Tuesday, July 07, 2009

খসরু চৌধুরী, আমার অভিবাদন নিন

খসরু চৌধুরীর সাথে আলাপের কোন সুযোগ আমার কখনও ঘটেনি। চোখেও দেখিনি তাঁকে। তাঁকে প্রত্যহ ভক্তিভরে স্মরণ করবো, পরিস্থিতিও সেরকম কখনও হয়ে ওঠেনি। ব্যাখ্যা করি।

খসরু চৌধুরীর নামাঙ্কিত একটি পেপারব্যাক, সেবা প্রকাশনীর "সুন্দরবনের মানুষখেকো"তে পড়েছিলাম শিকারী পচাব্দী গাজীর কথা। আমার বয়স তখন কম, ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে পড়ি, সেবা থেকে প্রকাশিত শিকারের সব বইয়ের ঘাড় মটকে চিবিয়ে খাই বাঘের মতোই। জিম করবেট, কেনেথ অ্যান্ডারসন আর জন হান্টার তখন আমার হিরো। এক একটা শিকারের গল্পে যে আশ্চর্য শিহরণ ছিলো, এখনও রোমাঞ্চিত হই ভাবলে। ঐ গল্পগুলোর কারণেই শুটিঙের প্রতি আমার একটা মোহ কাজ করে দীর্ঘদিন ধরে, কারো বাসায় আগ্নেয়াস্ত্র দেখলে নেড়েচেড়ে শুঁকে দেখি। যদিও রক্তপিপাসা নেই দেখে নিজে শিকারের আগ্রহ কাজ করে না।

কথা সেখানে নয়, কথা খসরু চৌধুরীকে নিয়ে। সেই সুন্দরবনের মানুষখেকোর পর খসরু চৌধুরীকে আর বইতে পাইনি। আয়ুর জোরেই তিনি আরো অনেকবার আমার সামনে হাজির হন পত্রিকায়। প্রত্যেকবারই প্রসঙ্গ বাঘ। বাঘপাগল খসরু থামেন না, বাঘ আর সুন্দরবন নিয়ে তাঁর বিরাম নেই। একটা দেশের মূর্খ লোভী মানুষ নিয়ম করে গিয়ে ঢুকছে জঙ্গলে, জঙ্গলটার বারোটা বাজাচ্ছে ক্রমাগত, যারা এর রক্ষক, তারাই গিলে খাচ্ছে জঙ্গলের কইলজাগুর্দাফ্যাপসা, আর বোকা খসরু চৌধুরী বার বার জঙ্গলে গিয়ে ঐ ধর্ষণের পাগপার্ক তুলে এনে আমাদের দেখাচ্ছেন। বলছেন, কীভাবে মরছে বাঘ, আমাদের গৌরবের ধন, যাকে ভালোবেসে ওপরের তলায় আমরা ঠাঁই দিয়েছি মুদ্রায়, প্রতীকে, আর নিচতলায় মারছি টুঁটি চেপে ধরে। জঙ্গলের ভেতরটা পঁচে যাচ্ছে, খসরু চৌধুরী লিখছেন কাগজে, প্রতিকার হচ্ছে কি না জানি না, কিন্তু একজন কেউ তো হাত তুলে দেখাচ্ছেন, কীভাবে মানুষ রাতের অন্ধকারে সুন্দরবনের ঘাড়ে হালুম করে লাফিয়ে পড়ছে, জঙ্গলটার মড়ি চিবিয়ে খাচ্ছে রোজ। বাঘ আর কত বড় বাঘ? বাঘের চেয়ে বড় বাঘ আমরা।

অতিশয় বড় মূর্খ ছাড়া সবাই জানে, কীভাবে সুন্দরবনের অভাবে পঞ্চগড় পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে এক একটা বড় সাইক্লোন। বৃহস্পতি গ্রহ যেমন মহাকাশের সমস্ত উল্কাপিণ্ডকে নিজের বুকে শোষণ করে নিয়ে ক্রমাগত রক্ষা করে চলছে পৃথিবীকে, সুন্দরবনও শত শত বছর ধরে পৃথিবীর রুদ্রতম উপসাগরের সুদর্শনচক্রের ঘা বুকে নিয়ে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে। সুন্দরবন না থাকলে দেশের সবচেয়ে বড় মন্ত্রণালয় হতো দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তাই অভিবাদন জানাই খসরু চৌধুরীকে। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত, আপনাকে থামতে না দেখে এই অভিবাদন। অভিবাদন আপনার স্বপ্ন আর প্রত্যাশার উচ্চতাকে, যে স্বপ্নের গায়ে খড়ি দিয়ে লেখা, একদিন আপনার লেখা পড়ে কেউ একজন "ব্যবস্থা" নেবে, বাঘ বাঁচাবে, সুন্দরবন বাঁচাবে। আপনি মানুষটা কে, কেমন, তা জানার কোন আগ্রহ আমার নেই, আপনার স্বপ্নের উচ্চতাকে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানাই। আপনার মতো অক্লান্ত স্বপ্নবানে দেশটা একদিন ভর্তি হয়ে উঠুক, বাঘ আর বাঙালির গর্জনে এক একটা দ্রাঘিমাংশ প্রকম্পিত হোক।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।