Thursday, August 20, 2009

কোয়েন্টিন টারান্টিনোঃ শজারুর কাঁটা

কোয়েন্টিন টারান্টিনোকে আর কোনো উপমা দিয়ে ভূষিত করা গেলো না। এই লোক বিঁধতে জেনে গেছে।

টারান্টিনোর সিনেমার খুব যে ভক্ত আমি, এমনটা নয়। কিন্তু লোকটা শজারুর মতোই তেড়ে এসে কাঁটা বিঁধিয়ে দিয়ে যায়। প্রথম দেখি রিজারভয়ার ডগস, অনেক আগে, প্রবল ভায়োলেন্সে ছোপানো সিনেমা। রক্তারক্তি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তখন স্টার মুভিজে সিনেমার আগে পিছে নানা সাক্ষাৎকারও দেখানো হতো। সিড়িঙ্গে টারান্টিনোর কথাবার্তা অত মনোযোগ দিয়ে শুনিনি, কিন্তু পরে কিল বিল দেখে নড়েচড়ে বসে বুঝলাম, টারান্টিনোর বিশেষত্ব রক্তে। সিনেমায় রক্তের ব্যবহার কমবেশি সব ডিরেক্টরই নিশ্চয়ই করেছে, কিন্তু টারান্টিনো রক্তকে নিজের স্বাক্ষরের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রায়। টারান্টিনোর সেরা কীর্তি হিসেবে পাল্প ফিকশনই স্বীকৃত, এতে তার স্বাক্ষরের বাকি অক্ষরগুলিও স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে।













পাল্প ফিকশন


ইন্টারনেটে টারান্টিনোকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে নয়, সিনেমাগুলি দেখে যা উপলব্ধি করলাম, টারান্টিনো সিনেমা দাঁড় করায় মন্থর যৌনতা, আকস্মিক দ্রুতগতির ঘটনা, রক্ত আর পুরনো দিনের সুরের ওপর ভিত্তি করে। কোনো সিনেমাতেই যৌনতার যথেচ্ছাচারের অভাব নেই, কিন্তু এই যৌনতার প্রকাশটা মন্থর, অনেকটা চুঁইয়ে পড়া রক্তের মতোই। টারান্টিনোর সিনেমায় পুরনো গান আর সুর ব্যবহার হয় প্রচুর; ৫০ আর ৬০ দশকের গান, যেখানে বেইজের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়, সেগুলোই ঘুরে ফিরে আসে দৃশ্যগুলির সাথে। টারান্টিনোর সিনেমার চরিত্রগুলি নাচের ব্যাপারেও খুব আগ্রহী থাকে প্রায়ই, এবং অবধারিতভাবেই কোনো বিকট, ভায়োলেন্ট কার্যকলাপের আগে দর্শককে সেই গান এবং/অথবা নাচ দিয়ে খানিকটা মোলায়েম আবহের গদিতে বসায় টারান্টিনো। গান বা সুরের রেশ কেটে যাবার কয়েক মিনিটের মধ্যে শুরু হয় সৃষ্টিছাড়া কোনো কিছু। আর সেখানে অবধারিতভাবে থাকবে রক্ত, প্রচুর রক্ত। এ যেন সিনেমার গায়ে নামাঙ্কণের জন্যে গলানো মোমের মতো। উদাহরণ হিসেবে বেছে নেয়া যেতে পারে পাল্প ফিকশনে চাক বেরির গানের সাথে মিয়া মার্সেলাস আর ভিনসেন্ট ভেগার টুইস্ট,



কিংবা ডেথ প্রুফে দ্য কোস্টারসের পাগলাটে "ডাউন ইন মেক্সিকো"র তালে তালে স্টান্টম্যান মাইককে ঘিরে বাটারফ্লাইয়ের উত্থানজাগানিয়া ল্যাপড্যান্স।



টারান্টিনোর ছবিগুলিতে পৃথিবীর রংও ভিন্ন, বুড়োটে কালার টেমপারেচারে দেখানোর প্রয়াস আছে। পুরনো দিনের চীনা সিনেমার দৃশ্যের কথা মনে হয় বিভিন্ন দৃশ্য দেখে। ডেথ প্রুফ আর কিল বিল ২ তে এর ব্যবহার এতো চড়া যে রীতিমতো চোখে লাগে। সুর আর রঙের ব্যবহার দেখে সন্দেহ থাকে না, রন হাওয়ার্ডের মতো টারান্টিনোও অতীতের দিনগুলিকে সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরে রাখে সিনেমার সাথে।













ডেথ প্রুফ


টারান্টিনোর ছবিতে মোচড়গুলি প্রত্যাশার আয়ত্বের বাইরে। শজারুর কাঁটা লোকটা বেঁধায় ওখানেই। মন্থর, ধীর, নিশ্চিত, সংলাপসঙ্কুল এক একটা দৃশ্যে দর্শককে হাতে ধরে কাহিনীর ধাপ পার করিয়ে একটা জায়গায় এনে পাছায় লাথি মেরে অতল খাদে ঠেলে দেবার কৌশল তার করায়ত্ব। ডেথ প্রুফ সিনেমাটাই একটা বিরাট রসিকতার মতো, পদে পদে সম্পাদনার প্রমাদ গুঁজে রাখা, বেশ কিছু জায়গায় সিনেমার গতি কমতে কমতে বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে আসে, কিন্তু সেখান থেকেই কয়েক মিনিটের জন্যে দর্শককে স্তম্ভিত করে রাখার মতো একটা কিছু ঘটিয়ে টারান্টিনো পাতা উল্টে সামনে যায়। কিল বিল ২ তে এর ব্যবহার বেশ দরাজ। পাল্প ফিকশন বা রিজারভয়ার ডগসে বর্ণনার ধরনটা সরলরৈখিক নয় বলে দর্শকের আগ্রহ থাকে, কীভাবে সুতোগুলো কোথায় গিয়ে জোড়া লাগে তা দেখার জন্যে।

সব মিলিয়ে টারান্টিনোকে উপেক্ষা করা মুশকিল। এতো সশব্দ, উচ্চকিত আর সংঘাতময় তার সিনেমাগুলি, যে উপেক্ষার উপায় থাকে না।

সিনেমা রিভিউ করতে গিয়ে কাহিনী বলার বদভ্যাস করতে চাই না, তারপরও কোনো সিনেমা দেখার আনন্দ মাটি করেছি বলে মনে হলে ক্ষমা করবেন।




[]

1 comment:

  1. Apnar review valo laglo... literature er ekta tibro gondho paoa jay... aro likhben cinema nie..

    darashiko.info ekbar visit kore jaben please

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।