Tuesday, May 12, 2009

একটি নবজাতক ফেসবুক বন্ধুত্বের অকালমৃত্যু

গল্পটি কোনরকম চাপানবিরতি ছাড়াই সমাপ্ত। কষ্ট করে নিচে স্ক্রল করে গিয়ে দেখতে হবে না। ধন্যবাদ।

১.
জেসমিন জোয়ারদার অফিস থেকে ফিরে এসে নানা ঘরোয়া কাজের পর এখন একটু ফেসবুক খোলেন। বিদেশ থেকে তার ভাইবোনেরা ঢোকে মাঝে মাঝে, প্রায়ই নিত্যনতুন ছবি বিনিময় হয়।

আর নিশ্চিন্দিপুরব্লগের লোকজন তো আছেই। তারা ফেসবুকে বড় সক্রিয়, একজন লেখার লিঙ্ক দিলে আরেকজন ছবি আপলোড করে পাল্টাপাল্টি। একটা না একটা ঘটনা লেগেই আছে ফেসবুকে। জেসমিন জোয়ারদারও তাই তাদের খোঁজখবর রাখেন সেখানে। অবশ্য সবার খোঁজ রাখতে পারেন না, সবার ফেসবুক নাম তিনি জানেন না। ব্লগে যে পালোয়ান নিকে লিখছে, তার হয়তো "টিনু খান" টাইপ রোগাভোগা নাম। নিকবন্দী মানুষরা অনেকেই ফেসবুকে নিজ নামে আছে, তাদের সেই স্বনামে বড় অপরিচিত লাগে।

তাই একদিন যখন তিনি দেখেন, একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে ছামছুল আরেফিনের কাছ থেকে, তখন তিনি তাতে সানন্দে সম্মতি দেন। শামসুল আরেফিন তো নিশ্চিন্দিপুরব্লগের মডারেটর। ভালোই হলো, ফেসবুকে ব্যাটাকে পেলে কোন সমস্যায় পড়লে ত্বরিত সমাধান পাওয়া যাবে।

বন্ধুত্বের অনুরোধ রক্ষিত হতে না হতেই একটি নীলজামাপরা মূর্তি টোকা দেয় তাঁকে। জেসমিন মনোযোগ দিয়ে দেখেন। বিদঘুটে চেহারার এক লোক একটি নীল ফতুয়া পরে পরম পরিতৃপ্তিভরে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে কোন এক দিকে। চেহারায় একটি হামবড়া ভাব। জেসমিনের মনটা একটু দমে যায়। নিশ্চিন্দিপুরব্লগে শামসুল আরেফিনকে তিনি আরেকটু বিনয়ী, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার কোন যুবক হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। এখন তো দেখা যাচ্ছে আসলেই লোকজনের কানকথা সত্যি, এরা মহা ঘাড়ত্যাড়া আর বেয়াদব। চোখেমুখে একটা উগ্র মারকুটে ভাব স্পষ্ট।

শামসুল আরেফিন তাকে মেসেজ পাঠায়। "কেমন আছেন?"

জেসমিন টাইপ করেন, "ভালো। আপনি কেমন?"

শামসুল আরেফিন বলে, "ভালো আছি। কী করছেন?"

জেসমিন বলেন, "আর কী করমু বলেন? ভাবছিলাম অফিসের একটা কান্ড নিয়ে একটা পোস্ট করবো, কিন্তু নিশ্চিন্দিপুরে আজকে কী জানি হইছে একটা, লেখা পোস্ট করতে গেলেই একটা উল্টাপাল্টা নোটিশ আসে। একটু দেখেন না ঠিক করতে পারেন কি না?"

শামসুল আরেফিন একটা দীর্ঘ বিরতি নেয়। তারপর বলে, "আপনি আমাকে এ টি এম শামসুল আরেফিনের সাথে গুলাইয়া ফালাইছেন। আমি এ টি এম নই, এ টি এম ছাড়া ছামছুল আরেফিন।"

জেসমিন জোয়ারদার একটু থতমত খান। আসলেই তো। এই লোক শামসুল নয়, ছামছুল। পাশাপাশি তিনি গোপনে আনন্দিতও হন। যাক, এই ব্যাটা নিশ্চিন্দিপুরের পরোপকারী এ টি এম শামসুল আরেফিন নয়, কোন এক অজানা হতভাগা ছামছুল আরেফিন।

জেসমিন জোয়ারদার টাইপ করেন, "আসলেই! আমারই ভুল। আপনাকে তো তাহলে চিনতে পারলাম না?"

ছামছুল আরেফিন আবারও দীর্ঘ বিরতি নেয়। তারপর লেখে, "আমি ছামছুল আরেফিন। কবি, গল্পকার, সাংবাদিক। ২০০০ সালে প্যানাসনিক পুরস্কারপ্রাপ্ত গল্পগ্রন্থ ব্যক্তিগত অর্শরাত আমার লেখা। বর্তমানে আমি মতিচুরব্লগের বিভাগীয় সম্পাদক। আমি অ্যান্টিনিশ্চিন্দিপুর।"

জেসমিন লেখাটা পড়ে আগামাথা কিছুই বুঝতে পারেন না। এই কবি-গল্পকার-সাংবাদিক মতিচুরব্লগের বিভাগীয় সম্পাদক তাকে কেন বন্ধু হিসেবে যোগ করতে চায়? দৈনিক মতিচুর তিনি নিয়মিতই পড়েন, কখনো কোন লেখায় ছামছুল আরেফিনের নাম চোখে পড়েনি। আর অ্যান্টিনিশ্চিন্দিপুর মানেটা কী?

তিনি লেখেন, "আসলে আমি গল্প উপন্যাসের অত খোঁজ রাখি না তো, তাই চিনতে পারছি না আপনাকে।"

এবার ছামছুল আরেফিন দ্রুত জবাব দেয়, "ইসলামাবাদব্লগ পড়েন?"

জেসমিন ভুরু কুঁচকে লেখেন, "না। আমি দিলখোলা আর নিশ্চিন্দিপুর পড়ি শুধু।"

ছামছুল আরেফিন লেখে, "ও। আপনি তো দেখি খুব একটা পড়াশোনা করেন না!"

রাগে জেসমিনের গা জ্বলে যায়। আরে হাবড়া, তোর নাম শুনি নাই দেইখা আমি এখন পড়াশোনা করি না? তুই কী লেখছস যে তোর নাম শুনতে হইব?

তিনি লেখেন, "জ্বি। ঠিকই ধরছেন।"

ছামছুল লেখে, "আমি আপনাকে আমার কিছু লেখার লিঙ্ক পাঠাচ্ছি। এ সবই গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন নামীদামী পত্রিকা আর ইসলামাবাদব্লগে প্রকাশিত হয়েছে। পড়ুন, অনেক কিছু জানতে বুঝতে পারবেন। নিশ্চিন্দিপুর নিয়ে পড়ে থাকলে কিছুই শিখা হবে না।"

জেসমিন লেখেন, "এখন তো কিছু কাজে বসবো ভাই। এত কিছু পড়ার সময় নাই।"

ছামছুল লেখে, "পজেটিভ থিঙ্কিঙের চেষ্টা করবেন সবসময়। আমি শিগগীরই মতিচুরব্লগ ঢেলে সাজাচ্ছি। কামলাদের ভাইভা চলছে এখন। আপনাকে লিখার আমন্ত্রণ জানাই। নিশ্চিন্দিপুরের ফ্যাসিস্ট পরিবেশ আপনাকে নষ্ট করবে। আপনার প্রয়োজন খোলা ঘাসে ছাওয়া ময়দান।"

জেসমিন লেখেন, "আচ্ছা আসি তাহলে আজ।"

ছামছুল লেখে, "জাযাকুল্লাহ খায়ের। আমার বন্ধুরা আমাকে ছামো ডাকে, আপনিও তাই ডাকতে পারেন। ডাকবেন আশা করি।"

জেসমিন হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন ছামছুল আরেফিনের সাথে আলাপ শেষ হবার পর। আর মনে মনে ভাবেন, আম্মার কথাই ঠিক, আমি চেহারা দেইখাই চিনতে পারি কোন ব্যাটা ভালো আর কোন ব্যাটা মন্দ। এই ব্যাটা যে লোক সুবিধার না, দেইখাই বুঝছি।

২.
দুইদিন পর ছুটির দিনে ছেলেকে প্রাইভেট টিচারের জিম্মায় দিয়ে এসে জেসমিন আবার ফেসবুক খোলেন। মাঝের দু'টা দিন অফিসের কাজের চাপে এত ব্যস্ত গেছে যে খোঁজখবর রাখা হয়নি।

পাঁচ মিনিটের মাথায় উঁকি দেয় সেই মনহুঁস সুরত। ছামছুল আরেফিন, তার নীল ফতুয়াসহ।

মেসেজ আসে, "জেসমিন, কেমন আছো?"

জেসমিন জোয়ারদারের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। তিনি অপরিচিত মানুষের মুখে তুমি শুনতে পছন্দ করেন না। টিভিতে দেখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা হরদম বয়সে বড় আর ছোটদের বেশ তুমি ডেকে আপন করে কথা কয়, কিন্তু এটা তো আর পশ্চিমবঙ্গ নয়।

তিনি লেখেন, "ছামো ভাই, আপনার সাথে পরিচয় হলো সপ্তাও ঘুরে নাই। এর মধ্যে আপনে আমার এমন কোন বড় দোস্তো হইয়া যান নাই যে তুমিতামারি শুরু কইরা দিবেন।"

ছামছুল আরেফিন চুপ হয়ে যায়। তারপর প্রায় মিনিট পাঁচেক নীরবতার পর এক দীর্ঘ মেসেজ পান জেসমিন।

ছামছুল সেখানে লিখেছে, "তুমি জানো আমি কে? কী আমার পরিচয়? তুমি জানো আমি মতিচুরব্লগের বিভাগীয় সম্পাদক? তুমি জানো এপার বাংলায় আর কে কে প্যানাসনিক সাহিত্য পুরস্কার পাইছে? তুমি জানো ওপার বাংলায় ভাবেশ রায় আমারে লইয়া মছলন্দবাজার পত্রিকায় কী লিখছেন? তুমি জানো বাংলা সাহিত্যে শূন্য দশকের গল্পকারদের মধ্যে আমার অবস্থান কোথায়? তুমি জানো ডালিম আল দীন তার পরিচিতজনদের কাছে বাংলা ছোটগল্পের ভবিষ্যৎ মশালবাহক হিসাবে কার নাম উচ্চারণ করতেন? তুমি জানো ... ?"

জেসমিন জোয়ারদার আর পড়েন না। তিনি কিছুই জানেন না, জানার ইচ্ছাও নাই। এই ছাগলটার হাত থেকে নিষ্কৃতি চান, এটুকুই শুধু জানেন তিনি।

নিশ্চিন্দিপুরে শেখা একটা বুলি আলগোছে ঝেড়ে দেয়ার লোভ আর সামলাতে পারলেন না তিনি। "ছামো ভাই, খুব খিয়াল কইরা। আপনারে ব্লক করলাম। এই দোস্তি দিয়া কাম নাই আমার। গেলাম। খুদাপেজ।"

মাউসের শেষ খোঁচায় ছামছুল আরেফিনকে ব্লক করতে করতে তৃপ্তির সাথে জেসমিন জোয়ারদার ভাবতে লাগলেন, কিছু কিছু বন্ধুত্বের গোড়া সময় থাকতে থাকতেই কাটা জরুরি। তা না হলে হুদাই ঝামেলা বাড়ে।


জীবিত বা মৃত কোন চরিত্রের সাথে গল্পের চরিত্রদের কোন সম্পর্ক নাই। কোন মিল খুঁজে পেলে তা নিতান্তই কাকতাল, আর পাঠকের কল্পনাপ্রবণ মনের পরিচয়মাত্র।

[সমাপ্ত]

[]

1 comment:

  1. ধুরু!!মজা পাইতেছিলাম,তখনি দেখি গল্পটা শেষ!!
    http://techtoday4u.blogspot.com/

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।