Thursday, October 01, 2009

মিসির আলি



প্রচণ্ড টেনশন আর ব্যস্ততা থাকলে মাঝেমধ্যে ঢিল দিতে ইচ্ছা করে। ওরকম একটা ঢিল দিয়ে বসে আছি, এরপর আবার নাট ঘুরিয়ে তারে টাইট দেবো। শেষ পর্যন্ত হয়তো সিদ্ধার্থের মঝ্যিম পন্থাই অবলম্বন করতে হবে।

গিয়েছিলাম মিউনিখে, অক্টোবরফেস্টে, অগ্রজপ্রতিম তীরন্দাজের আতিথ্য বরণ করে। সেই আতিথ্য আবার শটগান আতিথ্য, তীরুদার হাজারটা কাজের ব্যস্ততা, আমরা এদিক দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে মনে পড়লো, আচ্ছা তীরন্দাজ কি জানেন যে আমরা আসছি? শেষ পর্যন্ত মানুষটা তীরন্দাজ বলেই হয়তো জার্মানির তিন দিক থেকে আমরা চারজন গিয়ে হামলা করি তাঁর আর উশি ভাবীর ওপর, তাঁরাও অম্লানবদনে সহ্য করেন আমাদের উৎপাত। সে গল্প সামনে করছি ছবিসহ, আপাতত মিসির আলিকে নিয়ে বলি।

আমি নেটাসক্ত মানুষ, এটা টের পেয়ে গেছি ইতিমধ্যে। হাতের কাছে নেট না থাকলে শরীর কামড়াতে থাকে, মেজাজ খারাপ হয়, চা-কফি খাবার পরিমাণ বেড়ে যায়, একমাত্র নারীসংসর্গই এর নিরাময় করতে পারে। দীর্ঘ নয় ঘন্টা জার্নির পর মিউনিখে পৌঁছে আরো ঘন্টা তিনেক আড্ডা মেরে তীরুদার বাসায় পৌঁছেই তাই সচল হাসিবের ল্যাপটপ ছিনতাই করে বসে পড়লাম। সচলায়তন খুলে চোখ বুলাচ্ছি নীড়পাতায়, চোখে পড়লো অতন্দ্র প্রহরীর চমৎকার একটি রিভিউ। তা-ও আবার মিসির আলি। রহস্যগল্প আমি এমনিতেই ভালোবাসি, আর মিসির আলির গল্পগুলোর মেজাজই অন্যরকম। রাত তখন অনেক, কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে শুয়ে পড়েছে বাকিরা, আমি ডাউনলোড করে পড়তে শুরু করলাম। পড়া শেষ করে ভোরে ঘুমাতে গেলাম।

বইটা সম্পর্কে আমার প্রতিক্রিয়া প্রহরীর পোস্টেই বলেছি। কিন্তু মিউনিখে দেড়দিন প্রবল আড্ডাবাজি আর ঘোরাঘুরি করে আবারও দীর্ঘ ক্লান্তিকর জার্নি সেরে কাসেলে ফিরে এসে আমার মাথায় মিসির আলির ভূত চেপে রইলো। হাসিব ভাইকে টোকা দিয়ে মিসির আলির আরো কিছু পিডিয়েফ যোগাড় করলাম, সেগুলো পড়ছি এক এক করে।

একটানা কয়েকটা গল্প পড়ে যে সিদ্ধান্তে এসেছি, সেটি হতাশাব্যঞ্জক। আমার কাছে মনে হয়েছে, হুমায়ূন আহমেদ সময়ের সাথে এই ঘরানার গল্প বা বড়গল্প লেখার শৈলীটি ক্রমশ হারিয়ে ফেলছেন। দেবী বা নিশীথিনীর কথা বাদ দিই, সেগুলো বাদেও মিসির আলিকে নিয়ে তিনি চমৎকার কিছু গল্প লিখেছেন [নাম উল্লেখ করতে গেলে বলতে হয় "বৃহন্নলা" আর "অন্য ভূবন"], সেগুলি ভবিষ্যতে তাঁর মশালবাহক হবে। কিন্তু নিকট অতীতে লেখা মিসির আলিগুলিতে আগের সেই টানটান ভাবটা নেই। হুমায়ূন আহমেদের বইগুলিতে সাধারণত বর্ণনাগত ত্রুটি থাকে, দারুণ ঘটা করে বর্ণিত লেজকাটা কুকুর কয়েক পৃষ্ঠা পর লেজ নাড়তে থাকে, এইসব ছোটখাটো ত্রুটি মিসির আলির বইগুলিতে বরাবর অনুপস্থিত ছিলো, সেগুলি অনেক গোছানো, পরিমিত আর টানটান থাকতো, কিন্তু সময়ের সাথে হুমায়ূন আহমেদের গড় উপন্যাসগুলির ত্রুটি হেঁটে এসে মিশে গেছে মিসির আলির সাথে। আরো সহজ করে বললে, মিসির আলির লেখাগুলি লেখক নিজেই গোড়া থেকে কয়েকবার পড়েছেন, উলটে পালটে দেখেছেন, কোনো ত্রুটি থাকলে মার্জনা করেছেন, এমন একটা ধারণা পাঠকের মনে তৈরি হতো, যেটা এখন আর হয় না। মনে হয়, কোনোমতে টেনেটুনে শেষ করা এক একটা লেখা, যেটি লেখক নিজে দ্বিতীয়বার পড়ে দেখার উদ্যোগ নেননি। এই যে অযত্নটুকু, এটিই পাঠকের জন্যে অপমানকর বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।

মিসির আলির গল্পের দু'টি ধারা আছে, একটিতে লেখক উত্তম পুরুষে উপস্থিত থাকেন, মিসির আলিকে বর্ণনা করেন। অপরটিতে মিসির আলি স্ক্রাইবের অনুপস্থিতিতেই যা করার করে চলেন। এই দু'টি ধারা বরাবরই সমান্তরাল ছিলো, কিন্তু সময়ের সাথে যা হয়েছে, সেটি হচ্ছে, মিসির আলি চরিত্রটি জোলো আবেগের আধিক্যের শিকার হয়েছে, যা হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য লেখায় সুলভ। বরাবর যে স্বাতন্ত্র্য মিসির আলির চরিত্রে ছিলো, সেটি ক্রমশ লোপ পেয়েছে, এখন মিসির আলির গল্পে মিসির আলিকে লম্বা, শুকনো, নিরাবেগ, তীক্ষ্ণধী মানুষ বলে কল্পনা করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, মনে হয়েছে একজন প্রৌঢ় হুমায়ূন আহমেদকেই দেখছি মিসির আলির গেঞ্জি গায়ে। এই পরিবর্তনটি হজম করা কষ্টকর। গল্পের চরিত্রে লেখক সেই তাঁবুর উটের মতো একটু একটু করে ঢুকে পড়ছেন ক্রমশ, এতে মিসির আলির চরিত্রহননই হচ্ছে কেবল। যখন ঘনাদা পড়ি, প্রথম থেকে সেই শেষ পর্যন্ত, ঘনাদার চরিত্রটি স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখে, যেমন রাখে সত্যজিতের শঙ্কু আর তারিণীখুড়ো, কোনান ডয়েলের প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, শরদিন্দুর বরদাচরণ। বাস্তব পৃথিবীকে অতিক্রম করে লেখা গল্পের শিখণ্ডী চরিত্রগুলির এই স্বাতন্ত্র্য জরুরি বলে মনে হয় আমার কাছে। লেখকের ওতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকার অধিকার আছে, প্রয়োজন নেই।

পাশাপাশি আমি এ-ও স্বীকার করবো, মিসির আলির গল্পগুলিতে রহস্যগুলি মান্টোর গল্পের টোবাটেক সিং এর মতোই যেন, অর্ধেক বাস্তব পৃথিবীতে, বাকি অর্ধেক মানুষের মনে ... এ ধরনের গল্পের মানকে পরিমাণের বিপরীতে রেখে ছক কাটলে তা ওপর থেকে নিচের দিকেই নামে। এ ধরনের গল্প গণ্ডায় গণ্ডায় লেখা সহজ নয়, লিখলে মান বজায় রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অগণিত ছাইপাঁশের পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলির গল্পগুলি লিখেছেন বড় সযত্নে, যে যত্ন তিরোহিত হচ্ছে ক্রমশ। হুমায়ূন আহমেদ নিজস্ব পাঠকবলয় তৈরি করে নিয়েছেন, যারা তাঁর নামাঙ্কিত সবকিছুই নির্বিবাদে ভক্ষণ করে; কিন্তু এই যে মিসির আলির টানটান গল্পের ঘরানা, এটিকে যেন তিনি কমপ্রোমাইজ না করেন, পাঠক হিসেবে এটি আমার কামনা। আমি নতুন কোনো মিসির আলি পড়তে না পেলেও অখুশি হবো না, কিন্তু আধাখ্যাঁচড়া জোড়াতালি মার্কা জোলো রহস্যগল্প পেলে ঐ অযত্নের অভিযোগ করবো। পাঠক হিসেবে সে অধিকার আমি অর্জন করে নিয়েছি কয়েক দশকে।


[]


3 comments:

  1. নিলয় নন্দী12 January, 2012

    শরদিন্দুর বরদাচরণ? শীর্ষেন্দুর নয়?
    ... লেখাটা ভাল লাগল।

    ReplyDelete
  2. শীর্ষেন্দুর বরদাচরণ হচ্ছে গোয়েন্দা, শরদিন্দুর বরদাচরণ হড়ড়গল্পের কথক। হাতে পেলে পড়ে দেখবেন, বাংলায় লেখা সেরা কিছু হড়ড়গল্প বরদারচরণের বয়ানে আছে।

    ReplyDelete
  3. নিলয় নন্দী04 March, 2012

    ও আচ্ছা, মনে পড়েছে। একটা গল্প পড়েছিলাম ১৯৯০ সালে। খুব সম্ভব পিডিএফ (শরদিন্দু ৫ম খন্ড)আছে আমার কাছে।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।