ০১৬



ফুটোস্কোপিক গল্প হচ্ছে ফুটোস্কোপ দিয়ে দেখা গল্প। সামান্যই দেখা যায়।




"মিলুদা, কই, লেখা শেষ হোলো?"

জীবনানন্দ হাসিমুখে ঘাড় নাড়েন। পাড়ার ছোকরাগুলি কয়েকদিন ধরে খুব জ্বালাচ্ছে।

দিন কয়েক আগে তিনি বাজারের মোড়ে ব্যাটাদের কথাচ্ছলে জানিয়েছিলেন তাঁর কবিতার কথা।

"এই কবিতাটা, বুঝলে, অনেক লোকে মনে রাখবে।" মৃদুস্বরে বলেছিলেন জীবনানন্দ।

"কবিতার নাম কী রাখলে মিলুদা?"

"বলবো, আগে লিখে শেষ করি।" স্মিতহাস্যে জবাব দিয়েছিলেন জীবনানন্দ।

সেই ছোকরাগুলিই আজ বাড়ি পর্যন্ত উজিয়ে এসেছে কবিতার খোঁজে।

তা কবিতাটা শুরু হয়েছে বেশ। খাতাখানা খুলে জীবনানন্দ মৃদু গলায় কবিতা আবৃত্তি করে চলেন।

"তিরিশ বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
বঙ্গোপসাগর থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি ; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;"


এক ছোকরা খ্যা খ্যা করে হেসে উঠলো এটুকু শুনেই।

জীবনানন্দের মুখ লাল হয়ে যায়। "হাসছিস কেন রে ইষ্টুপিট? য়্যাঁ?"

ছোকরা বহুকষ্টে হাসি থামায়। "হবে না গো দাদা, হবে না।"

জীবনানন্দ রুষ্ট কণ্ঠে বলেন, "হবে না মানে? কী হবে না? আর হবে কি হবে না তা বলার তুই কে?"

ছোকরা হাসে। বলে, "আমি পাঠক। পাঠকের আত্মায় ঘা দেবেন না।"

জীবনানন্দ বলেন, "ঘা দিলাম কোথায় আবার রে রাস্কেল?"

ছোকরা হাসে। বলে, "মোটে তিরিশ বছর হাঁটলে চলবে? আরো বাড়ান। আজকালকার জমানা অন্যরকমের গো দাদা। এটা হচ্ছে থ্রিলিং থার্টিজ! লোকে এখন এভারেস্টে চড়তে চায়, দক্ষিণ মেরুতে কচুরির দোকান খুলতে চায়। চারদিকে মাচোম্যানগিরির জয়জয়কার। আর আপনি মোটে তিরিশ বছর ধরে হাঁটবেন?"

জীবনানন্দ একটু কাঁচুমাচু মুখে ভাবেন, ঠিকই তো। "তো কী করতে বলিস? তিরিশ কেটে শতেক বসিয়ে দেবো? শতেক বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি ... ?"

ছোকরা কঠোর মুখে মাথা নাড়ে। "উঁহু। আরো চড়ান।"

জীবনানন্দ অসহায় মুখে বলেন, "আরে ছন্দ মিলতে হবে তো!"

ছোকরা ফস করে একটা বিড়ি ধরায়, ডেঁপো বদমায়েশ আর কাকে বলে! "তিরিশ কেটে হাজার করুন।"

জীবনানন্দ বিড়বিড় করে বলেন, "হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে ...।"

ছোকরা মাথা নাড়ে। "এই তো! দেখুন না, কী ঝাঁঝ! হাজার বছর ধরে আপনি পথ হাঁটিতেছেন পৃথিবীর পথে! ট্রাম বাস রেলের পরোয়া করছেন না! এই যে গোঁয়ারগোবিন্দ পথিকাত্মা, এটাই পাঠকের মুখে কষে এক চড় বসিয়ে দেবে!"

জীবনানন্দ ঘাবড়ে যান। কিন্তু তিরিশ কেটে গুটি গুটি হরফে হাজার লেখেন।

আরেক ছোকরা মন দিয়ে শুনছিলো এ বিতণ্ডা, সে এবার গলা খাঁকরে বলে, "আর ঐ বঙ্গোপসাগরটাও পাল্টে দিন দাদা। দেশি জিনিস লোকে পছন্দ করে না। স্বদেশী আন্দোলনের মূল্যই দিতে শেখেনি কবিতার পাঠক! তারা বিলেতি সাবান মাখে, বিলেতি পমেটম ঘষে, বিলেতি কাপড়ের উড়ুনি পরে! ওটাকে ভূমধ্যসাগর করে দিন।"

বিপ্লবী গোছের একজন ক্ষেপে ওঠে, "ক্যানো রে? ভূমধ্যসাগর করতে হবে ক্যানো? বঙ্গোপসাগর খারাপটা কী?"

একটা জোর তর্ক বেঁধে যায়।

জীবনানন্দ দুর্বল গলায় বলেন, "আহ, ঘরের ভেতর এতো গোল কোরো না তো! আচ্ছা যাও, দু'পক্ষের কথাই রইলো। মাঝামাঝি কোথাও দিই। সিংহল সাগর। সিংহল সাগর কেমন শোনায়?"

প্রথমজন বলে, "পড়ুন দিখি!"

জীবনানন্দ কেশে গলা সাফ করে নিয়ে পড়েন,

"হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি ; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;"


সবাই মাথা নাড়ে। একজন বলে, "হ্যাঁ, এখন বেশ ভালো শোনাচ্ছে। একটা বেশ ইয়ে আছে, নাকি বলিস?"

সবাই স্বীকার করে, একটা বেশ ইয়ে আছে কবিতাটায়।

জীবনানন্দ বলেন, "তারপর শুনবি আরো, নাকি তক্কো করবি শুধু?"

সবাই শুনতে চায় আরো।

জীবনানন্দ পড়ে যান,

"আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো খুলনার নেত্যকালী সেন।"


ঘরে যেন নৈঃশব্দ্যের বোমা এসে পড়ে! সকলে চুপ করে যায়।

অবশেষে একজন উঠে দাঁড়ায়। তার মুখ থমথমে, চোয়াল শক্ত। চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলে, "আপনে নিজে বরিশালের পোলা, আর আপনে কোবিতা লেখসেন খুলনায় মাইয়া লইয়া? ছি ছি ছি!"

জীবনানন্দ থতমত খেয়ে বলেন, "কিন্তু ... আমি ... আমি ...।"

ছোকরা গর্জে ওঠে। "খবরদার! বেশি এতালবেতাল করবেন না! খুলনার মাইয়া লইয়া কোনো কোবিতা ল্যাখা চলবেনা! ওইসব খুলনা টুলনা বাদ দিয়া ঢকপদ কইরা কিছু লেহেন!"

জীবনানন্দ ঢোঁক গিলে বলেন, "কিন্তু তোমাদের তো বুঝতে হবে ... এটা একটা কবিতা মাত্র!"

তুমুল শোরগোল ওঠে। ছোকরার দল হট্টগোল করতে থাকে। কবিতায় খুলনা থাকা চলবে না।

জীবনানন্দ কপালের ঘাম মুছে বললেন, "তাহলে কি যশোর করে দেবো?"

একটি ছোকরা বলে, "পড়েন দেখি!"

জীবনানন্দ পড়েন,

"আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো যশোরের নেত্যকালী সেন।"


সবাই তুমুল অসন্তোষে মাথা নাড়ে। একজন দাঁতে দাঁত পিষে বলে, "যশোইরগারাও জোম্মের খারাপ! ওগো লইয়াও কোনো ল্যাহাল্যাহি করবেননা কোলোম!"

জীবনানন্দ বলেন, "তাহলে? তাহলে কি সিলেট দেবো? সিলেটের নেত্যকালী সেন?"

ছোকরার দল এবার জীবনানন্দকে প্রায় ধরে পেটায় আর কি! সিলেট পর্যন্ত যেতে হবে কেন? বরিশালের মেয়ে কী দোষ করলো?

জীবনানন্দ ক্লান্ত হয়ে বলেন, "আরো দুত্তোরি! বরিশাল দিলে ছন্দ মেলে না তো!"

ছোকরারা মানতে রাজি নয়। তারা বলে, আপনি কবি, ছন্দ মিলানোই আপনার কাজ। দরকার হলে নেত্যকালীকে পাল্টান। কমলা সেন, রমলা সেন লিখুন।

জীবনানন্দ বিব্রত হয়ে বলেন, "আচ্ছা, নেত্যকালীকে বাঁকুড়া পাঠিয়ে দিই বরং? বাঁকুড়ার নেত্যকালী সেন?"

এক ছোকরা বলে, "নেত্যকালী নামটাই তো সুবিধার নয় মিলুদা! ওসব আদ্যিকালের নাম চলবে না! নতুন কিছু রাখুন! আধুনিকা, তন্বী তরুণীর ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠতে হবে তো! নেত্যকালী তো আমার দিদিমার নাম!"

বাকিরাও হই হই করে ওঠে। নেত্যকালী চলবে না। অন্য কিছু রাখতে হবে।

এবার জীবনানন্দ হাল ছেড়ে দেন। "বল তাহলে তোরাই বল। কী নাম রাখবো?"

বিপ্লবী চেহারার ছেলেটি বলে, "প্রীতিলতা সেন!"

একজন তাতে আপত্তি করে। "উঁহু। সিডিশন আইনে ফেলে কোঁৎকা লাগাতে পারে মিলুদাকে। প্রীতিলতা বাদ।"

বিপ্লবী ছোকরাটি তেড়ে আসে, "ক্যানো রে কাপুরুষ!"

আবার তুমুল হট্টগোল বাঁধে।

জীবনানন্দ মীমাংসা করার চেষ্টা করেন, "আহা এসব হচ্ছে কী? থাম তোরা! আচ্ছা ... সুখলতা করে দিই। বাঁকুড়ার সুখলতা সেন।"

সবাই জল্পনা করতে থাকে। সুখলতা? সুখলতা সেন? হুমমমমম।

এক ছোকরা বলে, "বাঁকুড়া আমার মেজ পিসের বাড়ি। এমন হতচ্ছাড়া লোক আর দুটো দেখিনি! ছোটলোকের হদ্দ! পিসির জীবনটা ছারখার করে খেয়েছে। বাঁকুড়া টাকুড়া চলবে না। অন্য কোনো লোকেশন বাছুন দাদা!"

নাম নিয়ে আরেক ছোকরা ঘ্যাঙায়। "সুখলতা আমার সেজ কাকীমার নাম। না না না, অন্য কিছু রাখুন দাদা। শেষে একটা কেলেঙ্কারি না বাঁধে!"

জীবনানন্দ ক্ষেপে ওঠেন ভয়ানক। "তোরা এক একটা মহামূর্খ!" চিৎকার করে বলেন তিনি। "খুলনায় সমস্যা, যশোরে সমস্যা, সিলেটে সমস্যা, বাঁকুড়ায় সমস্যা! নেত্যকালীকে কোথায় পাঠাতে বলিস, নাটোরে?!"

সবাই চুপ হয়ে যায়, একজন শুধু বলে, "নেত্যকালী তো নয়, সুখলতা!"

আরেকজন বলে, "নাটোরের সুখলতা সেন! হুমমম, খারাপ শোনাচ্ছে না দাদা!"

যার সেজ কাকীমার নাম সুখলতা, সে আবার ফুঁসে ওঠে, "না না না! সুখলতা রাখা চলবে না!"

জীবনানন্দের চোখে জল চলে আসে। "তোরা এক একজন মনুষ্যপদবাচ্য নোস!" ধরা গলায় বলেন তিনি। "কোনো সুখ নাই আমার জীবনে! একটা কবিতা লিখবো বলে খাটছি অহর্নিশি, আরো তোরা, পদে পদে গিয়ানজাম করিস! বরিশ্যাইল্যা কোথাকার! থাকবো না আর এখানে। সুখ নাই যখন, বনে চলে যাবো, বনবাসী হব!'

ছোকরাদের একজনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। "সুখ নাই, বনে যাবেন?"

জীবনানন্দ বলেন, "হ! বনেই যামু গিয়া!"

ছোকরা উজ্জ্বল মুখে বলে, "পাইসি রে দাদো! সুখ কাইডগা বন বসাইয়া দ্যান! বনলতা সেন! নাটোরের বনলতা সেন!"

জীবনানন্দ একটু থতমত খেয়ে যান। "বনলতা সেন?"

ছোকরারা সবাই সানন্দে সম্মতি জানায়। নাটোর নিয়ে কারো আপত্তি নাই, কারো বজ্জাত পিসের বাড়ি সেখানে নয়, আর বনলতা সেনও কারো কাকীমার নাম নয়।

জীবনানন্দ গোমড়ামুখে টুকে রাখেন নামটা। তারপর বলেন, "এইবেলা বেরো সবাই বাড়ি থেকে! আর কোনোদিন যদি তোদের কবিতা পড়ে শোনাই, তাহলে আমার নাম জীবনানন্দই নয়!"

...



বরিশালের ভাষায় সংলাপ অনুবাদ করে দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বরিশালিয়ান।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।