Wednesday, May 20, 2009

প্রবাসে দৈবের বশে ০৫৭

১.
বহুদিন ধরে লিখি না আমার প্রবাসজীবনের এই একঘেয়ে অণূপাখ্যান [অণু + উপাখ্যান]। লেখার মতো অনেক কিছু ঘটলেও হয়তো সেগুলো সব লেখার মতো নয়, কিংবা খুব দৌড়ের উপর ছিলাম, কিংবা ভেবেছি, লিখে কী হবে। সবকিছুই শেষ পর্যন্ত জলের ওপর দাগ কাটার মতো অর্থহীন, একটা অন্তহীন রসিকতার মাঝপর্যায়ে থাকা, যার পাঞ্চ লাইন মাঝে মাঝে বেল্টের নিচে হিট করে জানান দেয়, সে আছে আশেপাশেই।

২.
আমার ফ্ল্যাটমেট পাঠান সৈয়দকে নিয়ে ভালোই মুসিবতে আছি। ছোকরার সবকিছুই ভালো, কেবল সে অতিশয় অপরিছন্ন। আমার ছিমছাম রান্নাঘরটাকে সে সাফল্যের সাথে গ্রাউন্ড জিরো বানিয়ে রেখেছে। প্রথমে মিষ্টি করে বুঝিয়ে দেখেছি, কাজ হয় না। অতিষ্ঠ হয়ে একদিন তাকে ঝাড়ি দিলাম। মুখ কালো করে সেদিনের মতো রান্নাঘরটা পাকসাফ করলেও দু'দিন বাদে আবার সেই আগের মতোই। কারো যদি সম্ভাবনা থাকে, কোন পাঠানের সাথে এক ফ্ল্যাটে বসবাস করার, তাহলে খুব খিয়াল কইরা।

প্রশ্ন করতে পারেন, কেন অভিযোগ করি না কর্তৃপক্ষের কাছে। এর উত্তর হচ্ছে, এক, এখানে এক কালা আদমীর নামে আরেক কালা আদমীর অভিযোগ ততটা গুরুত্বের সাথে নেয়া হয় না, দুই, আমি চেষ্টা করি নিজের সমস্যা যতদূর সম্ভব নিজেই সমাধান করতে, তিন, ওকে খেদালে ওর চেয়ে খতরনাক আরেকটা এসে জোটার সম্ভাবনা প্রবল।

৩.
সৈয়দের সাথে আমার সাংস্কৃতিক তফাৎ বোধহয় ওখানেই, আমাকে কেউ মিষ্টি করে কিছু বললে আমি সাধারণত তা মেনে নিই বা মেনে চলি। কিছু ব্যতিক্রম সবসময়ই থাকবে, সেগুলো ধর্তব্যে রাখছি না।

একদিন দুই পিচ্চিনি এসে হাজির, বারো তেরো বছর বয়স হবে। তারা একটা জরিপ করছে, আমি তাতে অংশগ্রহণ করলে ভালো হয়। ঘরে তাদের বসাতে গিয়ে দেখি সৈয়দ রান্নাঘরটাকে লঞ্চের ইঞ্জিনরুমের মতো বানিয়ে রেখেছে। প্যাসেজে দাঁড় করিয়েই তাদের জরিপের উত্তর দিলাম। মাদকাসক্তদের নিয়ে আমার ধ্যানধারণার ওপর জরিপ। জরিপ শেষে তারা জানালো, তারা অনাথ এবং প্রাক্তন মাদকাসক্ত। তারা আর অনাথাশ্রমে থাকতে চায় না, কিন্তু স্টেইট তাদের যা আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে তা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য (মাসে ৯০ ইউরো)। আমি তাদের সাহায্য করতে পারি, যদি একটা ম্যাগাজিনের সাবস্ক্রাইবার হই। আমি নিজেই মোটামুটি ফকির, গীটার হাতে শনিবারে ফ্রিডরিশপ্লাৎসে নেমে দীনের নবী মোস্তফা বলে হুঙ্কার দিতে পারি যে কোন এক সপ্তাহান্তে, কিন্তু বাচ্চা দুইটা আমাকে মিষ্টি কথা বলে ভজিয়ে ফেললো। যাবার আগে দুইজনকে চকলেট খেতে দিলাম, বললাম আমাদের দেশে ঘরে কেউ এলে মিষ্টি কিছু খেতে দেয়া হয়, তারা মোটামুটি অভিভূত হয়ে হাজারো ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলো। মনে মনে বললাম, তুফানে বেঁধেছি লুঙ্গি, বাতাসে কী ভয়?

ফোন কোম্পানি থেকে এক সন্ধ্যায় এক ছেমরি ফোন করে লোভ দেখানো শুরু করলো, মহাশয়, আপনি কি জানেন কী অভূতপূর্ব এক সুযোগ আপনার জন্যে অপেক্ষা করে আছে? আপনি আমাদের ঐ প্যাকেজটা গ্রহণ করলে এক্স সংখ্যক এসমএমএস মাসে ফ্রি করতে পারবেন। আমি টের পেলাম, ফোন কোম্পানি আমার প্যান্ট খোলার চেষ্টা করছে। বললাম, খুবই জোস সংবাদ, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার এসএমএস করতে বিরক্ত লাগে। সে তারপরও ফোনে কোম্পানির হয়ে আমার জিপার খুলতে লাগলো, এসএমএস ভালো না লাগলে ওটা বাদ দিয়ে দিন। এই প্যাকেজে আপনি তাহলে মাসে ওয়াই ইউরো না দিয়ে জেড ইউরো দেবেন, আর যে কোন নেটওয়ার্কে মাসে ডাব্লিউ সংখ্যক মিনিট ফ্রি কথা বলতে পারবেন। মনে মনে বললাম, ফ্রি হইলো ক্যাম্নে, জেড ইউরো কি তোর বাপ দিচ্ছে? আমি যতই না না করি, সে ততই আমার প্যান্ট আন্ডু খুলে আমাকে নাঙ্গা করে। অবশেষে দেখলাম আমি হতাশ হয়ে রাজি হয়ে যাচ্ছি। ফোন কোম্পানিও প্যাকেজখানা আমাকে গছিয়ে পেছন মেরে শুভসন্ধ্যা বলে বিদায় নিচ্ছে। ঠিক করলাম, এরপর ফোন কোম্পানির কোন মেয়ে বাড়ি বয়ে এসে খাটে না উঠলে কোন প্যাকেজেই রাজি হবো না, সে যতই সুবিধাজনক হোক না কেন। চোরের দশ দিন আর গৃহস্থের এক দিন।

এরপর একদিন দুপুরে ভোনহাইমের দরজায় বোতাম টিপছে কেউ। ইন্টারকম তুলে শুনি এক মহিলা জানতে চাইছেন, মহাশয় কি আরবদেশের লোক? মেজাজটা বিলা হয়ে গেলো, বললাম, না, আমি বাংলাদেশের লোক। তিনি আরো খুশি হয়ে বললেন, একটা জরুরি ব্যাপারে আলোচনা করা দরকার, আসতে পারি ওপরে?

উচিত ছিলো জরুরি ব্যাপারের মায়রে বাপ বলে তাঁকে নিরুৎসাহিত করা, কিন্তু ভদ্রতার অবতার হয়ে তাঁদের ওপরে আসতে দিলাম। দুই মাঝবয়েসী মহিলা এসেছেন কোথায় যেন যীশুর মহিমাকীর্তন হচ্ছে, তা নিয়ে আমাকে ভজাতে। আমি সবিনয়ে জানালাম, আমি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি বটে, কিন্তু পরবর্তীতে আমার কাছে মনে হয়েছে ধর্ম নিয়ে কথাবার্তা বলে সময় নষ্ট করা আমার পক্ষে আর উচিত হবে না, তাই তাঁরা যদি আমাকে ক্ষমা করেন ... মহিলা দুইজনও ঘাগু, তাঁরাও তৎক্ষণাৎ অন্য সব প্রলোভন দেখাতে শুরু করলেন, ধর্ম ভুল হতে পারে, ঈশ্বর তো আর ভুল নয় ... ইত্যাদি। আমি বললাম, ঈশ্বরের সাথে আমার সম্পর্ক ঠিক ভালো নয়, আমরা একজন আরেকজনের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি, শুনে তাঁরা আরো খুশি, বাহ, এই অভিমানের নিরসনের জন্য সেই ভ্যাজরভ্যাজর অনুষ্ঠানই নাকি হতে পারে প্রথম ধাপ। আমি মনে মনে বললাম, আন্টি, আপনার ডাগর মেয়েটাকে যদি পাঠাতেন এই দাওয়াতে, এত কথা খরচ করা লাগতো? দুইজন একসাথে ঈশ্বরের নাম ধরে ডাক পাড়তাম। তা না ... যা-ই হোক, ভদ্রতার যুদ্ধে আমাকে হারাতে না পেরে তাঁরা শেষমেশ বিদায় নিলেন। আমি ম্যাগাজিনের সাবস্ক্রাইবার হয়েছি, বেহুদা ফোন প্যাকেজের সাবস্ক্রাইবার হয়েছি, ঈশ্বরের সাবস্ক্রাইবার হতে সমস্যা ছিলো না, কিন্তু সব কিছুরই তো একটা সীমা আছে, তাই না?

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।