Wednesday, August 05, 2009

পুরনো বাড়ি

কবেকার মৃত কাক: পৃথিবীর পথে আজ নাই সে তো আর;
তবুও সে ম্লান জানালার পাশে উড়ে আসে নীরব সোহাগে
মলিন পাখনা তার খড়ের চালের হিম শিশিরে মাখায়;
তখন এ পৃথিবীতে কোনো পাখি জেগে এসে বসেনি শাখায়;
পৃথিবীও নাই আর; দাঁড়কাক একা — একা সারারাত জাগে;
কি বা হায়, আসে যায়, তারে যদি কোনোদিন না পাই আবার।
নিমপেঁচা তবু হাঁকে : ‘পাবে নাকো কোনোদিন, পাবে নাকো
কোনোদিন, পাবে নাকো কোনোদিন আর।’

--- "এই সব ভালো লাগে", জীবনানন্দ দাশ



টুলুর দিকে ঘাড়টা হালকা কাত করে তাকিয়ে আছে কাকটা। টুলু চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ওর কাঠের খেলনা বন্দুকটাতে একটা বরইয়ের বিচি ফিট করা আছে। কিন্তু হাতটা শরীরের পেছনে লুকানো।

কাকটার মাথায় অনেক বুদ্ধি।

একটু নেচে সামান্য ঘুরে দাঁড়ায় কাকটা। তারপর তিড়িক তিড়িক করে লাফিয়ে কার্ণিশের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়। গলাটা একটু সামনে বাড়িয়ে নির্বিকার গলায় শুধু বলে, "ক্ক!"

টুলু জানে, কাকটা দেখছে ওকে। কাকটা সব বোঝে। মাথাটা হঠাৎ ঘুরিয়ে অন্য চোখ দিয়ে দেখে, টুলুর হাতে এখন কী। যদি দেখে, টুলুর হাতে বন্দুক, তাহলেই ফসকে যাবে। একবার উড়তে শুরু করলে আর ওকে গুলি করা যাবে না।

টুলু একদম কাঠের পুতুলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কাকটাও উদাস বৈরাগ্য নিয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। পৃথিবীতে আর কোন কাজ ওর আর নেই আজকের দিনটায়। সে শুধু টুলুর হাতের দিকে নজরদারি করেই বেলাটা কাটিয়ে দেবে।

টুলু শরীরের ভর বদল করে, বাম থেকে ডান পায়ে। কাকটা তিড়িক করে নেচে ঘুরে দাঁড়ায়, অন্য চোখ দিয়ে টুলুকে দেখতে থাকে। আর একবার বিদ্রুপের সুরে বলে ওঠে, ক্ক্যা?

টুলু নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। দাদা যেমনটা বলেছিলো, শিকারী হতে হলে চাই ধৈর্য। টুলু মনে মনে বলে, আমি শিকারী। আমার অনেক ধৈর্য। ও অন্যদিকে না ফেরা পর্যন্ত, আমি নড়বো না। এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবো। আমি শিকারী।

কাকটাও যেন বোঝে, টুলু শিকারী। তার হাতে আছে একটি কাঠের বন্দুক। সেই বন্দুকে গোঁজা আছে একটি অমোঘ বরইয়ের বিচি। সামান্যতম বেখেয়াল যদি সে হয়, যদি সে নাচতে নাচতে কার্ণিশের ঐধারটায় গিয়ে টুলুর হাত থেকে চোখ ফিরিয়ে একটি বার দাঁড়ায়, অমনি টুলুর হাতে নিমেষে উঠে আসবে বন্দুকখানা, ট্রিগারে চেপে বসবে আঙুল, আর প্রচণ্ড গর্জনের পর অনেক কালো বারুদের ধোঁয়া চিরে ছুটে আসবে একটি বরইয়ের বিচি, চুরমার করে দেবে তার নশ্বর কাকের পাঁজর। তাই সে-ও নড়ে না, ঠায় দাঁড়িয়ে ঘাড় কাত করে চোখ রাখে টুলুর শিকারী হাতের ওপর।

টুলু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কাকটা বাঘের মতো চালাক। কোন সুযোগই সে দিতে নারাজ টুলুকে।

দাদা বলেছিলো, কাক মারতে হলে তোর লাগবে ইস্পাতের স্নায়ু। তোর কি সেটা আছে রে টুলু?

টুলু ঢোঁক গিলে সায় দিয়েছিলো। ইস্পাতের স্নায়ু ব্যাপারটা সে বোঝেনি, স্নায়ুই সে ঠিকমতো বোঝে না, কিন্তু যদি সে বলতো, তার ইস্পাতের স্নায়ু নেই, দাদা কি তাকে বন্দুকটা এনে দিতো?

দিতো হয়তো। দাদা প্রায়ই এটা সেটা এনে দেয় টুলুকে। সেগুলির সব ক'টার পরিণতি যে ভালো হয়, এমন নয়। একটা আতশ কাঁচ এনে দিয়েছিলো দাদা। রোদের মধ্যে একটা দেয়াশলাইয়ের কাঠি রেখে বলেছিলো, দ্যাখ, কীভাবে আগুন ধরিয়ে দিলাম। টুলু দারুণ খুশি হয়েছিলো। কিন্তু পরদিন সকালে দাদারই কী একটা কাগজ রোদে রেখে আতশ কাঁচ দিয়ে বড় করে পড়তে গিয়ে সেটাতে বেমালুম আগুন ধরে গেলো। দাদা এসে টুলুকে দিয়েছিলো কষে এক চড়। মার খেয়ে টুলু কাঁদতে কাঁদতে মা-কে গিয়ে নালিশ করেছিলো বটে, কিন্তু মা ওসব নালিশে পাত্তা দেন না। দাদাকে শুধু গলা চড়িয়ে বলেছিলেন, ভালো হয়েছে। হাবিজাবি জিনিস আরো এনে দে। পুরা বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিক।

বন্দুকটা টুলু মা-কে শুরুতে দেখাতে চায়নি, কিন্তু মা অচিরেই সেটা আবিষ্কার করে হইচই শুরু করে দিয়েছিলেন। নিজের চোখেমুখেই যে গুলি করবি না, তা কে বলবে? তারস্বরে চেঁচাচ্ছিলেন মা। এইসব ঘোড়ার ডিম কেন এনে দিস ভাইকে? দাদা মা-র চিৎকারকে পাত্তা দেয়নি, উদাস গলায় শুধু বলেছিলো, খেলুক না। বিড়াল তাড়াতে পারবে। কীরে টুলু, পারবি না?

টুলু বুক ঠুকে রাজি হয়ে গিয়েছিলো। মনের চোখে দেখতে পাচ্ছিলো, কার্ণিশে গুটিসুটি মেরে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে আসছে ভয়ঙ্কর একটা বিড়াল। আর একটা লাফ দিলেই সে দুধের হাঁড়িতে গিয়ে মুখ দিতে পারবে। কিন্তু লাফ দেয়ার আগেই গর্জে উঠলো টুলুর বন্দুক, কাঁধের ওপর গুলি খেয়ে ঢলে পড়ে গেলো ভয়ঙ্কর বিড়ালটা। দূরে আগুন জ্বলে উঠলো, শহরের লোক হই হই করে উঠলো, মারা গেছে, মারা গেছে, রুদ্রপ্রয়াগের বিড়ালটাকে মেরে ফেলেছে টুলু করবেট। সকালে উঠে টুলু ফিতা দিয়ে মেপে দেখছে, বিড়ালটার লেজ থেকে নাকের ডগা পর্যন্ত আট ফুট লম্বা। পায়ের নিচে সজারুর কাঁটা বিঁধে আছে। আহারে। ওর জন্যেই বেচারা নিজে জঙ্গলে ইঁদুর শিকার না করে টুলুদের বাড়িতে দুধ চুরি করে খেতে আসতো। ও কি আর জানে, টুলুর এখন একটা বন্দুক আছে?

ইস্পাতের স্নায়ুর ব্যাপারটাতে রাজি হয়ে বন্দুকটা পেয়ে গেছে টুলু। ভারি ভালো জিনিস। খট করে একটা শব্দ হয় শুধু। ভেতরে বরইয়ের বিচি, ছোট গোল নুড়ি ভরলে দুরন্ত বেগে ছুটে বেরোয়। টুলু দারোয়ানের ছেলে আমজাদকে নিয়ে মেপে দেখেছে, বাইশ ফিট পর্যন্ত দারুণ জোরে যায় গুলিগুলো। আমজাদ অবশ্য ব্যাপারটাকে ভালো চোখে দেখেনি, তাই আরো দূরে কতটুকু জোরে গিয়ে লাগে, সেটা টুলু বুঝতে পারেনি। আমজাদ সহযোগিতা করলে বন্দুকটার রেঞ্জ টুলু ফিতা ধরে মাপতে পারতো।

কিন্তু বাইশ ফিটের দরকার নেই। বদমায়েশ কাকটাকে মারার জন্যে দশ-বারো ফিটই যথেষ্ঠ। কিন্তু কার্ণিশটা এমন হতচ্ছাড়া জায়গায়, যে বারান্দা পেরিয়ে কোথাও লুকালে আর কাকটাকে দেখা যায় না। ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে গুঁড়ি মেরেও দেখা যায় না কার্ণিশ, তা না হলে টুলু দিব্যি ওঁত পেতে থেকে মারতে পারতো কাকটাকে। ভাগ্যের ফেরে আজ মানুষখেকো কাকটার মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে টুলু করবেটকে।

টুলু অবশ্য দাদাকে সকালে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলো, মাদী কাকের ডাক ডাকলে মদ্দা কাক এসে বসবে কি না জানালার পাশে। দাদার মেজাজটা ভালো নেই, প্রচণ্ড এক ধমক দিয়ে টুলুকে ভাগিয়ে দিয়ে সে কী একটা কাজে বেরিয়ে গেছে বাসা থেকে। টুলুর মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। গতকাল রাতেও দাদা কত ভালো ভালো আইডিয়া দিলো তাকে। একটা ইঁদুর মেরে রেখে দিলে নাকি কাক জায়গামতো আসবে মড়ি খেতে। তখন আড়াল থেকে টুলু সেটাকে পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলতে পারবে। যদিও হাতের কাছে মারার মতো ইঁদুর নেই, কিন্তু তারপরও কী দারুণ বুদ্ধি!

টুলু আবারও শরীরের ভর বদলায়। কাকটা এবার মহা আলস্যে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে তাকায়, তারপর টুলুর দিকে ফিরে ক্কা করে একটা বিদ্রুপের হাসি দিয়ে নাচতে নাচতে কার্ণিশের সামনের দিকটায় গিয়ে বসে, এবার টুলুর দিকে পেছন ফিরে।

টুলুর সমস্ত রক্ত যেন কানের পাশ দিয়ে টগবগ করে ফুটতে থাকে। অতি সন্তর্পণে সে বন্দুকটা কাঁধে নিয়ে নল বরাবর তাকায়। দাদা এক টুকরো তার দিয়ে কী সুন্দর একটা মাছি বানিয়ে দিয়েছে বন্দুকের নলে। যোগচিহ্নের মতো একটা আকার, দাদা বলেছে মাঝখানের পয়েন্টটা নিশানা বরাবর রেখে মারতে।

টুলু ট্রিগারে চাপ দেয়।

বরইয়ের বিচিটা কাকটার পাশে গিয়ে কার্ণিশে ঠোক্কর খায় তীব্র বেগে। কাকটা একবার তাচ্ছিল্যের সাথে ঘাড় ফিরিয়ে টুলুকে দেখে, তারপর নিতান্ত বিরক্ত হয়ে কার্ণিশ থেকে লাফিয়ে পড়ে বাতাসে। তারপর কয়েকবার ক্কা ক্কা করে ডেকে উড়ে যায় পাশের বাড়ির নারকেল গাছটার দিকে।

টুলুর চোখে জল চলে আসে। মানুষখেকোটা পার পেয়ে গেলো আবারও।

টুলু রেলিঙের ওপর ঝুঁকে কাকটাকে দেখার চেষ্টা করতে যাবে, এমন সময় লোকটাকে দেখতে পায় সে। টুলুর বুকটা ধ্বক করে ওঠে।

লোকটা তাদের বাড়ির বাউন্ডারির ভেতরে দাঁড়িয়ে। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে সে টুলুকে দেখছে।

টুলু তাড়াতাড়ি পকেট হাতড়ায়। তার পকেটে একটা ছোট প্লাস্টিকের প্যাকেট ভর্তি গোল গোল নুড়ি, সে আর আমজাদ সেদিন পেছনের মাঠ থেকে খুঁজে খুঁজে বার করেছে নুড়িগুলো। পেছনের মাঠে কী একটা কাজের জন্য পাথর জড়ো করে রাখা, বন্দুকের মাপের অনেকগুলি নুড়ি খুঁজে পেয়েছে তারা।

টুলু লোকটাকে এক নজর দেখেই ভয় পেয়েছে। লোকটা ভীষণ লম্বা, মিশমিশে কালো, মুখভর্তি গোঁফদাড়ি, মাথায় লম্বা লম্বা চুল। ঠিক যেন দস্যু বীরাপ্পন!

টুলু কাঁপা হাতে বন্দুকে একটা নুড়ি ভরে। তারপর সাহস করে আবার তাকায় লোকটার দিকে।

লোকটা এখনও তাকিয়ে আছে টুলুর দিকে।

টুলু দৌড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। তারপর বিছানার ওপর উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে আলগোছে উঁকি দেয়।

লোকটা এবার তাকিয়ে আছে জানালার দিকে!

ভয়ে টুলুর শরীরটা অবশ হয়ে আসে। সে বন্দুকটা হাতে মুঠো করে ধরে রান্নাঘরে ছুটে যায়।

মা! একটা লোক! একটা ভীষণ লোক! আমাদের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে! টুলু হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে বলে।

টুলুর মা করলা কুটছিলেন, তিনি একটু ঘাবড়ে যান টুলুকে দেখে। টুলু কখনো রাস্তার লোক দেখে এভাবে ছুটে এসে কিছু তো বলে না।

টুলু মা-কে হাত ধরে টানতে টানতে তার শোবার ঘরের জানালার কাছে নিয়ে আসে। সাবধানে তাকাও! লোকটা দেখে ফেলবে!

টুলুর মা আলগোছে পর্দা ফাঁক করে বাইরে তাকান। কই? কোথায় লোক?

টুলু এবার হাঁচড়ে পাঁচড়ে বিছানায় উঠে মায়ের পাশে গিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে তাকায়। মাঠ খালি! কেউ নেই সেখানে।

টুলুর মা টুলুর মাথায় হাত রেখে বললেন, রোদে ঘুরে ঘুরে তো কুটকুটে কালো হয়ে গেছিস! গোসল করে আয়। মাথা গরম হয়ে গেছে তোর, কী দেখতে কী দেখিস। কোথায় ভীষণ লোক?

টুলু কিছু বলতে যাবে, এমন সময় ঘরের কলিং বেলটা হুঙ্কার দেয় কোকিল পাখির সুরে।

টুলু মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে, মা! ঐ লোকটা!

টুলুর মা এবার একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলেন, দাঁড়া দেখি। তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন? তোর না বন্দুক আছে? তুই না শিকারী? হ্যাঁ? আয় আমার সাথে।

টুলু বন্দুক হাতে নিয়ে মায়ের পেছন পেছন গুটিসুটি পায়ে গিয়ে দাঁড়ায় দরজার পাশে।

দরজার ম্যাজিক আইতে চোখ রাখেন টুলুর মা, তারপর হেসে ফেলেন। দরজা খুলতে খুলতে বলেন, টুনু এসেছে। তোর দাদা এসেছে। দাদাকে লোক বলছিস?

টুলু জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। টুনু বাড়িতে ঢুকে মা-কে বলে, মা, একজন গেস্ট এসেছেন।

টুলু এবার চমকে ওঠে। সেই ভীষণ লোকটা, দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে!

টুনু টুলুর মাথায় হাত রাখে। কী রে শিকারী? মেহমান এসেছে, বন্দুক সরিয়ে রাখ।

লোকটা দাদার চেয়েও অনেক লম্বা, টুলু দেখে। গায়ে একটা বাদামী জ্যাকেট। চোখে একটা চশমা। টুলুকে দেখে লোকটা হাসে এবার।

টুনুর মা মাথায় ঘোমটা টেনে চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকান টুনুর দিকে। টুনু বলে, মা, ইনি হাসান ভাই। ওনারা আগে আমাদের বাসাটাতে থাকতেন।

হাসান নামের ভীষণ লোকটা এবার হাতের প্যাকেটটা খুব বিনয়ের সাথে বাড়িয়ে ধরে টুলুর মা-য়ের দিকে।

সালামালাইকুম। টুলু চমকে ওঠে লোকটার গলা শুনে। কী ভীষণ ভারি ডাকাতের মতো গলা! লোকটার পকেটে নিশ্চয়ই পিস্তল আছে। না হলে লোকটা জ্যাকেট পরে কেন? তার মুখে এত দাড়িগোঁপ কেন? চুল এত লম্বা কেন?

টুলুর মা অস্ফূটে সালামের প্রত্যুত্তর দেন, টুনু স্মার্ট ভঙ্গিতে প্যাকেটটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর নিয়ে রাখে।

টুনু বলে, মা, হাসান ভাই অনেকদিন ছিলেন না দেশে। শহরে এসেছেন, তাই আমাদের বাসাটা একবার ঘুরে দেখে যেতে চান।

হাসান দরজার সামনেই ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে এবার ঘর দেখতে থাকে ঘুরে ফিরে।

টুলু শরীরের ভর পাল্টায়, বাম পা থেকে ডান পায়ের ওপর।

টুনু এবার টুলুকে বকা দেয়, টুলু, বন্দুকটা রেখে আয়! মেহমানের সামনে বন্দুক নিয়ে ঘুরছিস কেন? ঘাড় ফিরিয়ে সে হাসানকে বলে, আমার ভাই, খুব চঞ্চল। বন্দুকটা পেয়েছে হাতে, এখন সারাদিন এটা নিয়েই পড়ে আছে। রাতে বন্দুক নিয়ে ঘুমাতে যায়।

হাসান নামের ভীষণ লোকটা হাসে শব্দ করে। টুলুদের বসার ঘর কেমন ঝনঝন করে ওঠে। টুলু ভাবে, লোকটা হাসেও ডাকাতের মতো।

আমি দেখছিলাম ওকে অনেকক্ষণ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাক শিকার করছিলো। হাসান বলে গমগমে গলায়।

টুনু হাসে, হাসেন টুলুর মা-ও। কাকের সঙ্গে শত্রুতা খুব। টুনু বলে।

আপনাদের বারান্দায় গ্রিল নেই। হাসান বলে হঠাৎ।

টুনু থতমত খায়। মমমম, না, গ্রিল ছিল আসলে, অনেক আগে, কিন্তু নড়বড়ে হয়ে খুলে পড়ে গেছে আমরা আসার কিছুদিন আগেই।

হাসান এবার হঠাৎ এগিয়ে এসে বসে পড়ে একটা সোফায়। বেতের সোফাটা মচমচ করে ওঠে তার ভীষণ ভারে। কবে এসেছেন আপনারা এখানে?

টুলুর মা এবার এগিয়ে এসে বসেন একটা মোড়ায়। অনেকদিন হয়ে গেলো, বছর পাঁচেক ... তাই না টুনু?

টুনু মাথা দোলায়। আমি ক্লাস এইটে এসে ভর্তি হয়েছিলাম স্কুলে।

হাসান টুনুর দিকে তাকিয়ে হাসে। আপনি তো তাহলে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র?

টুনু মাথা চুলকায়। এখনো না। সামনে অ্যাডমিশন টেস্ট।

হাসান বলে, আগে গ্রিল ছিলো।

টুনু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, জ্বি?

হাসান বলে, আগে গ্রিল ছিলো বারান্দায়। আমরা যে বছর চলে যাই এখান থেকে, সে বছর লাগানো হয়েছিলো। বিশ্রী লাল রং করা হয়েছিলো তাতে।

টুনু মায়ের দিকে তাকায় হালকা অস্বস্তি নিয়ে।

টুলুর মা বলেন, "আপনার কবে চলে গেলেন?"

হাসান স্পষ্ট, গমগমে গলায় বলে, "কুড়ি বছর আগে।"

টুনু বলে, অনেক দিন তো!

হাসান মাথা দোলায়। সে তারপর মন দিয়ে ঘরের বিভিন্ন জিনিস দেখতে থাকে।

টুনু মা-কে তাড়া দেয়, মা, কিছু খেতে দাও হাসান ভাইকে।

টুলুর মা উঠে দাঁড়িয়ে আবার ঘোমটা টানেন। আপনি হাতমুখ ধুয়ে আসুন বরং, ভাত দিই গরম গরম?

হাসান তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়। না! প্লিজ, ভাত খাবো না! আমাকে একটু চা দিতে পারেন বরং।

টুলু শরীরের ভর পাল্টায় অন্য পায়ের ওপরে।

টুলুর মা কী ভেবে আর জোরাজুরি করেন না। টুলু দেখেছে, তাদের বাসায় এ সময়ে কেউ এলে মা ভাত না খাইয়ে ছাড়েন না। কিন্তু এই ভীষণ ডাকাতটাকে নিশ্চয়ই মা-ও ভয় পেয়েছেন!

টুনু হাসান নামের ভীষণ লোকটার সঙ্গে আলাপ করতে থাকে, টুলু এক ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে মা-কে ধরে।

মা! লোকটা ডাকাত!

টুলুর মা হেসে ফেলেন। বলেছে তোকে, লোকটা ডাকাত! আমাদের বাসায় আগে সে থাকতো, অনেকদিন পরে এসেছে, তাই বাসাটা দেখতে এসেছে। ডাকাত কি মিষ্টি নিয়ে আসে সাথে?

টুলু উঁকি দেয়, দেখি কী মিষ্টি?

টুলুর মা বাক্সটা খুলে ধরেন। অনেক পদের মিষ্টি, খোপ খোপ করে সাজানো। দুই কেজির মতো হবে। টুলুকে জিজ্ঞেস করেন, খাবি একটা?

টুলু মিষ্টির ভক্ত নয়, সে কালোজাম ভালোবাসে শুধু। টুলু আঙুল দিয়ে দেখাতে টুলুর মা একটা পিরিচে করে মিষ্টি দেন টুলুকে। এখানে বসে খা, ওখানে যাবি না। মেহমানের আনা জিনিস মেহমানের সামনে খেতে নেই।

টুলু রান্নাঘরে পায়চারি করতে থাকে বন্দুক আর মিষ্টির পিরিচ হাতে। টুলুর মা একটা দুধের কৌটা থেকে কতগুলি বিস্কিটের প্যাকেট বার করেন, আরেকটা দুধের কৌটা থেকে চানাচুর।

ও বাসা দেখতে আসলো কেন? টুলু মিষ্টি খেতে খেতে জানতে চায়।

হয়তো ও তোর মতো ছোট থাকতে ছিলো এ বাসায়। অনেকদিন পর মনে হয়েছে ছোটবেলার বাসার কথা, দেখতে এসেছে। তুই আজকে থেকে বিশ বছর পর যখন অনেক বড় হবি, বিদেশে চাকরিবাকরি করবি, তখন দেশে ফিরলে একবার আসবি না এখানে? টুলুর মা প্লেটে বিস্কুট আর চানাচুর সাজাতে সাজাতে বলেন।

টুলু কাঁধ ঝাঁকায়।

টুলুর মা চায়ের পানি গরম দিয়ে বলেন, আর কোথায় ভীষণ লোক? ও তো তোর ছোটমামার মতো। চুলমোচদাড়ি একগাদা।

টুলু মিষ্টি অর্ধেকটা খেয়ে ফিল্টারের সামনে একটা গ্লাস ধরে। ফিল্টার থেকে পানি খেতে তার খুবই ভালো লাগে। না, ছোটমামা তো ভালো লোক। এই লোকটা ডাকাত।

টুলুর মা মিটিমিটি হাসেন। টুলু অনেক গল্প শোনে তার দাদার কাছ থেকে, অনেক বই পড়ে শুয়ে শুয়ে, টিভিতে আজগুবি সব সিনেমা দেখে। এর আগে তার বাবার এক বসকেও ডাকাত বলেছিলো। মেজফুপুর বিয়েতে ফুপুর শ্বশুরকেও ডাকাত বলেছিলো।

টুলু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আবার ড্রয়িংরুমে আসে। হাসান নামের ভীষণ লোকটা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে তাদের বুক শেলফের সামনে।

ঠিক এই জায়গাটায় আমাদের বুকশেলফটাও ছিলো, জানেন? গমগমে গলায় বলে সে। আপনাদেরটা একটু ছোট, আমাদেরটা আরো বড় ছিলো। মিস্ত্রি ডেকে বানানো। গরীব ছিলাম আমরা, নতুন একটা খাট কেনা হলো, পুরনো খাটের তক্তা দিয়ে ভাইজান রাতারাতি একটা বুকশেলফ বানিয়ে ফেললেন। ছোট একটা বেতের বুকশেলফ ছিলো, সেটা ঐ কোণায় রাখা ছিলো, যেখানে আপনারা একটা কাঁচের শেলফে টুকিটাকি জিনিস রেখেছেন।

টুনু বলে, অনেক বই ছিলো আপনাদের?

হাসান হাসে। এখনও আছে। আরো বেশি আছে। কয়েক টন বই। ভাইজান যতদিন বেঁচে আছেন, টনেজ বাড়তেই থাকবে। বইখোর লোক।

টুনু বলে, বাসা পাল্টানোর সময় নিশ্চয়ই অনেক ঝামেলা হয়েছে?

হাসানের হাসিটা মলিন হয়ে আসে। হ্যাঁ, তা হয়েছে। বাক্স যোগাড় করা, বই তাতে প্যাক করা, পরে আবার সেসব বই খুলে ঠিক করা, একটা বিরাট হ্যাপা গেছে। বই হচ্ছে বড়লোকের জিনিস, বুঝলেন, যাদের বাসা পাল্টাতে হয় না।

টুলু চুপ করে হাসানকে দেখে আর শোনে। হাত পা নেড়ে কথা বলে যাচ্ছে লোকটা।

আপনাদের মতো আমাদেরও বেতের সোফা ছিলো। ইন ফ্যাক্ট, এখনও আছে। আমরা মাঝে মাঝে নিজেরা ঐ সোফা সিরিশ দিয়ে ঘষে রং করতাম।

টুলু দেখে, দাদা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছে।

হাসান হাত পা নেড়ে বকে যায়। এখন তো দেখছেন কী ভালো ডিসটেম্পার করা দেয়াল, আমরা যখন ছিলাম, বাড়িঅলা শুধু মাঝে মাঝে চুনকাম করে দিতো। ঘরের দরজা জানালা পাইকারি হারে রং করে দিয়ে যেতো, কোন ছিরিছাঁদ ছিলো না রে ভাই।

টুলু দেখে, হাসান খুব হাসছে। প্রত্যেকটা কথাই যেন তার হাসি হয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

আপনাদের তো এই ঘরে একটা সিঙ্গেল খাট পাতা, আমাদের ছিলো বিশাল ডাবল খাট একটা। যখন ছুটিতে সবাই একসাথে হতাম, ভাইবোনেরা, তখন বাসা ভর্তি করে থাকতাম আমরা। আপনারা কয় ভাই বোন?

টুনু বলে, আমরা দু'জনই।

হাসান বলে, আমরা ছিলাম চারজন। আমাদের হইচইয়ে গোটা বাড়ি কাঁপতো। তখন গ্রিল ছিলো না বারান্দায়।

টুনু বলে, আপনি গ্রিলের ব্যাপারটা খুব মনে রেখেছেন দেখছি।

হাসান অন্যমনস্ক হয়ে যায়। হ্যাঁ। আমাদের বারান্দায় অনেকগুলি ফুলের টব ছিলো। আপনাদের বারান্দায় নেই দেখছি।

টুনু মাথা চুলকায়। আমরা অতটা ফুলের ভক্ত নই আর কি। ছাদে কিছু ফুলের গাছ আছে অবশ্য। মা দুয়েকটা লাগিয়েছেন ওখানেই।

হাসান বলে, আমাদের একটা বেলি ফুলের গাছ ছিলো। বৃষ্টির পর পর তাতে ফুল ধরতো। কী যে সুন্দর গন্ধ তাতে! বেলি ফুলের গন্ধ কেমন, জানেন?

টুনু বোকার হাসি হেসে মাথা নাড়ে।

হাসান বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। আরো ফুলের গাছ ছিলো। সন্ধ্যামালতী, নয়নতারা, গন্ধরাজ, আরো অনেক ফুল, নামও জানি না। আমরা যখন শহর ছেড়ে চলে গেলাম, ফুলগাছগুলির মায়া ছাড়তে পারিনি। টানতে টানতে নিয়ে গেলাম ঢাকায়। ট্রাকে করে কি আর ফুলগাছ নেয়া যায়, বলেন? যায় না। টবগুলি ভেঙে গেলো। ফুলগাছগুলি চোখের সামনে মরে গেলো। যেগুলি মরেনি তখনও, সেগুলিও ফেলে দিতে হলো। কী করবো? নতুন বাসায় জায়গা নাই। নিজেরা কোনমতে থাকি জড়োসড়ো হয়ে।

টুনু বললো, আপনারা চলে গিয়েছিলেন কেন?

হাসান চমকে ওঠে। হ্যাঁ? ওহ। চলে তো যেতে হয়ই সবাইকে। সারাজীবন তো আর কেউ এক জায়গায় থাকতে পারে না। বাবা বদলি হয়ে গেলেন, আমরা চলে গেলাম।

টুনু বলে, হ্যাঁ, আমরা আগে রাজশাহী ছিলাম। ওখান থেকে এসেছি এখানে।

হাসান এগিয়ে গিয়ে রেলিঙের ওপর হাত রাখে। আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে আমরা এই বাসাটাতে প্রথম আসি। তখন এই রেলিঙের কাঠটা ছিলো পঁচা। ঝুরঝুরে। ইঁট আর কাঠের মাঝে সরু একটা ফাঁক ছিলো। আমি ঐ ফাঁকে চোখ রেখে বাইরের পৃথিবীটা দেখতাম। তখন শহর ছিলো ফাঁকা, দেখতাম মাঝে মাঝে দুয়েকটা বাস যাচ্ছে, রিকশা যাচ্ছে ঘন্টা বাজাতে বাজাতে। মানুষজন হাঁটছে দেখতাম। কোন গ্রিল ছিলো না। পুরোটা আকাশ দেখা যেতো। আরো যখন বড় হলাম, লম্বা হলাম, মাথা বার করে পুরোটা পৃথিবী দেখতাম। মানে যতদূর দেখা যায় আর কি। গ্রিল বসানোর পর দেখা যেতো না সেসব। পৃথিবীটা ছোট হয়ে গেলো। ... ভালো হয়েছে, আপনাদের বারান্দায় এখন গ্রিল নেই। আমাদের বারান্দার মতো।

টুনু মাথা চুলকায়।

হাসান বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে রেলিঙের ওপর কনুই রেখে।

টুলুর মা ডাক দেন, টুনু, চা তৈরি।

টুনু বলে, হাসান ভাই, আসুন, কিছু চা নাস্তা হোক।

হাসান ঘুরে দাঁড়ায় অন্যমনস্কভাবে।

টুলুর মা চা এগিয়ে দেন। আমি চিনি দিইনি। আপনি নিয়ে নিন যতটুকু লাগে।

হাসান বসে পড়ে চায়ের কাপ তুলে নেয়। তার মুখ বিষণ্ন।

কেমন হয়েছে চা? টুলুর মা জানতে চান।

হাসান যেন অন্য পৃথিবী থেকে ফিরে আসে। জ্বি? জ্বি, ভালো। হ্যাঁ, চা ভালো হয়েছে। চায়েরই তো শহর এটা, হা হা। চা ভালো হয়েছে খুব।

টুলু মন দিয়ে দেখে ভীষণ লোকটাকে।

টুনু কিছু বলতে যাবে, এমন সময় খুব অভিমান নিয়ে হাসান বলে, কৃষ্ণচূড়া গাছটা নেই।

টুনু বলে, কোন কৃষ্ণচূড়া গাছ?

হাসান বলে, উল্টোদিকের বাড়ির কৃষ্ণচূড়া গাছ।

টুনু বলে, কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিলো নাকি ওখানে?

হাসান হঠাৎ অধৈর্য হয়ে ওঠে, সশব্দে কাপে একটা চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখে। কিচ্ছু জানেন না। কীভাবে জানবেন, আপনি জন্মাননি তখন। কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিলো একটা। বিশাল। এই বাড়ির চেয়ে উঁচু। এত উঁচু হয় না সব কৃষ্ণচূড়া। যখন ঝড় হতো, তখন ঝর্ণা আপাদের বাড়ির কৃষ্ণচূড়া গাছের পাঁপড়ি আশপাশে ছড়িয়ে যেতো। ঝর্ণা আপা ছিলো আমার বোন স্বর্ণা আপার বান্ধবী। ঝর্ণা আপার মা ছিলেন বদ্ধ উন্মাদ। মাঝে মাঝে ওনাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো। আমরা বিকালে বারান্দায় বসে সবাই গল্প করতাম, চা খেতাম এক সাথে, ঝর্ণা আপা এসে আমাদের সাথে গল্প করতো। ওনার তো মায়ের সাথে বসে গল্প করা হয় না, চা খাওয়া হয় না, তাই উনি চলে আসতেন আমাদের বাসায়। রাস্তা পার হলেই তো আমাদের বাসা। ... ওনাদের কৃষ্ণচূড়া গাছটা নেই!

টুনু চুপ করে থাকে।

হাসান এবার তার অবিন্যস্ত লম্বা চুলে আঙুল চালাতে থাকে। ধরা গলায় বলে, আমরা চলে গেলাম, তারপরে এই শহরেই আর আসতে ইচ্ছে হতো না। যতবার আসি, দেখি একটা না একটা জিনিস হারিয়ে গেছে। চোরের মতো অন্য পথ দিয়ে চলাফেরা করতাম, আমাদের এই বাসাটার দিকে যেন তাকাতে না হয়, যেন এমন কিছু না দেখি, যাতে কষ্ট পাই। কিন্তু কৃষ্ণচূড়া গাছটা যে নেই, সেটা জানা হয়নি।

টুলুর মা কোমল গলায় বলেন, আপনারা অনেক বছর ছিলেন এখানে, না?

হাসান মাথা নাড়ে। তেরো বছর। আমি এই বাসাটাতে বড় হয়েছি।

টুলুর মা বলেন, টুনু, ওনাকে তোমার ঘরটা দেখিয়ে আনো।

হাসান উঠে দাঁড়ায় ঝট করে। না! না না। থাক। আমি আর দেখবো না। আমি শুধু ... আমি দেখতে এসেছিলাম বাসাটা, কিন্তু অনেক কিছু পাল্টে গেছে।

টুনু অপ্রস্তুত মুখ করে বসে থাকে। হাসান চায়ের কাপটা নিয়ে চুমুক দেয় বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে।

টুলু বলে, বিস্কুট খাবেন না?

হাসান যেন চমকে ওঠে টুলুর রিনরিনে কণ্ঠস্বর শুনে। তারপর হেসে ফেলে। হা হা, না না টুলু, আমি বিস্কুট তেমন একটা খাই না। চা খাই শুধু।

টুলুর মা হেসে ফেলেন ছেলের কথা শুনে। টুনু ভাইকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

হাসান চায়ের কাপে চুমুক দেয়, তার মুখ আস্তে আস্তে ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে। আমিও টুলুর মতো ছিলাম। ওর মতো চঞ্চল ছিলাম। আজকে ও বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাক মারছিলো, আমি ভীষণ চমকে উঠেছিলাম, মনে হচ্ছিলো নিজেকেই দেখছি। পাশের বাড়িটা দেখছেন, এটা তখন টিনশেড ছিলো। ওরা কিন্তু নারিকেল গাছগুলো কাটেনি। বৃষ্টি হলে আশেপাশের সব ক'টা বাড়ির টিনের ছাদে ঝমঝম আওয়াজ হতো, ঝড় হলে নারিকেল আর সুপারি গাছে ভীষণ শোঁ-শোঁ আওয়াজ হতো। বাতাসে সুপারি গাছগুলি হেলে পড়তো, বাজ চমকালে দেখা যেতো কী ভাষণ তাণ্ডব চলছে!

টুলু মন দিয়ে শোনে ভীষণ ডাকাত লোকটার কথা।

আমার স্কুল ছিলো মর্নিং শিফটে। স্কুল ছুটির পর আমরা ক্রিকেট খেলতাম, ফুটবল খেলতাম, ভলিবল খেলতাম। দুপুরে ফিরে গোসল করে এই বারান্দাটায় বসে রোদ পোহাতাম। আমার আম্মা তখনও রান্না চড়িয়েছেন মাত্র। যেদিন ডাল রান্না হতো, সেদিন আমি দৌড়ে যেতাম, ডালে বাগাড় দেয়ার সময় একটা ফোঁসফোঁস আওয়াজ হতো, সেটা শোনার জন্যে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেতো, পেছনে চৌধুরীবাড়ির শিমুল গাছটা। বসন্তে, বছরের শুরুতে, আকাশটা নীল হয়ে থাকতো, নীল আকাশে শিমুল গাছটা আগুনের মতো জ্বলতো। দেখেছেন নিশ্চয়ই?

টুলুর মা দুঃখিত চোখে তাকান হাসানের দিকে।

এই নীরবতার অর্থ বুঝতে সময় লাগে একটু, হাসানের মুখ থেকে রক্ত সরে যায়। দেখেননি? শিমুল গাছটা নেই?

টুলুর মা কিছু বলেন না।

হাসান উঠে দাঁড়ায়, আমি একটু ... একটু রান্নাঘরটা ...?

টুনু বলে, আসুন, দেখাচ্ছি।

টুলু ছুটে যায় আগে আগে, রান্নাঘরে আধখাওয়া মিষ্টির পিরিচটা পড়ে আছে, সে সেটা আড়াল করে দাঁড়ায়।

হাসান যেন রুদ্রপ্রয়াগের চিতার মতোই ঝড়ের গতিতে এসে দাঁড়ায় রান্নাঘরের জানালার সামনে। জানালার সামনে আকাশের চিহ্নমাত্র নেই, পেছনে ঢ্যাঙা একটা সিরামিক ইঁটের দালান তার শ্বদন্তগুলি বার করে তাকিয়ে আছে মানুষখেকোর মতো।

হাসান চুপ করে তাকিয়ে থাকে জানালার দিকে। অনেকক্ষণ।

টুলু দাদার দিকে তাকায়। দাদা অপরাধীর মতো মুখ করে চেয়ে থাকে হাসানের দিকে।

হাসান খুব দুর্বল গলায় বলে, ভাই, একটু পানি খাওয়াবেন?

টুনুর কিছু করতে হয় না, টুলু ছুটে গিয়ে ফিল্টারের সামনে একটা গ্লাস ধরে।

পানির গ্লাসটা নিয়ে তাতে একটা মৃদু চুমুক দেয় হাসান। আমার মায়ের বড় প্রিয় ছিলো ঐ দৃশ্যটা। রান্না করার সময় আমি তাঁকে জ্বালাতন করতাম এসে, স্কুলের গল্প বলতাম, বন্ধুদের গল্প বলতাম, তিনি আমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে আরেক হাতে রান্না করতেন। আমি মাঝে মাঝে তাঁকে দেখতাম, কী সুখী মুখ, পেছনে ঐ নীল আকাশ, ঐ লাল শিমুল ...। আহ!

টুনু কিছু বলে না। টুলুর মা এসে পরম স্নেহে হাসানের মাথায় হাত রাখেন। একটু লেবুর শরবত দেই?

হাসান যেন সেই স্পর্শ অনুভব করে না, ঘোরের মধ্যে যেন বলে যায়, আমার ভাইজানের সাইকেলের রডে চড়ে মাঝে মাঝে ঘুরতে বের হতাম, কত ছোট ছিলাম তখন। সামনের রাস্তাটার দুই পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিলো তখন। বৃষ্টির পর মনে হতো কেউ দুই পাশ লাল রঙে নকশা করে দিয়ে গেছে। আমার বোনের সাথে মাঝে মাঝে বেড়াতে যেতাম, তাঁর বান্ধবীর বাড়িতে। বন্ধুর বাড়িতে ফুটবল নিয়ে খেলতে যেতাম, সন্ধ্যার আজানের আগে ফিরে আসতে হতো, নাহলে বাবা বকতো। কত কত স্মৃতি! সেগুলোর কোনটাই তো ফিরে চাইনি! আমি শুধু শিমুল গাছটা, কৃষ্ণচূড়া গাছটা দেখতে চেয়েছিলাম। দুইটা সামান্য গাছ, কারো কোনো ক্ষতি তো করেনি! আপনারা কীভাবে থাকেন এ বাড়িতে? এখানে তো কিছু নেই! কিচ্ছু নেই!

টুলু অবাক হয়ে দেখে, হাসান নামের ভীষণ ডাকাত লোকটা রুদ্রপ্রয়াগের চিতার মতোই কিভাবে হাঁটু মুড়ে মাটিতে ভেঙে পড়ে হু হু করে কাঁদতে থাকে। নিঃশব্দ সে কান্না, শুধু হাসানের পিঠের বাদামী জ্যাকেট কেঁপে কেঁপে ওঠে তার দমকে। সেই কান্নাও যেন টুলুদের এই নিঃস্ব বাড়ির মতো, তাতে শব্দ নেই, আছে শুধু স্মৃতিঘাতের শোক, ঐ কান্নাটুকুতে একটা নীলরঙের আকাশে ফুটে ওঠা লাল শিমুলের জন্যে বিষাদ আছে, একটা বুড়ো কৃষ্ণচূড়া গাছের জন্যে লালিত ভালোবাসা আছে। এক বুক কান্না নিয়ে হাসান নামের লোকটা ওলটপালট হতে থাকে টুলুদের রান্নাঘরের মেঝেতে।

টুলু পরিচিত একটা শব্দ শুনতে পায়, ক্ক! পেছনের বারান্দার রেলিঙে এসে বসেছে একটা কাক। সেই মানুষখেকো কাকটা নিশ্চয়ই। শুধু কাকেরাই একরকম থেকে যায়, বদলায় না এতটুকু।


[]

1 comment:

  1. ভাল লাগল। মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা।
    "চায়েরই তো শহর" দেখে মনে হল, লেখকের নিজের কোন স্মৃতি কি এ লেখার সাথে জড়িয়ে আছে?

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।