Thursday, April 30, 2009

ঈস্টার দ্বীপ নিয়ে পত্রিকায় শ্রদ্ধেয় শাহাদুজ্জামানের লেখায় বেশ কিছু ভুল তথ্য

ঈস্টার দ্বীপ নিয়ে আমার আগ্রহ বেশ অনেকদিনের, এমনকি আমি এই দ্বীপের জনব্যবস্থার মডেল নিয়েও কাজ করেছি ব্যবস্থাকৌশল শিখতে গিয়ে। ঈস্টার দ্বীপ সম্পর্কে আমার প্রাথমিক জ্ঞান থর হেয়ারডাল ও এরিখ ফন দ্যানিকেনদের তত্ত্বভিত্তিক, যা পরে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেই প্রমাণিত হয়। ঈস্টার দ্বীপ সম্পর্কে আমার মাধ্যমিক জ্ঞান জ্যারেড ডায়মন্ডের "কোল্যাপ্স" পড়ে। শাহাদুজ্জামানও তাঁর লেখায় কোল্যাপ্সের কথা বলে এমন কিছু তথ্য সন্নিবেশিত করেছেন তাঁর লেখায়, যেগুলো কোল্যাপ্সে নেই, এবং কোল্যাপ্সে যা আছে তা তাঁর লেখা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শাহাদুজ্জামান বলেছেন,

ইস্টার দ্বীপের ছবি যখন প্রথম দেখি তখন থেকেই কৌতুহলী হয়ে উঠেছি দ্বীপটির ব্যাপারে। জনমানুষ নেই, খাঁ খাঁ একটা দ্বীপের চারপাশে সারিবদ্ধ অসংখ্য প্রাগৈতিহাসিক পাথরের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে অতল সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে মুখ করে।
ঈস্টার দ্বীপের এই বিখ্যাত মূর্তি বা "মোয়াই"গুলির বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, এরা কেউ সাগরের দিকে মুখ ফিরিয়ে নেই। প্রতিটি মোয়াই সাগরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড় করানো।

শাহাদুজ্জামান লিখেছেন,


নৃতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিকদের আগ্রহের অন্ত নেই এই দ্বীপটি নিয়ে। বিস্তর গবেষণা হয়েছে এ দ্বীপটি নিয়ে এবং বহু তথ্যই এখন জানা হয়ে গেছে। জানা গেছে, কয়েক হাজার বছর আগে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরের এক আগ্নেয়গিরির উদ্গিরণ থেকে জন্ন নিয়েছিল এই দ্বীপ।
কয়েক হাজার নয়, কয়েক লক্ষ বছর আগে দ্বীপটির জন্ম হয়েছে।

শাহাদুজ্জামান লিখেছেন,


এই দ্বীপ থেকে নিকটতম দেশ পেরু। সেই পেরুরই কোনো পথভোলা নৌকা গিয়ে ভেড়ে ওই দ্বীপে। পেরুর পাহাড়ি প্রকৃতি থেকে ওই আশ্চর্য শ্যামলিমায় পৌঁছে নিশ্চয় ঘোর লাগে নৌকাযাত্রীদের। তারা থেকে যায় সেখানে। কেউ কেউ ফিরে গিয়ে নিয়ে আসে আরও মানুষ। একটু একটু করে গড়ে ওঠে এক বিশাল জনপদ। গড়ে ওঠে সম্প্রদায়, প্রশাসন, নতুন এক সংস্কৃতি। এসবই ঘটে কয়েক শতাব্দী ধরে।

এইখানে এসে ব্যাপক অস্বস্তি শুরু হয়। প্রশ্ন জাগে, শাহাদুজ্জামান কি আদৌ কোল্যাপ্সের সেই অধ্যায়টি পড়ে দেখেছেন, যেখানে ঈস্টার সম্পর্কে লেখা হয়েছে?

ঈস্টার বা রাপা নুই বা ইজলা দে লা পাসকুয়ার নিকটতম দেশ পেরু নয়, চিলে। কিন্তু এর প্রাচীন জনপদের অধিবাসীরা পেরু বা চিলে বা দক্ষিণামেরিকার মূল ভূখন্ড থেকে আগত নয়, ধারণা করা হয় তারা হেন্ডারসন দ্বীপ বা পিটকেয়ার্ন দ্বীপ থেকে আগত। এর প্রমাণ মেলে ঈস্টারে পাওয়া পাথরের যন্ত্র বিশ্লেষণ করে। ঈস্টারের পাথর মূল ভূখন্ডে বা মূল ভূখন্ডের পাথরের যন্ত্র ঈস্টারে পাওয়া যায়নি। এর সংস্কৃতির সাথে দক্ষিণামেরিকার কোন সংস্কৃতির মিল নেই, দূরতর সাদৃশ্য আছে পলিনেশিয়ার সাথেই। এর ভাষার সাথে মূল ভূখন্ডের কোন ভাষার সাদৃশ্য নেই, কিন্তু প্রচুর সাদৃশ্য আছে পলিনেশিয়ার ভাষার সাথে। ঈস্টার শুধু দূরেই ছিলো না, অষ্টাদশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্নও ছিলো।

শাহাদুজ্জামান লিখেছেন,


এই নতুন রাজ্যের গোত্রপ্রধানরা নতুন এক প্রথা চালু করেন। এ দ্বীপের যেকোনো গণ্যমান্য ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর স্নৃতিতে একটি পাথরের মূর্তি বানাতে হবে এবং সেটিকে স্থাপন করতে হবে দ্বীপের সীমানায়। সে মূর্তি সাগরের দিকে মুখ করে নতজানু হয়ে সাগরকে শ্রদ্ধা জানাবে।

এটি লেখক কোথায় পেলেন তা উল্লেখ করেননি, তবে মূর্তিগুলি ঠিক কেন বানানো শুরু হয়েছিলো, তা এখনও পর্যন্ত অনির্ণীত। ঈস্টারের সভ্যতার শেষ দিকে সেখানে ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা পরিবারের কেউ মারা গেলে সে উপলক্ষ্যে মূর্তি নির্মাণ করতো বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। দ্বীপের সীমানায় মূর্তি স্থাপন শুরু হয়েছে অনেক পরে, প্রাথমিক মূর্তিগুলো দ্বীপের মাঝামাঝি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সাগরের দিকে মুখ করে থাকার কথা আগেই বলেছি।

শাহাদুজ্জামান লিখেছেন,


একেকজন মারা যায় আর দ্বীপের কয়েক শ মানুষ লেগে পড়ে মূর্তি বানাতে। দ্বীপের মাঝখানে অগ্নিগিরির লাভা থেকে সৃষ্ট প্রাচীন পাথর থেকে তৈরি হয় মূর্তি এবং প্রকান্ড সেসব মূর্তিকে এরপর কাঠের তৈরি বিশাল এক গাড়িতে করে আনা হয় দ্বীপের কিনারে। ক্রমেই দ্বীপ ভরে উঠতে থাকে সাগরের দিকে মুখ করা নতজানু অসংখ্য মূর্তিতে। সেই সঙ্গে আরও নিয়ম হয় যে রাতে আগুন জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে হবে এই পবিত্র মূর্তিগুলোকে।

রাতে আগুন জ্বালিয়ে শ্রদ্ধার ব্যাপারটিও লেখক কোথায় পেলেন, জানা যায় না। ঈস্টারে মানুষকে শুরুতে দাহ করা হতো, তার প্রমাণ মিলেছে, যা পরবর্তীতে কাঠের অভাবে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়। রাতে তারা অবশ্যই আগুন জ্বালাতো (ঈস্টারের গড় তাপমাত্রা কম), কিন্তু পবিত্র মূর্তিকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্যে রাতে আগুন জ্বালানোর তথ্যটির উৎস জানা দরকার।

বিপত্তি শুরু হয় সেখান থেকে। দুটো কাজে তাদের কাঠের প্রয়োজন পড়ে। মূর্তিগুলোকে যে বিশাল যানে চড়িয়ে দ্বীপের কিনারে আনতে হবে সেই যানটি বানাতে এবং নিয়মিত আগুন জ্বালিয়ে তাদের পূজা দিতে।

আবারও সন্দেহ জাগে, শ্রদ্ধেয় শাহাদুজ্জামান কি কোল্যাপ্স বইটি পড়ে দেখেছেন? যে "বিশাল" যানে করে মূর্তিকে আনা হবে, সেটিকে রোজ রোজ বানানোর প্রয়োজন কেন পড়তো, এ প্রশ্ন তো নিজের মনেই জাগে! কোল্যাপ্সে বলা হয়েছে, পলিনেশিয়ার অন্যত্র বড় ক্যানো পরিবহনের জন্য তা গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে গড়িয়ে বড় দূরত্ব পার করা হতো। সেই রোলার হিসেবে প্রচুর গাছ কাটা হয়েছে ঈস্টারে। তবে চিলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক সোনিয়া হাওয়া, যিনি ঈস্টারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের সাথে জড়িত, তিনি একটি সাম্প্রতিক পেপারে প্রস্তাবনা লিখেছেন যে ঈস্টারের পরবর্তী যুগের মূর্তিগুলো গড়িয়ে নয়, বরং কাঠের ভেলায় করে দ্বীপের পরিধি বরাবর পার করা হতো। এ কারণেই পরবর্তীতে দ্বীপের সৈকত জুড়ে মূর্তি দাঁড় করানো হয়।

শাহাদুজ্জামান লিখেছেন,

এই দুই কাজে অবিরাম বৃক্ষ নিধন চলতে থাকে ওই দ্বীপের। কেউ খেয়াল করে না প্রকৃতি যে হারে বৃক্ষ প্রতিস্থাপন করতে পারে, তার চেয়েও দ্রুত তারা তাদের বৃক্ষ ধ্বংস করছে। অবিরাম গাছ কেটে কেটে দেবতার পূজা দিতে থাকে তারা। দ্বীপের সীমিত ভুমির গাছ ক্রমেই কমতে থাকে। কমতে থাকে পাখিদের ডিম পাড়ার জায়গা, প্রাণীদের আশ্রয়। যত্রতত্র মারা যেতে থাকে তারা। অজান্তে কমতে থাকে দ্বীপের পাখি আর প্রাণী। এক পর্যায়ে ভয়ংকর পরিবেশ ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় দ্বীপে। আর কোনো বৃক্ষ জন্নায় না। জন্নায় না কোনো ফসল। পথে পথে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে পাখি, বিবিধ জন্তু-জানোয়ার। পরিবেশ বিপর্যয়ে শেষে মানুষের মধ্যে দেখা দেয় অজানা মহামারি। এক এক করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে থাকে দ্বীপের মানুষ। খাবারের অভাবে মৃতদেহ খেতে শুরু করে তারা। ফলে-ফুলে শোভিত বর্ণাঢ্য এক জনপদ ক্রমেই পরিণত হয় এক দুর্বিষহ মৃত্যুপুরিতে। সপ্তদশ শতকে ডাচ্ অভিযাত্রী রোগিভিন যখন এই দ্বীপে তাঁর জাহাজ ভেড়ান, তখন দেখতে পান এক ভুতুড়ে বিরাণ দ্বীপ, যেখানে বেঁচে আছে মুমূর্ষু গুটিকয় মানুষ আর পুরো দ্বীপকে যেন পাহারা দিচ্ছে রহস্যময় সেসব মূর্তি। সেই বেঁচে যাওয়া কতিপয় অধিবাসী, তাদের প্রাচীন লিপি, গুহাচিত্র, লোকগাঁথা থেকে বেরিয়ে আসে এই ট্র্যাজিক জনপদের কাহিনী।

অজানা মহামারী ঈস্টারে ঘটে রগেভেন সে দ্বীপে পা দেয়ারও বহু পরে। ১৮৭২ নাগাদ দ্বীপটির অধিবাসীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১১১ তে, এবং সেই মহামারী ছিলো স্প্যানিয়ার্ড বোম্বেটেদের আমদানী করা। ঈস্টারের জনব্যবস্থা হুমকির মুখে যখন পড়ে, তখন দ্বীপে প্রচন্ড সংঘাতের আলামত পাওয়া গেছে। সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠে তারা আবার একটি ইকুইলিব্রিয়ামে পৌঁছাতে পেরেছিলো, যেটি নষ্ট হয় ইয়োরোপীয়দের বয়ে আনা অসুখ আর দাসব্যবসায়ীদের উৎপাতে। আর এই ট্র্যাজিক জনপদের কাহিনী তাদের সেই প্রাচীন লিপি (রঙ্গোরঙ্গো লিপি, যা খুব বেশি প্রাচীন নয়, এমনকি অনেকে ধারণা করেন এর উৎপত্তি হয় ইয়োরোপীয়দের পদার্পণের পর), গুহাচিত্র (গুহাচিত্রের কথা জানা যায় না, ঈস্টারে বরং জনপ্রিয় ছবি হচ্ছে পতিত মোয়াইয়ের ওপর আঁকা পরবর্তী পক্ষীমানব কাল্টের ছবিগুলো) আর লোকগাঁথা (এটি প্রকৃত তথ্যের আকর, নিঃসন্দেহে) ছাড়াও যে অগণিত প্রত্নতাত্ত্বিক এবং উদ্ভিদ, প্রাণী ও পরিবেশবিজ্ঞানী এই দ্বীপের রহস্যভেদে কাজ করেছেন, সেটিও উল্লেখ্য, কারণ রহস্যের একটি বড় অংশ তাঁরা ভেদ করেছেন।

শাহাদুজ্জামান বলেছেন,

লেখক জেরাড ডায়মন্ড সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বই কলাপস-এ বেশ কয়েকটি বিলুপ্ত প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কী করে তারা নিজেরা নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছে। নিজেদের সম্পদ, শক্তি ভুল পথে চালিত করে নিঃশেষ হয়ে গেছে তারা। তাঁর বইয়ে অন্যতম একটি উদাহরণ হিসেবে এসেছে ইস্টার দ্বীপ। ইতিহাসবিদ টয়েনবি যে বলেছিলেন, ‘সভ্যতাকে কেউ হত্যা করে না, সভ্যতা আত্মহত্যা করে’−এ কথার আক্ষরিক অনেক উদাহরণ হাজির করেছেন ডায়মন্ড।

এখান থেকেই জানতে পারি, তিনি কোল্যাপ্সের কথা জানেন। কিন্তু বইটি একটু কষ্ট করে পড়লে ওপরের তথ্যজনিত ভ্রান্তি আর পাঠককে পেতে হতো না।

শাহাদুজ্জামানের সাথে শুধু একমত হই শেষ অংশে এসে, যেখানে তিনি বলেছেন,

ইস্টার দ্বীপের গল্প পড়তে পড়তে আমি নিজের দেশের দিকে তাকাই, তাকাই নিজের শহরের দিকে। এই মহামান্য রাজধানীকে নজরানা দিতে সারা দেশের মানুষ এসে জড়ো হয়েছে এই ঘেরাটোপে। এ শহর আর তার ভার বইতে পারছে না। শুনি শহরের পানির স্তর নেমে গেছে মরু অঞ্চলের মতো, নিঃশেষ হয়ে গেছে শহরকে আলোকিত করার ক্ষমতা, রাতে অন্ধকারে হাঁসফাঁস করে পুরো জনপদ, দিনে গাড়ি, মানুষ একে অপরের গায়ে লেপ্টে স্থবির হয়ে বসে থাকে পথে। আমরা কি ক্রমেই একটা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছি? ইস্টার দ্বীপবাসীর মতো কোনো মূর্তিও তো বানিয়ে রাখলাম না, যারা আমাদের ধ্বংসের সাক্ষী হয়ে থাকতে পারে?

কোল্যাপ্সের ওপর ভিত্তি করে ঈস্টার নিয়ে একটি সিরিজ লিখেছিলাম সচলে, লিঙ্ক দিয়ে যাই আগ্রহী পাঠকের জন্য, যদিও সেই সিরিজটি কোন কারণে তেমন পাঠকপ্রিয়তা পায়নি। আর এ অনুভব করে অস্বস্তি বোধ করছি, সুলেখকরা বইয়ের নাম উদ্ধৃত করেন, কিন্তু তা পড়ে দেখেন না।


[]

1 comment:

  1. রাজীব রহমান07 August, 2010

    শেষ লাইনের সাথে আমিও একমত... কখনো কখনো তো দেখি এইকাজ ভাল শিক্ষকরাও করে আমাদের দেশে...

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।