Tuesday, May 26, 2009

ভেতো

১.
আমি ভোজনরসিক নই। খাওয়াকে আমার একটা রুটিন ঝামেলা বলেই মনে হয়। তারিয়ে তারিয়ে, রসিয়ে রসিয়ে, উপভোগ করে খাওয়ার ব্যাপারটা আমি রপ্ত করতে পারিনি। নেহায়েত হাগতে হবে বলেই খাই।

কিন্তু তারপরও দেখলাম, আমি আসলে ভোজনবেরসিকও নই। যেমন, একটা কিছু হলেই আমার চলে না। খেতে বসে এটা দেখি, সেটা নাড়ি, ওটা শুঁকি। যা খুশি তাই আমাকে খেতে দিয়ে হাগতে বলা হলে, আমি আপত্তি জানাবো। নো স্যার!

খেতে বসে নানা খুঁত ধরাকে আমার মায়ের ভাষায় যথাক্রমে "প্যাংসা" এবং "কুয়ারা" বলা হতো। এই কাজে আমি একটা সময় মায়েস্ত্রো ছিলাম। আমার প্যাংসা আর কুয়ারার নুয়্যান্স নিয়ে খেতে বসে সকলেই উচ্ছ্বসিত আলাপ করতেন। সমস্যার মূলে না গিয়েই তারা নানা সমাধান বাতলে দিতে চাইতেন তুঘলকি স্টাইলে। যেমন ধরে একটা শক্ত চটকানা মারলে প্যাংসা/কুয়ারা কমবে কি না, একটা আছাড় দিলে কেমন হয়, দুইদিন না খেতে দিলেই এসব লোপ পাবে, ইত্যাদি। সৌভাগ্যক্রমে এইসব প্রস্তাবিত বর্বরতার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছি। ভাই-বোন, যাঁরা বিভিন্ন ডাইনিঙে খেয়ে অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁরা মিটিমিটি ভিলেনি হাসি হেসে বলতেন, রোসো, বাড়ির ভাত খাওয়া কমলেই এসব দূর হবে।

সত্যিই তাই হলো। বাড়ির বাইরে বেশির ভাগ খাওয়া-দাওয়ার যুগ শুরু হতেই আমি এক আশ্চর্য বৈরাগ্যে আক্রান্ত হলাম খাওয়াদাওয়া নিয়ে। বুঝলাম, খাওয়া নিয়ে অভিযোগ এক বৃথা কালাতিপাত। তারপরও অভ্যাসের বশে মাঝেমধ্যে ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হলে আমার মা বলতেন, সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন নিঃসঙ্গ প্রবাসে আমাকে হাত পুড়িয়ে রান্না করে খেতে হবে। আমি যেন সেই কথা স্মরি ভালো মনে।

প্রথম দীর্ঘ প্রবাসে গিয়েই বুঝলাম, এ কথা কত সত্যি। নিজের রান্না খেয়েই মানুষ কেবল অপরের রান্নার দোষগুণ ধরতে পারে, তার আগে নয়। নিজের রান্না কয়েকদিন খেয়ে আমার মনে হলো, এরচেয়ে অনাহার ভালো ছিলো।

২.
দ্বিতীয় যে সত্যটি দ্বিতীয় দফা প্রবাসে এসে বুঝতে পারছি, তা হচ্ছে, আমি প্রকৃত ভেতো। ভাতের সাথে পানতামুক বন্ধ করে বিকল্প অভ্যাস করতে গিয়ে বুঝেছি, এ হবার নয়।

রুটি-সসেজ-সালাদকে ভাতের বিকল্প করার জোর চেষ্টা চালালাম কয়েকদিন। কয়েকদিন ভালোই লাগে, কিন্তু এরপর কেমন যেন একটা অকৃত্রিম অশ্রদ্ধা আস্তে আস্তে অবিচল হতে থাকে মনে। বুঝলাম, লিলিয়া লিউকোভার মতো সন্ধ্যায় বেক করা রুটি আর একগাদা সসেজ আমি খেতে পারবো না। পারবো না সসেজ আর আলুভাজা দিয়েও কাজ চালিয়ে নিতে। ফিশষ্টেবশেন আর ভর্তা আলু মাখনে সেঁকেও আমার চলবে না।

এরপর কিছুদিন দৌড়ের ওপর থেকে আমি পিৎজার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। দিনে দুইবেলা পিৎজা খাই। মাছ, মাংস, সব্জি, কেবল চীজ ... যত জাতের পিৎজা হতে পারে সবই খাই তখন। কিন্তু সে-ও বেশিদিন টেকার নয়। অভক্তি ধরে গেলো পিৎজার ওপর।

এরপর শুরু করলাম তুর্কি রুটি আর মাংস খাওয়া। রুটি মাংস আমার অতি প্রিয় খাবার, কিন্তু রাতের পর রাত কি আর খাওয়া যায় এই জিনিস? রুটি দিয়ে সব্জি চেষ্টা করে দেখলাম, কিন্তু এমনি করে করে রুটির ওপরও আমার একটা রাগ চাপলো।

ঠিক হায়, ন্যুডলসই খাবো। ভিয়েতনামী দোকান থেকে পাইকারী দরে ন্যুডলস কিনে ঘরে ফিরলাম। যত রকম উপকরণ পাওয়া যায় হাতের কাছে, সব কিনে শুরু করলাম ন্যুডলস রান্না। কিন্তু ঐ যে, সবকিছুরই একটা সীমা আছে। কয়েক বাক্স ন্যুডলস খেয়ে শেষ করে একদিন তালাকবাক্য উচ্চারণ করে শেষ প্যাকেট ন্যুডলসে খেয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম, আর না।

আরো বিকল্প চেষ্টা করে দেখেছি। তুর্কি স্যুপ-নান, স্যুপ-বাগেত, স্পাগেতি বোলোগনেজে। দই-সালাদ-শিঙ্কেন-ফ্লাডেনব্রোট। ডোয়নার-ফ্লাডেনব্রোট। হয় না।

শেষমেশ কেন যেন গরমাগরম ডাল-ভাত-কাঁচামরিচ-মাছভাজা, নয়তো ভর্তা-ভাজি-মাছ-ভাত, কিংবা তেহারি, কিংবা মুরগির ঝোল-ভাত, এই ভাত ভাত ভাতের প্রতিই আকর্ষণটা টিকে থাকে। বিপ্লবস্পন্দিত বুকে টের পাই ভেতরে স্লোগান উঠছে, ভাতের আমি ভাতের তুমি তাই দিয়ে যায় চেনা!

জেনারেল উ বৃথাই বাঙালিকে আলু খাওয়ানোর জন্য মমতাজকে দিয়ে গান গাইয়েছিলেন। ছ্যাহ। স্বর্গের হুররা এসে খাটে চড়লেও লাভ নাই। আগে ভাত, পরে অন্য কথা।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।