Sunday, August 23, 2009

মাটির ময়না

মাটির ময়না দেখিনি আগে। এতক্ষণ ধরে দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখতে বসলাম।

আমি ধরে নিই, যে সিনেমা সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছি, সেটি পাঠক আগে দেখেননি। ফলে, তাঁর সিনেমা দেখার আনন্দ মাটি করে কোনো কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু সিনেমারিভিউ লিখতে গেলে কাজটা যথেষ্ঠ কঠিন হয়। ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মাটির ময়না নিয়ে কথা বলতে গেলে আগাম কিছু আনন্দ মাটি হবার সম্ভাবনা এই পোস্টে দেখতে পাচ্ছি।

সিনেমা নিয়ে আমার জ্ঞান তলানি স্পর্শ করে। তারপরও এ নিয়ে কথা বলার সাহস পেয়েছি জোকার নায়েককে দেখে, হাঁটুতে জ্ঞান নিয়েও যে মহাকাশ সম্পর্কে কথা বলে।

মাটির ময়না স্তিমিত, মৃদু সুরের সিনেমা। উচ্চকিত কোনো "বক্তব্য" ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়নি, একটা মিহি, শান্ত টোনে বলে যাওয়ার ভঙ্গি আছে সিনেমার আদ্যোপান্ত। সিনেমায় এই সুর ধরে রাখা খুব কঠিন বলে মনে হয়েছে আমার কাছে, সেই কঠিন কাজটি নির্মাতারা মসৃণভাবে করতে পেরেছেন। লোকেশন বাছাই দুর্দান্ত হয়েছে, গোটা কাহিনী তার পটভূমিতে কোনো দৃষ্টিকটু চড়াই-উৎরাই ছাড়াই মিশে গেছে।

ক্যামেরা সম্পর্কে আমি ততটুকুই জানি, যতটুকু জোকার নায়েক জানে মহাকাশ নিয়ে, কিন্তু প্রেরণা পাই তার কাছ থেকেই, তাই বকে যাই। ক্যামেরার লোকাস বা "গতিপথ" আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। সামান্য একটু সরে বিভিন্ন বাঁক ধরে বয়ে চলা ঘটনা ধারণ করার কৌশলটা দারুণ মুনশিয়ানায় করা হয়েছে। বেশ কিছু শটে পরিস্থিতির নাটকীয়তাকে আরো তীক্ষ্ণ করার জন্যে ক্যামেরা যেভাবে বসিয়ে শটগুলি নেয়া হয়েছে, তা মনের ওপর ছাপ ফেলার মতো। মাদ্রাসা থেকে আনু ফিরছে কাকার সাথে, কাজী সাহেব একটু এগিয়ে এসে দেখছেন, ঘাটে এসে ভিড়লো নৌকা, প্রথমে পাড়ের উঁচু ঢালের ওপাশে দেখা গেলো করিম মাঝির রোদে পোড়া রুষ্ট মুখ, এরপর ঢাল বেয়ে উঠে আসছে মিলন আর আনু, এ অংশটি দারুণ লেগেছে আমার কাছে। বন্যায় পানি বাড়ছে, সেই অপূর্ব মেঘলা দিনে করিম মাঝির নৌকা আনুকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে, ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল আনুর কাছে সবকিছু ঝাপসা, তার কানে শুধু ভেসে আসছে দূরাগত শব্দ আর সংলাপগুলো, এ অংশটিও অপূর্ব।

সিনেমায় রঙের ব্যবহারও আমাকে মুগ্ধ করেছে। কাজী সাহেবের সর্বদাপরিধেয় সাদা রঙের পাশে উজ্জ্বল রংগুলি দর্শককে একটি বক্তব্যই পৌঁছে দেয়, কাজীর পরিবারে ভিন্ন কোনো ধারণা, বিশ্বাস বহমান, গাঢ় কনট্রাস্ট বারেবারেই স্মরণ করিয়ে দেয় সে কথা। মাদ্রাসার ভেতরের পরিবেশটুকুই যেন কাজী সাহেব বহন করে বেড়ান তাঁর সফেদ জামাকাপড়ে, একটি ছোটখাটো চলমান মাদ্রাসা হয়ে তিনি সতত সঞ্চরণশীল, তাঁরই উঠানে একটি লাল শাড়ি মেলে দেন আনুর মা, যখন আনু বাড়ি ফিরে আসে মাদ্রাসা থেকে। আবার কাজী সাহেবের বামপন্থী ছোট ভাই মিলনেরও পরনে সাদা কাপড়, যদিও সে কাজীর বিপরীত মেরুর লোক, কিন্তু সিনেমায় তাকেও দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে কাজীর সারিতেই, দু'জনেই নিজের বিশ্বাসের ছায়ায় দাঁড়িয়ে অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। দু'জনের চোখেই গাঢ় কালো ফ্রেমের চশমা, এঁচড়ে-পাকা দর্শক হিসেবে সন্দেহ জাগে, এই চশমা কেবল জৈব প্রেসবায়োপিয়া বা মায়োপিয়ার কারণে নয়, এই চশমা যেন দু'জনের বিশ্বাসেরও প্রতীক।

মাদ্রাসা সম্পর্কে আমার ধারণা কম, তাই মাদ্রাসার ভেতরের দৃশ্যগুলি কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে কিছুই বলা সাজে না আমার। পরিচালক ও কাহিনীকার তারেক মাসুদ যেহেতু নিজে মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন এক সময়ে, সম্ভবত উপস্থাপিত দৃশ্যাবলি যথেষ্ঠ বাস্তব, অন্তত কাহিনীর সময় '৬৯-'৭১ এ। মাদ্রাসার দৃশ্যগুলির একটা বড় অংশ রাতে, দিনের শটগুলির একটা বড় অংশ মেঘলা, ভোরের ঘাটে আছে তিনটি বড় দৃশ্য, সেগুলি হয় কুয়াশাচ্ছন্ন, নয়তো মেঘলা। এমনকি আনু যখন মাদ্রাসা ছেড়ে বেরিয়ে আসে, আমরা দেখি এক বিশাল উঁচু দেয়াল আর তার ফাটলে গজানো বনস্পতির চারাকে। রোকন চরিত্রে রাসেল ফারাজির অভিনয় অনবদ্য মনে হয়েছে, তার সংলাপ উপস্থাপনের দক্ষতা মনে রাখার মতো। স্কিটজোফ্রেনিক রোকনের উপস্থিতি সিনেমায় হয়তো প্রয়োজন ছিলো মাদ্রাসার "জলবায়ু"কে আরো পরিস্ফূট করার জন্যেই, সেখানে রোকন বড়জোর লিটমাস পেপার।

ইব্রাহিম হুজুর চরিত্রটিতে যিনি অভিনয় করেছেন, তিনি অভিব্যক্তিতে সফল হলেও সংলাপ পরিবেশনে ততটা দক্ষ নন বলে মনে হয়েছে, এবং তাঁর কারণে নিবেশিত মনোযোগে আঁচড় পড়েছে একাধিকবার । সিনেমায় করিম মাঝি, যে মাঝে মাঝে সংলাপের মাধ্যমে কাহিনীতে অবয়ব যোগ করে, তার চরিত্রে শাহ আলম দেওয়ানকে মানিয়েছে চমৎকার। পুঁথিপাঠ আর নৌকোয় বসে বৈঠা চালাতে চালাতে গল্প বলা, এই দুই জায়গায় তিনি করতালি পাবার যোগ্য। মাদ্রাসার সিড়িঙ্গে হুজুর, যাকে ছেলেরা শিঙ্গি মাছ বলে ডাকে আড়ালে, তিনি এক কথায় মাস্টারপিস।

আমার চোখে আর কানে ছোটখাটো কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে, জোকার নায়েকদত্ত স্পর্ধা নিয়েই বলি, যেমন আনু মাদ্রাসা থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরছে, যেখানে স্পষ্টতই তার ভালো লাগছে না, কিন্তু আমরা দেখি বাড়ির কাছে এসে তার কোনো তাড়া নেই, বেশ কিছুদিন ধরে বাড়িছাড়া একটি মাদ্রাসাবন্দী বালক যে আকুতি নিয়ে বাড়িতে ছুটে ঢুকবে, তার চিহ্ন নেই তার আচরণে। কাহিনীর পটভূমি বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের, কিন্তু আনুর বাবা, কাকা কিংবা মায়ের সংলাপ অঞ্চলানুগ নয়। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংলাপ পরিবেশনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চরিত্রগুলিকে সচেষ্ট দেখা যায়নি।

মাটির ময়নার গানগুলো ভালো লেগেছে, সিনেমার গতি রুদ্ধ করেনি সেগুলি। ছবির শেষাংশে এসে "যদি ভেস্তে যাইতে চাও গো" গানটি অবশ্য কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিলো, তবে মানুষের গোছানো জীবনযাত্রায় যে বড় একটি পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, তারই আভাস মেলে এতে। নৌকায় ইব্রাহিম বয়াতির পরিবেশনায় "শের এ খোদা আলি সায়েব" গানটি দারুণ লাগসই, চিত্রায়নও ভালো।

সারা সিনেমাতেই ছোটো ছোটো রূপক দৃশ্য রয়েছে, যেমন কাজী সাহেব কেবল খোলা জানালা বন্ধ করে দেন, পিচ গলানো চুলার পাশ দিয়ে চলে যায় দশ বারোজনের একটি ছোট মিছিল, এমন আরো। শিল্প নির্দেশনা বুঝি কম, কিন্তু ভালো লেগেছে শিল্প নির্দেশকদের কাজ, যখন দেখি রাস্তার দেয়ালে কাজী সাহেবের পেছনে সিনেমার পোস্টারগুলিতে সেই আমলের সিনেমার নাম আর চরিত্র, কিন্তু এ-ও মনে হয়েছে, যেন এই পোস্টার জোর করেই দেখানো হচ্ছে দর্শককে। গ্রামের গানের আসরের দু'টির চিত্রায়নই চমৎকার, শিল্পীদের তন্ময় ভাবটা খুব ফুটেছে। আমি এমন পরিবেশন বাস্তবে খুব বেশি দেখিনি, কিন্তু ঐ ঘোরাবিষ্ট অভিব্যক্তি মনে ছাপ ফেলে, ফলে গানের আসরে সঙ্গীত ও যন্ত্রীদের চেনা মনে হয়েছে।

মাটির ময়না চুরানব্বই মিনিটের সিনেমা, কিন্তু দর্শককে ধরে রাখতে পারে। সিনেমা দেখে শেষ করে মনে হয়, আনুর মা শেষ পর্যন্ত যেন ভূখন্ডটিরই প্রতিনিধিত্ব করেন, সিনেমা যত গড়ায়, তিনিও যেন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে বাংলাদেশ হয়ে ওঠেন। তাঁর ভেতরে কোনো দ্রোহ নেই, আছে কষ্ট, শোক আছে, বিহ্বলতা আছে, স্মৃতি আছে, সব মিলিয়ে আনুর মা নিরাপদ উঠোন থেকে আক্রান্ত দেশ হয়ে ওঠেন ক্রমে। হঠাৎ মনে হয়, সিনেমাটি হয়তো তাঁকে ঘিরেই "বলা হয়েছে" খুব মৃদু স্বরে।

আসমার ভূমিকায় রিমঝিমের অভিনয় খুব ভালো লেগেছে। তাকে দেখে মনে পড়ে গেলো আমার বোনের মেয়ের কথা, যাকে বেবিসিট করেছি দীর্ঘদিন। পোস্টটি তাই হিমু মামার পক্ষ থেকে রিমঝিমকেই উৎসর্গ করলাম।


[]

1 comment:

  1. লেখাটা ভালো লাগলো। কিছু টুকরো ছবি আপনি যেভাবে লিখেছেন তা প্রথম দর্শনে চোখে পড়েনি। যেমনটা বললেন রঙের ব্যাপারগুলো। এখন মনে ভাসছে,হ্যাঁ তেমনি। অপর্ণা সেন এর "The Japanese Wife" দেখলাম আজ।youtube এ আছে। ভালো লেগেছে। দেখতে পারেন।

    সুব্রত

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।