Friday, June 12, 2009

হারাইয়া ফেলি চকিতে

প্রথম আলোতে পড়লাম, স্কুলে প্রাক নির্বাচনী আর নির্বাচনী পরীক্ষার মূল্যায়ন অভিন্ন করার লক্ষ্যে একই দিনে সারা দেশে একই প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হবে। সাথে সাথে মাথায় খেললো প্রশ্নটা, টেস্ট পেপারের ব্যবসা কি তাহলে শেষ?

মনটা উদাস হয়ে গেলো। চৌদ্দ বছর আগে এক একটা সুন্দর সকাল আর দুপুর পণ্ড করেছি সেই জগদ্দল নিউজপ্রিন্টে ছাপা খুদি খুদি হরফশোভিত ভয়াবহ পুস্তকের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে। সারা দেশে এত এত স্কুল, আর তাদের বিখাউজ সব টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্নের গাদা, কোন দুঃখে আমাকে সেগুলি সমাধান করতে হবে, সেই ফরিয়াদ মুখ ফুটে জানাতে না পেরে বুকের ভেতর পুষে কলম চালিয়ে গেছি। বিধাতার মৃত্যু হয়েছিলো তার বছরখানেক আগেই, তিনি কফিনে শুয়েই হাসছিলেন নিশ্চয়ই।

মেসেঞ্জারে পেয়ে টোকা দিলাম আনোয়ার সাদাত শিমুলকে। দেখলাম সে-ও স্মৃতির ঘায়ে মূর্ছা গেলো। সারা দেশের কত কত স্কুলের নাম জানা যেতো টেস্ট পেপার পড়ে। নোয়াখালি জেলার স্কুলগুলি যে হুদাই বেশি কঠিন প্রশ্ন করতো, এ ব্যাপারে একমত হলাম আমরা এতদিন পরও। টেস্ট পেপারের ঘ্রাণও শিমুল ভোলেনি। হায় সেই সোনালী সময়, কী যে দাগ কেটে গেছে বুকের ভেতর, এতগুলি বছরের অভিজ্ঞতার পলি-আবর্জনা দিয়েও তাকে ভরাট করা যায় না, বেহায়া হলরেখার মতো সে দাঁত বের হাসে শুধু।

এরপর আলোচনা হচ্ছিলো কী কী জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে এভাবে, তার একটা তালিকা করা নিয়ে। যা পেলাম, সেগুলো হচ্ছে এমনঃ

[list]
[*] টেলিগ্রাম
এ জিনিস আমি কখনো আসতে দেখিনি। পরিচিত কাউকে পেতেও দেখিনি। কিন্তু এককালে সে ছিলো, আজ আর নেই। টেলিগ্রামের স্মৃতি নিয়ে কারো কিছু বলার থাকলে, বলুন প্লিজ। পরের মুখেই ঝাল খাই।

[*] রোটারি ডায়াল
এখন তো হাতে হাতে মোবাইল। ঘরের ফোনের সেটও বাটনপ্রেস ডায়াল। পুরনো সেই আদিম রোটারি ডায়ালে চার ডিজিটের নাম্বারে ফোন করার স্মৃতি ভেসে উঠলো চোখের সামনে। কত মধুর, কত বেদনার স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার সাথে! মনে পড়ে, বহু বছর আগে একবার আব্বা দুপুরে বাড়ি ফিরে আমাকে সাথে করে নিয়ে গেলেন অফিসে। তখন আমাদের সেই ছোট্ট পাহাড়ি শহরে রাতে মাঝে মাঝে কারেন্ট থাকে না, দি এ-টিম দেখতে পারি না। ঠিক রাত দশটার খবরের সময় ফিরে আসে কারেন্ট। এই পাশবিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর নির্বাচিত হয়েছে আমার, বাবার এক সহকর্মী এই বুদ্ধি দিয়েছেন, পিচ্চিকে দিয়ে একটা ফোন করান। আব্বা নাম্বার লিখে দিলেন, ফোন ডায়াল করার দারুণ শখ আমার, নিজেই ডায়াল করলাম পাওয়ার সাপ্লাইয়ের কোন এক প্রকৌশলীকে। তিনি ফোন ধরলেন গম্ভীর গলায়, হ্যালো! আমিও গম্ভীর হয়ে বললাম, হ্যালো, আমি হিমু বলছি! আমাদের বাসায় রাতে কারেন্ট থাকে না! আমরা দি এ-টীম দেখতে পারি না! ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে খুকখুক করে হাসলেন, তারপর বললেন, কোথায় তোমাদের বাসা? বাসার ঠিকানাই দিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, ঠিক আছে। আজ আর কারেন্ট যাবে না। আমি ফোন নামিয়ে রাখতে যাচ্ছি, আব্বা বললেন, থ্যাঙ্কিউ বলো! আমি আবার পাড়া কাঁপিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দিলাম। আব্বার কয়েক সহকর্মী বসে বসে ঘটনা দেখছিলেন, তারা একচোট পিঠ চাপড়ে দিলেন এসে। এবং সত্যি, সেদিন কারেন্ট যায়নি! লিখতে লিখতে মনে হলো, সেই শিশুর কাছে প্রতিজ্ঞা করার মতো প্রকৌশলীও বুঝি আজ হারিয়ে গেছেন।

[*] পত্রমিতালি
শিমুল যোগালো পরের এন্ট্রি। [url=http://www.sachalayatan.com/ashimul/23523]পত্রমিতালি[/url]! আমার শৈশবে আমার বড় দুই ভাই ছুটিতে ফিরে অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে সবসময় আমাদের ছোট্ট বাসাটা মাতিয়ে রাখতেন, তারা পত্রমিতালি নিয়ে দীর্ঘ সময় হইহই করেছেন। দুই ভাই-ই পত্রমিতালির পার্টনার যোগাড় করেছিলেন জার্মানীতে। এখনও মনে আছে সেই দুই মিষ্টি চেহারার তরুণীর নাম, বড় ভাইয়ার পত্রমিতা রেবেকা, ছোট ভাইয়ার পত্রমিতা নাতাশা। তারা মাঝে মাঝেই নিজেদের ছবি পাঠাতো, ভাইয়ারাও সেজেগুজে ছবি তুলে তাদের পাঠিয়েছে, দেখেছি।

[*] সাইবারক্যাফে
শিমুলের এন্ট্রি। না, পুরোপুরি উঠে যায়নি। তবে শহর থেকে হয়তো হারিয়ে যাবে। দুয়েকটা টিকে থাকবে এখানে ওখানে। টু-স্ট্রোক অটোরিকশার মতো বাকিগুলো একদিন মুখ লুকিয়ে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে যাবে বড় শহর থেকে, অধোমুখে পৌঁছুবে দূরের মফস্বলে, তারপর জায়গা করে নেবে।

[*] সিঁদ কেটে চুরি
গ্রাম থেকে নাকি হারিয়ে যাচ্ছে এ জিনিস, শিমুল জানালো। সিঁদেল চোরের হাতেও এখন শটগান, সে এখন তেল আর গায়ে মাখে না, থানার ওসিকে দেয়। গ্রামেও সিঁদ দেয়ার মতো বাড়ি কমে যাচ্ছে।

[*] ফাউন্টেন পেন
কেউ কি আর ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করে এখন? কালির দোয়াত কেনে? টিপে টিপে টিউবে কালি ভরে লেখে? পেনম্যানশিপ চর্চার জন্যে ফাউন্টেন পেনে রোমান হরফ গুঁতিয়েছি কত! কলেজে পার হবার আগেই হাতে লেখার খাটনিকে বিদায় জানিয়ে কীবোর্ডকে আপন করে নিয়েছি কয়েক মাসের মধ্যে। জানি না ফাউন্টেন পেন এখনও আগের গাম্ভীর্য নিয়ে স্কুলের শিশুদের জ্যামিতি বক্সে থাকে কি না।

[*] স্ট্যাম্প অ্যালবাম
স্ট্যাম্প জমাতাম পাগলের মতো। এই স্ট্যাম্প জমানো নিয়ে বন্ধুদের সাথে মারপিট করেছি, দোকানে নতুন স্ট্যাম্প আসার খবর পেয়ে রেসিং সাইকেলের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুট লাগিয়েছি স্কুল ছুটি হবার পর, প্রবল যত্নে আদ্যাক্ষর ধরে ধরে অ্যালবামে স্ট্যাম্প সাজিয়েছি। আমি যখন স্ট্যাম্প জমানো ছেড়ে দিই, তখন জমানো স্ট্যাম্প দিয়ে যাবার মতো কাউকে পাইনি। মনে আছে, একবার স্কুলে এক ফেল্টুশ সিনিয়র সহপাঠীকে ইংরেজি পরীক্ষায় প্রায় পুরোটা সময় খাতা দেখিয়েছিলাম। পরীক্ষার যেদিন ফল বেরোলো, সেদিন সে সুন্দর বাদামি খামে ভরে নিয়ে এসেছিলো তার পুরো স্ট্যাম্প অ্যালবাম, ইংরেজিতে উৎরে যাওয়া উপলক্ষে ... ঘুষ নয়, উপহার। আজও নিশ্চয়ই অনেকে স্ট্যাম্প জমায়, অ্যালবামেই তারা সেগুলো গুঁজে রাখে। কিন্তু, আগের মতো কি?

[*] এক পাতার হলুদ সরকারী ক্যালেন্ডার
সরকার হয়তো থামেনি, ছাপিয়েই চলছে, কিন্তু বাসায় তো আর আসতে দেখি না। পরিবারগুলোও পড়েছে বেসরকারীকরণের মুখে।
[/list]


কিন্তু অনেক কিছুই হারায়নি। মশার কয়েল টিকে গেছে, টিকে গেছে হারিকেন আর হাতপাখা। শহর থেকে মশা বা লোডশেডিং দূর হয়নি, আর আজও আইপিএস আর জেনারেটর সবটুকু অন্ধকার আর গরম দূর করতে পারে না, মনে হয় না আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেও পারবে। টিকে গেছে মাসিক মদিনা, ইউনিকোডেড অনলাইন সংস্করণেও আছে সে। পুরনো প্রেমের তিক্ত স্মৃতির মতো টিকে গেছে আরো অনেক কিছু।


Get this widget | Track details | eSnips Social DNA




[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।