Thursday, May 14, 2009

দেশে-বিদেশে

১.
আমার বই পড়ার অভ্যাস শুয়ে। গত দুই যুগ ধরে আমি শুয়েই বই পড়ছি। পাঠ্যের সাথে অনুপাঠ হিসেবে থাকতো মুড়িমাখা, সে-ও প্রায় দুই যুগ ধরেই। প্রবাসে হাতের নাগালে মলাটবন্দী কোন বই নেই, যা পড়ি সবই ই-বুক। সে তো আর শুয়ে পড়া যায় না। যদি জানতে চান, কেন প্রিন্টাউট নিয়ে পড়ি না, তাহলে উত্তর, হয় না। সব দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে না।

২.
মেসেঞ্জারে নোটিশ টাঙিয়েছিলাম সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার সন্ধানে। শিমুল এসে হালুম করে একটা লিঙ্ক গছিয়ে দিয়ে গেলো। গুঁতিয়ে পেলাম আলী সাহেবের কয়েকটি গল্পের স্ক্যান্ড কপি, পিডিয়েফ সংস্করণ। নামিয়ে পড়া শুরু করলাম কয়েকটি অপঠিত গল্প। শেষে পেলাম দেশে-বিদেশে-র তিনখান টুকরো।

আজ সারাদিন সেটি নিয়েই ছিলাম। পরিকল্পনা ছিলো ঘরে বসে অঙ্ক কষার, সেটি না করে পুরোটা দিন অকাতরে ব্যয় (নাকি আয়?) করলাম দেশে-বিদেশে পড়তে পড়তে। আর অনুভব করলাম, কী অমূল্য একটি গ্রন্থ অপঠিত রয়ে গিয়েছিলো এই মূর্খ জীবনে।

আমি নিজে ভ্রমন্থন আর স্মৃতিকথার খুব উৎসাহী পাঠক, যদিও তাবৎ বড় বড় লেখকের তেমনি ধারার লেখা আমার পড়া নয়। আলী সাহেবের এমন একটি সরস রচনা পাঠের আড়ালে রয়ে যাওয়া যেন পাঠকের ফৌজদারী অপরাধ।

আমি এই গ্রন্থালোচনায় কোন অংশ উদ্ধৃত করছি না আপাতত। নতুন পাঠকের আলী-আবিষ্কারের অভিজ্ঞতায় যেন বিন্দুমাত্র আঁচড় না পড়ে আমার লেখার দোষে।

৩.
দেশে-বিদেশে আলী সাহেবের কাবুলবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। বইটি শুরুই হয়েছে বাংলা ছেড়ে পেশোয়ারের দিকে ট্রেনযাত্রার বর্ণণা দিয়ে। আলী সাহেব সরস বর্ণণায় সিদ্ধহস্ত, সেই রসে পাঠককে প্রথম পাতাতেই মজতে হয়, বাকি পৃষ্ঠাগুলো সে সেই রসের ঘোরেই ওল্টায়।

পেশোয়ার থেকে কাবুল যাত্রার যে কাহিনী বইটিতে আছে, সেটি শুধু রচনাগুণেই নয়, তথ্যগুণেও অমূল্য। বাঙালির চোখে অচেনা আফগানিস্তানকে আলী সাহেব যে মুগ্ধ প্রেমিকের উচ্ছ্বাস নিয়ে এঁকেছেন, তার প্রতিধ্বনি বইটির পাতায় পাতায়। পশ্চিম ভারত আর আফগানিস্তানের শহর গ্রাম সব কাগজ-কালির বন্ধন ছাড়িয়ে পাঠককে ঘিরে ধরে একটু পর পর, এমনই মোহনীয় সেই বর্ণণা।

আফগানিস্তানের রাজত্ব নিয়ে তখন ঘোর সঙ্কটকাল, আলী সাহেব সেই সঙ্কটের প্রত্যক্ষদর্শী, আর তাঁর কলম সেই সঙ্কটদৃশ্য এঁকেছে দারুণ নৈপুণ্যের সাথে। ভারতীয় শিক্ষক হিসেবে তিনি কাবুলে কর্মরত, পাঠান আর কাবুলীদের জীবনযাত্রা নিয়ে প্রতিদিন শিখছেন কিছু না কিছু, এক একটি ঘটনা তাঁর মনে যে ছাপ ফেলেছে, সেই একই ছাপ তিনি কী অদ্ভূত দক্ষতার সাথে ফেলছেন কাগজে, পাঠকের জন্যে। কখনও যাইনি কাবুল, কিন্তু আলী সাহেবের লেখায় ফুটে ওঠা ছবিতে তাকে যেন দেখতে পাচ্ছি জানালার ওপাশেই। আফগানিস্তানের ইতিহাস ও রচনাকালীন বর্তমানকে যে স্বচ্ছ আর বর্ণিল ভাষায় আলী সাহেব তুলে ধরেছেন, তা তুলনারহিত। দুর্গম কাবুল যুদ্ধসঙ্কটাপন্ন, তিনি একা বাঙালি, নির্ভর করছেন ভাগ্য আর স্থানীয় বন্ধুদের ওপর, মুখোমুখি হচ্ছেন নির্মম ইংরেজের মাৎসর্য্যের, অনুভব করছেন পরাধীনতার তিক্ত আঁচটুকু, শুনছেন প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ, নিজে মুখোমুখি হচ্ছেন মৃত্যুর, এরই মাঝে মানুষের মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন সুর আর অসুরকে। এরই আগে পরে উঠে আসছে কাবুলের জীবনযাত্রার টুকরো টুকরো ছবি, তার বাজারের কথা, সুধীজনের বাড়িতে নিমন্ত্রণের ছবি, নতুন বন্ধুদের সাথে পরিচয় আর সে বন্ধুত্ব গাঢ় হবার গল্প। লেখার প্রতিটি মোড়েই একটি বাংলা বা ফারসী কবিতা ফুটে আছে পথের পাশের ঘাসফুলের মতো। দীর্ঘদিন আমার কৌতূহল ছিলো আলী সাহেবের ইংরেজবিদ্বেষ আর জার্মানপ্রীতি নিয়ে, এই বইটি পড়ে যেন কিছুটা উত্তর পেলাম। বেঁচে থাকলে তাঁর চরণস্পর্শ করে ধন্যবাদ জানাতাম এমন একটি গ্রন্থরচনার জন্যে।

সত্যজিৎ রায়ের লেখায় পড়েছিলাম আনপুটডাউনেবল বিশেষণটি। সৈয়দ মুজতবা আলীর এই বইটি আসলেই তাই।

৪.
কারো যদি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের আফগানিস্তান নিয়ে আগ্রহ না-ও থাকে, অন্তত আবদুর রহমানের কথা পড়তে হলেও দেশে-বিদেশে পড়ুন। আবদুর রহমান যেন বইটির আত্মাকে ধারণ করেছে নিজের মাঝে, সে যেন ফেলে আসা সময় আর দেশকে ধারণ করেছে অ্যাটলাসের মতো, যার জন্যে একটি দিন আলাদা রেখে দিনান্তে পাঠশেষে সামান্য অশ্রুপাত করা যায় সবসময়।


[]

1 comment:

  1. এখানেও পড়তে পারেন:
    Kmonsoor on Scribd

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।