Thursday, September 03, 2009

ফুটোস্কোপিক ০১৫


ফুটোস্কোপিক হচ্ছে ফুটোস্কোপ দিয়ে দেখা গল্প। সামান্যই দেখা যায়।

...

রবি ফেসবুকের লগইন টেক্সট বক্সে ঝড়ের বেগে টাইপ করলেন, ভানু ডট সিংহ অ্যাট জিমেইল ডট কম। পাসওয়ার্ড এইচ ও টি আর এ এন ইউ থ্রি টু টু থ্রি থ্রি সিক্স।

ফেসবুক রবির বড় ভালো লাগে। গোটা ফেসবুক ভর্তি ডাগর সব মেয়ে। তারা স্কুলে পড়ে, কলেজে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কেউ কেউ চাকরিবাকরি করে। তারা নানারকম ছবি আপলোড করে রোজ রোজ। হাসিমুখের ছবি। গোমড়ামুখের ছবি। শাড়ি পরা ছবি। গেঞ্জি পরা ছবি। রবির দিন কেটে যায় এসব ছবি দেখে। তিনি মনে মনে ভাবেন, তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা?

একটা টেক্সট ফাইল ওপেন করে কথাটা লিখে রাখেন রবি। আরো কয়েক পদ জুড়ে গান বানিয়ে ফেলা যাবে নাহয়।

সম্প্রতি রানু নামের এক চঞ্চলা বালিকার সাথে রবির ভাব হয়েছে। রানু বড় ছটফটে, ফেসবুকে ঢুকেই সে স্ট্যাটাসে হড়বড় করে নানা মেসেজ লেখে, ছবি আপলোড করে, অন্যের স্ট্যাটাসে গিয়ে মন্তব্য করে। রবি মাঝে মাঝে চ্যাট উইন্ডো খুলে টুকটাক আলাপ করেন রানুর সাথে।

রানুর আরেকটি গুণ হচ্ছে, তার বান্ধবীরাও তার মতোই ছম্মাকছল্লো। রবি তাদেরও অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন। তাদের মধ্যে কারিনা কুলসুম*, শাফিনা শবনম*, মোদিনা মোনওয়ারা* এ পর্যন্ত সেই অনুরোধ রেখেছে। পাপিতা পাটওয়ারি* এখনও কথা রাখেনি, অ্যাড করার পর তেত্রিশ ঘন্টা কেটে গেলো ... ।

রবি দেখেন, অনলাইনে শাফিনার নামখানি দেখা যাচ্ছে। তিনি ক্লিক করে চ্যাট উইন্ডো খুললেন।

- হাই শাফিনা।

শাফিনার জবাব আসে দেরি করে।

- হাই ভাইয়া। কী করেন?

- এই তো, কিছু না।

- কিছু একটা তো করেন?

- গান লিখি।

- কী গান?

- আছে একটা গান।

- হঠাৎ গান লেখেন কেন?

- তোমার নতুন প্রোফাইল পিক দেখে একটা গান মাথায় এলো ... ।

- যাহ দুষ্টু। ঐ পচা শাড়ি পরা ছবি দেখে আপনি কী গান লিখলেন?

- সত্যি!

- কী গান?

- দাঁড়াও, বলি। আজ বুকের বসন ছিঁড়ে দাঁড়িয়েছে এই প্রভাতখানি / আকাশেতে সোনার আলোয় ছড়িয়ে গেল তাহার বাণী।

- যাহ দুষ্টু! আপনি খুব দুষ্টু! মোটেও বসন ছিঁড়ে যায়নি, ব্লাউজটা হাতাকাটা!

- আহ শোনোই না। ওরে মন, খুলে দে মন, যা আছো তোর খুলে দে / অন্তরে যা ডুবে আছে, আলোক পানে তুলে দে!

- ভাইয়া! আপনি খুব পাজি!

- আনন্দে সব বাধা টুটে, সবার সাথে ওঠ রে ফুটে / চোখের 'পরে আলস-ভরে রাখিস নে আর আঁচল টানি ।।

- ইয়াল্লা! আঁচল টানতেই আপনার এই অবস্থা! আঁচল একটু সরালে আপনি কী লিখতেন?

- দাঁড়াও ভাবি। মমমমমম ... খোলো খোলো দ্বার, রাখিও না আর, বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে ... ?

- উফফফফফ। তারপর?

- দাঁড়াও ভাবি ... কীভাবে মেলানো যায়? ... দাও সাড়া দাও, এইদিকে চাও, এসো দুই হুঁহুঁ বাড়ায়ে ...।

- মানে? হুঁহুঁ মানে কী?

- বাহু।

- মোটেও না! আপনি লিক্সেন হুঁহুঁ!

- টাইপো।

- মিথ্যা কথা। আপনি দুষ্ট।

- শিষ্ট হয়ে লাভ কী বলো?

- অ্যাই যাই এখন। আর আপনি এমন করলে কিন্তু আমি আর ছবি দেক্তে দিবো না আপনাকে।

- সে কী!

- হুঁ।

- আমার গান লেখার কী হবে তাহলে?

- সবিতাভাবী দেখে লিখেন।

- দুষ্টু মেয়ে! আচ্ছা, এসো নাহয়। পরে আবার কথা হবে। তোমার নতুন ছবির অপেক্ষায় রইলাম।

- আমি আর শাড়িই পরবো না। বোরখা ধরবো। বোরখা পরে ছবি তুলবো। হি হি হি।

- আঁধার অম্বরে প্রচণ্ড ডম্বরু?

- মানে কী?

- কিছু না। হিহি।

- হিহি কেন? খালি পচা কথা বলেন!

- হুঁ।

- যাই গিয়া। খুদাপেজ।

রবি আনমনে হাসেন। আবারও শাফিনার শাড়িপরা ছবি দেখেন আনমনে। হুমমমমমমমমমমমমমম।

গ্লুপ করে একটা শব্দ হয়। রবি দেখেন, মোদিনা মোনওয়ারা নক করেছে তাঁকে।

- সালাম ভাইয়া। কেমন আছেন?

- সালাম, সালাম। এই তো।

- করেন কী?

- কিছু না।

- ফেসবুকে ঢুকে কিছু করেন না কেন? আমার স্ট্যাটাসে একটা লাইক মেরে আসেন তাহলে।

- স্ট্যাটাসে কেন? একটা ছবি আপলোড করো। লাইকাই।

- মমমম, না ভাইয়া, ছবি আপলোডানো যাবে না আর।

- সে কী কথা! কেন?

- লোকজন বিরক্ত করে।

- কোন লোকজন? কী বলে তারা?

- আছে যত আজেবাজে লোকজন। এসে কীসব বলে।

- ব্লক করে দিও দুষ্টের দলকে।

- যাহ, তাই কি হয়?

- হুঁ। ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা, হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা ...।

- হা হা। মজার তো!

- তাই?

- হ্যাঁ। আচ্ছা দাঁড়ান, আপনাকে আমার একটা ছবি মেইল করি বরং। দেখে মুছে ফেলবেন, ওকে?

- ওকে।

রবি মেইল চেক করেন। মোদিনা মোনওয়ারা ছবি অ্যাটাচ করে পাঠিয়েছে। মোটাসোটা চশমা পরা গোলগাল বালিকা, বসে আছে কোনো এক বাগানে। পরনে টিশার্ট আর পৌনেপাৎলুন। রবি মনোযোগ দিয়ে দেখেন আর গুনগুন করেন, ভালো মানুষ নই রে মোরা ভালো মানুষ নই, গুণের মধ্যে ওই আমাদের গুণের মধ্যে ওই ... দেশে দেশে নিন্দে রটে, পদে পদে বিপদ ঘটে ...।

- পাইসেন?

- হুঁ। বড় মনোহর ছবি।

- এক্সকারশনে তোলা ... ঐ যে শিলাইদহ গেসিলাম ... ঐখানে।

- শিলাইদহ? সে কী কথা? ওখানে তো আমার কুঠিবাড়ি আছে।

- রিয়েলি? ওটা আপনার??

- হুঁ।

- খুব সুন্দর জায়গা!

- আবার যেতে চাইলে বোলো। বেড়িয়ে যেতে পারো কয়েকদিন।

- মমমম, বাসা থেকে দিবে না ভাইয়া :( ।

- বোলো এক বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছো।

- নাহ ভাইয়া, ওভারনাইট ট্রিপ হলে মুশকিল।

- হুম। হুমমমমমমমমমমমম।

- কী?

- নাহ, কিছু না। তবে আমন্ত্রণ রইলো সবসময়। সুযোগ পেলেই চলে এসো। দু'দিন আগে কনফার্ম করলেই হবে।

- আপনি খুব দুষ্টু।

- শিষ্ট হয়ে কী লাভ বলো?

- হুমমম। আচ্ছা ভাইয়া, আমি আসি এখন।

- ঠিকাছে। বিদায়।

- খুদাপেজ!

রবি মোদিনার ছবি সেইভ করে রাখেন সযত্নে।

ফেসবুক ট্যাবটা কিলবিল করে ওঠে। মেসেজ ফ্রম কারিনা। রবি ট্যাব খোলেন।

- হাই ভাইয়া! কী করেন?

- এই তো, কিছু না।

- কেন, আপনার কোনো কাম নাই?

- তা কেন হবে? নিষ্কাম হওয়ার কোনো সুযোগ তো তুমি রাখোনি।

- ভাইয়া! আপনি খুব দুষ্ট!

- শিষ্ট হয়ে লাভ কী বলো?

- আপনি কখনো সেন্ট মার্টিন গিয়েছেন?

- নাহ। বিলেত গিয়েছি। সিলেট গিয়েছি। শিলাইদহ গিয়েছি।

- সেন্ট মার্টিন খুব সুন্দর। আমরা যাচ্ছি।

- তোমরা মানে কারা?

- আমি আর আমার বান্ধবীরা।

- বাহ। তা তোমরা শিলাইদহ আসো না কেন? বেরিয়ে যাও?

- শিলাইদহে সী বিচ আছে?

- না। কিন্তু আমার কুঠিবাড়ি আছে। সেখানে আর কেউ থাকে না।

- তো?

- এসে নিরিবিলি বেড়িয়ে যাও। বজরায় করে ঘুরিয়ে দেখাবো আশপাশটা।

- কার সাথে যাবো?

- আমার সাথেই যেতে পারো।

- আর কে কে যাবে?

- আবার কে যাবে? তুমি আর আমি। আমরা দু'জনা স্বর্গখেলনা গড়িব না ধরণীতে, মুগ্ধ ললিত অশ্রুগলিত গীতে ...।

- ভাইয়া! আপনি খুব পাজি!

- আহা। আমরা সবাই পাজি। আমরা সবাই পাজি আমাদের এই পাজির রাজত্বে ...।

- না। আমি ভালু।

- হুমমম। তুমি বেএএএশ ভালু।

- নাহ। আপনি শুধু দুষ্টামি করছেন আজ। যাইগা।

- চলে যাবে? হে ক্ষণিকের অতিথি ...।

- পরে কথা হবে ভাইয়া।

- বেশ। আবার যদি ইচ্ছা কর আবার আসি ফিরে ...।

- বাই দ্য ওয়ে ভাইয়া, আমরা এখন সবাই রানুর বাসায়।

- তাই নাকি?

- হ্যাঁ। ওর পিসি থেকেই ঢুকেছি সবাই।

- সবাই মানে কারা?

- আমি, মোদিনা, শাফিনা, রানু ...।

- ওহ!

- যাইগা ভাইয়া। টিটিওয়াইএল।

রবি মনে মনে প্রমাদ গুণলেন। সব ডিম এক ঝুড়িতে কেনু? কেনু কেনু কেনু?

ভাবতে না ভাবতেই ফেসবুকে জ্বলজ্বল করে উঠলো রানুর নাম।

- এ মনু, আপনে আছেন নাকি?

- কেমন আছো রানু?

-ভালোই তো ছেলাম আগে, হেয়ার পর আপনের বদমাইশি দেইখ্যা এহন এক্কারে হতবম্ব হইয়া গেছি। আপনে আমার বান্দোবিগো লগে এইসব কী আরম্ভ করছেন?

- কী হয়েছে বলো তো?

- বেয়ারবি। আইতে আছি খাড়ান।

রবি মনে মনে ছড়া কাটেন, পাখিসব করে রব রাতি পোহাইলো ...।

মিনিট খানেক বাদেই রানুর উইন্ডো গর্জে ওঠে।

- আপনের মতলবডা কী? আপনে মোর বান্দোবিগো লগে এর'ম অসাইব্যোতা করেন ক্যা?

- আমি আবার কী করলাম?

- আপনে মোর দোস্তাইনরে লইয়া খাছড়া গান ল্যাকছেন ক্যা?

- খাছড়া? সে কী! সে তো প্রভাতবন্দনার গান!

- পরভাতবন্দনা না আপনের মাতা! মোরে কি এক্সের বলদ পাইসেন আপনে? আমার বান্দোবিগো লগে এক্সের অসাইব্যো কতা কয়েন, কুপরস্তাব দ্যান, আবার কয়েন মুই আবার করলামডা কী?

- কী যে বলো না রানু! তোমার বান্ধবীদের আবার কী কুপ্রস্তাব দিলাম?

- আপনে আমার বান্দোবিরে আপনের লগে ওভারনাইট টিরিপে যাইতে কয়েন নায়? খবরদার যদি মিত্যা কতা কইসেন... হেলে ঠ্যাং পিডাইয়া ভাইঙ্গা দিমু কোলোম!

- ওহ! ওটা এমনিই। সিরিয়াস কিছু তো নয়।

- সিরিয়াস কিছু নয়? সিরিয়াস কিছু নয়? অসাইব্যো কতা কইয়া ধরা খাইয়া এহন কইতে আছেন সিরিয়াস কিছু না?

- আহ রানু। তুমি তো ভারি অবুঝ?

- খবর্দার... এসমস্ত মিডা মিডা কতার কোনো মুইল্যো নাই... আপনে এট্টা জোম্মের অসাইব্যো ব্যেডা।

- রানু! কী বলছো তুমি!

- ঠিকই কইতে আছি! আপনে আমার লগে মিডা মিডা কতা কয়েন পাছ ওয়াক্ত আর ওইদিকে মোর বান্দোবিগো কুপরস্তাব দ্যান!

- আহ, ভুল বুঝলে রানু! আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো!

- আপনের সাতে আমার আর কোনো কতা নাই! আপনে এক্সের লল্পুরুষ! আপনেরে আমি বলক মারতে আছি! খুদাপেজ!

রবি দ্যাখেন, রানু অফলাইন।

মনটাই খারাপ হয়ে যায় তাঁর। ভাবেন, একটা মিষ্টি ক্ষমার চিঠি লিখবেন কি না রানুকে। চরণ ধরিতে দিও গো আমারে, নিও না, নিও না সরায়ে ...।

ফেসবুকে ডান কোনায় একটা লাল নোটিফিকেশন আসে। রবি খুলে দেখেন, লেখা, পাপিতা পাটওয়ারি হ্যাজ অ্যাকসেপ্টেড ইয়োর অ্যাড রিকোয়েস্ট।

রবি মুচকি হাসেন। গুনগুন করে ওঠেন, কে এলো আজি এ ঘোর নিশীথে, সাধের কানন শান্তি নাশিতে?

পাপিতা পাটওয়ারি মেসেজ দেয়, হাই ভাইয়া!

রবি গুনগুন করে চলেন, কী জানি কী হবে আজি এ নিশীথে, তরাসে প্রাণ ওঠে কাঁপিয়া ...।

...



বরিশালের ভাষায় রানুর সংলাপ অনুবাদ করে দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বরিশালিয়ান ও মামুন হক।

* নামগুলি কাল্পনিক।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।