Saturday, October 10, 2009

বইপাগলঃ আনিসুল হকের "এতদিন কোথায় ছিলেন"


বইটা হাতে পেয়েছি কনফুসিয়াসের সৌজন্যে।

বইটির শুরুতে যে কথাগুলো লেখা আছে, পড়ে বেশ উৎসাহিত হয়েছিলাম। এক ঔপন্যাসিক লিখছেন তাঁর প্রিয় কবির জীবনকে নিয়ে, ওদিকে উপন্যাসের পৃষ্ঠাসংখ্যাও ১৩৩, কাজেই মনের মধ্যে প্রত্যাশার পাগমার্ক বেশ গভীর হয়েই ফোটে। বইয়ের শেষে দুই পৃষ্ঠা জুড়ে বিবলিওগ্রাফি দেয়া, আশাবাদ আরো গাঢ় হয়।

কিন্তু বইটা যতই পড়ি, সেই আশার লণ্ঠনের চারপাশে কুয়াশা জমে।

বই শুরু হয়েছে জীবনানন্দের বালকবেলার বর্ণনা দিয়ে। ঔপন্যাসিক আগাগোড়া রচনা করেছেন জীবনানন্দকে "আপনি" সম্বোধন করে ... আপনি করলেন, আপনি বললেন, আপনি হেসে উঠলেন ... জীবনানন্দকে মুখোমুখি বসিয়ে যেন তাঁকে পড়ে শোনানো হচ্ছে তাঁর জীবনকাহিনী, কবিতা, তাঁর ডায়রির পাতা। ভঙ্গিটি অভিনব, কিন্তু ঠিক যেন পুরোপুরি ফোটেনি সবকিছু, চিনি-লিকার-দুধ মেশেনি ঠিকমতো। কেন এমন মনে হলো, সে প্রসঙ্গে আসছি।

এ কথা সত্য, প্রচুর তথ্য নেয়া হয়েছে বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ থেকে, কিন্তু সে তথ্য সন্নিবেশনের কাজটি যেন ঔপন্যাসিক পটু হাতে করে উঠতে পারেননি। উপন্যাসটি দাঁড়িয়েছে একটি ড়্যানসমনোটের মতো, এক এক ফন্টে এক একটি অক্ষর দিয়ে তৈরি করা বাক্যসমারোহের মতো, একটি তথ্যের পরিবেশন মসৃণভাবে মিশতে পারেনি পরবর্তী তথ্যের সাথে। কোথাও দেখতে পাচ্ছি সরাসরি উদ্ধৃত করা হচ্ছে ড, আলী আকবর খানের বই থেকে, কোথাও জীবনানন্দের উপন্যাস থেকে, কোথাও তাঁর ডায়রি থেকে, কোথাও অপর কোনো গবেষণাগ্রন্থ থেকে, উদ্ধৃতির ভিড়ে উপন্যাসটি লজ্জাবনতা কিশোরীর মতো মুখ লুকিয়েছে কোথাও, গোটা বইতে তাকে খুঁজে পাওয়া ভার।

কালানুক্রমে জীবনানন্দকে আঁকতে গিয়েও ছন্দপতন হয়েছে। প্রসঙ্গান্তরে চলে এসেছেন অন্য কোনো জীবনানন্দ, একটি দৃশ্য থেকে লেখক লাফিয়ে সরে যাচ্ছেন ভিন্নদৃশ্যে, এই কক্ষপথ পরিবর্তন পাঠকের মনে অস্বস্তি তৈরি করে বলে আমার মনে হয়েছে। বালক মিলুর চারপাশ আঁকতে গিয়েও যেন তুলি সরে আসছে কাগজের ওপর থেকে, তারপর অকস্মাৎ দেখতে পাই জোয়ান জীবনানন্দকে। সেই জীবনানন্দ কখনো সিটি কলেজের চাকরি খোয়াচ্ছেন, আবার কখনো সেখানেই চাকরি করছেন, স্পষ্ট নয়, ঔপন্যাসিক কি পাঠককে তেলমাখা বাঁশে তিনফুট চড়িয়ে আবার ফুট দেড়েক নামিয়ে আনছেন, নাকি স্বয়ং জীবনানন্দই পর্যায়কালীন চাকরি ধরা-ছাড়ার মধ্যে রয়েছেন।

ব্যক্তির জীবনকে আঁকতে গেলে তাঁর জীবদ্দশায় যেসব ঘটনা তাঁর আশপাশের পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, সেদিকেও ঔপন্যাসিকের মসীর স্পর্শ কামনা করে পাঠকের মন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বড় বড় ঘটনার কোনো প্রভাবই কি জীবনানন্দের ওপর পড়েনি? ঢাকার তরুণেরা রাইটার্স বিল্ডিঙে ঢুকে পিস্তল হাতে যুদ্ধ করছে বৃটিশের গুর্খাবাহিনীর সাথে, জীবনানন্দের বয়স তখন ৩১, এ ঘটনার কোনো ছাপই কি পড়েনি তাঁর মনে? বৃটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের তুমুলতম সময়টিতে জীবনানন্দের যৌবনকাল, তিনি কি একেবারেই অস্পৃষ্ট ছিলেন সেই প্রতিবেশে? এর কোনো হদিশ মেলে না "এতদিন কোথায় ছিলেন"-এ, কারণ রহস্যে মোড়া। হয়তো বিবলিওগ্রাফিতে বর্ণিত বইগুলিতে ও নিয়ে কিছু লেখা ছিলো না, কে জানে?

উপন্যাসটিতে শুধু মুগ্ধ হয়েছি "বনলতা সেন" কবিতাটির ঠিকুজি সন্ধানের কুশলতায়। বোধ করি এ নিয়ে গবেষকরা গান্ধার-মগধ-লঙ্কা-কামরূপ-বিশ্বসংসার তন্নতন্ন করে একশো আটটি আইডিয়া-গরু খুঁজে এনেছেন, কে এই নাটোরিকা, এবং ঔপন্যাসিক সেই হাইপোথিসিসগুলি সাজিয়েছেন সুবিন্যাসে। তাঁর পুস্তকটি পাঠ করিলে জানিতে পারা যায়, হয়তো বনলতা সেন ছিলেন জীবনানন্দের নাটোর হয়ে দার্জিলিংগামী ট্রেনে নাটোর স্টেশন থেকে ওঠা কোনো তরুণী, হয়তো বনলতা সেন ছিলেন রাণী ভবানীর বাড়িতে আতিথ্যমগ্ন কবির পরিবেশন নিয়োজিতা কোনো রূপসী পরিচারিকা, হয়তো বনলতা সেন ছিলেন রূপোপজীবিনীদের পসরার জৌলুসে খ্যাত নাটোরের কোন দেহপসারিণী, হয়তো বনলতা সেন কিছুই ছিলেন না কবির কবিত্বের জলছাপ ছাড়া ... কিন্তু এই কবিতাটির স্থানকালপাত্র গবেষকদের আতশ কাঁচের নিচে পড়ে পড়ে তার অন্ত্রের ভাঁজের রহস্যটুকুও হারিয়েছে, নানা প্রকল্পে জর্জরিত বনলতাসেনের যাবতীয় সম্ভাবনা সেই গবেষকদের গ্রন্থ থেকে উঠে এসেছে হকের উপন্যাসে। বনলতা সেনের পরিচয়হীনতার ক্ষমা নেই, তার রহস্য কবিতার পাঠক খঞ্জর হাতে মোচন করবেই। পাখির নীড়ের মতো চোখ থেকে শুরু করে থাকে শুধু অন্ধকার, সবই গবেষকের এক্সরে ভেদ করে দেখে ফেলে। মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন এমন অন্তহীন রিমান্ডে গবেষকের মুখোমুখি বসে, কে বলবে, আদৌ কোনো অন্ধকার থাকে শেষ পর্যন্ত?

উপন্যাস এগিয়েছে জীবনানন্দের মানসপ্রিয়াদের সন্ধান করে করে। খুড়তুতো বোন শোভনা মজুমদারই কি বারে বারে জীবনানন্দের ফ্যান্টাসির উদ্দিষ্টা হয়ে তাঁর ডায়রি আর গল্পের চরিত্র হয়ে এসেছেন? নাকি অন্য কেউ ছিলেন? উপন্যাসে তাই এক কবির প্রেয়সীদের হারিকেন হাতে খুঁজতে থাকে পাঠক। সেই সন্ধানের ভুলভুলাইয়াতে চলতে চলতেই জীবনানন্দের বিয়ে হয় লাবণ্যপ্রভার সাথে, তাঁর কন্যা আসেন পৃথিবীতে, তাঁর বিবাদ-বিষাদের কাহিনীটুকু হুবহু উঠে আসে তাঁর ডায়রি আর তাঁর উপন্যাসের পেপারকাটিঙে চড়ে। ঔপন্যাসিকের নিজস্ব কল্পনাশক্তি তখন জরুরি অবস্থায় সংবিধানের মতোই যেন, অস্তিত্বশীল কিন্তু স্থগিত। তিনি কেবল সাজিয়ে নেন এই টুকরো টুকরো পৃষ্ঠাকে। এই প্রচেষ্টা চলে উপন্যাসের শেষ স্তবক দুটির আগ পর্যন্ত।

যাঁরা বইটির সন্ধান আমাকে দিয়েছেন, তাঁদের কয়েকজনের কাছ থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া পেয়েছি জীবনানন্দের হস্তমৈথুনের বর্ণনার বিরুদ্ধে। ফেসবুক এবং ব্লগে হালের কতিপয় আজিজীয় কবির নিজের কলমে নিজেকে রমণের পুনরাবৃত্ত সব ঘটনায় তাদের স্বমেহনপারঙ্গমতা এবং স্বমেহনপ্রবণতার নিদর্শন দেখে আমি বিস্মিত নই, যে কবিরা বাস্তব জীবনেও স্বমেহন করতেই পারেন, এবং জীবনানন্দও স্বমেহন করে থাকতে পারেন, তাঁর যৌনজীবন আমার কাছে আগ্রহের বিষয় নয় বলে এই বর্ণনায় আমি উৎফুল্ল বা বিমর্ষ হবার মতো কিছু পাইনি। তবে বেশ কিছু ইংরেজি প্রতিশব্দ ঘুরে ফিরে ব্যবহৃত হয়েছে উপন্যাসে, হাত মারাকেও মাস্টারবেশন লিখে একটু আবছা করে দেয়ার কৌশল চোখে পড়েছে।

উপন্যাসটি শুরু হয়েছে ঔপন্যাসিকের চোখের জল দিয়ে, শেষও হয়েছে অশ্রু দিয়েই, জীবনানন্দের মৃত্যুর করুণাধারাসিক্ত বর্ণনার পর, তবে সে অশ্রু আবার সামষ্টিক, লেখক সচেতনভাবেই পাঠককেও অশ্রুপাতের সহযাত্রী হিসেবে ধরে নিয়েছেন। পাঠকের অশ্রু জীবনানন্দের নিরানন্দ, বিমর্ষ, বেদনাতুর, ভালোবাসাহীন জীবনের জন্যে যতটা গড়িয়ে নামে, তারচেয়ে বোধ করি বেগবান হয় জীবনানন্দের প্রতি মমত্বের যে অঙ্গীকার উপন্যাসের প্রাগকথনে মূর্ত, তা ভঙ্গ হওয়ায়। এই উপন্যাসটি আরো ব্যাপ্তি নিয়ে, আরো সময় নিয়ে রচিত হওয়া উচিত ছিলো, তাতে ঔপন্যাসিকের "জিগর কা খুন" আরো একটু রঞ্জিত থাকার কথা ছিলো, জীবনানন্দের জীবনটি আরো অধিক হয়ে ফোটার প্রয়োজন ছিলো, তার কিছুই ঘটেনি। শেষ বিচারে উপন্যাসটি কিছু গবেষণাগ্রন্থের কাটিংবুক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মাঝে অল্প কিছু জায়গায় শুধু চোখে পড়ে, এক কবি আরেক কবিকে স্মরণ করে দুয়েকছত্র লিখেছেন প্রগাঢ় ভালোবাসায়, বাকি অংশগুলিতে সেই কবিকে আইপিসহ ব্যান করে একজন ব্যস্ত কলামিস্ট উপন্যাস লেখার অভিনয় করে যাচ্ছেন কেবল।

আমি জানি না, ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাসের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের "সেই সময়", "একা এবং কয়েকজন", "প্রথম আলো", কিংবা "মৈত্রেয়ী জাতক" (বাণী বসুর নয় কি?) অথবা ভার্গাস ইয়োসার "ফীস্ট অব দ্য গোট" পড়ে বিরাট ব্যাপ্তির মধ্যে ইতিহাসের ঘটনাগুলি দেখার আগ্রহ আমার মাঝে তৈরি হয়েছে কি না, কিন্তু স্বল্পায়তনের মধ্যে জীবনানন্দ দাশকে পড়তে গিয়ে এই বইটির কাছে আমার পাঠক মন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আমি ভবিষ্যতে আনিসুল হকের কাছ থেকে মহত্তর উপন্যাসের প্রত্যাশায় থাকবো।


[]

2 comments:

  1. আনিসুল হকের লেখা আমার কখনোই সপ্রতিভ লাগে নাই। ব্যস্ত মানুষ, এজন্যই মনে হয় ফিনিশিংটা জুত করে দেওয়া হয়ে ওঠেনা।

    ReplyDelete
  2. উপন্যাস কাকে বলে? এটা কি উপন্যাস? আবার নাকি পুরষ্কারও পেয়েছে। আমাদের অবস্থা কি এতই খারাপ? সত্যি সেলুকাস!

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।