Monday, October 19, 2009

এমন যদি হতো ...


ইকবাল আর মুনিরা খানিকটা দেরি করে ফেলেছে। ট্রেন ধরতে গেলে শেষ মূহুর্তে একটু দেরি হয়েই যায়, স্বাভাবিকভাবেই, কাজেই বগিতে শেষ যে সীটদু’টো খালি ছিলো, সে দু’টোতেই বসতে হলো দু’জনকে। ওদের সীটদু’টো পাশাপাশি, এবং আরেকজোড়া সীটের মুখোমুখি। ইকবাল স্যুটকেসটাকে ওপরের রযাকেকে ঠেসে ঢোকাতে লাগলো, আর মুনিরা নিজের মধ্যে আবিষ্কার করলো হালকা একটা অস্বস্তি।

ওদের মুখোমুখি সীট জোড়ায় যদি অন্য আরেকটা জুটি বসে, তাহলে ঢাকায় পৌঁছোনোর আগ পর্যন্ত সময়টা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে পার করতে হবে। অথবা, যেটা করা যেতে পারে, খবরের কাগজের একটা ভদ্র আড়াল তোলা যেতে পারে। তবে এখন আর জায়গা পাল্টানোর চেষ্টা করে লাভ নেই, ট্রেনে আর সীট খালি না-ও থাকতে পারে।
ইকবালকে দেখে অবশ্য মনে হলো না সে এই ব্যাপারে খুব একটা চিন্তিত, আর এজন্যেই মুনিরা আরেকটু হতাশ হলো। সাধারণত ওদের দু’জনের ভাবনা একই পথে চলে। এ জন্যেই, ইকবাল দাবি করে, সে নিশ্চিত যে সে ঠিক মেয়েটাকে বিয়ে করেছে।

ইকবাল আগে প্রায়ই বলতো, ‘আমরা একজন আরেকজনের জন্যে তৈরি, বুঝলে মুনিরা? এটাই আসল কথা। জিগ’স পাজল খেলতে গিয়ে কী হয়? একটা টুকরোর সাথে কেবল আরেকটা টুকরোই মেলে। অন্য কোনো টুকরো দিয়ে খেলা মেলানো যায় না, আর আমার অবশ্যই অন্য কোন মেয়েকে দিয়ে চলতো না।’

মুনিরা হাসতো সবসময়। ‘দেখো ইকবাল, তুমি যদি সেদিন বাসে না চড়তে, তাহলে হয়তো জীবনে আমার সাথে দেখা-ই হতো না। কী করতে তখন?’

‘বিয়েই করতাম না। সোজা হিসেব। তাছাড়া, তোমার সাথে হয়তো শারমিনের মাধ্যমে আরেকদিন পরিচয় হতো।’

‘তাহলে নিশ্চয়ই ব্যাপারটা একই রকম হতো না।’

‘অবশ্যই হতো।’

‘উঁহু, হতো না। আর তাছাড়া শারমিন আমাকে কোনদিনই তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতো না। ও নিজেই অনেকটা আগ্রহী ছিলো তোমার ব্যাপারে। আমাকে ওর নিজের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী বানানোর মতো বোকা ও কখনোই ছিলো না।’

‘কী যে বলো!’

মুনিরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওর প্রিয় প্রশ্নটা করতো, ‘ইকবাল, মনে করো, কেমন হতো যদি তুমি সেদিন বাস স্টপে এক মিনিট পর গিয়ে অন্য আরেকটা বাসে চড়ে যেতে? তোমার কী মনে হয়, কী ঘটতে পারতো?’

‘ধরো, মুনিরা, কেমন হতো যদি চিংড়ি মাছগুলোর দু’টো করে ডানা থাকতো, আর তারা উড়ে গিয়ে সব গাছে চড়ে বসে থাকতো? তাহলে রোজ রোববার আমরা কী খেতে পেতাম?’

কিন্তু ওরা দু’জন সেদিন একই বাসে ছিলো, চিংড়ি মাছগুলোর দু’টো করে ডানা নেই, পাঁচ বছর হয়ে গেলো ওরা দু’জন বিয়ে করেছে আর প্রতি রোববার চিংড়ি মাছের নানারকম অপভ্রংশ খাচ্ছে। এখন ওরা দু’জন ঢাকা যাচ্ছে বিয়ের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক হপ্তার ছুটি কাটাতে।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মুনিরা আবার বাস্তবে ফিরে এলো। ‘আমার মনে হয় অন্য কোন সীট পেলে ভালো হতো।’

‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে। তবে এখনো সীট দু’টো খালি আছে, কাজেই কিছু সময় নিরিবিলি কাটানো যাবে।’ বললো ইকবাল।

মুনিরা তবুও সন্তুষ্ট হতে পারলো না। আর এ সময়ই ছোটখাটো, মোটাসোটা লোকটাকে বগির মাঝখানটা ধরে হেঁটে আসতে দেখলো সে। এহহে, এই লোকটা আবার কোত্থেকে এলো? ট্রেন তো এখন সিলেট আর শ্রীমঙ্গলের মাঝামাঝি। এই লোক যদি এই সীটটাই নিয়ে থাকে, তাহলে ফাঁকা রেখে গিয়ে এতক্ষণ কোথায় ছিলো? মুনিরা ব্যাগ থেকে আয়না বের করে নিজের ছায়ার দিকে চোখ রাখলো। ওর কেন যেন মনে হচ্ছে, লোকটার দিকে আর না তাকালে সে ওদের পার হয়ে চলে যাবে। কাজেই মুনিরা নিজের কালো চুল, ট্রেন ধরার তাড়াহুড়োয় যা অনেকটা অগোছালো হয়ে আছে, তারপর কালো চোখ, আর ছোট্ট পেলব ঠোঁট, যে দু’টোকে ইকবাল “কেবল চুমোর জন্যে তৈরি” বলে রায় দিয়েছে, সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিলো।
খারাপ না, ভাবলো মুনিরা।

এরপর মুনিরা মাথা তুলেই ছোটখাটো মানুষটাকে নিজের সামনের সীটে দেখতে পেলো। চোখাচোখি হতেই লোকটা বিশাল একটা হাসি উপহার দিলো। হাসির সাথে লোকটার মুখে একগাদা ভাঁজ পড়লো। তাড়াহুড়ো করে মাথার টুপি খুলে পাশে ছোট্ট কালো বাক্সটার ওপর রাখলো সে, যেটা সে বয়ে বেড়াচ্ছিলো। সেই সাথে তার মাথার চকচকে টাকটার চারপাশে সাদা চুলগুলো সটান খাড়া হয়ে দাঁড়ালো।
মুনিরা হাসির উত্তরে অল্প না হেসে পারলো না। একই সাথে ওর চোখ পড়লো লোকটার কালো বাক্সটার ওপরে। মুনিরার হাসি আস্তে আস্তে মুছে গেলো, ইকবালের কনুই ধরে টান দিলো সে।

ইকবাল খবরের কাগজ থেকে চোখ তুললো। তার ঘন, পুরু, কালো ভুরূ জোড়া প্রায় মিশে গেছে, প্রথম দর্শনেই তাকে কঠোর বলে মনে হয়। কিন্তু ভুরূর নিচে চোখ দু’টোতে আপাতত সন্তুষ্টি আর হালকা চমকে যাওয়া ভাব ছাড়া কিছুই নেই।

‘কী হলো?’ জিজ্ঞেস করলো সে। মোটাসোটা লোকটাকে সে অতটা খেয়াল করে দেখেনি।

মুনিরা নিজে যা দেখেছে, ইকবালকে সেটা দেখানোর জন্যে হাত আর মাথার সাহায্য নিয়ে যতটুকু সম্ভব আবছাভাবে ইঙ্গিত করলো। কিন্তু ছোটখাটো লোকটা সবকিছুই লক্ষ্য করছে। মুনিরা নিজের কাছে বোকা বনে গেলো, কারণ ইকবাল বুঝতে না পেরে শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

শেষ পর্যন্ত মুনিরা ইকবালকে কাছে টেনে এনে ফিসফিস করে বললো, ‘তুমি দেখছো না, ঐ বাক্সের ওপর কী লেখা আছে?’

বলতে বলতেই মুনিরা আবার তাকালো বাক্সটার দিকে। উঁহু, কোন ভুল নেই। খুব স্পষ্টভাবে বোঝার উপায় নেই, কিন্তু বাক্সটার ওপর আলো কাত হয়ে পড়েছে, কালো পটভূমির ওপর লেখাটা জ্বলজ্বল করছে। গোটা গোটা হরফে লেখা, “এমন যদি হতো”।

খর্বকায় মানুষটা হাসছে আবার। সে দ্রত মাথা ঝাঁকিয়ে কয়েকবার আঙুল তুলে লেখাটা দেখালো, তারপর নিজেকে দেখালো।

ইকবাল নিচু গলায় বললো, ‘নিশ্চয়ই ওর নাম।’

মুনিরা উত্তর দিলো প্রশ্নে, ‘আচ্ছা, এটা কিভাবে একজন মানুষের নাম হয়?’

ইকবাল খবরের কাগজটা নামিয়ে রাখলো। ‘দাঁড়াও, দেখাচ্ছি তোমাকে।’ সামনে ঝুঁকে বললো সে, ‘হতো সাহেব?’

লোকটা আগ্রহী চোখে তাকালো ইকবালের দিকে।

‘হতো সাহেব .. .. কয়টা বাজে বলতে পারেন?’

এবার লোকটা কোটের পকেট থেকে বড় একটা ঘড়ি বের করে ডায়ালটা দেখালো।

‘ধন্যবাদ, হতো সাহেব।’ ইকবাল তারপর ফিসফিস করে বললো, ‘মুনিরা, দেখলে?’

ইকবাল আবারের খবরের কাগজে মন দিতো, কিন্তু ছোটখাটো লোকটা তার বাক্স খুলে ফেলেছে। শুধু তাই না, ওদের মনোযোগ আকর্ষণের পর একটু পর পর আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। বাক্স খুলে একটা ভাপসা কাঁচের টুকরো বের করলো সে। মোটামুটি ছয় ইঞ্চি লম্বা, নয় ইঞ্চি চরড়া, আর মোটামুটি এক ইঞ্চি পুরু হবে জিনিসটা। কাঁচের টুকরোটার কিনারাগুলো উঁচু, কোণগুলো মসৃণ গোলাকৃতি, কিন্তু আর কোন বৈশিষ্ট্য এর নেই। লোকটা বাক্স থেকে একটা তারের কাঠামোও বের করে ফেলেছে, এবং সেটার মধ্যে কাঁচের টুকরোটা নিখুঁতভাবে বসে গেছে। গোটা জিনিসটাকে সে নিজেরহাঁটুর ওপর দাঁড় করিয়ে খুব গর্বিতভাবে তাকালো ওদের দিকে।

মুনিরা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বললো, ‘ইয়াল্লা, ইকবাল, এটা কোনো একটা ছবি!’

ইকবাল ঝুঁকে বসলো। তারপর লোকটার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘কি এটা? নূতন কোন টেলিভিশন?’

লোকটা এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লো। মুনিরা বললো, ‘না, ইকবাল, এটা আমাদের ছবি।’

‘মানে?’

‘দেখছো না? ঐ যে বাসটা, যেটাতে আমাদের দেখা হয়েছিলো। ঐ দ্যাখো তুমি নিজে, কালো সীটটাতে বসে আছো, ঐ যে তোমার পরনে ঐ পুরনো সোয়েটারটা, যেটা আমি তিন বছর আগে ফেলে দিয়েছি। আর ঐ যে, আমি আর শারমিন উঠছি বাসে। ঐ যে, সামনে সেই মোটা মহিলাটা। দ্যাখো! দেখছো না?’

ইকবাল বিড় বিড় করে বললো, ‘নিশ্চয়ই কোন কৌশল .. ..।’

‘কিন্তু তুমিও তো দেখতে পাচ্ছো, তাই না? এর জন্যেই এটার নাম “এমন যদি হতো”। এটা আমাদের দেখাবে, কেমন হতো যদি সব কিছু অন্যরকম হতো। কেমন হতো, যদি বাসটা মোড় না ঘুরতো .. ..।’

মুনিরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত। এবং সে খুবই চঞ্চল হয়ে উঠেছে। কাঁচের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শেষ বিকেলের রোদটুকু আস্তে আস্তে মলিন হয়ে এলো, আশেপাশে যাত্রীদের অস্পষ্ট গুঞ্জন আরো অস্পষ্ট হতে লাগলো .. ..।

সেই দিনটা মুনিরার চোখে এখনো ভাসে। ইকবাল শারমিনকে চিনতো, সে নিজে সীট থেকে উঠে শারমিনকে বসতে দিতে চাচ্ছিলো, এমন সময় বাসটা জোরে মোড় ঘুরলো, আর মুনিরা ছিটকে গিয়ে সোজা ইকবালের কোলের ওপর পড়লো। ছি, এমন একটা হাস্যকর আর লজ্জাজনক পরিস্থিতি, কিন্তু সেটা কাজে লেগেছিলো। মুনিরা এতো লজ্জা পেয়েছিলো যে ইকবাল নিজে থেকেই সাহস করে আলাপ শুরু করলো। এমনকি শারমিনকে পর্যন্ত কোন ভূমিকা রাখতে হয়নি। বাস থেকে নামার আগে ইকবাল জেনে গিয়েছিলো মুনিরাকে এরপর কোথায় পাওয়া যাবে।
মুনিরার এখনো মনে পড়ে, শারমিন কেমন কটমট করে তাকিয়ে ছিলো ওর দিকে। বিদায় নেয়ার আগে সে অনেক কষ্টে একটা অভিমানী হাসি দিয়ে বলেছিলো, ‘ইকবাল মনে হচ্ছে বেশ পছন্দ করে ফেলেছে তোমাকে।’

মুনিরা বলেছিলো, ‘কী যে বোকার মতো কথা বলো! ও সামান্য ভদ্রতার খাতিরে .. .. কিন্তু লোকটা দেখতে ভালো, কী বলো?’

এর মাত্র ছয় মাস পরই ওদের বিয়েটা হয়ে যায়।

এখন ওরা তিনজন আবার সেই বাসের ভেতর। ভাবতেই ট্রেনের ঝুকঝুক শব্দটা একদম থেমে গেলো, তার বদলে মুনিরা নিজেকে বাসের গুমোট ভিড়ের মধ্যে খুঁজে পেলো। আগের স্টপেই ও আর শারমিন উঠেছে বাসটায়।

বাসের দোলার সাথে তাল মিলিয়ে মুনিরা নিজের ওজন এক পা থেকে অন্য পায়ে নিচ্ছিলো, যেমনটা করছিলো অন্যান্যরা, বসে কিংবা দাঁড়িয়ে, একই একঘেয়ে আর খানিকটা হাস্যকর ছন্দে। মুনিরা হঠাৎ বললো, ‘শারমিন, কে যেন তোমাকে ইশারায় ডাকছে। চেনো নাকি?’

‘আমাকে?’ শারমিন খানিকটা ইচ্ছাকৃত আলস্যে ঘাড় ফেরালো। তার চোখের আলগা দীর্ঘ পাঁপড়িগুলো নড়ে উঠলো হঠাৎ। ‘এই তো, চিনি আর কি .. .. কী চায় বলো তো?’

‘চলো দেখি কী চায়।’ মুনিরা খানিকটা খুশি হলো দুষ্টুমি করার সুযোগ পেয়ে।

সবাই জানে, নিজের পুরুষ বন্ধুদের অন্যান্যদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা শারমিনের একটা উদ্ভট স্বভাব। আর ওকে খানিকটা জ্বালানোর এই মজার সুযোগ মুনিরা হারাতে রাজি নয়। আর তাছাড়া, এই লোকটা .. .. দেখে বেশ ভালোই মনে হচ্ছে।

মুনিরা এঁকেবেঁকে দাঁড়িয়ে থাকা ভিড়টাকে পার হলো, আর শারমিন নিতান্ত নিমরাজি ভঙ্গিতে তার পিছু নিলো। মুনিরা এই অপরিচিত যুবকের সীটের সামনে এসে দাঁড়ালো, আর সাথে সাথে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বাসটা মোড় ঘুরলো। মুনিরা প্রাণপণে হাত বাড়িয়ে একটা হ্যান্ডেল ধরার চেষ্টা করলো। একটা কিছুতে আঙুল বেধে যাওয়া মাত্রই সে সেটাকে আঁকড়ে ধরলো। কিছুটা সময় যাওয়ার পর মুনিরা টের পেলো সে শ্বাস বন্ধ করে রেখেছে। ওর মনে হচ্ছিলো, কিছুতেই যেন কোনোকিছুর নাগাল পাওয়া যাবে না, প্রকৃতির সব নিয়ম যেন যুক্তি করে ওকে ফেলে দেবে।
লোকটা ওর দিকে তাকিয়েও দেখলো না। সে শারমিনের দিকে তাকিয়ে হাসলো, তারপর সীট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘন ভুরূতে তাকে মানিয়েছে, বেশ আত্মবিশ্বাসী একটা ভাব আছে চেহারায়। মুনিরা সিদ্ধান্তে পৌঁছালো, লোকটাকে তার ভালো লেগেছে। শারমিন বললো, ‘আরে না, সে কি! আমরা তো এই পরের স্টপেজেই নেমে যাবো।’

ওরা নামলোও। মুনিরা বললো, ‘আমি ভেবেছিলাম আমরা শাহবাগ নামবো।’

শারমিন বললো, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আমার একটু কেনাকাটা করতে হবে। বেশি সময় লাগবে না, চলো।’

‘শ্রীমঙ্গল!’ ট্রেনের ভেতরে জোরেসোরে ঘোষণা করা হলো। ট্রেন এখন ধীর গতিতে চলছে, আর অতীতের দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে কাঁচের টুকরোটার মধ্যে হারিয়ে গেছে। আর ছোটখাটো লোকটা এখনো ওদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।

মুনিরা ইকবালের দিকে ফিরলো। একটু ভয় ভয় লাগছে তার। ‘দেখলে কী হলো?’

ইকবাল বললো, ‘বাজে কয়টা এখন? এরই মধ্যে শ্রীমঙ্গল পৌঁছে গেলাম?’ ঘড়ি দেখলো সে। ‘হুঁ, মনে হচ্ছে তাই।’ মুনিরার দিকে ঘুরলো সে। ‘তুমি পড়ে যাও নি।’

‘ওহ, দেখেছো তাহলে।’ মুনিরা ভেংচি কাটলো। ‘দেখেছো তো, এটাই হচ্ছে শারমিন। আগেভাগে বাস থেকে নেমে পড়ার কোন কারণই ছিলো না। যাতে তোমার সাথে আমার আলাপ না হয়, সেজন্যেই ও এমনটা করলো। তুমি শারমিনকে কতদিন ধরে চিনতে, ইকবাল?’

‘খুব বেশিদিন না। যতদিন ধরে চিনলে ওকে দেখে চেনা যায়, আর সীট ছেড়ে দেয়ার মতো ভদ্রতা করা যায়, ততদিন।’

মুনিরা ঠোঁট বাঁকালো।

ইকবাল হাসলো। ‘কী হতো না হতো সেটা ভেবে হিংসে করার কী দরকার? আর তাছাড়া, কী-ই বা এমন ঊনিশ-বিশ হতো? আমি নিশ্চয়ই পরে কোন ছুতোনাতা ধরে তোমার সাথে পরিচিত হতাম।’

‘তুমি আমার দিকে ফিরেও তাকাওনি।’

‘বাহ, সে সময়টাই বা পেলাম কখন?’

‘তাহলে কিভাবে আমার সাথে পরিচিত হতে?’

‘কোনো না কোনো ভাবে। আমি জানি না। .. .. আর, আমরা বোকার মতো এটা নিয়ে কেন তর্ক করছি?’

ট্রেন শ্রীমঙ্গল ছেড়ে আবার আস্তে আস্তে চলা শুরু করেছে। মুনিরার মনের ভেতর একটা কিছু খচখচ করতে লাগলো। সেই ছোটখাটো লোকটা এতক্ষণ ওদের ফিসফিস আলাপ শুনছিলো, তবে তার মুখে এখন আর সেই হাসিটা নেই। মুনিরা জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাই, আপনি কি আমাদের আরো দেখাতে পারবেন?’

ইকবাল বাধা দিলো, ‘আহ, মুনিরা। কী করতে চাইছো, বলো তো?’

‘আমাদের বিয়ের দিনটা দেখতে চাই। কী হতো যদি আমি সেদিন বাসের হ্যান্ডেলটা ধরে ফেলতাম .. ..।’

ইকবালের চেহারায় বিরক্তি ফুটে উঠলো। ‘কী হচ্ছে এসব, মুনিরা? আমরা যে সেই একই তারিখে বিয়ে করেছি, এমনটা না-ও হতে পারতো।’

মুনিরা তবুও বললো, ‘“এমন যদি হতো” ভাই, একটু দেখাবেন?’ ছোট্ট মানুষটা মাথা ঝোঁকালো।

কাঁচের টুকরোটা আবার প্রাণ ফিরে পেলো, আস্তে আস্তে আলো আর ছায়া মিলে আকৃতি তৈরি করলো তাতে। মুনিরার কানে বিয়েবাড়ির হৈচৈ ভেসে এলো, যদিও বাস্তবে কোন শব্দ এখন নেই।

ইকবাল খানিকটা স্বস্তি নিয়ে বললো, ‘ঐ তো আমি। আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। খুশি এখন?’

ট্রেনের শব্দ আবার আস্তে আস্তে মুছে যেতে লাগলো, মুনিরা শেষ যা শুনলো তা ওর নিজের কন্ঠস্বর, ‘হ্যাঁ, তুমি তো আছো দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আমি কোথায়?’

মুনিরা বিয়ের মঞ্চ থেকে অনেক দূরে বসে। আসার ইচ্ছে ছিলো না ওর। গত কয়েক মাসে ওর আর শারমিনের মাঝে দূরত্ব ক্রমশ বেড়েছে কেবল, কেন তা মুনিরা জানে না। ইকবাল আর শারমিনের বাগদানের খবরটাও মুনিরা পেয়েছে আরেক বন্ধুর কাছ থেকে। ছয় মাস আগে সেই দিনটার কথা মুনিরার স্পষ্ট মনে আছে, যেদিন বাসে ইকবালকে সে প্রথম দেখেছিলো। সেদিন শারমিন কেমন তাড়াহুড়ো করে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো ওকে। পরে আরো কয়েকবার বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ইকবালের সাথে মুনিরার দেখা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেকবারই শারমিন ছিলো ইকবালের সাথে, ওকে আড়াল করে।

না, মুনিরার আফসোস করার কিছু নেই, লোকটা তো আর ওর কেউ নয়। এমনিতে যতটা নয়, শারমিনকে আজকে বিয়ের সাজে তারচেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে দেখতে, আর ইকবাল, নিঃসন্দেহে যথেষ্ঠ সুপুরুষ।

কেন যেন মুনিরার ভেতরটা ফাঁকা লাগছিলো, আর খানিকটা বিষণ্ন, কোথায় যেন কোনো বড় ভুল হয়ে গেছে, কিন্তু সেটা সে ভেবে বের করতে পারছে না। শারমিন বসে আছে বিয়ের মঞ্চে, ভুলেও তাকাচ্ছে না ওর দিকে। তবে ইকবালের সাথে চোখাচোখি হয়েছে মুনিরার, একটু হাসিও সে উপহার দিয়েছে শারমিনের বরকে। ইকবাল কি তার উত্তরে পাল্টা হাসলো? তা-ই মনে হয়েছে মুনিরার।
কাজী সাহেবের গৎ বাঁধা গম্ভীর গলা খুব দূর থেকে ভেসে এলো মুনিরার কানে, ‘বলেন কবুল .. ..।’

ট্রেনের গর্জন আবার ফিরে এসেছে। দু’সারি চেয়ারের মাঝে পথ ধরে হেঁটে আসছেন এক মহিলা, ছোট্ট একটা ছেলের হাত শক্ত করে ধরে রেখে, নিজেদের সীটে ফিরে চলেছে তারা। কিছুদূরে কয়েকজন কিশোরী বসে আছে, একটু পর পর তাদের খিলখিল হাসি ভেসে আসছে। কী কারণে কে জানে, একজন কন্ডাকটর ব্যস্ত সমস্ত হয়ে হেঁটে গেলো মুনিরাদের পাশ দিয়ে।

মুনিরা গম্ভীর হয়ে সব কিছু লক্ষ্য করছে।

ট্রেনের পাশে গাছগুলো ঝাপসা সবুজের পোঁচ হয়ে ছুটে চলছে উল্টোদিকে, একটু পর পর টসবগিয়ে তেড়ে যাচ্ছে একেকটা টেলিফোনের পোস্ট। মুনিরা নিজের সীটে শক্ত হয়ে বসে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।

‘তুমি ওকে বিয়ে করেছো।’ মুখ খুললো ও শেষ পর্যন্ত।
ইকবাল কিছুক্ষণ মুনিরার দিকে চেয়ে থেকে হালকা একটা হাসি নিজের মুখে ছড়িয়ে পড়তে দিলো। ‘উঁহু, মুনিরা, করিনি। আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। ভেবে দ্যাখো।’

মুনিরা ইকবালের দিকে ফিরলো। ‘হ্যাঁ, তুমি আমাকে বিয়ে করেছো, কারণ আমি আকাশ থেকে তোমার কোলের ওপর পড়েছিলাম। যদি না পড়তাম, তুমি শারমিনকেই বিয়ে করতে। যদি শারমিন রাজি না হতো, তাহলে অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করতে। তুমি যে কোন মেয়েকেই বিয়ে করতে! তোমার জিগ’স পাজলের টুকরোগুলোর নিকুচি করি আমি।’

ইকবাল খুব ধীরে ধীরে বললো, ‘আরে .. .. দূরো .. জ্বালা!’ ওর দু’টো হাতই মাথার পাশে উঠে গেছে, সেখানে ইকবালের চুল প্রায়ই সটান দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু ক্ষণিকের জন্যে মনে হলো, ইকবাল নিজের মাথা ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। সে বললো, ‘দ্যাখো মুনিরা, তুমি একটা সামান্য ভোজবাজি নিয়ে খামোকা ঝগড়া করছো। আমি যা করিনি, তার জন্যে তুমি আমাকে দোষ দিতে পারো না।’

‘কিন্তু তুমি তা-ই করতে।’

‘কীভাবে জানো?’

‘দেখলাম-ই তো।’

‘কী দেখলে? এটা তো একটা ফালতু .. .. চোখে ধাঁধা লাগানো জিনিস!’ হঠাৎ ইকবালের গলা উঁচুতে উঠে গেলো, সে সামনে বসা ছোটখাটো মানুষটার দিকে ফিরলো ঝট করে, ‘হতো সাহেব, কিংবা যা-ই হোক আপনার নাম, আপনি দূর হন। চলে যান এখান থেকে! আপনাকে এখানে দেখতে চাই না আমরা। জলদি যান, নইলে আপনার এই রংতামাশার জিনিসটা আমি ছুঁড়ে ফেলবো জানালা দিয়ে .. .. আপনাকে সহ!’

মুনিরা ইকবালের কনুই ধরে ঝাঁকি দিলো, ‘অ্যাই, থামো! থামো বলছি। এখানে আমরা একগাদা লোকের সামনে .. .. ছি ছি!’

ছোটখাটো মানুষটা গুটিসুটি হয়ে সীটের একেবারে কোণায়, ইকবাল থেকে যতটুকু সম্ভব দূরে বসলো, কালো বাক্সটা নিজের পেছনে আড়াল করে রেখেছে সে। ইকবাল তার দিকে তাকালো, তারপর মুনিরার দিকে, তারপর ওপাশে কিছুদূরে এক বয়স্কা মহিলার অসন্তুষ্ট চেহারার দিকে।

ইকবালের মুখ লালচে হয়ে উঠলো, ঝাঁঝালো কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো সে। আখাউড়া পার হয়েও একটা শীতল নৈঃশব্দ্য ঘিরে রইলো তিনজনকে।

ট্রেন ছাড়ার মিনিট পনেরো পর ইকবাল ডাকলো, ‘মুনিরা!’
মুনিরা চুপ করে রইলো। জানালা বন্ধ করা, তবুও সে সেদিকেই চেয়ে আছে।

ইকবাল আবার বললো, ‘মুনিরা, অ্যাই মুনিরা! কথা বলো!’

মুনিরা গোমড়া মুখে বললো, ‘কী চাও তুমি?’

ইকবাল বললো, ‘দ্যাখো, এটা পুরোটাই ফালতু একটা ব্যাপার। আমি জানি না এই ভদ্রলোক কিভাবে এই কান্ড ঘটাচ্ছেন, কিন্তু এটাকে জায়েজ ধরে নিলেও .. .. তুমি কাজটা ঠিক করছো না। আমরা এটুকু দেখেই থামবো কেন? ধরে নিচ্ছি, আমি শারমিনকে বিয়ে করেছি, কিন্তু তুমি কি মনে করো তুমি একা রয়ে যাবে? আমার তো মনে হয়, তোমার অন্য কারো সাথে এর মধ্যেই বিয়ে হয়ে গেছে। হয়তো এ কারণেই আমি শারমিনকে বিয়ে করে ফেলেছি।’

‘আমি বিয়ে করিনি।’

‘তুমি কীভাবে জানো?’

‘বাহ, আমি বুঝবো না? আমি কী ভাবছিলাম আমি জানি।’

‘তাহলে এর পরের বছরই তোমার বিয়ে হয়ে গেছে।’

মুনিরা চটে উঠলো। ওর মনের মধ্যে একটা অংশ যদিও এই অকারণ রাগকে শাসন করতে চাইছে, কিন্তু তাতে করে মুনিরার অশান্তি আরো বেড়ে চলেছে। সে বললো, ‘আমি বিয়ে করলেই তোমার কী?’

‘হুঁ, আমার আর কী? কিন্তু তাতে করে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার হবে যে আমাদের এই বাস্তব জীবনে .. .. কী হতে পারতো সেটা নিয়ে কারো ঘাড়ে দোষ চাপানো ঠিক না।’

মুনিরার নাকের পাতা ফুলে উঠলো, সে কিছু বললো না।

ইকবাল হঠাৎ বললো, ‘আচ্ছা! মনে আছে, আমরা যে গত বছরের আগের বছর যে আমরা তিন্নিদের বাড়িতে পহেলা বৈশাখের জন্যে সবাই একসাথে গিয়েছিলাম?’

‘হ্যাঁ, মনে আছে। তুমি পুরো এক বালতি বোরহানি আমার গায়ে উপুড় করে দিয়েছিলে।’

‘ওটা বড় কথা নয়, আর তাছাড়া মোটেও পুরো এক বালতি না, এক জগ। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা হচ্ছে, তিন্নি তোমার খুব ভালো বন্ধু। আমার সাথে বিয়ে হওয়ার বহু আগে থেকেই।’

‘হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?’

‘শারমিনও তো তিন্নির ভালো বন্ধু?’

‘হ্যাঁ।’

‘ঠিক আছে, শোনো তাহলে। তুমি আর শারমিন, দু’জনই সেদিন তিন্নির বাসায় যেতে, যার সাথেই আমার বিয়ে হোক না কেন। এখন চলো ইনাকে আমাদের সেই পার্টিটা দেখাতে বলি। আমার তো শারমিনের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে, কিন্তু আমি বাজি ধরে বলতে পারি, ঐ পার্টিতে তুমি তোমার ফিয়াঁসে বা বর, এমন গোছের কাউকে নিয়ে হাজির হবে।’
মুনিরা দ্বিধায় পড়ে গেলো। ওর পরিষ্কার ভয় লাগছে কাজটা করতে।

ইকবাল বললো, ‘কী, ভয় লাগছে নাকি?’

ব্যস, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো মুনিরা। ঝট করে ইকবালের দিকে ফিরলো সে, ‘না! মোটেও না! আর আমার বিয়ে হলেই ভালো! তোমার জন্যে হাহুতাশ করে নিশ্চয়ই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেবো না? আর হ্যাঁ, আমি দেখতে চাই, এক বালতি বোরহানি শারমিনের গায়ে উল্টে দিলে ও তোমার কী দশা করে। সবার সামনে চেঁচামেচি করে তোমার কান দু’টো পঁচিয়ে ফেলবে ও। আমি ওকে হাড়েমজ্জায় চিনি! তোমার সাধের জিগ’স পাজলের টুকরোর কাজকারবারগুলো দেখো তখন!’ মুনিরা সামনের দিকে ঘুরে বসলো, হাত দু’টো শক্ত করে বুকের ওপর বাঁধা।

ইকবাল সামনের মানুষটার দিকে তাকালো, কিন্তু কোন কিছু বলার প্রয়োজন পড়লো না। কাঁচের টুকরোটা ইতিমধ্যে কোলের ওপর রেখে বসেছে সে। পশ্চিম দিকে থেকে সন্ধ্যের আলো এসে পড়েছে, তার মাথার সাদা চুলের কিনারাগুলো এখন গোলাপি দেখাচ্ছে।

ইকবাল খানিকটা উৎকন্ঠিত হয়ে বললো, ‘রেডি?’

মুনিরা মাথা নাড়লো। ট্রেনের শব্দ আবার ফুরিয়ে যেতে শুরু করলো।

মুনিরা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, সর্দি লেগেছে বেচারির। ছাতাটা মাত্র নামিয়ে রেখেছে সে, মুক্তোর মতো কিছু জলকণা সেটাতে লেগে আছে এখনো। ভেজা ভেজা বাতাসে এই পহেলা বৈশাখেও শীত করছে ওর।
ভেতরে রবীন্দ্র সঙ্গীত চলছে, মুনিরাকে দেখে সবাই শুভ নববর্ষের হুল্লোড় তুললো, জবাব দিতে গিয়ে তাদের সাথে মুনিরাকেও গলা চড়াতে হলো। শারমিনের তীক্ষè গলা বাড়িতে পা রেখেই শুনতে পেয়েছে মুনিরা, ওর দিকেই এগিয়ে গেলো সে। শারমিন, কিংবা ইকবালের সাথে বেশ অনেকদিন ধরে দেখা নেই তার।

শারমিন ওকে দেখে একটা ভুরু ওপরে তুললো, এ জিনিসটা সে ইদানীং রপ্ত করেছে। ‘তোমার সাথে কেউ এসেছে, মুনিরা?’ চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে আবার মুনিরার দিকে ফিরলো সে।

মুনিরা খানিকটা তাচ্ছিল্যের সাথে বললো, ‘আমার মনে হয় মুনতাসির কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পড়বে। ওর কী যেন একটা কাজ পড়েছে, সেটা করতে গেছে।’ এ ব্যাপারে তাচ্ছিল্য শুধু কথনে নয়, মুনিরার ভাবনাতেও।

শারমিন মুখ শক্ত রেখেই হাসলো। ‘ওহ, ইকবাল এসেছে এখানে। তোমার তো তাহলে অতটা একলা লাগবে না, কী বলো? আগেও তো এমন দেখেছি।’

বলতে না বলতেই ইকবাল রান্নাঘর থেকে হেলতে দুলতে বেরিয়ে এলো। তার হাতে একটা জগ, ভেতরের যা-ই থাক সেটাকে সে একটা চামচ দিয়ে ঘুঁটছে। সেটার তালে তালে সে বললো, ‘আসিতেছেএএএএ! হে তৃষ্ণার্ত ভুখা নাঙ্গা জনতা, লাইনে দাঁড়াও। তোমাদের পিপাসা মেটাবে আমার এই স্পেশাল মামা মার্কা বোরহানি .. .. আরে, মুনিরা যে!’
ইকবাল হাসিমুখে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলো মুনিরার দিকে। ‘অ্যাদ্দিন কোথায় লুকিয়ে ছিলে? তোমার সাথে তো দশ বারো বছর ধরে দেখা হয়নি মনে হচ্ছে। ঘটনা কী বলো তো? মুনতাসির কি চায় না অন্যরা তোমাকে দেখুক?’

‘এই, আমার গ্লাসে আরেকটু ঢেলে দাও তো!’ শারমিন কড়া গলায় বললো।

‘এই তো, দিচ্ছি .. ..।’ ইকবাল শারমিনের দিকে তাকালো না। ‘কী মুনিরা, তোমারও চাই নাকি? দাঁড়াও, একটা গ্লাস নিয়ে আসি।’ ইকবাল ঘুরলো, আর চোখের পলকে যা ঘটার ঘটে গেলো।

মুনিরা চেঁচিয়ে উঠলো, ‘সাবধান .. ..।’ ও বুঝতে পারলো কী ঘটতে যাচ্ছে, আর কেন যেন মনে হচ্ছিলো এমনটা আগেও ঘটেছে, আর ঘটলোও তাই। কার্পেটে পা বেঁধে হোঁচট খেয়েছে ইকবাল, নিজেকে সামলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে গিয়ে জগটা তার হাত থেকে ফসকে গেছে, আর জগের ভেতরে ঠান্ডা মামা মার্কা বোরহানি পুরোটা ছলকে পড়ে মুনিরার কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত ভিজিয়ে দিয়েছে।

মুনিরা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো, তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। চারপাশের গুঞ্জন থেমে গেছে, মুনিরা অসহনীয় কয়েক সেকেন্ড নিজের শাড়ি থেকে বোরহানি ঝেড়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। ইকবাল ক্রমাগত বলে যাচ্ছে, ‘ইশ, কী অবস্থা, দুঃখিত, ধ্যত্তেরি .. ..,’ ক্রমশ তার গলা চড়ছে।

শারমিন ঠান্ডা গলায় বললো, ‘ইশ, কী বাজে ব্যাপার। থাক মুনিরা, এমনটা মাঝে মাঝে হয় .. .. আর, শাড়িটা তো খুব একটা দামী না .. ..।’

মুনিরা ঘুরে ছুটলো। তিন্নির শোবার ঘরটায় কেউ নেই, ওদিকটায় কোন হৈচৈ-ও পৌঁছোয় না। ম্লান একটা আলো জ্বেলে তিন্নির আলমারি খুলে ওর একটা শাড়ি খুঁজতে লাগলো মুনিরা।

ইকবাল ওর পেছনে এসে দাঁড়ালো। ‘ইয়ে, মুনিরা, শারমিনের কথায় কিছু মনে করো না .. .. আমি সত্যি খুব লজ্জিত .. .. আমি শাড়িটার জন্যে ক্ষতিপূরণ ..।’

‘না, ঠিক আছে। তোমার কোনো দোষ নেই।’ মুনিরা ইকবালের দিকে ফিরলো না। ‘আমি বাড়ি গিয়ে পাল্টে নেবো।’

‘তুমি আসছো তাহলে ফিরে?’

‘জানি না। মনে হয় না।’

‘মুনিরা, দ্যাখো ...।’ ইকবালের উষ্ণ হাত মুনিরার কাঁধ স্পর্শ করলো।

মুনিরা নিজের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করলো, যেন একটা মাকড়সার জালে আটকা পড়ে হাত পা ছুঁড়ছে সে, আর ...।

... আর ট্রেনের শব্দ ফিরে এলো আবার।

ইতিমধ্যে একটা গোলমাল অবশ্যই হয়েছে। চারদিকে এখন সন্ধ্যের অন্ধকার। ট্রেনের ভেতরে আলো জ্বলে উঠেছে। তাতে কিছ যায় আসে না, মুনিরা ওর ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ কাটিয়ে উঠছে।

ইকবাল দু’হাতে চোখ ডলছে। ‘কী হলো?’

‘থেমে গেলো, হঠাৎ করেই।’ মুনিরা বললো।

ইকবাল অস্বস্তি নিয়ে বললো, ‘আমরা বোধহয় কিছুক্ষণের মধ্যেই টঙ্গী পার হবো।’ সে নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মাথা দোলালো।

মুনিরা খানিকটা বিস্ময় নিয়ে বললো, ‘তুমি আমার ওপরেই বোরহানি ফেলেছো।’

‘হ্যাঁ, তাই তো। তোমার ওপরেই তো ফেলেছিলাম।’

‘কিন্তু আমি তো তোমার বউ ছিলাম। আর এখানে তোমার বউ .. .. তোমার তো বোরহানিটা শারমিনের ওপর ফেলা উচিত ছিলো। ব্যাপারটা কেমন যেন ইয়ে না?’ কিন্তু মুনিরা ভাবছিলো, ইকবাল ওকে বোঝাতে এসেছিলো, কাঁধের ওপর হাত রেখে .. ..।

মুনিরা ইকবালের দিকে তাকিয়ে উষ্ণ সন্তুষ্টি নিয়ে বললো, ‘আমি বিয়ে করিনি।’

‘হুম, তুমি বিয়ে করো নি। কিন্তু এটা কি মুনতাসির আলি, যার সাথে তুমি ঘুরছিলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘তুমি নিশ্চয়ই ওকে বিয়ে করার কথা ভাবছিলে না, কী বলো?’

‘হিংসা হচ্ছে, ইকবাল?’
ইকবাল খানিকটা বিমূঢ় ভাব নিয়ে বললো, ‘কীসের জন্যে? একটা কাঁচের টুকরোর জন্যে? অবশ্যই না।’

‘আমার মনে হয় না আমি মুনতাসিরকে বিয়ে করতাম।’

ইকবাল বললো, ‘আমার মনে হয় কী জানো? এটা এখানে শেষ হওয়াটা ঠিক হয় নি। আমার ধারণা, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছিলো।’ একটু থেমে ইকবাল ধীরে ধীরে বললো, ‘ব্যাপারটা এমন যে ঐ ঘরে কারো ওপরেই বোরহানি ফেলতে পারতাম।’

‘এমনকি শারমিনের ওপরেও।’

‘দ্যাখো, শারমিনকে নিয়ে আমি অতটা মাথা ঘামাইনি। তুমি আমাকে তো বোধহয় বিশ্বাস করবে না।’

‘করতেও পারি।’ মুনিরা ফিরলো ইকবালের দিকে। ‘একটু বেশিই ছেলেমানুষি করে ফেলেছি ইকবাল। চলো ... আমরা আমাদের সত্যিকারের জীবনটা নিয়ে থাকি। কী কী সব জিনিস হতে পারতো সেটা নিয়ে আর এমন বাচ্চাদের মতো করবো না।’

কিন্তু ইকবাল মুনিরার হাত ধরলো। ‘উঁহু, মুনিরা, শেষবারের মতো .. .. চলো দেখি আমরা এখন, এই মূহুর্তে কী করতাম! এই মূহুর্তে, যদি আমি শারমিনকে বিয়ে করতাম।’

মুনিরা একটু ভয় পেলো, ‘থাক না, ইকবাল ... বাদ দাও।’ ওর মনে পড়লো, ইকবালের প্রশস্ত হাসিমুখ, ওর দিকে আগ্রহী ভঙ্গিতে চেয়ে থাকা, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শারমিন, কিন্তু ইকবাল শারমিনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। মুনিরা এর পর কী ঘটতে পারতো তা জানতে চায় না। সে এখন শুধু এই জীবনটাই চায়, এই সুখী জীবনটা।

টঙ্গী পার হয়ে গেলো ট্রেন।

ইকবাল আবার বললো, ‘মুনিরা, আমি চেষ্টা করে দেখতে চাই।’

মুনিরা বললো, ‘ঠিক আছে, তুমি চাইছো যখন।’ কী আসে যায়, ভাবলো সে। কোন কিছুই আসে যায় না। মুনিরা হাত বাড়িয়ে ইকবালের বাহু জড়িয়ে ধরলো। শক্ত করে ইকবালকে ধরে রেখে ভাবলো, ‘এই সব যাদুটোনা কিছুই ওকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিতে পারবে না।’
ইকবাল ছোট্ট মানুষটাকে বললো, ‘আরেকবার দেখবো।’
ট্রেনের হলদেটে আলোয় দৃশ্য ফুটে ওঠার ব্যাপারটা আরো ধীর হয়ে এলো। ধীরে ধীরে ঝাপসা কাঁচটা পরিষ্কার হলো, যেভাবে বাতাসের ছোঁয়ায় আকাশ থেকে মেঘ সরে যায়।
ইকবাল বললো, ‘উঁহু, সমস্যা আছে। এই তো, আমরা দু’জন, এখন যেভাবে আছি।’

ইকবালের কথাই ঠিক। একই সীট জোড়ার ওপরে ওরা দু’জন বসে আছে। আস্তে আস্তে ইকবালের কন্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগলো, ‘ঠিক এই ট্রেনটাই। এই যে, পেছনের জানালাটার কাঁচে ফাটল ধরা ...।’

মুনিরা খুশিতে বাকবাকুম। ‘ইশ, এতক্ষণে যদি ঢাকায় পৌঁছে যেতাম!’

ইকবাল বললো, ‘এই তো সোনা, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবো। দেখি, একটু আদর সোহাগ করি .. ..,’ মুনিরার দিকে এগিয়ে যাবার উদ্যোগ নিলো সে।

‘এখানে? কক্ষণো না! চারদিকে সবাই তাকাচ্ছে!’

ইকবাল পিছিয়ে এলো। ‘আমাদের একটা ক্যাব নেয়া উচিত ছিলো।’

‘সিলেট থেকে ঢাকা, ক্যাবে চড়ে?’

‘আলবাৎ! পয়সা যা লাগতো তা উসুল হয়ে যেতো।’

মুনিরা হাসলো। ‘তুমি যখন এমন ঢং করো, খুব হাসি পায় আমার।’

‘ঢং না।’ হঠাৎ ইকবালের স্বর একটু ভারি হয়ে উঠলো। ‘এটা শুধু আর এক ঘন্টার ব্যাপার না মুনিরা। আমার মনে হচ্ছে আমি তোমার জন্যে পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছি।’

‘আমিও করেছি।’

‘কেন শুরুতেই তোমার সাথে আমার দেখা হলো না? মাঝখানের সময়টা মিছিমিছি নষ্ট হলো।’

‘বেচারা শারমিন।’ মুনিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

ইকবাল অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসলো। ‘ওর জন্যে দুঃখ করতে যেও না মুনিরা। আমরা কখনোই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারিনি। ও বরং কিছুটা খুশিই হয়েছে আমি চলে যাওয়ায়।’

‘জানি তো। সে জন্যেই বললাম, বেচারা শারমিন। যা পেয়েছিলো, তার মূল্য বুঝলো না।’

‘হুম। দেখো, তুমি বুঝতে পারো কি না। ভালো করে মূল্যায়ন করো আমাকে, খুব ভালো করে। অন্তত আমি যা পেয়েছি, তার যতখানি মূল্য দিই, তার অর্ধেকটা করো।’

‘নাহলে? আমাকেও ডিভোর্স দিয়ে দেবে?’

‘জিন্দেগীতেও না।’ বললো ইকবাল।

মুনিরা বললো, ‘ব্যাপারটা কেমন যেন আজব, বুঝলে? আমি সবসময় ভাবি, কেমন হতো যদি তুমি সেদিন তিন্নির বাড়িতে পহেলা বৈশাখের পার্টিতে আমার গায়ে বোরহানি ঢেলে না দিতে? তা না হলে তুমি আমার পিছু পিছু আসতে না, আমাকে কখনো কিছু বলতে না, আমি জানতামও না। সবকিছুই তখন অন্যরকম হতো ... সবকিছু।’

‘কী যে বলো! সবকিছু একই রকম হতো। হয়তো অন্য আরেক সময় হতো।’

‘কী জানি!’ মুনিরা নরম গলায় বললো।

ট্রেনের গর্জন ট্রেনের গর্জনের সাথে মিশে গেলো। বাইরে শহরের আলো ঝিকমিক করছে, ঢাকার উপকন্ঠে চলে এসেছে ট্রেন। বগির ভেতরে সবার মধ্যে লাগেজ নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া চলছে।

এতসব গোলমালের মধ্যে দ্বীপের মতো একা হয়ে বসে আছে মুনিরা। ইকবাল তার হাত ধরে ঝাঁকি দিলো।
মুনিরা ওর দিকে ঘুরলো, ‘জিগ’স পাজলের টুকরোগুলো তাহলে শেষ পর্যন্ত মিলে গেলো, কী বলো?’

ইকবাল বললো, ‘হ্যাঁ।’

মুনিরা ইকবালের হাতের ওপর একটা হাত রাখলো। ‘কিন্তু যাই বলো, ভালো লাগেনি। আমি খুব ভুল ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম, আমরা যখন একজন আরেকজনকে পেয়ে গেছি, হয়তো এমন সম্ভাব্য আরো অনেক জুটি হতে পারতো। কিন্তু এখন আর সেসব সম্ভাবনা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাবো না। আমাদের এই সত্যি জীবনটাই ভালো। তুমি কি বুঝতে পারছো আমি কী বলতে চাইছি?’

ইকবাল মাথা ঝাঁকালো।

‘এমন আরো লক্ষ লক্ষ “এমন যদি হতো” থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলোতে কী হলো আমি আর জানতে চাই না। আমি আর কখনো “এমন যদি হতো” কথাটাই উচ্চারণ করবো না।’

ইকবাল বললো, ‘ঠিক আছে, মাথা ঠান্ডা করো। এই যে ধরো, তোমার সোয়েটার।’ র‌্যাক থেকে স্যুটকেস নামাতে গেলো সে।

মুনিরা হঠাৎ তীক্ষ্ণ গলায় বললো, ‘সেই লোকটা কোথায়? “এমন যদি হতো” সাহেব?’

ইকবাল আস্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের সামনে ফাঁকা সীট দেখতে পেলো। তারপর দু’জন মিলে বগির বাকি অংশ খুঁটিয়ে দেখলো।

‘কে জানে, হয়তো পাশের বগিতে চলে গেছে।’ সিদ্ধান্তে আসলো ইকবাল।

‘কিন্তু কেন? আর গেলে তো সে টুপি ফেলে রেখে যেতো না।’ মুনিরা টুপিটা তুলতে নিচে ঝুঁকলো।

‘কিসের টুপি?’ জিজ্ঞেস করলো ইকবাল।

আর মুনিরা থেমে গেলো, কারণ তার আঙুলের নিচে কিছুই নেই। ‘ছিলো তো এখানেই .. .. আমি আরেকটু হলেই .. ..।’ মুনিরা সোজা হয়ে দাঁড়ালো, ‘ওহ ইকবাল, এমন যদি হতো ...।’

ইকবাল মুনিরার ঠোঁটের ওপর একটা আঙুল রাখলো। ‘সোনা ...।’

মুনিরা বললো, ‘আচ্ছা বাবা আচ্ছা, মাফ চাই। চলো দেখি, স্যুটকেসটা নামানো যাক।’

ট্রেন কমলাপুরের দিকে এগিয়ে চললো, চাকার ঝুক ঝুক ঝুক ঝুক আওয়াজটাই শুধু শোনা যাচ্ছে চারপাশে।
.
.
.


আইজ্যাক আজিমভের "হোয়াট ইফ" গল্পের ছায়াবলম্বনে। অনুবাদকাল ২০০৩।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।