Thursday, October 22, 2009

মরা মানুষের সিন্দুক



১.
পিক-আপের ভেতরে কবরের নিস্তব্ধতা। এমনকি চোখ আর হাত বাঁধা খালেকও কোনো শব্দ করছে না।

রুহুল আমিন আর সদরুলের মাঝে বসে আছে লোকটা। রুহুল আর সদরুল দু'জনেই পোড় খাওয়া লোক, তাদের প্রশিক্ষিত, শক্তিশালী পেশীর পাহারায় ন্যাতানো মুড়ির মতো পড়ে আছে কসাই খালেক।

ইয়াকুব রাস্তার পলাতক ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দেখতে চেষ্টা করে খালেককে। এমন নয়, যে সে খালেককে আগে দেখেনি। ফাইলে কসাই খালেকের কয়েকটা ঝাপসা ছবি গত কুড়িদিন ধরেই মনোযোগ দিয়ে দেখেছে ইয়াকুব। গত পরশু যখন শহরতলির এক বাড়ির নড়বড়ে দরজার কবাট বুটের লাথিতে ভেঙে ভেতরে ঢুকে সাবলেট নিয়ে বসবাসরত খালেককে পাকড়াও করা হয়, ষাট পাওয়ারের বাল্বের আলোতে তার ভীত, উন্মত্ত, উত্তেজনায় বিকৃত চেহারা ইয়াকুব খুব কাছ থেকে দেখেছে। খালেকের এই সৌম্য, শান্ত রূপটাই কেবল দেখা হয়নি তার।

কোন অস্ত্র ছিলো না খালেকের সাথে। আগুয়ান বুটের শব্দ শুনে ঘর থেকে ভীরু খরগোশের মতো ছুটে বেরিয়ে চারতালার বারান্দা থেকে লাফ দিতে চেয়েছিলো সে। পারেনি। যে সদরুলের পাশে সে বসে আছে এখন, সেই সদরুল তার ঘাড়ে এক ভয়ঙ্কর চপ মেরে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে তৎক্ষণাৎ। তারপর টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে এনে মাইক্রোবাসে তুলেছে।

ইয়াকুব চোখ বোঁজে। ভাড়াটিয়া পরিবারটা এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলো প্রচণ্ড ত্রাসে। বাচ্চা মেয়েটা টুলটুলে ঘুম ঘুম চোখে দেখছিলো তাদের। খালেকের লোকজন কি পরে কোনো ক্ষতি করবে ঐ ছোট্ট পরিবারের? খালেকের লোকজন যদি তাদের ছেড়েও দেয়, পুলিশের জেরায় জেরায় কাহিল হয়েই তাদের ভবিষ্যতের একটা অনিশ্চিত দৈর্ঘ্যের টুকরো কেটে যাবে। কেন তারা কুখ্যাত আব্দুল খালেক ওরফে কসাই খালেক ওরফে মিজান ওরফে পারভেজকে বাড়িতে সাবলেট দিয়েছিলো? কেন? তারা কি জানে না, এটা কত বড় অপরাধ? ঐ ঘুম ঘুম চোখের ছোট্ট মেয়েটা কি জানে, সে কত বড় পাপী? না বোধহয়। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র কি ক্ষমা করবে তার এই অজ্ঞতাকে?

খালেক হেফাজতে ছিলো গতকাল। তার নিয়তি নির্ধারিত হয়ে আছে অবশ্য অনেক আগে থেকেই।

ইয়াকুব অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে খালেককে দেখেছে গতকাল। ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো লাগছিলো ব্যাটাকে দেখতে। কসাই খালেক নিজ হাতে কমপক্ষে কুড়িটা খুন করেছে। তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা মোট কত করেছে, সঠিক হিসাব নেই। সেই দুর্ধর্ষ খুনী খালেক একটা কেন্নোর মতো গুটিয়ে বসে ছিলো সেলের এক কোণায়, ছাদের দিকে চোখ মেলে।

হেফাজতে নাস্তাপানি মন্দ দেয়া হয় না। গরম আটার রুটি, সব্জির ঘ্যাঁট, ডিমের অমলেট। এক মগ চা। মুখে দেয়নি খালেক কিছুই। নেড়েচেড়ে রেখে দিয়েছে আবার। দুপুরটা উপোস করিয়ে রেখে সন্ধ্যেবেলা মুরগির ঝোল দিয়ে গরম মোটা চালের ভাত দেয়া হয়েছিলো। খালেক খায়নি।

ইয়াকুব আজ সন্ধ্যাবেলাতেও জিজ্ঞেস করেছে তাকে, খালেক, খাইবেন কিছু ভালোমন্দ? বিরিয়ানি? ইলিশ মাছ দিয়া ভাত? খাসির গোস্ত? খাইতে চাইলে বলেন।

খালেক কেঁপে উঠেছে একবার, কিন্তু চোখ নামিয়ে নিরুত্তর বসেছিলো চুপচাপ।

ইয়াকুব একটা সিগারেট ধরায়। পিক-আপ শহর ছাড়িয়ে এসেছে। মফস্বলের অন্ধকার ঘিরে ধরেছে পিক-আপকে, পেছনের পিক-আপের নির্লজ্জ হেডলাইট দু'টি জ্বলছে বেশ্যার স্তনের মতো, অন্ধকার কাঁপতে কাঁপতে সরে যাচ্ছে রাস্তার ওপর থেকে।

দূরাগত হেডলাইটের আলো আর সিগারেটের মন্থর আভায় ইয়াকুব খালেককে দেখার চেষ্টা করে। চোখ বাঁধা অবস্থায় কারো চেহারা দেখার মানে হয় না, যেমনটা মানে হয় না সানগ্লাস পরা অবস্থায় দেখলে। চোখ মানুষের আত্মার মিটার, সেটার কাঁটা নড়ে উঠে জানিয়ে দেয় ভেতরে কী চলছে। চোখ বাঁধা খালেক একটা অন্ধকার দাঁড়িপাল্লার মতো, তার কোন পাল্লা কোনদিকে হেলে আছে, বোঝার কী উপায়!

ইয়াকুবের পাশে বসা হামজা কেশে গলা পরিষ্কার করে একবার। ইয়াকুব ঘাড় ফিরিয়ে হামজাকে দেখার চেষ্টা করে।

হামজা ট্রুপের জল্লাদ। গুলি সে-ই করবে। শক্ত সমর্থ, ছোটোখাটো, অমায়িক চেহারার হামজাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, নির্বিকার মুখে গুলি করে সে হাত বাঁধা, চোখ বাঁধা মানুষকে মেরে একটু তফাতে গিয়ে অফিসারের চোখের আড়ালে একটা সিগারেট ধরাতে পারে।

খালেকের কণ্ঠস্বর থেকে গোঙানির মতো একটা শব্দ বেরিয়ে আসে।

"কিছু বললেন, খালেক?" ইয়াকুব কর্কশ গলায় প্রশ্ন করে।

খালেক মাথা নাড়ে।

পিক-আপ দুটো চলতে থাকে অন্ধকার চিরে।

২.
লোকেশনটা ইয়াকুবই খুঁজে বের করেছে। পুরনো একটা পোড়ো, ভাঙা দালান আছে মাঠের এক প্রান্তে, অন্যদিক ঘন গাছের সারি, দূরে একটা প্রাইমারি স্কুল। পিক আপ দু'টোর মসৃণ গতি হঠাৎ টালমাটাল হয় রাস্তা ছেড়ে মাটির ওপরে নেমে আসায়।

পিক আপ থামতেই খালেক ফুঁপিয়ে ওঠে, "স্যার, খালি জানে মারবেন না। যা চান দিবো স্যার। আমার ধানী জমি আছে অন্যের নামে। বাসায় গিয়ে টাকা দিয়ে আসবে আমার লোক। খালি জানে মারবেন না স্যার ...।"

ইয়াকুব সিগারেটে টান দেয় চুপচাপ, সদরুল আর রুহুল আমিন তার বাঘের মতো চোখ দেখতে পায় সিগারেটের আভায়।

"তুই ধানী জমি কিনলি ক্যামনে রে মাদারচোদ?" ইয়াকুব গুলির মতো প্রশ্ন করে। "আট বছর আগে তুই ছিলি গ্যারেজ মেকানিক খসরুর চামচা। ধানী জমি কিনার পয়সা পাইলি কই? বাপের গোয়া দিয়া পয়সা বাইর হয়?"

খালেক ফোঁপাতে থাকে।

সদরুলকে ইশারা করে ইয়াকুব, প্রচণ্ড এক চড় মারে সদরুল।

"কথা বল। পয়সা বাপের গোয়া দিয়া বাইর হয়?"

খালেক আবারও বলে, "স্যার, খালি জানে মারবেন না। যত টাকা লাগে ... ।"

ইয়াকুবের ভুরু আবারও ইঙ্গিত দেয়, সদরুল আবারও চড় কষায়। খালেক এবার হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।

"নামাও এইটারে।" ইয়াকুবের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। খালেকের সাধ্য নাই টাকা দিয়ে রফা করার। তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে কয়েকদিন আগেই।

দুই পিক আপ থেকে একে একে নামে হাতাকাটা জ্যাকেট পরা লোকজন। জ্যাকেটের পেছনে তাদের বাহিনীর নাম লেখা। প্রত্যেকের হাতেই অস্ত্র। ইয়াকুব শুধু স্মল আর্মস নিয়ে এসেছে সাথে।

খালেককে টেনে হিঁচড়ে নামায় রুহুল আমিন। এই খালেককে দেখে বিশ্বাস করার উপায় নেই, এই লোক এই অঞ্চলের দুর্ধর্ষতম খুনীদের একজন। ফোঁপাচ্ছে, বিড়বিড় করছে, থরথর করে কাঁপছে তার শরীর, খালেক এখন একজন মানুষ।

ইয়াকুব এই পর্যায়ে এসে কোনো খুনীকে দেখেনি। প্রত্যেকেই তখন মানুষ হয়ে যায়, চিৎকার করে, কাঁদে, অনুনয় করে, টাকার প্রলোভন দেখায়, আল্লাহর নামে জিকির করে, আসন্ন মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কাপড় নষ্ট করে।

দুয়েকজন আদালতে বিচার চায়।

খালেকও দেখা গেলো সেই পদেরই লোক। "স্যার, জানে মারবেন না স্যার। আমাকে কোর্টে তুলেন। ফাঁসি দেন। জানে মারবেন না স্যার।"

"ফাঁসি দিলে জানে মরবি না?" ইয়াকুব হালকা গলায় প্রশ্ন করে।

খালেক জিভ বার করে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় একবার। "স্যার, যত টাকা লাগে ...।"

ইয়াকুব খসখসে গলায় বলে, "হামজা, তৈরি হও।"

খালেক কুকুরের মতো গোঙাতে থাকে। "স্যার, আদালতে তুলেন আমারে। জানে মারবেন না স্যার। আল্লাহ আপনাদের হায়াত দিবে স্যার। জানে মারবেন না স্যার। আপনি মা-বাপ স্যার ...।"

খালেক যাদের খুন করেছে, তারাও নিশ্চয়ই এমন কাতর অনুনয় করেছিলো জবাই হওয়ার আগে, গুলি খাওয়ার আগে। খালেক সেদিন ঈশ্বরের মতোই বধির ছিলো।

ইয়াকুব দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ইঙ্গিত দেয়, সদরুল প্রচণ্ড এক লাথি মেরে খালেককে মাটিতে ফেলে দেয়। পিছমোড়া করে বাঁধা হাত নিয়ে খালেক গড়িয়ে পড়ে শিশির ভেজা মাঠে। হামজা এগিয়ে যায়, তার হাতে টি-৫৬ থেমে থেমে সংক্ষিপ্ত গর্জন করে কয়েকবার।

বাকিদের মধ্যে কয়েকজন আশেপাশের অন্ধকারে কয়েক রাউণ্ড গুলি ছোঁড়ে। ওঁত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেছে নিশ্চয়ই।

একটা কাটা রাইফেল, দুইটা দেশি পিস্তল আর কয়েক রাউণ্ড গুলি পাওয়া যাবে অদূরেই। ক্যামেরা আছে ইয়াকুবের ব্যাগে, সবকিছুর ছবি তুলে রাখতে হবে।

সদরুল এগিয়ে গিয়ে খালেকের মৃতদেহে বুট দিয়ে খোঁচা দেয়। তারপর হাত আর চোখ বাঁধা গামছা দুটো খুলে আনে। ইয়াকুব এগিয়ে গিয়ে টর্চ মেরে দেখে খালেকের মৃত মুখটা। এক কাতর অভিব্যক্তি সেখানে, চোখ দু'টো সামান্য খোলা। শার্টের সামনের দিকটা রক্তে ভিজে গাঢ় হয়ে আছে।

ইয়াকুব চারপাশে তাকায়। দলের পনেরোজন খালেকের মৃতদেহ গোল হয়ে ঘিরে দেখে। তাদের হাতের সাব মেশিনগানগুলো নীরব প্রভুভক্ত কুকুরের মতো তাকিয়ে আছে খালেকের দিকে।

ইয়াকুবের মনে হয়, খালেকের বুক যেন একটা সিন্দুকের ডালা হয়ে খুলে যাচ্ছে, খুলে যাচ্ছে প্যাণ্ডোরার বাক্সের মতো, ভেতর থেকে আশ্চর্য সঙ্গীতের মতো পাক খেয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে দেবত্বের অনুভূতি। ঈশ্বরের পৃথিবীতে আরো পনেরোজন ঈশ্বর যেন অভিষিক্ত হলো আবার, বহুতম বারের মতো, যেখানে তারাই সংহারের শিল্পী, যেখানে তাদের অস্ত্রের নিচে কসাই খালেক মানুষ খালেক আর মানুষ খালেক মরা মানুষ খালেকে পরিণত হবে রাতের পর রাতে। ভোরের পর ভোরে মাঠগুলোতে জমা হবে আরো আরো মানুষের দল, তারা ভীত চোখে দেখবে কয়েকজন সশস্ত্র ঈশ্বর আর একটি মানুষের মৃতদেহকে, শিখবে, পৃথিবীতে অনেক ঈশ্বর, আর মানুষের আদালত ঈশ্বরের আদালতের মতোই দূর, স্পর্শের বাইরে। ঈশ্বরের আকাশের নিচে এই মাঠগুলো শুধু মঞ্চ, সেখানে আর কোনো যুক্তি নেই, প্রশ্ন নেই, সাক্ষ্য নেই।

ইয়াকুব টর্চ নিভিয়ে দিলো। শেষ মুহূর্তগুলোতে কোনো খুনীকেই নিধন করা হয়ে ওঠে না, তখন এসে মানুষ হয়ে যায় সকলে, যাদের জন্যে মৃত্যু ছাড়া আর কেউ ওঁত পেতে বসে থাকে না।

ইয়াকুব ঘড়ি দেখে। ভোর হবে একটু পরেই। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে ভারি গলায় সে বলে, "ইয়ো হো হো অ্যাণ্ড আ বটল অফ রাম!"

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।