Tuesday, June 02, 2009

প্রবাসে দৈবের বশে ০৫৮

কয়েক মাস ধরেই জগৎসংসারকে একটা খটকা নিয়ে দেখছিলাম। ক্ষণে ক্ষণেই মনে ঘাই দিয়ে উঠতো সেই সংশয়াকূল প্রশ্ন, পৃথিবীটা এমন কেনু কেনু কেনু?

একদিন বাস থেকে নেমে ট্রাম ধরতে গিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর মিললো। মাউয়ারষ্ট্রাসে থেকে বাঁয়ে ঘুরে কোয়নিগ্সপ্লাৎসের দিকে এগোচ্ছি, সোঁ সোঁ করে একটা ট্রাম এসে হাজির। দূর থেকে নাম্বারটা পড়ার চেষ্টা করতে গিয়েই বুঝলাম, চশমার পাওয়ার আর চোখের পাওয়ারে যে বনিবনা, যে সমঝোতা, যে অস্ত্রবিরতি, যে শান্তিচুক্তি নিয়ে দেশ ছেড়েছিলাম, সময়ের সাথে তা তামাদি হয়ে গেছে। দিনরাত সচলায়তনে দিস্তা দিস্তা গদ্যপদ্যদর্শনসাহিত্য পড়েই আমার চোখের এই করুণ হাল। সেদিন যেমন নাম্বার পড়তে না পেরে একছুটে কাছে গিয়ে দেখি, ভুল ট্রামের জন্যে এরকম হারেরেরে করে ছুট লাগিয়েছি। অবশ্য পরে মনে হলো, সারাজীবন তো এ কাজই করে গেলাম। ভুল ট্রামের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতেই জীবনটা পার হয়ে যাচ্ছে। ঠিক ট্রামটা বোধহয় একদিন এসে জীবনানন্দের মতো করে চাপা দিয়ে যাবে।

সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলাম, ডান চোখটা বুড়িয়ে গেছে।

আজ চোখ দেখিয়ে এলাম। চক্ষুচিকিৎসক আমাদেরই ভাবী হন সম্পর্কে, ঘ্যাম বাংলা বলেন। বাংলাদেশের সাথে এখানকার পার্থক্য হচ্ছে, ডাক্তার ঘরের ভেতর জাঁকিয়ে বসে নেই, নিজেই বেরিয়ে এসে হাঁকডাক মেরে রোগীদের নিয়ে যাচ্ছেন চেম্বারে। যিনি রিসেপশনে বসেছিলেন, সেই টেকনিশিয়ান মহিলাই আমার খালি চোখ মাপলেন। আরেক টেকনিশিয়ান মহিলা আমার চশমা মাপলেন। ডাক্তার ভাবী একটা সফটওয়্যারে ঘচাঘচ কী যেন লিখে বললেন, কই আপনার চোখ আর চশমা তো মানানসই দেখা যাচ্ছে! চশমার বয়স বছর তিনেক হয়েছে জেনে আরো কীসব পরীক্ষা করতে যাবেন, আমি করুণ স্বরে আর্জি জানালাম, ট্রামের নাম্বার পড়তারিনা।

এবার ডাক্তার তাঁর যন্ত্রে থুতনি রাখতে বলে সেই আশৈশব পরিচিত পদ্ধতি চালু করলেন। বাংলাদেশে একটা E কে বিভিন্ন সাইজে রেখে তার ঠ্যাংগুলি কোনদিকে, সেটা জিজ্ঞেস করা হতো। এখানে এক কামরায় হরফ দিয়ে চোখ মাপিয়েছিলো, ডাক্তারের কামরায় পরীক্ষা হলো সংখ্যা দিয়ে। সব দেখেশুনে ভাবী জানালেন, হুঁ, চশমাকে কিছু ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে পাওয়ার বাড়াতে হবে। রিপোর্টে দেখলাম হাফ ডায়প্টার বেড়ে গেছে ডান লেন্সের পাওয়ার। রেটিনা পরীক্ষা করার পদ্ধতিটা একটু সমস্যার, তাই পরে কোন এক সময় এসে সেটা করিয়ে যাবো ঠিক করলাম।

এখানে চশমার ফ্রেমের দাম মোটামুটি গগনচুম্বী। দেড় হাজার টাকা দিয়ে যে চশমা গড়িয়েছি ঢাকা থেকে, সে চশমার ফ্রেমের দাম এখানে দেড়শো ইউরোর মতো। গুণগত হেরফের আছে কি না খোদা জানে, কিংবা খোদাও জানে না। আর চশমা নতুন একটা করানো যাবে না, স্পেয়ার লাগবে। বিষম ফাঁপর।

চেম্বার থেকে বেরিয়ে কটকটে গ্রীষ্মের রোদে বেরিয়ে এলাম। আশেপাশে রোদের প্রশ্রয় পেয়ে স্বল্পবসনা ললনারা হেঁটে বেড়াচ্ছেন, সে এক মনোহর দৃশ্য। কবিগুরু বোধহয় এমন পরিস্থিতিতেই লিখেছিলেন, কিছু তার দেখি আভাস, কিছু পাই অনুমানে। পথ চলতে চলতে ভাবলাম, এই গ্রীষ্মের প্রকোপেই কি চোখ দুইটার এই চারিত্রিক অধঃপতন, নাকি জামাল ভাস্করের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলবো, এর জন্যে সচলায়তনের ফ্যাসিস্ট মডারেটররাই দায়ী? আফটার অল, চোখ দুইটা তো দিনে একটা লম্বা সময় ওখানেই পড়ে থাকে!


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।