Sunday, April 19, 2009

উকিলের ঘরে কুকিল

১.
বৃষ্টিবাদলার দিন। সারাদিন কখনো টিপটিপ, কখনো ঝরঝর, কখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। দুলাল ঘ্যাঙাচ্ছিলো পরোটা দিয়ে গরুর মাংস খাওয়ার জন্য। সাথে কাঁচা পেঁয়াজ। একটু আচার।

টেনে থাবড়া মারতে ইচ্ছা করছিলো, কিন্তু জিভের জল সংবরণের পাশাপাশি সেই জলে রাগটাকেও চুবিয়ে মারি। আর দৈব বিপাকে মোবাইলটাও ঝনঝন করে বেজে ওঠে অ্যাসিস্টেন্ট হেডমিস্ট্রেসের ধমকের মতো।

ফোন তুলে চৌধুরীর হাসি হাসি গলা শুনি। "চলে আসুন।" বলেন তিনি। "আজ সারাদিন বৃষ্টিবাদল। গরম কিছু খাওয়া দরকার।"

বাইরে উঁকি দিয়ে আকাশের আমার মতো কালোপানা মুখটা দেখি। "হ্যাঁ, মানে ... বৃষ্টি তো ...।"

"পরোটা আর গরুর গোস্ত ভুনা কেমন চলবে? গুর্দাফ্যাপসাকলিজা সহ?"

একটু পর দেখি রিকশায় আমি বিরসমুখে বসে, পাশে দুলালের বিকশিত খান চল্লিশেক দাঁত।

অচিরেই আমরা চৌধুরীর বাড়ির সামনে অবতরণ করি। ছাতা গুটিয়ে রিকশা ভাড়া দিয়ে কয়েক তালা সিঁড়ি ভেঙে চৌধুরীর ঘরে শুধু কলিংবেলটা টিপেছি ... এমন সময় চারদিক অন্ধকার করে লোডশেডিং শুরু হলো।

চৌধুরী দরজা খুললেন একটু বাদে, বৈদ্যুতিক বাতি হাতে। মুখচোখ হাসি হাসি।

"আপনারা যে অপয়া তা মাঝে মাঝেই মনে হয়।" অমায়িক ভঙ্গিতে বললেন তিনি। "যখনই আসেন একটা না একটা দৈব গোলযোগ ঘটে। ভাগ্যিস সকালে উঠে আপনাদের দেখতে হয় না!"

মাথায় রক্ত চড়ে গেলো। "আপনিই না ফোন করে ...।"

"হ্যাঁ। আরে ওসব পয়া অপয়ায় বিশ্বাস করলে চলে?" হাসেন তিনি খিলখিল করে।

রাগটা একটু পড়ে আসতেই তিনি আবার শুরু করেন। "তবে রিগ্রেশন অ্যানালাইসিস বোঝেন তো? ধরুন, এমন যদি হয়, আপনাদের উপস্থিতি আর দৈব গোলযোগের ঘটন, দু'টা সবসময় একসাথে ঘটে, তাহলে আবার ... হেঁ হেঁ হেঁ ...।"

দুলালের চামড়া মোটা দেখে সে এসব কানেই তোলে না, উৎফুল্ল গলায় বলে, "একটু চা খাই কী কন?"

চৌধুরী উদার ভঙ্গিতে বাতিটা দুলালের হাতে ধরিয়ে দেন। "সবই তো চেনেন? রান্নাঘর, কাবার্ড, দুধের কৌটা, চাপাতার কৌটা, চিনির কৌটা, এলাচের কৌটা ... শুধু বাতি ফেলে দেখে নেবেন আর বানাবেন। তিন কাপ।"

বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা না করে চৌধুরী কাটাকুটিতে মনোনিবেশের বুদ্ধি দেন চায়ের কাপ তুলে নিয়ে।

"পেঁয়াজ কাটুন। একেবারে সরু মিহি মসলিন কুচি। একেবারে স্বচ্ছ করে ফেলুন পেঁয়াজের ফালিগুলোকে। মন দিয়ে, গতর খাটিয়ে কাটুন।" আমাকেই বেশি স্নেহ করেন চৌধুরী। "আর দুলাল, আপনি গোস্ত কাটুন। ছোট ছোট টুকরো করবেন। লুডুর ছক্কার সাইজের। তাহলে মশলা গিয়ে ঠিকমতো ঠুকবে।"

"আপনি পরোটা বানাবেন?" আমার মুখ ফসকে প্রশ্ন বেরিয়ে যায়।

"আপনাদের মতো দু'জন কর্মঠ ইয়ংম্যান থাকতে আবার আমি কেন ... হেঁ হেঁ হেঁ ...।" চৌধুরী আরাম করে বসেন একটা টুলের ওপর।

আমি পেঁয়াজ নিয়ে ছুলতে থাকি চুপচাপ।

চৌধুরী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেন, "আজ আবহাওয়াটা খুব নস্টালজিক, বুঝলেন? একটা ভুতুড়ে ভাবসাব আছে। এই যে স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার চারদিক, এমনটা হলেই আমার মনে পড়ে যায় আমার বন্ধু আহাম্মদ আলি আকন্দ আর আরাফাত হাবিবের কথা ...।"

২.
আমি আর দুলাল খাটতে খাটতেই চৌধুরীর গল্প শুনতে থাকি চুপচাপ।

জানতে পারি, চৌধুরীর নাকি মধ্যযৌবনে দুই বন্ধু ছিলো। চৌধুরীর এখনকার বয়েস আন্দাজ করতে গেলে বলতে হয়, সে বহু আগের কথা। যা-ই হোক, তাদের নাম ছিলো যথাক্রমে আহাম্মদ আলি আকন্দ ও আরাফাত হাবিব।

আহাম্মদ আলি আকন্দ ছিলো দুঁদে সাংবাদিক, দেশের প্রথম পাঁচজন টেলিপ্রিন্টার ব্যবহার করা সাংবাদিকদের একজন, তাবড় তাবড় লোকজন তার ভয়ে থরহরিকম্প হয়ে থাকতো। আহাম্মদ আলি আকন্দ পত্রিকায় কারো নামে প্রতিবেদন ঠুকে দিলে তার আর রেহাই ছিলো না। ভীষণ কড়া ছিলো তার লেখনী, ধারে আর ভারে একেবারে হাড়েহাড়ে কাটতো। এমন কোন বদলোক এলাকায় ছিলো না যে আহাম্মদ আলি আকন্দকে সমঝে না চলতো। বিদেশী এক বেয়াদব টেলিফোনকোম্পানীকে তো আহাম্মদ আলি আকন্দ বলতে গেলেই একাই লড়ে দেশছাড়া করেছিলো। এমনই ভয় পেয়েছিলো সেই দুইনাম্বারের দল, যে পাশে ভারত বা বার্মাতেও ব্যবসা খুলতে সাহস পায়নি, এমনই তেজ আর তান্ডব ছিলো আকন্দের কলমে।

ওদিকে আরাফাত হাবিব ছিলো দুঁদে উকিল। অল্প বয়সেই মারাত্মক ছিলো তার পসার। মফস্বলের সেই শহরে কোন বেসামাল মোকদ্দমায় ফাঁসার আরেক অর্থ ছিলো আরাফাত হাবিবের শরণাপন্ন হওয়া। বাঘা বাঘা হাকিমরাও আরাফাত হাবিবের সামনে কেঁচো হয়ে কুঁকড়েমুকড়ে থাকতো। বদলোকের বদকাজের ভরসাই ছিলো আরাফাত হাবিব। দিনেদুপুরে শ'খানেক লোকের সামনে খুন করার পরেও কেবল আরাফাত হাবিবকে উকিল ধরে বেকসুর খালাস পেয়ে গেছে, এমন লোক খুঁজলে এখনও জীবিত পাওয়া যাবে প্রচুর। ওদিকে নিরীহ স্কুলমাস্টারকে ব্যাঙ্ক ডাকাতির অভিযোগে বারো বছর ঘানি টানানোও ছিলো আরাফাত হাবিবের জন্যে ছেলেখেলা, স্থানীয় স্কুলের মাস্টাররা সর্বদাই তাই তটস্থ হয়ে থাকতেন।

দু'জনে ছিলো ছেলেবেলার বন্ধু। একই স্কুলে একই কলেজে লেখাপড়া, একই মেয়ের সাথে প্রেম করতে গিয়ে ছ্যাঁকা খাওয়া দুই হরিহরাত্মা ছিলো তারা। একই শুঁড়িখানায় একই বোতলের মদ দুই গেলাসে ঢেলে তারা বহুবার খেয়েছে। দু'জনেই দেখতে ছিলো ভিলেনের মতো। আহাম্মদ আলি আকন্দের কপালে ছিলো এক নিদারুণ আঁচিল, আর আরাফাত হাবিবের ছিলো রোমশ জোড়া ভুরু।

এহেন বদলোকের সাথে চৌধুরীর বন্ধুত্ব নিয়ে কিছু বলতে যাবো, কিন্তু থেমে গিয়ে পেঁয়াজ কুচাতে থাকি। বিচিত্র কিছু তো নয়!

দু'জনেরই সমস্যা ছিলো এক। সুন্দরী মেয়ে বা মহিলা দেখলেই তাদের নানা কুমতলব মাথাচাঁড়া দিতো। আহাম্মদ আলি আকন্দ মাঝে মাঝে উঠতি নায়িকাদের বাড়িতে অসময়ে বেনামী ফোন দিয়ে খোশগল্পের চেষ্টা করতো, মিটিংফাংশনে পরিচয় লুকিয়ে চিঠিচিরকুট পাঠাতো। আর আরাফাত হাবিব চেষ্টা করতো নিত্যনতুন স্যুটকোটটাই পড়ে সুন্দরী মেয়েদের সাথে গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে। বড় দুইদিস্তার একখানা অ্যালবাম সে প্রায় বোঝাই করে এনেছিলো সেসব গাঘেঁষা ছবি দিয়ে।

কিন্তু যত দিন যায়, আহাম্মদ আলি আকন্দ আর আরাফাত হাবিবের পরিবার থেকে চাপ আসতে থাকে বিয়ে-থা করে সংসারী হবার জন্যে। আহাম্মদ আলি আকন্দের বাবা মরার আগে নাতির মুখ দেখে যাবার জন্যে একরকম মারাত্মক গোঁ ধরে বসেন। ওদিকে আরাফাত হাবিবের মা-ও মৃত্যুর আগে নাতনিদর্শনের এক মর্মান্তিক আব্দার ফেঁদে বসেন। পরিবারের চাপে আকন্দ ও হাবিব, দু'জনেই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। যদিও হাবিব আকন্দকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, "সন্তানকে বাৎসল্য দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে, নিবারণে চাই কঠোর আইন" শিরোনামে একটি আর্টিকেল দেশের বড় একটি দৈনিকে ঠুকে দিতে। আকন্দ রাজি হননি, যদিও তিনি হাবিবোদ্ধারের মহতী উদ্দেশ্যে "মৃত্যুর আগে নাতনিদর্শনঃ মায়েদের স্বার্থোদ্ধারের কূটকৌশল" শিরোনামে একটি আর্টিকেল প্রায় গুছিয়ে এনেছিলেন।

আকন্দ তার আঁচিল পাকিয়ে তাকিয়ে বললেন, "ভাই হেবো, এই স্ফূর্তিময় জীবনে মনে হয় একটি দাঁড়ি যোগ করাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে। চলো আর গিয়ানজাম না করে একটি সরলস্বভাবা নারীকে বিবাহ করে সংসারধর্ম পালন করি। রবি ঠাকুরের ইশটাইলে প্রচুর সন্তানাদি উৎপাদন করে মহিলাকে সংসারের ঘানিগাছ ঠেলতে দিয়ে বছর পাঁচেক পর নাহয় আবার এই স্ফূর্তিময় জীবনে পুনর্প্রবেশ করবো। তখন আরশ কাঁপিয়ে দিবো! এমন ঝাঁকুনি লাগবে যে ঈশ্বর পড়ে গিয়ে বুড়ো হাড়ে চোট পাবেন!"

হাবিব তার জোড়া জঙ্গুলে ভুরু কুঁচকে বললেন, "দোস্ত আক্কু, এই রঙিন নেশারু রাত্রিগুলির ওপর রুলজারি করতে হবে। চলো ভোলাভালা একটি রমণীকে মুসলিম আইন অনুযায়ী শাদী করে কাবিননামা দেখিয়ে বাপমাকে আগে শান্ত করি। এক বা একাধিক সন্তানের ট্যাঁওট্যাঁও কান্না শুনিয়ে তাঁদের সংক্ষুব্ধ চিত্তে একটু ঠান্ডা পানি ঢালি। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলিকে রদ করে রাখলে অচিরেই প্রচুর সন্তানাদি উৎপন্ন হয়ে স্ত্রীকে সাংসারিক কৃত্যাদিতে ব্যস্ত করার পর নাহয় আবার শুঁড়িখানা প্রমোদালয় গরম করবো। তখন আরশ কাঁপিয়ে দেবো। এমন লাড়া লাগাবো যে ঈশ্বর সীটবেল্ট বেঁধে বসবেন!"

দুই বাল্যবন্ধু এক হপ্তার ব্যবধানে বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়লেন।

প্রথমে কবুলমন্ত্র আবৃত্তি করে উত্তেজনায় ভরপুর ব্যাচেলর জীবনের খাতা থেকে নাম কাটিয়ে নিলেন আহাম্মদ আলি আকন্দ। বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলেন আরাফাত হাবিব। বিয়ের মঞ্চে বসে তিনি আকন্দকে বললেন, "আক্কু, তুমি তো ভাগ্যবান হে! সারাজীবন বদমায়েশি করে এসে এমন পরীর মতো সুন্দরী বৌ পেলে!"

আকন্দ কিছু বললেন না। বৌ খুব বেশি পছন্দ হয়নি তার।

পরের হপ্তায় আরাফাত হাবিব মুখে রুমাল গুঁজে বরযাত্রার অগ্রভাগে চললেন। বিয়ের মঞ্চে বসে আকন্দ তার কানে কানে বললেন, "দোস্ত, তুমি তো কামাল কর দিয়া! সারাজীবন ধ্যাষ্টামো করে এসে এমন নায়িকার মতো ঝলমলে বৌ পেলে!"

হাবিব জোড়া ভুরু কুঁচকে তাকালেন কেবল, কিছু বললেন না। বৌ খুব বেশি পছন্দ হয়নি তার।

৩.
দুলাল সোৎসাহে মাংস কাটা শেষ করে বললো, "তারপর তারপর?"

চৌধুরী চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, "তারপর পরোটার লেই থেকে টুকরো টুকরো করে খাবলে নিয়ে এই বেলনটা দিয়ে গোলগাল পরোটা বেলতে থাকুন। বাংলাদেশের ম্যাপ বানালে চলবে না। পরোটা হতে হবে গোলগাল, আকন্দ আর হাবিবের বৌদের মতো।"

দুলাল থতমত খেয়ে লেইয়ের থালাটা হাতে নিয়ে বেলনকাঠ খুঁজতে লাগলো। আমি পেঁয়াজ কুচাতে লাগলাম, তারপর কী হলো আর জানতে চাইলাম না।

চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন, "কৌতূহল কম থাকলেই কি আর খাটনি থেকে রেহাই পাওয়া যায়? পেঁয়াজ কুচানো শেষ হলে রসুন আর আদা কুচিয়ে ফেলুন। একেবারে পাউডার বানিয়ে ফেলুন।"

৪.
খাটতে খাটতেই শুনতে থাকি আকন্দ আর হাবিবের জীবনকাহিনী।

সরলস্বভাবা নারী বিবাহের এরাদা থাকলেও আকন্দ আর হাবিব, উভয়েরই ললাটলিখনে অতিশয় কূটবুদ্ধিসম্পন্না দুই রমণীর বায়োডেটা ২০ সাইজের ফন্টে বোল্ড ফরম্যাটে লিখিত ছিলো।

আকন্দের স্ত্রী, যার নাম চৌধুরী ভুলে গিয়েছিলেন বলে গল্পে তাকে আক্কুনি বলে চালিয়ে দিতে চাইলেন, ছিলেন চলিত অর্থে রূপসী ও খরবুদ্ধিসম্পন্না। হাবিবের স্ত্রী, যার নাম বিস্মৃত হয়েছেন বলে চৌধুরী তাকে হেবোনি বলে উল্লেখ করতে চাইলেন, তিনিও ছিলেন অনুরূপ রূপবতী ও বুদ্ধিমতী। আকন্দ অনুভব করলেন, তার স্ত্রী আক্কুনির জিহ্বা তার কলমের চেয়ে কোন অংশে কম তীক্ষ্ণ নয়, সেটিও ভারে-ধারে প্রতিপক্ষকে একেবারে ফর্দাফাই করে ছাড়ে। ওদিকে হাবিব দেখলেন, জীবনের এই মামলায় তিনি একেবারে সানডেমানডে কোলোজ করে হারছেন, তার বৌ হেবোনির উকিলি বুদ্ধি তারচেয়ে বহুগুণে শাণিত, পদে পদে নানা আবছা কালাকানুনের প্যাঁচ মেরে মেরে তিনি হাবিবকে পর্যুদস্ত করে ছাড়ছেন।

আকন্দ আর হাবিব পরস্পরের জানি দোস্ত হলেও তাদের স্ত্রীদের মধ্যে কোন সখ্যতা গড়ে উঠলো না। আক্কুনি প্রায়শই আকন্দকে হাবিবের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতে লাগলেন, এবং হেবোনির নানা ত্রুটি ফলাও করে ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। এসব আলোচনা শয্যায় হতো বলে বেশিরভাগ সময় আকন্দকে আক্কুনির বক্তব্যে সম্মতিজ্ঞাপন করে উত্তমজাঝাবাদ জানাতে হতো, অন্যথায় আক্কুনি প্যারাসিটামলঘাতী, জিত্যাসপিরিন এক অচিন্ত্যনীয় অসহনীয় মাথাব্যথায় আক্রান্ত হতেন। ওদিকে হেবোনির আচরণও কিছুটা আক্কুনির কার্যক্রমেরই কার্বনকপি হিসেবে বিবেচনার যোগ্য ছিলো, তিনিও বছরের যেসব ঋতুতে শয্যায় একটু ঘনীভূত হয়ে শয়নের তাগিদ জোরদার হয়, সেসব ঋতুতে হাবিবকে তার বন্ধু আকন্দের নানা দোষ সম্পর্কে আলোকিত করতেন, আর আক্কুনির সাথে যে কলতলায় সমবেত গাগরীভারাবনতা মুখরা মাগীদের কোন পার্থক্য নেই, সে ব্যাপারে বিশদ যুক্তিবিস্তারে সচেষ্ট থাকতেন। ঐকমত্যে না পৌঁছালে তিনি হাবিবকে শয্যাত্যাগ করে মেঝেতে শুতে বাধ্য করতেন।

ফলে বছরখানেক অতিক্রান্ত হবার পর দুই বন্ধুর দোস্তি শীতল ও শিথিল হয়ে এলো। তারা আর বিবাহিত জীবনের শুরুতে যেমন মাঝে মাঝে বৌদের খরচক্ষু ফাঁকি দিয়ে শুঁড়িখানায় কয়েক পাত্র মেরে আসতেন, তেমন প্রীতিসাক্ষাতে মিলিত হতে পারতেন না। কদাচিৎ আকন্দ অফিসের পর একটি আধপাঁইটের বোতল চটের ব্যাগবন্দী করে সন্তর্পণে হাবিবের চেম্বারে ঢুকতেন, কিংবা হাবিব লাঞ্চব্রেকে আকন্দের অফিসে একটি শিশুতোষ আকৃতির মদের বোতল নিয়ে বন্ধুসাক্ষাতে আসতেন।

আক্কুনি আর হেবোনি কোন দাওয়াত-ফাংশন-সম্মেলনে মুখোমুখি হলে পরস্পরকে অতিশীতল ভঙ্গিতে গ্রহণ করতেন। দু'জনেই সম্ভাব্য সকলরকম প্রকাশ্য অলঙ্কারে ভূষিত হয়ে অপরকে হিংসায় জর্জরিত করার চেষ্টা করতেন, জনান্তিকে নানা তির্যক মন্তব্য করে প্রতিপক্ষকে খাটো করার চেষ্টা করতেন। তবে বড় কোন পারমাণবিক হলোকস্ট তারা ঘটাননি, বা ঘটাতে পারেননি।

দিন এভাবেই যাচ্ছিলো। কিন্তু দুলালের পরোটা বেলার উৎসাহে ভাঁটা পড়ায়, আর আমার আদারসুন কুচিয়ে চূর্ণীকরণ মোটামুটি সমাপ্তি পাওয়ায় চৌধুরী দিনের গতিতে রাশ টেনে কাঁচামরিচ ধরিয়ে দিলেন গোটাবিশেক।

"লম্বালম্বি ফাড়ুন। ব্যাঙ কাটার মতো শুধু মাঝে পুঁচিয়ে রেখে দেবেন না। একেবারে দুইভাগে ভাগ করে ফেলুন উত্তর আর দক্ষিণ কোরিয়ার মতো।"

দুলাল বেলন রেখে একটু জিরোচ্ছিলো, চৌধুরী তাকে মিষ্টি হেসে বললেন, "হাঁপিয়ে গেছেন? মেয়েদের পরোটা বেলতে দেখেননি বোধহয়? আমাদের মাখালারা তো শ'খানেক পরোটা বেলতেন। অবশ্য আপনারা পেলব শহুরে নওজোয়ান, বড়সড় একটা রজনীগন্ধার ডাঁট বাগিয়ে একটা বাড়ি দিলে মূর্ছা যাবেন ...।"

দুলাল আবার ঘ্যাঁচাঘ্যাঁচ পরোটা বেলতে বেলতে বললো, "তারপর?"

তারপর একদিন ঘটলো এক কিমাশ্চর্যম। হাবিব আকন্দের অফিসে একটি প্রমাণ আকন্দোচিত কলেবরের বোতল নিয়ে এসে হাজির।

"দোস্ত আক্কু!" উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন হাবিব। "আসো সেলিব্রেট করি!"

আকন্দ চোখ থেকে চশমা খুলে বললেন, "কিভাবে মরলো?"

হাবিব থতমত খেয়ে বললেন. "কে মরবে?"

আকন্দ সামলে নিয়ে বললেন, "না ... মানে, ঐ আর কি ... তা সুখবরটা কী?"

হাবিব বললেন, "বাচ্চা হবে দোস্ত! অবশেষে পরওয়ারদিগার কেশছেদন বাদ দিয়ে একখানা কাজের কাজ সম্পন্ন করেছেন! বৌ সামনে কয়েকটা বছর বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে! একটু শান্তির মুখ দেখতে পাবো!"

আকন্দের মনে আনুষঙ্গিক আপদের ভাবনা এলেও এই শুভলগ্নে তিনি আর খোঁচ ধরলেন না, বড় দুইখানা গেলাস বার করলেন আলমারি থেকে।

পরের হপ্তায় আকন্দ হাবিবের চেম্বারে একটি হাবিবসম্ভব আকারের দারুর বোতল নিয়ে তশরিফ রাখলেন।

হাবিব ফাইল থেকে চোখ তুলে বললেন, "কত ধারায় ফাঁসাতে হবে?"

আকন্দ থতমত খেয়ে বললেন, "কাকে ফাঁসাতে চাও?"

হাবিব সামলে নিয়ে বললেন, "না ... মানে, ভাবছিলাম আর কি ... তা ঘটনা কী?"

আকন্দ উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন, "বাপ হতে যাচ্ছি দোস্ত! সামনে কয়েকটা বছর বৌ বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, আমাকে জ্বালানোর ফুরসতই পাবে না! আজ ফির জিনেকি তামান্না হায় ... ও ও ও ও ও ও ...!"

হাবিব ভাবলেন, আকন্দকে বুঝিয়ে বলবেন, যে সামনের ক'টা দিন গর্ভবতী বৌ আকন্দের জীবন আরো কড়া আঁচে ডুবো তেলে ভাজবে, বাচ্চা হবার পর তো কড়াই থেকে সোজা উনুনে ... কিন্তু সাতপাঁচ ভেবে সামলে নিয়ে তিনি ড্রয়ার থেকে দু'টো বড় গেলাস বার করলেন।

৫.
কড়াইয়ে তেল ছেড়ে দিয়ে চৌধুরী পরোটার আকার নিয়ে দুলালের সাথে তর্ক করতে লাগলেন।

"আপনার এই পরোটাটি মোটেও ভদ্রজনোচিত হয়নি। সজারুর মতো হয়েছে।" একটা পরোটা তিনি বাতিল করে দিলেন। আরেকটা দেখে পাসমার্ক দিলেন এই বলে, "এটা কিছুটা ঠিকাছে, গর্ভবতী অবস্থায় হেবোনির মতোই লাগছে দেখতে।" আরেকটাকে তিনি গ্রেসমার্ক দিয়ে ছাড়পত্র দিলেন, "এটা যদিও আকন্দের আলমারিতে রাখা মালের বোতলের মতো হয়েছে দেখতে, তবে খেতে খারাপ লাগবে না।" এভাবে বাকিগুলো যথাক্রমে পাস বা ফেল করে ভাজার থালায় পড়লো বা বেলনকাঠের সংশোধনাগারে চড়লো।

আমার কাজ শেষ, তাই বললাম, "তারপর কী হলো?"

চৌধুরী উদাস হয়ে আবার গল্প শুরু করলেন।

৬.
দিন যাচ্ছিলো। আকন্দ আর হাবিবের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছিলো, গর্ভবতী অবস্থায় তাদের স্ত্রীরা আরো হিংস্র ও পূর্বাভাষের অযোগ্য হয়ে পড়লেন। বছরখানেকের বিবাহিত জীবনে যেসব ইশারাইঙিত অনুধাবন করে প্রিয়েমটিভ স্ট্রাইকের কলাকৌশল আকন্দ আর হাবিব শিখেছিলেন, তা সবই জলে বিসর্জিত হলো। দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা আক্কুনি ও হেবোনি নানা অনুযোগ, অভিযোগ, আর্তনাদ ও আব্দারে তাদের দু'জনকে ব্যতিব্যস্ত করে ছাড়লেন। আকন্দ যেচে পড়ে হাবিবের নামে গালমন্দ করে এবং হেবোনির রুচিবোধের নিন্দাবাদ করে আক্কুনিকে বশ করার চেষ্টা করলেন, আক্কুনি তাতে একরাতের মতো সন্তুষ্টিবাচক নীরবতা পালন করলেও পরদিন আবার অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। হাবিবও আকন্দের অজান্তে স্বাধীনভাবে বন্ধুগীবতের পথটি আবিষ্কার করে কিছুদূর তাতে হেঁটে একরাতের মতো স্বস্তি পেলেন, কিন্তু হেবোনি পরদিন ভোরেই আবার লেলিহান শিখা বাগিয়ে তেড়ে এলেন। আকন্দ অফিসে প্যাটারনিটি লিভ দাবি করে বিফল হয়ে পত্রিকায় এ নিয়ে জোর লেখালেখি শুরু করলেন, অন্তত পাঁচমাসের প্যাটারনিটি লিভ যে প্রতিটি পিতৃত্বলব্ধ পুরুষের অবশ্যপ্রাপ্য, তা নিয়ে অনলবর্ষী সব আর্টিকেল লিখে চললেন। ওদিকে হাবিব স্থানীয় বদলোকদের হাতেপায়ে ধরে তাদের পাঁচটা মাসের জন্যে পেজোমি একটু থামাতে অনুরোধ জানিয়ে বিফল হয়ে আদালতে ঘুরঘুর করতে লাগলেন মোকদ্দমার তারিখগুলো একটু গ্যাপ দিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে। স্থানীয় স্কুলের মাস্টাররা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

সন্তানপ্রসবের মাস দু'য়েক আগে আক্কুনি আর হেবোনি তাদের পিত্রালয়ে যাত্রা করলেন। বৌদের বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসে আকন্দ আর হাবিব বিবাহের পর প্রথমবারের মতো ভোর পর্যন্ত স্থানীয় গোপন মদের আড্ডায় একেবারে চুরচুর হয়ে মাল টেনে বাড়ি ফিরলেন।

তারপর একদিন আকন্দ শ্বশুরবাড়ি থেকে খবর পেলেন, তার একটি কন্যা জন্মেছে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাবিবকে ফোনে এ সংবাদ জানাতে গিয়ে তিনি শুনলেন, হাবিব একটি পুত্রের জনক হয়েছেন।

শ্বশুরবাড়িতে ছুটে গিয়ে সদ্যোজাত কন্যাকে পরম স্নেহে কোলে তুলে নিয়ে আকন্দ একটু থতমত খেলেন। দিব্যি ওঁয়া ওঁয়া করছে মেয়েটি, হাত পা চোখ নাক কান সবই ঠিকাছে, মায়ের মতোই ফর্সা হয়েছে সে, কিন্তু কী একটা হিসাব যেন মিলছে না!

হাবিবও শ্বশুরবাড়িতে ছেলেকে কোলে নিয়ে চমকে উঠলেন। সদ্যপ্রসূত ছোকরাটি হাত পা নাড়ছে, তার চোখ নাক কান সবই ঠিকাছে, কিন্তু কোথায় যেন হিসাবে গরমিল রয়ে গেছে!

পরদিন শ্বশুরবাড়ি থেকে গাড়ি চালিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ আকন্দের মাথাটা দপদপ করে উঠলো। তিনি অ্যাকসিলারেটরে পা দাবিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে চললেন হাবিবের বাড়ির দিকে। যখন পৌঁছলেন, তখন সন্ধ্যে হবো হবো করছে। হাবিবের বাড়িতে তখনও অন্ধকার। লোকজন সব হাবিবের শ্বশুরবাড়িতে।

হাবিব বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন বন্ধুকে। "দোস্ত আক্কু, কংগ্রাচুলেশনস!"

উত্তরে আকন্দ একটা লোহার রড বাগিয়ে হাবিবের মাথার একেবারে মাঝখানে, জোড়াভুরুর মধ্যিখানে কষে একটা অন্তিম বাড়ি বসিয়ে দিলেন। সেই জোড়াভুরু, যা তার মেয়ের কপালেও শোভা পাচ্ছে!

৭.
দুলাল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, "জোড়াভুরু আছে তো কী হইছে?"

চৌধুরী বঙ্কিম চোখে দুলালের দিকে তাকিয়ে কড়াইয়ের ভাজা পেঁয়াজের ওপর মাংস ঢাললেন। "বিশেষ কিছু হয়নি। বদলোকের মন তো ... কখন কু-ডাক দেয়, বলা মুশকিল!"

আমি বললাম, "তারপর?"

৮.

আকন্দ সেই লোহার রড দিয়ে চ্যাঙাব্যাঙা করে পেটালেন হাবিবকে। তার রাগ যখন পড়ে এলো, তখন দেখলেন, হাবিব আর বেঁচে নেই।

আকন্দ পাকা লোক, তিনি হাবিবের লাশখানা হাবিবেরই বাড়ির পাশের বাগানে পুঁতে ফেললেন। গাড়িতে একটা বেলচা ছিলো, সেটা দিয়ে অতিদ্রুত বাগানের নরম মাটি খুঁড়ে তিনি হাবিবকে গাপ করলেন। তারপর ফিরে চললেন নিজের বাড়ির দিকে।

বাড়ির কাছাকাছি এসে তিনি দেখলেন, বাড়িতে কোন আলো জ্বলছে না। জ্বলবে কিভাবে, লোকজন তো সবই তার শ্বশুরবাড়িতে। গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে ঢুকে তিনি থমকে গেলেন।

দেখলেন, তার বন্ধু হাবিব, যাকে তিনি একটু আগে বেধড়ক পেঁদিয়ে মেরে তারই বাগানে তালের আঁটির মতো পুঁতে রেখে এসেছেন, সে পাগলের মতো তার বাড়ির বাগানের মাটি খুঁড়ছে, পাশে পড়ে আছে একটা মৃতদেহ, সেটার নাকমুখ ঠিক আস্ত নেই, বাকি শরীরের মতো সেগুলোও থ্যাঁতলানো, কিন্তু কপালের মস্ত আঁচিলটা অক্ষত রয়েছে।

আকন্দ বিকট এক চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।

৯.
দুলাল রূদ্ধশ্বাসে বললো, "কন কী? কন কী হালায়?"

চৌধুরী বললেন, "হুঁ। হাবিবের ছেলের কপালেও আঁচিল ছিলো!"

আমি বললাম, "তারপর?"

চৌধুরী বললেন, "তারপর আর কী! আকন্দ আর হাবিব, দুইজনেই সেই মফস্বল ছেড়ে চলে গেলেন অন্যত্র!"

দুলাল বললো, "আপনে এই হিষ্টুরি জানলেন ক্যামতে?"

চৌধুরী মৃদু হেসে একটা কিছু বলতে যাবেন, এমন সময় কারেন্ট আবার ফিরে এলো। তিনি বৈদ্যুতিক বাতিখানা নিবিয়ে দিয়ে বললেন, "সবকিছু কি আর ব্যাখ্যা করা যায় দুনিয়াতে? নিন, পরোটাগুলি ভাজতে শুরু করুন।"

[সমাপ্ত। গেটলক।]


এ গল্পটি রহস্যপত্রিকার জুলাই, ২০১২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। []

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।