Wednesday, April 29, 2009

কী হতে চাই আসলে?

পরীক্ষার খাতায় "তোমার জীবনের লক্ষ্য" গোছের রচনার ফরমায়েশে কখনোই সত্য কথাটা উগড়ে দিয়ে আসতে পারিনি। দু'য়েকবার কিছু অসংলগ্ন মুখস্থ মিথ্যা কথা লিখতে গিয়ে প্রবল পীড়া বোধ করে পরবর্তীতে তিনটি বা পাঁচটি বিকল্প থেকে অন্য কিছু বেছে নিয়ে আবোলতাবোল লিখেছি। সময়ের মূল্য, শ্রমের মর্যাদা, বর্ষণমুখর দিনের স্মৃতি, বালছাল।

ক্লাস সেভেনের ষান্মাসিকে যদি লিখতাম, হে পূজ্যপাদ পরীক্ষক মহোদয়, আমি বড় হয়ে একজন জাহাজডুবি নাবিক হতে চাই, নির্জন পলিনেশীয় দ্বীপে বিশালবক্ষা কোন তরুণীর সাথে নারকেল পেড়ে পেড়ে তাতে সংলগ্ন ল্যাগুন থেকে পাকড়াও করা গলদা চিংড়ি ভরে আগুনে ঝলসিয়ে খেতে চাই রুটিফল দিয়ে, আপনি আমার এই লক্ষ্যপাপ ক্ষমা করুন, তিনি কি আমায় ছেড়ে দিতেন? পুটকির চামড়া কি খানিকটা হলেও বেতে তুলে আনতেন না? অথচ সেই বাসনাটি বড় সৎ ছিলো, এক বিন্দু মিথ্যা কথা ছিলো না তাতে। আরো বড় ক্লাসে যখন উঠেছি, ক্ষণিকের জন্যে হলেও ভেবেছি, আমার জীবনের লক্ষ্য বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের দুর্ধর্ষ স্পাই মাসুদ রানার মতো একটা কিছু হবার, যার বয়েস বাড়ে না, যে শুধু নানা ফ্যাসাদের কাজে ঘুরে বেড়ায় আর মাগীবাজি করে, এবং অবধারিতভাবে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত মরে না কিছুতেই। ভেবেছি, লিখি, বড় হয়ে আমি কিছু হতে চাই না, আমি সারাজীবন শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়তে চাই, মাঝে মাঝে উঠে শুধু একটু উদ্দাম প্রেম করতে চাই মাস তিনচারেকের জন্যে। ভেবেছি লিখবো, বড় হয়ে আর যাই হই স্যার, আপনার মতো হবো না, বাংলা দ্বিতীয় পত্রের খাতা দেখার কোন ইচ্ছা আমার নাই স্যার, আমাকে ক্ষমা করবেন। ভেবেছি লিখি, বড় হয়ে কী হবো আমি এখনো জানি না, আগে বড় হই তারপর দেখা যাবে।

তবে আমার জীবনের আপাতঃস্থিরকৃত লক্ষ্য আমি ভেদ করতে পেরেছিলাম টেনেটুনে। আমাদের ভাইবোনরা একেকজন একেক পেশায় গেলেও প্রকৌশলবিদ্যার দিকে কেউ এগোননি, সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্যে একটা অব্যক্ত অস্ফূট ইঙ্গিত মাঝে মাঝে অনুভব করতে পারতাম। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে যথাক্রমে এক নানা ও এক মামা কৃতী তড়িৎপ্রকৌশলী ছিলেন, তাঁদের উদাহরণগুলি যেন একটু বেশি করে শুনতাম। এক সময় দেখলাম, আমি হদ্দমুদ্দ হয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎকৌশল বিভাগের সীমিত কিছু আসনের একটিতে গদ্দিনশীন হবার জন্যে। এবং পরীক্ষার ফল বার হবার পর দেখা গেলো সেটি পেয়েছিও। সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম উল্লুকের মতো।

কিন্তু এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যা হয়েছি তা হতে চাইনি। আমি হতে চেয়েছি একজন প্রকৃত অলস পড়ুয়া, যার ঘরে বোঝাই বই থাকবে, যে বিছানায় শুয়ে মুড়িমাখা খেতে খেতে শুধু বই পড়বে, আর অবশ্যই অবশ্যই মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে মাগীবাজি করে বেড়াবে। এ যেন সেই কৈশোরের স্বপ্নগুলোর মিশেল, জাহাজডুবি নাবিক, মাসুদ রানা আর পেশাদার পাঠকের এক এইজিওট্রোপ, যাকে বকযন্ত্রে ছেঁকে আলাদা করা যায় না। এক সবকরাযায় গোছের খাটে শুয়ে থাকতে চেয়েছি, যে খাটে বই মুড়ি মেয়েছেলে শুধু আসতেই থাকবে একের পর এক।

কিন্তু এই মনে হওয়াটাও সাময়িক ঢংধনু বলে মনে হয়। একটা কিছু করে জীবন পার করে দিতে গেলে এই বালের তড়িৎপ্রকৌশলী না হয়ে কী হতাম আসলে? ফ্রিল্যান্স ফোটোগ্রাফার? রেস্তোরাঁ ক্রিটিক? ফুলচাষী? আবহাওয়া অফিসের অ্যানালিস্ট? রেডিওর ভুয়াচিঠিলেখক?

বাচ্চাদের স্কুলের এক খামাখা ক্লাসের মাস্টার হতে ইচ্ছা করে মাঝে মাঝে। মনে হয় একগাদা বাচ্চাকে সামনে বসিয়ে তাদের শেখাই, কিভাবে সাবানের ফেনা গুলে বুদ্বুদ বানাতে হয়, কিভাবে রঙিন কাগজ কেটে কেটে ঘর সাজানোর নকশা বানানো যায়, কিভাবে শুধুশুধুই একদিন পানিতে রং গুলে বেলুনে ভরে দুই দলে ভাগ হয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা যায়, কিভাবে আতশ কাঁচ দিয়ে ছোট্ট বেগুনী রঙের ঘাসফুল দেখতে হয়, কিভাবে হঠাৎ ক্লাসের মাঝখানে একদিনে হারেরেরেরেরেরে বলে একছুট দিয়ে মাঠের মাঝখানে গোলহয়ে কিছুক্ষণ ছুটোছুটি করে টের পাওয়া যায়, এই জীবনটা আসলে আরোপিত মূল্যের ওপরই চলছে, যার যা খুশি দাম ধরে কাটিয়ে দেয়া যায়, জীবনের লক্ষ্য নিয়ে রচনা লেখা নিতান্তই সেইসব ফেল্টুশ বোকাসোকা বোকাচোদাদের কাজ, যারা বোকাদেরও ঠিকমত চুদতে পারে না।


[]

1 comment:

  1. শেষ প্যারাটা পড়ে চোখে পানি চলে আসল কেন জানি।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।