Sunday, May 17, 2009

টিউলিপ আর হাওয়াকলের দেশে

১.
ইয়োরোপের মূল ভূখন্ডে সচলদের উপস্থিতি সরব নেদারল্যান্ডস আর জার্মানিতেই। বহু দূরে ইউক্রেইনে থাকেন সন্ন্যাসী। ঘুরে ঘুরে এর আগে কাসেলের সচলরা দেখা করে এসেছেন জার্মানির কয়েকজন সচলের সাথে, তাই মে মাসে কয়কেনহোফের টিউলিপ মেলাকে কেন্দ্র করে সীমান্তের ওপারে তানবীরা তালুকদারের কাছ থেকে একরকম জবরদস্তি নিমন্ত্রণ আদায় করেই ছাড়া হলো।

জার্মানির ভেতরে, আগেই বলেছি, ট্রেনযাত্রার বিশেষ সুবিধা আছে। পাঁচজন মিলে একটা দল বানিয়ে সর্বনিম্ন মাথাপিছু খরচে ঘোরাফেরা করা যায় দেশটাতে, কিন্তু এ সুবিধা ইয়োরোপের অন্য দেশগুলিতে ততটা নেই [এ ব্যাপারে আমার জ্ঞান সীমিত, কারণ ইয়োরোপের খুব বেশি দেশে আমি ট্রেনে ভ্রমণ করতে পারিনি] বলেই জানি। কাসেল থেকে সীমান্তের ওপারে ভেনলো শহর পর্যন্ত যেতে দু'টো প্রদেশ পড়ে, হেসেন আর নর্ডরাইনভেস্টফালেন, ছাত্রত্বের জোরে হেসেনের ওপরের আদ্ধেকটা আমি আর চৌধুরী ছাত্রটিকিটেই চলতে পারি, আর নর্ডরাইনভেস্টফালেনের জন্যে কাটা হলো প্রদেশটিকেট। সীমান্তে শেষ শহর কালডেনকিরশেন পর্যন্ত তা দিয়েই চলা যায়। একেবারে শেষ মাথায় গিয়ে টিকেটচেকার জানালো, বাকিটুকু পথের জন্যে টিকেট কাটতে হবে, নইলে জরিমানা খেতে হতে পারে।

সীমান্ত অতিক্রম করার সাথে সাথেই মোবাইলে এসএমএস, বৎস, তুমি ইয়োরোপের সব জায়গায় এখন মিনিটে অত সেন্ট করে কথা বলতে পারবে, অত সেন্ট করে এসএমএস খিঁচতে পারবে। তবে এসব মাড়োয়াড়ি বুলি কানে না নিয়ে চোখদু'টোকে জানালার ওপাশে তাগ করলেই টের পাওয়া যায়, জার্মানি বোধহয় পেছনেই ফেলে এসেছি। চারদিকে বাড়িঘরের স্থাপত্য অন্যরকম, জমি আর গাছপালা অন্যরকম। ভাটির দেশ নেদারল্যান্ডসে চলে এসেছি আমরা।

ভেনলোতে নেমে আইন্ডহোফেন [ডাচরা বোধহয় এইন্ডহোফেন বলে] যাবার এবং ফিরে আসার টিকেট কাটা হলো। ডাচ ট্রেনে চড়লেও টের পাওয়া যায়, জার্মানি পেছনে ফেলে আসা হয়েছে। ঝাঁ চকচকে ট্রেন, কিন্তু আসনগুলো ততখানি এর্গোনমিক নয়। মাল রাখার জায়গাটা সংকীর্ণ, লোকজন সবাই স্যুটকেস পায়ের কাছে নিয়ে বসেছে, মাথার কাছে খোপ সব খালি। ডাচরাও আকারে জার্মানদের মতোই অসুর, তাদের বাক্সপ্যাঁটরাও আসুরিক হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু সেগুলো রাখার জায়গা সুন্দরীদের হৃদয়ের মতোই অপরিসর।

আসার পথে শুরুর দিকে বিস্তর হাঙ্গামায় পড়েছিলাম আমরা, শুক্কুরবার দুপুর বলে কাসেলের সব লোক যেন গোঁ ধরে ভারবুর্গ রওনা দিয়েছিলো, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিলো অনেকখানি পথ। এক বুড়ির পাশের সীট খালি হতেই বুড়ি সুদূরে দন্ডায়মান আরেক ধলা ছোকরাকে যেভাবে কাতর স্বরে তার পাশে বসার আমন্ত্রণ জানালো, তাতে চটেমটে চৌধুরী খালি আসনের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। পরে বসবার অনুমতি চাইবার পর বুড়ি এমন কুইনিনগেলা চেহারা করে অনুমতি দিলো, তাতে বোঝাই যায়, একজন কালা আদমী তার পাশে বসে কোথাও যাবে, তা বরদাশত হচ্ছে না মোটেও। তবে ভারবুর্গ পেরোনোর পর বেশ জাঁকিয়ে হাতপা ছড়িয়ে কল ব্রিজ খেলতে খেলতে গিয়েছি আমরা। ভেনলো থেকে আইন্ডহোফেন পর্যন্ত ট্রেনে আর তাস না খেলে আশপাশটা দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম সবাই। গাছপালায় ছাওয়া চারপাশ, আর মাঝে মাঝে নিচু মাঠ, স্নিগ্ধ খাল, প্লাস্টার ছাড়া ইঁটের বাড়িঘর। ট্রেনে আমাদের কামরাতে নেদারল্যান্ডসের গঞ্জিকাসংস্কৃতির তিনজন সেবক নিজেদের মধ্যে কী এক ইশারার ভাষায় কথা বলতে বলতে একটু পর পর হাসছিলো, শুষ্করসের রসিক চৌধুরী বোধহয় সে কারণেই একটু পর পর গলা খাঁকারি দিতে দিতে আমস্টারডামের নাম জপ করছিলেন।

ডাচ তরুণীদের বড় ভালো লেগেছে আমার। জার্মান মেয়েদের মধ্যে একটা রুক্ষভাব আছে, তারা দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন, কমনীয়তার একটু টান থাকে সাধারণত (ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, তবে ব্যতিক্রমই)। ডাচ ব্যাটামুখী মেয়েদের বাদ দিলে বাকিরা বেশ কমনীয়, ভাটির দেশের মেয়ে বলেই হয়তো। কিংবা কে জানে, হয়তো সসেজ খায় বলেই জার্মান মেয়েরা কর্কশ, আর চীজ খায় বলে ডাচ মেয়েরা একটু কম কর্কশ। মনে মনে পরিকল্পনা করলাম, এরপর একা বেড়াতে আসতে হবে। এ ব্যাপারে আরও বিশদ জ্ঞানার্জন প্রয়োজন।

আইন্ডহোফেন মোটামুটি বড় স্টেশন, নেমে বাইরে দাঁড়ালাম আমরা দুলাল ভাইয়ের অপেক্ষায়। যোগাযোগ হয়েছিলো ট্রেন জার্মানি পেরোনোর আগেই, তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই দুলাল ভাইয়ের সাক্ষাৎ মিললো। পরবর্তী দিনে তাঁর সাথেই অধিকাংশ সময় আড্ডায় কেটেছে। স্বল্পবাক কিন্তু রসিক মানুষ, আর তাঁর গল্পের ঝাঁপিটি দারুণ।

তানবীরা তালুকদার আর পিচকিনি মেঘলার সাথেও এই প্রথমই আমাদের সাক্ষাৎ, তাঁদের ছিমছাম বাড়িটা ঢুকেই একরকম দখল করে ফেললাম আমরা।

সচলদের আড্ডায় সচলায়তনই মুখ্য হয়ে থাকে, তাই নানা লেবু চিপতে চিপতে চিপতে চিপতে একসময় দেখলাম, কয়েকটা বিয়ারের বোতল খালি, আর টেবিলে এসে জমেছে কলার খোসার ভর্তা, শুঁটকির ভর্তা, ইলিশ মাছ, কই মাছ আর চিংড়ি-সব্জি। মোটামুটি কনুই মেরে খাওয়া শুরু করলাম। এইসব জিনিস সামনে পেলে মনে হয়, কা তব কান্তা কস্তে পুত্র! শুঁটকির ভর্তা নিয়ে বলাইনীর সাথে মরণপণ লড়াই করে ভাতের হাঁড়ি খালি করে ছাড়লাম। এখনও ভার্সাই চুক্তি করে রেখেছি, কাসেলে ফিরে শুঁটকির ভর্তা খাওয়ালেই কেবল ছবি হস্তান্তর করা হবে, নইলে নয়।

দিনটা শেষ হোলো তানবীরার তৈরি ঘরে পাতা দই দিয়ে। স্বভাবসুলভ ঘ্যাঙাচ্ছিলাম, না না খাবো না, মিষ্টি জিনিস কম খাই, মুখে দেয়ার পর বাকরুদ্ধ হয়ে আবার কনুই চালানো শুরু করলাম।

২.
পরদিন সবাই নড়েচড়ে উঠে কয়কেনহোফের জন্যে তৈরি হলাম। ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জ দিয়ে এসেছি একেবারে ঘর থেকেই। ডালপুরি আর স্যান্ডউইচ ধ্বংস করে দুলাল ভাইকে একরকম অস্ত্রের মুখে বন্দী করে নিয়ে চললাম। বহু দূরের লিসে শহরে আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবেন তিনি।

আইন্ডহোফেন শহরটা নিরিবিলি, রাস্তার পাশে একফালি ঘাসের পর সাইকেল চালানোর চওড়া রাস্তা। এ শহরে সাইকেলের আধিক্য দেখেই বোঝা যায়, বাসট্রামের সুবিধা কম, কিংবা টিকিটে অনেক খর্চা, রাস্তায় গাড়ির দেখা কদাচিৎ মেলে, হাজারে হাজারে সাইকেল। সাইকেল চালানোর ভঙ্গিটিতেও যেন বোঝা যায়, জার্মানিতে নেই আমরা। জার্মানরা সব কাজই করে দারুণ তাড়াহুড়ো নিয়ে, হন্তদন্ত হয়ে চলে তারা, ডাচদের শরীরের ভাষায় একটা নিশ্চিন্ত নিরিবিলি আয়েশি ভাব আছে। একজন আরেকজনের কাঁধে হাত রেখে পাশাপাশি সাইকেল চালাচ্ছে মন্দলয়ে। সমতল আর ভাটির দেশের মানুষেরা বোধহয় এই আরামটুকু সব আচরণেই ফুটিয়ে তোলে। তপন রায়চৌধুরীর [প্রথমে বন্দ্যোপাধ্যায় লিখে বসেছিলাম, পাণ্ডবদা শুধরে দিলেন। আসলে ঐ ডাচ তরুণীদের কথা ভাবতে ভাবতে ... বুঝতেই পারছেন, বয়সের দোষ] বাঙালনামার কথা মনে পড়ে গেলো, তিনি সুখী ডাচ জাতির জীবনকে তাদেরই বিশেষণ "খজেলিক" দিয়ে মোহরাঙ্কিত করেছিলেন।

নেদারল্যান্ডস জার্মানির চেয়ে অনেক ছোট, তাই বড় শহরগুলোও কাছাকাছি। জার্মানীতে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে গেলে যেমন বেশ খানিকটা গ্রাম, পাহাড়, জঙ্গল (উত্তরে পাহাড় নেই) পেরিয়ে যেতে হয়, সেই ঝামেলা নেদারল্যান্ডসে নেই। আমস্টারডাম, রটারডাম, ডেন হাগ, সব কাছাকাছি যেমন। রাস্তার পাশে জমি অনেক নিচু, সাধে তো আর নেদারল্যান্ডস (নিচু দেশ) নাম হয়নি। দুলাল ভাই গাড়ি চালাতে চালাতে গল্প করছিলেন নেদারল্যান্ডবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে। আর আমরা যেমন, আমাদের সব আলাপেই বাংলাদেশ এসে উঁকি দেয় কৌতূহলী শিশুর মতো। নেদারল্যান্ডসের জমিজিরাত দেখতে বাংলাদেশের মতোই, পার্থক্য হচ্ছে জমি বিভক্ত করা খাল দিয়ে, আল দিয়ে নয়। আর বাংলাদেশটা ঝাঁঝরা হয়ে গেছে জিএসএম টাওয়ার দিয়ে, এদের এখানে অত উঁচু বলতে আছে কেবল উইন্ড টারবাইন। একটু পর পর এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে ফুটফুটে একেকটা উইন্ডমিল। মনে হচ্ছে কোথাও একটু গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করলেই দেখা মিলবে রোগা রোসিনান্তের পিঠে চড়া সিড়িঙ্গে মারকুটে দন কিহোতের, পেছনে গাধায় চড়ে সাঞ্চো পানজা, "থামুন সেনিওর, থামুন ...!"

দুলাল ভাইয়ের গল্পগুলি নিয়ে সচলায়তনে গোটা কুড়ি মারদাঙ্গা গল্প হতে পারে, কিন্তু সেগুলি তাঁর নিজেরই লেখা উচিত, তাই গল্পগুলো এড়িয়ে ভ্রমণেই সীমাবদ্ধ থাকি। ডাচ ভাষাটাকে জার্মান আর ইংরেজিকে যোগ করে দুই দিয়ে ভাগ করা একটা ভাষা বলে মনে হয়েছে, শুনে যদিও কিছু বুঝতে পারি না, তবে পড়লে দশ শতাংশের মতো আঁচ করা যায়। ট্রেনে দরজার পাশে লেখা, LAAT UITSTAPPERS VORGAAN, জার্মানের সাথে ছাপ মিলিয়ে দেখে আন্দাজ করা যায়, বলা হচ্ছে, যারা নামবে তাদের আগে যেতে দাও। জার্মানে ডিট্যুরকে বলা হয় UMLEITUNG, ডাচে OMLEIDING, এমনি ধারা আর কি। তবে ইংরেজির ব্যাপারে গড় জার্মানের যে বিতৃষ্ণা, তা গড় ওলন্দাজের নেই, পেট্রল পাম্পের দোকানদারনী ভুরু না কুঁচকে সাবলীল ইংরেজিতে কথা বলে যায়। জার্মানীতে ইংরেজি জানা লোকও ইংরেজি বলে নিতান্ত ঠ্যাকায় পড়লে, আর ইংরেজি অনেকে ভালো করে জানেও না। ভাঙা ভাঙা জার্মান বললেও তারা সহযোগিতা করে, ইংরেজি শুনলেই চটে যায়। ওলন্দাজরা এই মেজাজ থেকে অনেকটা মুক্ত। নেদারল্যান্ডসে আরো চোখে পড়লো কালা আদমী, তারা সংখ্যায় জার্মানীর চেয়ে অনেকগুণ বেশি। ভারতীয়, আফ্রিকান, দক্ষিণামেরিকান, কালো, শ্যামলা, বাদামী হরেক চামড়ার লোক রাস্তাঘাটে। কাসেলে যেমন উঠতে বসতে তুর্কি।

আইন্ডহোফেন থেকে লিসে শহরে পৌঁছতে মাঝে পড়ে স্খিফোল বিমানবন্দর, হাইওয়ের দুপাশে, রাস্তায় নেমে ঢিল মারলে বিমান ছ্যাঁদা করা সম্ভব। কেএলএমের একেকটা ঢাউস বিমান দিব্যি আয়েশে বিশ্বরোডের পাশে পার্ক করে রাখা। ভাবলাম, বাংলাদেশ হলে বিমানের চাকা খুলে নিয়ে গিয়ে বেচে দিতো কোন রুস্তম। তেল তো দুইয়ে নিতোই।

৩.
কয়কেনহোফে পৌঁছে দেখি বিশাল গাড়ির হাট। শত শত গাড়ি পার্ক করে রাখা মাঠে। তারই একটা করে রাখার পর হুড়মুড়িয়ে বাগানের দিকে রওনা দিলাম সবাই। বলাই একেবারে কাসেল থেকে যাবতীয় টিকেটাদি কেটে প্রিন্টাউট করে বয়ে নিয়ে এসেছেন, তাই কোন লাইন ধরাধরির ঝামেলায় আর যেতে হলো না।

কয়কেনহোফের প্রবেশপথ কয়েকটা, যেদিক দিয়েই ঢোকা হোক না কেন, টাশকি খেতেই হবে। কেবল টিউলিপ আর ড্যাফোডিল দিয়ে যে এত বড় একটা জায়গাকে এত মনোহর করে সাজানো যায়, তা না দেখলে বোঝা যাবে না। আমাকে যদি কখনো বলা হয়, একেবারে একা কিছু সময় কাটানোর জন্য কোন জায়গা বেছে নিতে, নিঃসন্দেহে কয়কেনহোফকে বেছে নেবো। হাজার হাজার লোক গিজগিজ করছে চারপাশে, পটাপট ছবি তুলছে লোকজন ফুলের সামনে, যদিও ঘাসের ওপর নোটিশ লাগানো, ঘাস মাড়াবেন না। কে শোনে কার কথা? সবাই কি আর আমাদের মত ভালো লোক?

চারপাশে শোনা যায় মানুষের কলকাকলি, ডাচ ফ্লেমিশ আলাদা করে বোঝার বিদ্যা নেই আমার, কী বলা হচ্ছে তার ষোল আনা না বুঝলেও জার্মান ইংরেজি ফরাসী স্প্যানিশ হিন্দি আর বাংলা যে বেশ চলছে আশেপাশে, তা টের পাওয়া যায়। আমি আমার মান্ধাতার আমলের ক্যাননেরঝোলাখানা চৌধুরীর কাঁধে চাপিয়ে ট্রাইপডের আগায় ক্যামেরা এঁটে ছবি তুলতে লেগে গেছি। আমার চেহারাটা এমনিতেই কদাকার, তারওপর হাবভাবেও একটা ক্যামঞ্জানি ভাব আছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই আশপাশের লোকজন আমাকে দেখলেই সুড়সুড় করে জায়গা ছেড়ে দিতে শুরু করলো ছবির জন্যে। এক জাপানী প্রথমটায় খেয়াল করেনি আমাকে, মাজা মুচড়ে বারবার ছবি তুলছিলো একই ফুলের সামনে, যখন দেখলো আমি কোমরে হাত রেখে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছি, সে প্রায় উড়ে ভাগে আর কি! শুধু তা-ই নয়, অনেকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আমার ছবি তোলাও দেখা শুরু করলো, সাথে মৃদু ফিসফাস। এক মহিলা তাঁর মহামূল্যবান নাইকন ক্যামেরা নিয়ে ছুটে এসে পাকড়াও করলেন আমাকে, "মহাশয়, একটু কি দেখিবেন, কী সমস্যা হইয়াছে ফুটোস্কোপখানায়? টিপি কিন্তু কর্মসাধন হয় না!" আমি আমার পোড়া চেহারাকে বিশেষজ্ঞের অভিজ্ঞতার আঁচে প্রায় অঙ্গার করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তাঁকে হতাশ করে জানালাম, এ ত্রুটি এখানে সারাবার নহে। আপসোস, মহিলা প্রৌঢ়া ছিলেন, কোন ডাচ তরুণী হলে জান লড়িয়ে দিয়ে ক্যামেরা ঠিক করে দিতাম। কয়েক পা এগোলে কেউ না কেউ এসে উঁকি মেরে ক্যামেরার ব্র্যান্ড-মডেল দেখে যায়, আরো পোড়ো যারা তারা লেন্স দেখে। না বুঝেই অনেকে "কোয়াইট আ প্রফেশনাল গ্যাজেট" এর সার্টিফিকেট দিয়ে দিলো। মনে মনে ভাবলাম, অরূপ বা মুস্তাফিজ ভাইয়ের লেন্সগুলি নাগালে থাকলে হয়তো মুরীদও জুটিয়ে ফেলতে পারতাম কয়েকটা। হয়তো কোন ওলন্দাজ তরুণী এসে সানুদেশ আলিঙ্গন করে ফুঁপিয়ে উঠতো, "হে কেলেকিষ্ঠি কেশবৎ, আমায় ফোটো খিঁচওয়ানা শিখলা দে। ইয়ে জ্ঞান মুঝে দে দে ঠাকুর!"

আশপাশে মোটামুটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে অবশেষে কয়কেনহোফ ছেড়ে যখন বেরোলাম, একটা চিন্তাই কেবল মাথায় ঘুরছিলো, এত অজস্র ফুলের দেশ বাংলাদেশে এমন একটা বাগান কেন থাকবে না? কী ঘটতো এমন একটা বাগান দেশে থাকলে? লোকে ফুল ছিঁড়তো? বাগান নষ্ট করতো? চাঁদাবাজি লুটপাট চলতো? নাকি আদৌ দর্শকই হতো না? ফুলের সমঝদার কি কেউ নেই দেশে? আমাদের আরবান প্ল্যানার-ডিজাইনার আর স্থপতিরা কি কেবল কংক্রীট ইঁট-কাঠ নিয়েই ভাবেন?

৪.
এরপর ঠিক করলাম, লিসে যখন এসেছি, একবার সবাই মিলে হেগে যাই। দুর্দান্তের সাথে ফোনে আলাপ হলো, তিনিও জানতে চাইলেন, আমরা হেগে যাবো কি যাবো না। ধূসর গোধূলিও সুদূর অতীতে একবার পণ করেছিলো, সে বন থেকে হেগে যাবে, কিন্তু এ যাত্রায় কী এক মাফিয়াবৃত্তিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আর সময় করতে পারেনি সে।

ডেন হাগ বা দি হেগ শহরটা উত্তর সাগরের তীরে। শেভেনিঙেন সৈকতটা আমাদের কক্সবাজার সৈকতের তুলনায় তুশ্চু, তবে অনেক পরিচ্ছন্ন। গোটা সৈকত জুড়ে পায়ে হাঁটার চওড়া পথ, সৈকতের এ পাশে সার বাঁধা রেস্তোরাঁ, দূরে দেখা যাচ্ছে নোঙর ফেলা প্রকান্ড সব জাহাজ। অদূরে এক ফাইভস্টার হোটেল, শুনলাম আমাদের নেত্রীরা হেগে এলে ওখানেই ওঠেন। ম্যাকডোনাল্ডসে খানিকটা উদরপূর্তি করে সৈকতে এক চক্কর হেঁটে আবার ফিরে চললাম আমরা। বলাই সৈকতে লিখলেন, সচলায়তন, জোয়ার এলে সে লেখা মুছে দেবে নর্থ সীর ঘিনঘিনে ফেনা।

আইন্ডহোফেন ফেরার পথটা কাটলো গল্পে। দুলাল ভাই পুরোটা সময়ই সুদূর অতীতে ফিরে গেলেন, গল্পে গল্পে পুরোটা পথ উপভোগ্য কাটলো।

সন্ধ্যেবেলা ফিরে দেখা মিললো দুর্দান্ত দম্পতি আর তাঁদের দুই রাজকন্যার। ঘন্টাদু'য়েক হৈহল্লার পর আবার সেদিনের মতো ক্ষ্যামা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম সবাই।

৫.
সব ভ্রমণের ফেরার পথটা হয়তো নিরামিষ থাকে না, তবে এবারে ছিলো। কে জানে, হয়তো দুইদিন জমজমাট দেশী আড্ডার পর আবার সেই স্তিমিত কর্মপিষ্ট জীবনে ফেরার ব্যাপারটাই সবকিছু নিরামিষ করে তোলে। তালুকদার পরিবারকে দুইদিন নিরতিশয় জ্বালাতন করে আইন্ডহোফেন থেকে বিদায় নিলাম আমরা। স্টেশনে প্রতি দশজনের একজনের হাতে প্রকান্ড ফুলের তোড়া বা টব, এরা অনেক ফুল কেনে সবাই।

বাকিটা পথ সেই একই কল ব্রিজ। নেদারল্যান্ডস থেকে সাথে করে নিয়ে যাওয়া কেবল মনে স্মৃতি, ক্যামেরায় ছবি আর পেটে তানবীরা তালুকদারের ভর্তা-ভাজি-বিরিয়ানি। গ্রীষ্মেই আবার কাসেলে তাঁদের সাথে জমজমাট গ্রিল-তেহারি-আড্ডা-ভ্রমণের আমন্ত্রণ ছাড়া আর কিছু তো দিয়ে আসার ছিলো না আমাদের।

[কিছু ছবি পরে যোগ করবো]


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।