Monday, July 06, 2009

বাংলাদেশে বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কি অঙ্কুরেই নষ্ট করা হচ্ছে?

আজ প্রথম আলোর একটি আর্টিকেলে পড়লাম, কুতুবদিয়ায় স্থাপিত দেশের সর্ববৃহৎ বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি একটি সমস্যায় পড়ে অচল, এবং দ্বিতীয় সমস্যায় পড়ে ধ্বংসের মুখোমুখি।

প্রথম সমস্যা হচ্ছে, এর একটি যন্ত্রাংশ নষ্ট, এবং গত এক বছর ধরে এই নষ্ট যন্ত্রাংশের কারণে প্ল্যান্টটি অচল হয়ে পড়ে আছে। প্রথম আলোর রিপোর্টাররা লিখেছেন "ইঞ্জিনের বুস্টার" এর কথা, যদিও এর কোন অর্থ দাঁড়ায় না, কারণ বায়ু টারবাইনে ইঞ্জিন বলে কিছু নেই, থাকে ব্লেড-গিয়ারবক্স-জেনারেটর, আর উৎপন্ন অসম ফ্রিকোয়েন্সির বিদ্যুৎকে একটি ইনভার্টার মডিউলের মাধ্যমে আবার ৫০ হার্টজের বিদ্যুতে রূপান্তরিত করা হয়। বুস্টারটি সম্ভবত এই ইনভার্টার মডিউলেরই, যার অভাবে কার্যত গোটা প্ল্যান্টটি নিরর্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ঠিকাদার কোম্পানির নাম প্যান এশিয়া পাওয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্যবস্থাপক আহসান হাবিব সাহেব নিখোঁজ। প্রথম আলোর ভাষ্যমতে, বুস্টার মডিউলটি চীন থেকে আনার কথা। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সেক্টরে চীনের সাথে সহযোগিতার কুফল আমাদের পদে পদে ভোগ করতে হচ্ছে। এর আগে টঙ্গীতে একটি আশি মেগাওয়াটের থার্মাল প্ল্যান্ট আধ ঘন্টা চলে সেই যে হাঁটু ভেঙে পড়ে গিয়েছিলো, আর কোন খবর নেই তার।

যা-ই হোক, চীনের বদনাম করার উদ্দেশ্যে আমি পোস্ট লিখছি না। আমি বিস্মিত দু'টি তথ্য পেয়ে।

1. এক. সরকারের মোট ১২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে ১ মেগাওয়াটের প্রকল্পটির পেছনে (২০০৬ সালে শুরু হয়েছে)।

2. দুই. ২০ কিলোওয়াটের মোট ৫০টি টারবাইন রয়েছে, যার হাব হাইট ৫০ মিটার।

প্রথম তথ্যটি খুব একটা বিস্ময়কর কিছু নয়, বায়ুবিদ্যুতে মেগাওয়াটপিছু ইরেকশন কস্ট জার্মানিতেও টাকার অঙ্কে ১০-১১ কোটি টাকা। কিন্তু আমি বিস্মিত এ কারণে, যে ৫০ মিটার হাব হাইটে মাত্র ২০ কিলোওয়াটের ৫০টি টারবাইন বসানোর পরিকল্পনাটি খুব একটা এফিশিয়েন্ট কিছু না। কারণ ৮০-৯০ মিটার হাব হাইটে দুই মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন টারবাইন জার্মানিতে গিজগিজ করছে বেশ কয়েক বছর ধরেই, যেগুলোর রোটর ডায়ামিটার ৮০-৯০ মিটার। ৫০টি ৫০ মিটার উচ্চতার টারবাইন বসানোর পেছনে যে নির্মাণ খরচ গেছে সরকারের, নিঃসন্দেহে একটি ৮০ মিটার উঁচু টারবাইন বসাতে তারচেয়ে অনেক কম খরচ হতো।

হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে তখন হয়তো রিস্ক ফ্যাক্টরও বাড়তো, কোন কারণে একমাত্র টারবাইন ক্ষতিগ্রস্থ হলে সারা দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হতো, কিন্তু এখন কি তার কোন ব্যতিক্রম আমরা দেখতে পাচ্ছি? সে-ই তো একটা মাত্র ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্টের অভাবে প্ল্যান্ট ধুঁকছে, উৎপাদন ছাড়াই।

দ্বিতীয় যে সমস্যাটির কথা বললাম, যে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ৫০টি টারবাইন বসানো হয়েছে, তার পুরোটা এখন সাগরের চাপে বিপন্ন। আপনারা বুঝতেই পারছেন, বিস্তৃত এই এলাকাকে আবার বাঁধ দিয়ে রক্ষা করার কাজটি খরুচে ও সময়সাপেক্ষ, এবং বছরের এই সময়ে হয়তো অসম্ভবও। পরিবর্তে একটি মাত্র স্থানে একটি টারবাইন বসালে কি এই ঝামেলা হতো? আমার শিক্ষা আর কমনসেন্স বলছে, হতো না।

আমার কথায় প্রথম যে আপত্তিটা পাঠক করতে পারেন, তা হচ্ছে, উত্তর ইয়োরোপে তো বাতাসের বেগ অনেক বেশি। সেখানে ৮০ মিটার উচ্চতায় টারবাইন বসালে হয়তো ৬০০-২০০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, বাংলাদেশে তো বাপু বাতাসের বেগ মন্দা। এর উত্তরে আমি বলবো, কুতুবদিয়ায় সাগরের পারে ৮০ মিটার উচ্চতায় কম করে হলেও ৬-৮ মিটার/সেকেন্ড বেগে বাতাস পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে বায়ুর বেগ নিয়ে কিছু মাপজোক হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমি কিছু কাজও করেছি, সেই জরিপটি যে পদ্ধতিগত ত্রুটিমুক্ত, এমনটি কেউ দাবি করতে পারবে না। একগাদা বিল্ডিং আর গাছপালার মাঝে একটা ১০ মিটার বা ২৫ মিটার উঁচু পোলে অ্যানেমোমিটার বসিয়ে যে বেগ পাওয়া গেছে, তাকে প্রামাণ্য ধরলেও সাগর এবং কুতুবদিয়ার টেরেইনকে হিসাবে ধরলে এই বেগ কুতুবদিয়ার ঐ এলাকায় ৮০ মিটার উচ্চতায় অনেকগুণ বেশি হবে। ফলে সহজেই, একটি মাত্র উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টারবাইন দিয়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যেতো।

আমার পোস্টের শিরোনাম সম্পর্কে এ পর্যায়ে পাঠক আপত্তি জানাতে পারেন, হাঁড়ির একটা ভাত টিপেই কেন আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। এর উত্তরে বলবো, ফেনীতে দেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প মুহুরি প্রজেক্টের কথা। সেখানে চারটি টারবাইনে মোট ০.৯ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে, যেটি এখন কার্যত অচল। তবে ভারতীয় একটি কোম্পানির তত্ত্বাবধানে স্থাপিত এ প্রকল্পটি শেষ খবর পড়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। কিন্তু নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা ঐ প্ল্যান্ট প্রমাণ করছে, এই দেশে বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা তেমন নেই।

এই দু'টি মাত্র উদাহরণ থেকেই কিন্তু মানুষের মনে একটি ধারণা জন্মানো সম্ভব, বাংলাদেশে বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। কিন্তু আসলেই কি তাই? সঠিক বায়ুজরিপ আর সঠিক নকশা অনুযায়ী প্রকল্প প্রণয়ন করলে যে জিনিস সারা দুনিয়ায় ঘুরছে, বাংলাদেশে কোন দুঃখে ঘুরবে না? কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত ১০৮ কিমি সৈকত থেকে খানিকটা দূরে স্থাপিত হতে পারে অফশোর উইন্ড টারবাইন প্ল্যান্ট, যা উচ্চবিভব কেবল দিয়ে কক্সবাজারের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইনে যোগ করা যেতে পারে। উত্তরাঞ্চলে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ নদী তীরবর্তী সমতল অঞ্চলে স্থাপন করা যেতে পারে সুউচ্চ টারবাইনগুলি, যা বন্যা বা ভূমিধ্বসের হাত থেকে নিরাপদে থাকবে। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বেশি বলে সেখানে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সাধারণত টারবাইনের ব্লেডগুলি ৪০ মি/সে বেগ (ঘন্টায় ১৪৪ কি.মি.) পর্যন্ত বাতাস সহ্য করতে পারে, এর ওপরে গেলে তা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গেল সিডরে বাগেরহাটের একটি জায়গায় বাতাসের বেগ রেকর্ড করা হয়েছিলো ৬২ মি/সে। এছাড়া যেসব জায়গায় জলোচ্ছ্বাসের কারণে মাটি ক্ষয় হবার সম্ভাবনা বেশি, সেখানেও টারবাইন স্থাপন করা ঝুঁকিপূর্ণ।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানাই, একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচ মোটামুটি মেগাওয়াট পিছু পাঁচ কোটি টাকা, বায়ুবিদ্যুতের জন্যে ১০-১২ কোটি টাকা, সৌরবিদ্যুতের জন্যে ৪০-৫০ কোটি টাকা। চলমান খরচ ঠিক উল্টো হারে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি, বায়ু বা সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে নগণ্য।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, আপনারা প্রয়োজনে একটি আলাদা শাখা করুন, সেই শাখার কর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন, প্রয়োজনে বৃত্তি দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে আনুন, কিভাবে বায়ু প্রকল্প জরিপ ও নকশা করতে হয়। বায়ুবিদ্যুতের অমিত সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশে। অপ্রশিক্ষিত হাতে ছেড়ে এর ইমেজ নষ্ট করবেন না। ভারত বা চীন নয়, বড় আকারে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইলে যোগাযোগ করুন জার্মানি বা ডেনমার্কের সাথে, তারা বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তির শিখরে।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।