Wednesday, September 09, 2009

লাল বেড়ালঅলা বইয়ের লোকটা

সুকুমার রায় আরো অনেকের মতো আমার শৈশবের একটা অংশ দখল করে বসে আছেন। শৈশব উত্তীর্ণ হবার পর একমাত্র বেরসিকরাই সেই দখলের পাট্টা ওপড়ানোর সামর্থ্য রাখেন। আমি পারিনি।

আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত লাল ডিমাই সাইজের (নাকি ডাবল ডিমাই?) সেই সমগ্র শিশু সাহিত্য আমার হাতে পড়ে মাজার জোর হারিয়ে খণ্ডবিখণ্ড হয়েছে কয়েকবার। শেষবারের মতো গুঁড়ো গুঁড়ো করার পর আমার ভাই রেগেমেগে একটা হার্ড কাভার সুকুমার সমগ্র কিনে আনলেন কোত্থেকে যেন। কিন্তু কিমাশ্চর্যম, ওতে আমাদের কারোই রুচি হয় না, না আমার ভায়ের, না আমার, না আমার ছোট্ট ভাগ্নির, বইটা পড়ে পড়ে বুকশেলফের কাঁচের ওপাশ থেকে আমাদের দেখে আর ধূলো খায়। বইয়ের ভেতরে যা লেখা আছে, তা কয়েকশো বার পড়া হয়ে গেছে, বই বার করা হয় ছড়ার কোনো লাইন নিয়ে তর্ক বাঁধলে রেফারেন্স হিসেবে। তা না হলে হেড আপিসের বড় বাবু, কাঠবুড়ো, কাতুকুতু বুড়ো, রামগরুড়ের ছানা, হিজবিজবিজ, পাগলা দাশু, হেশোরাম হুঁশিয়ার, ভজু আর রামার ছিলকা কুকুর, সবই বই থেকে ছেঁকে নিয়ে সেই কবে বুকে রেখে ঘুরছি।

কোনো জটিল তত্ত্ব নেই, কানে ধরে ভারি ভারি কথা বোঝানোর চেষ্টা নেই, কিন্তু তারপরও সুকুমার কণ্ঠস্থ হয়ে থাকেন কী করে, এই এতগুলি বছর ধরে? প্রফেসর ইউনুস বিদেশে সংবর্ধনা নিতে যান, মৃদু হেসে বলি, অতুল কীর্তি রাখলো ভবে চণ্ডীদাসের খুড়ো। সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে সেনানায়কেরা নানা বুকনি ঝাড়েন, দূরে বসে বিড়বিড় করে বলি, হাতে আমার মুগুর আছে তায় কি হেথায় থাকবে না? সংবিধান নিয়ে সংকটের আমলে বড় বড় আইনজীবীরা কথার ফানুস ফোলাচ্ছেন আর ফাটাচ্ছেন টক শো-তে এসে, তাদের কথা শুনে আপনা থেকেই মুখে চলে আসে, নাহয় আমি বাতলে দেবো বাঁচবে মামা কী খেলে! সাধু সেজে ব্লগে শয়তানের লেজ ধরে ঘুরপাক খাচ্ছেন কোনো জাতেমাতাল, লিখে ফেলি, ট্যাঁশগরু গরু নয়, আসলেতে পাখি সে!

সুকুমারের হাত থেকে মুক্তি নাই আর এই জীবনে। তাঁর মৃত্যুতে শোক করি না এই ৮৬ বছর পর, শোক করি সুকুমারমুগ্ধ নিজের শৈশবের মৃত্যু নিয়ে। ঢাকা থেকে সুকুমারের সমগ্র শিশু সাহিত্য পাঠানো হয়েছে আমাকে, বোনকে ফোন করে ঘ্যানঘ্যান করছিলাম, বইটা আর আগের মতো নাই। কাগজ খারাপ করে ফেলেছে, বাঁধাই অন্যরকম, ছাপা কেমন যেন। আমার বোন সব শুনে শুধু বললেন, ভাইয়া, তুমিও তো আর আগের মতো নাই। সবকিছুই পাল্টায়।

সবকিছু পাল্টে যায়, এই সত্যিটুকু স্বীকার করে নিয়ে চোখ মুছে শ্রদ্ধা জানাই আপনাকে, সুকুমার। আপনি ছিলেন বলে অতীত জীবনটা লাল গানে নীল সুর, হাসি হাসি গন্ধে আনন্দময় কেটেছে, যেমন কাটবে আরো অগণিত শিশুর।


[]

3 comments:

  1. Anonymous09 June, 2010

    কাটবে কি? সুকুমারের নাম জানে এমন শিশু কেন, এমন পিতা-মাতা আজকাল চোখে পড়ে আপনার?

    ReplyDelete
  2. Sukumar na pore boro hoye jaoar jonno amar charpasher manushder upor onek raag holo lekhata pore!

    Janen ki Kabir Suman tar gore othar pechone sobcheye boro krititto Sukumar kei den!

    ReplyDelete
  3. আনন্দ পাবলিশার্স কলকাতা থেকে একটা তিন খন্ডে সম্পূর্ণ সুকুমার সমগ্র বেরিয়েছে। এটা কিন্তু শুধু শিশুসমগ্র নয়।অন্যান্য লেখা এমনকি অনেক ইংরাজী লেখা, অনুবাদ এসবও আছে। হাতে নিয়ে দেখতে পারেন।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।