Saturday, July 04, 2009

বাংলাদেশে ব্যাঙ্কিং সেবা

১.
ব্যাঙ্কের কথা শুনলেই শরীর শিহরিত হয়। ব্যাঙ্ক শব্দটা শুনলেই প্রথমে চোখের সামনে ভেসে ওঠে যে শব্দটা, সেটা হচ্ছে বিল। বিল দিতে ব্যাঙ্কে যাওয়া, বিশাল কিউ ধরা, এক মিনিটের একটা কাজ সারার জন্যে কয়েক ঘন্টা সময় অপচয় করা, এসবই নিকট অতীতের কথা।

এদেশে এসে অ্যাকাউন্ট খোলার পর ব্যাঙ্কে সশরীরে গিয়েছি একবার। বাদবাকি সময় এটিএম থেকে টাকা তুলেছি, অনলাইনে টাকা ট্র্যান্সফার করেছি কোন কিছু কিনতে। বাড়িভাড়া, ফোনবিল, ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম, সবই আপনাআপনি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট থেকে কাটা পড়ে। মনে হয় না, দেশে এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করতে রকেট সায়েন্টিস্টের দরকার পড়বে। ব্যাপারটা খুব সহজ, যখন কোন পরিষেবা গ্রহণ করবো, তখন আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নাম্বার সরবরাহ করবো, বিলের এক কপি আসবে আমার কাছে, আরেক কপি যাবে সেই ব্যাঙ্কে। টাকা আমার অ্যাকাউন্ট থেকে চলে যাবে সেই পরিষেবার অ্যাকাউন্টে। ব্যাঙ্ক একটা ফি রাখবে সেই পরিষেবার কাছ থেকে। ঝামেলা শেষ।

আমি ঠিক নিশ্চিত নই, কেন এই পদ্ধতিটি এখনও কেউ অনুসরণ করছে না। মুখে শুধু "ডিজিটাল", "তথ্য প্রযুক্তি", "একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ" ইত্যাদি বড় বড় শব্দের বোল ফুটিয়ে শব্দ দূষণ, কাজের বেলায় কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেই, পরিষেবাগুলি থেকেও কোন সাড়াশব্দ নেই। আমি আমরণ মনে রাখবো, টেলিফোন বিল দেয়ার জন্যে পুরো একটা বেলা খরচ করতে হয়েছে এক বৃহস্পতিবারে, আর তার পরের বৃহস্পতিবারে টিঅ্যান্ডটির অফিসে গিয়ে সেই বিল এন্ট্রি করিয়ে দিয়ে আসতে হয়েছে আমাকে বছরের পর বছর। বিল দিয়েও শান্তি নেই, শুয়োরের বাচ্চাদের কাছে গিয়ে সেই বিল পরিশোধের ইতিহাস তাদের খাতায় তুলিয়ে দিয়ে আসতে হয়, নাহলে ঠুশ করে একদিন লাইন কেটে দেয়। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারী ব্যাঙ্কে রেজিস্ট্রেশনের সময় এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা ঘটতো, কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে একটা অপরিসর হলের দমবন্ধকরা ভিড়ে দাঁড়িয়ে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে খুবই সহজ ছিলো, ঐ টাকা তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে রেখে হল অফিসে একটা রিসিট স্লিপ পাঠানোর ব্যবস্থা করা। কয়েক হাজার রিসিট স্লিপ প্রিন্টআউট নিতে হয়তো ব্যাঙ্কের কর্মীদের বড়জোর কয়েক ঘন্টা সময় লাগতো, এবং কোন শারীরিক হাঙ্গামাও তাদের পোহাতে হতো না। এই অটোমেশনের জন্যে অতিরিক্ত কুড়ি টাকা করে চার্জ করলেও সব ছাত্রছাত্রী এক বাক্যে রাজি হতো। কিন্তু আমরা মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে অর্গাজমের কাছাকাছি তৃপ্তি পাই হয়তো, তাই এই কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রীর কয়েক ঘন্টা নষ্ট না করে কাজটি সম্পন্ন করার শুভবুদ্ধির উদয় বিশ্ববিদ্যালয় বা ব্যাঙ্কের হয়নি।

আমি জানি না, দেশে এই ছয়খানা মোবাইল কোম্পানির বিল এখন সশরীরে গিয়ে পরিশোধ করতে হয় কি না। এদের পক্ষে খুব সহজেই গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যাঙ্কের মাধ্যমে বিল নেয়া সম্ভব, প্রয়োজন শুধু কয়েকটি ব্যাঙ্কের মধ্যে চুক্তি। কাজটা একটু উদ্যোগ নিলেই করা সম্ভব, কিন্তু এর ইমপ্যাক্ট হবে ব্যাপক। ঢাকা শহরে কম করে হলেও কয়েক লক্ষ লোক পোস্টপেইড পরিষেবা ব্যবহার করে, এদের যদি যাতায়াত আর কিউ ধরার পেছনে এক ঘন্টাও ব্যয় হয় (ধরে নিচ্ছি সবাই আলাদাভাবে নিজে গিয়ে বিল দেয়), তাহলে মানুষের কয়েক ঘন্টা সময় বাঁচে, বাঁচে ব্যাঙ্কে যাতায়াতের কারণে রাস্তায় জ্যামটুকু। আমাদের সমাজ সময়ের মূল্য নিয়ে কত বালের রচনা লিখতে দেয় স্কুলের বাচ্চাদের, কিন্তু সময়ের মূল্য সে নিজেই বোঝে না।

২.
রেজওয়ান ভাইয়ের একটা নোটে পড়লাম, সৌদি আরবের শ্রমিকরা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন। সৌদি গুপ্তপুলিশ তাদের অজ্ঞতার সুযোগে সমানে তাদের হয়রানি করে, টঙ্কাধোলাই আইনে মামলা ঠুকে দেয়। বাধ্য হয়ে তারা আশ্রয় নেয় হুন্ডির। ফলে দেশ বঞ্চিত হয় বৈদেশিক মুদ্রা থেকে।

এই তথ্য গোপন কিছু নয়, কিন্তু আমাদের ব্যাঙ্কগুলি তাহলে কেন সৌদি আরবে যাচ্ছে না? কেন তারা ওখানে একটা ছোট ব্রাঞ্চ অফিস খুলে পরামর্শ-সেবা দিচ্ছে না রেমিটারদের? পত্রিকায় দেখলাম প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলছেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাঙ্ক খোলা হবে, বিদেশে যাওয়ার জন্যে ঋণ দেয়া হবে সেখান থেকে। এই ব্যাঙ্কের শাখা বিদেশেও খোলা হোক, প্রবাসীরা যাতে তাঁদের কষ্টার্জিত আয় বিনা হয়রানিতে দেশে পাঠাতে পারেন, সেই পথ সুগম করা হোক।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।