Wednesday, March 25, 2009

পেশীবহুল মুক্তিযোদ্ধার মিথ

ম্যুরালে, ছবিতে, বিজ্ঞাপনে প্রায়ই দেখি পেশীবহুল মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি। শিশুদের চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতায় তারা টেলিভিশনে হলিউডি বলিউডি নায়কদের আদলে আঁকে দুর্ধর্ষ চেহারার মুক্তিযোদ্ধা, যাদের বুকে মেশিনগানের গুলির বেল্ট, হাতে প্রকান্ড সব পিলে চমকানো আগ্নেয়াস্ত্র।

আজ প্রথম আলোর একটি বিজ্ঞাপনের ছবি দেখে মুখটা তেতো হয়ে গেলো।

2009_03_25_2_10_b

ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে একটি জিএসএম অপারেটরের আগডুমবাগডুম বিজ্ঞাপন। সেখানে এক মুক্তিযোদ্ধা খালিগায়ে টারজানের মতো শরীরের সম্ভব অসম্ভব সবরকম পেশী পাকিয়ে দাঁড়িয়ে, তার চেহারাটি হিন্দি সিনেমার নায়কের মতো। এই বিজ্ঞাপনচিত্রী এবং বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনসংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্তারা মনে করেন বা মনে করাতে চান, মুক্তিযোদ্ধারা এমন ছিলো। তারা ছিলো নাসের ভুলুর মতো পালোয়ান, তারা ছিলো কাপুর-খান্না-খান-বচ্চনদের মতো সুদর্শন, তারা ছিলো হাফন্যাংটা ও জ্বলজ্বলে।

বাস্তবতা কী রকম ছিলো, নিচের দু'টি ভিডিওতে আমরা চাইলে দেখে নিতে পারি। আমরা দেখতে পাই, মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরে অনাহারের ছাপ, আমরা দেখি তারা নিতান্ত সাধারণ চেহারার মানুষ, আমরা দেখি দিনের পর দিন রোদেজলে যুদ্ধ করে তাদের শ্রান্ত সজল চোখ, আমরা দেখি একটি নৃশংস গণহত্যা কিভাবে তাদের হাতে থেকে লাঙল ছিনিয়ে এক টুকরো অচেনা ইস্পাত ধরিয়ে দিয়েছে। আমরা দেখি সেইসব জীর্ণশীর্ণ কিশোর তরুণ প্রৌঢ় লুঙ্গি মালকোঁচা দিয়ে বসে আছে প্রশিক্ষকের সামনে। আমরা যা দেখি না, তা হচ্ছে অবচেতনে তাদের ভাবনা-স্বপ্নটুকু তারা যুদ্ধে যাবে, যুদ্ধে জিতবে, জিতে ফিরবে নিজের আঙিনাটুকুতে, নিজের স্ত্রীসন্তানপরিজনকে নিয়ে সন্ধ্যায় টেমির আলোতে বসে একটু ভাত খাবে একটু তরকারি দিয়ে। কারো কারো সেই স্বপ্ন সফল হয় তাদের অনুপস্থিতিতে। কেউ কেউ উপস্থিত থাকলেও আঙিনা মেলে না, পরিজনেরা মেলে না, কিংবা মেলে না ভাত আর তরকারি। আমরা কোন হিন্দিসিনেমামুখো মাসলম্যান দেখতে পাই না মুক্তিযোদ্ধাদের ভিড়ে।












কোন বোধসম্পন্ন মানুষ কি নেই এসব বিজ্ঞাপন ইস্যুর পেছনে? তারা কি অনুভব করে না, এই বিজ্ঞাপন মুক্তিযোদ্ধাকে মহিমা এনে দেয় না, তাকে কেবল সিনেমার নায়ক বানাতে চায়? মুক্তিযোদ্ধার শরীরের অবাস্তব গোস্তের আধিক্যটুকু না দেখালে কি হাজার হাজার সেইসব স্বপ্নবান মানুষের ছবি দেখানো যায় না নতুন প্রজন্মের মানুষকে? পেশীর জয়গানই যদি গাইতে হয়, থিম হিসেবে ডাব্লিউ ডাব্লিউ এফকে বেছে বিজ্ঞাপন তৈরি হোক।

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বিরক্তি প্রকাশ করছি এই বিশেষ বিজ্ঞাপনটির সাথে জড়িত অসংবেদনশীল লোকগুলির জন্য। আহাম্মকির সীমা তারা ঠেলতে ঠেলতে নতুন দিগন্তে নিয়ে গেছে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।