Wednesday, October 28, 2009

শিমুল ফুলের কাছে শিশির আনতে গেছে সমস্ত সকাল




বোনকে ফোন করলে তাঁর ছোটো মেয়েটা এসে খুব হইচই করে। মা ফোনে কারো সাথে কথা বলছে, এটা তার পছন্দ নয়। আবার সে নিজেও কথা বলতে নারাজ। জিজ্ঞেস করি, "ও চায় কী?"

বোন বলেন, "ও চায় ও দুষ্টামি করবে, আর আমি পিছে পিছে দৌড়াবো। শয়তানের আঁটি একটা!"

আমি বলি, "দাও দেখি ফোনটা, কথা বলি।"

পিচ্চি কথা বলবে না কিছুতেই, সে তারসপ্তকে চেঁচামেচি করে ম্লেচ্ছ ভাষায় কী কী যেন বলে। বোন অনেক কাকুতি মিনতি করেন, "কথা বলো একটু? হিমু মামা তো! বলো, হিমু মামা কেমন আছো? বলো?"

রিনরিনে কণ্ঠে ভাগ্নি বলে, "হ্যালো! আমি উদিতা! আমি ভালো আছি! আমি দুষ্টুমি করি! তুমি কে?"

এইটুকু বলেই সে ছুট দেয় অন্যদিকে, শুনতে পাই আবার হইচই করছে, ভাইকে তাড়া করছে, জিনিসপত্র ওল্টাচ্ছে।

খুব হাসি, কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে যায়, আমার ভাগ্নি আমাকে চিনবে না?

তারপর মনে হয়, কীভাবে চিনবে? তার জন্ম হয়েছে ভিনদেশে, কবে সেই টলোমলো পায়ে হাঁটার বয়সে এসে একবার দেখেছে আমাকে, আমি তো তার কাছে ফোনের ওপাশের আগন্তুকই, তার বেশি কিছু তো নই। তার বড় বোন যেমন আমার কোলে চড়ে বড় হয়েছে, তেমন সুযোগ তো সে পায়নি।

বড় ভাইয়ের ছেলেও জন্মেছে অন্য দেশে। তার সাথে ফোনে আলাপেরও সুযোগ হয়ে ওঠেনি। একদিন হয়তো তার বাবা তাকে ফোনে একটা অচেনা আগন্তুক কণ্ঠ ধরিয়ে দিয়ে বলবে, কথা বলো, তোমার হিমুকাকা, কথা বলো ...?

গত পরশু মেজ ভাইয়ের মেয়ে এসেছে পৃথিবীতে। হাসপাতালের আইসিইউতে ধুকধুক করছে তার নতুন প্রাণ। একদিন তার কাছেও আগন্তুক হয়ে যাবো। ফোনের ওপাশের কাকা হয়ে থাকবো, সে চিনবে কেবল একটা কণ্ঠস্বরকে। তাকে কোলে নিয়ে ঘোরা হবে না, ঘুঘুসই খেলা হবে না, ঘাড়ে চড়িয়ে গিটার বাজিয়ে গান শোনানো হবে না, তার মুখে রং দিয়ে চিত্রবিচিত্র এঁকে দেয়া হবে না, ঘুমপাড়ানোর জন্যে গল্প পড়ে শোনানো হবে না।

পৃথিবীটা নাকি ছোটো হয়ে আসছে। ছোটো ছোটো মানুষগুলোর পৃথিবী আরো ছোটো করে ফেলছি আমরা নিজেরাই। তাদের মাঠ নাই, আকাশ নাই, ঘুড়ি নাই। তাদের মামা নাই, কাকা নাই, আছে শুধু নিষ্প্রাণ টেলিফোনে কণ্ঠস্বরের ভিড়।

মা রে, ভালো থাকিস এইসব ছাড়াই। কীভাবে, আমি জানি না।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।