Sunday, March 22, 2009

পারফেক্ট স্ট্রেইঞ্জার্স

আমি ইংরেজি আর হিন্দি ভাষা শিখেছি টিভির কাছে। বলা যেতে পারে, ভাষা দুটোর প্রাণবন্ত অংশ শেখা হয়েছে ওভাবে। অনেক কিছু না বোঝার পর্যায় থেকে আস্তে আস্তে প্রায় সবটুকু রসাস্বাদনের সক্ষমতা পাওয়া যেতে পারে টিভি থেকে, এ কথা আমি নিজের উদাহরণ থেকে বিশ্বাস করি। ট্র্যান্সলেশন, কুৎসিত গ্রামার বই ইত্যাদি হাবিজাবি আমাকে ইংরেজির কিছুই শেখাতে পারেনি, যতটা শেখাতে পেরেছে আমার শৈশব আর কৈশোরের বিটিভি আর টিনটিন।

ঐ আবছা অর্ধেক বোঝা ইংরেজির যুগেই বিটিভিতে শুরু হয় পারফেক্ট স্ট্রেইঞ্জার্স, রাত আটটার খবরের পর। বিটিভির প্রায় সবকিছুই যেহেতু "শিশুতোষ" ছিলো, ইংরেজি কোন প্রোগ্রামই দেখার বারণ ছিলো না আমাদের, পারফেক্ট স্ট্রেইঞ্জার্স দেখাও কোন বাধা ছিলো না। বিটিভিতে চমৎকার সব কমেডি শো-র তালিকায় আমি একে সবার ওপরে স্থান দেবো নির্দ্বিধায়। ডিফরেন্ট স্ট্রোকস, মর্ক অ্যান্ড মিন্ডি, স্মল ওয়ান্ডার ... সব কিছুই পারফেক্ট স্ট্রেইঞ্জার্সের কাছে এসে মলিন। [img=auto]http://tv.popcrunch.com/wp-content/uploads/2008/06/perfect-strangers.jpg[/img] ওরকম ভালো লেগেছে কেবল আর তিনটি সিটকম, ক্যারোলাইন ইন দ্য সিটি, চার্লস ইন চার্জ আর হ্যাপি ডেইজ। সিটকম ১৯৮৬ থেকে '৯৩ পর্যন্ত বেশ দাপটের সাথেই চলেছে এবিসি টেলিভিশনে, বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই এসেছে একটু গ্যাপ দিয়ে। কাহিনী এরকম, ল্যারি অ্যাপলটন আর তার অতিদূরসম্পর্কের তুতোভাই বাল্কি বার্টাকোমুস (ল্যারির ভাষায়, উই আর রিলেটেড বাই রিউমরস) এক অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। বাল্কি এসেছে মিপোস নামে ভূমধ্যসাগরের এক কাল্পনিক দ্বীপদেশে থেকে, যেখানে একটি মাত্র ফোন, একটি মাত্র সড়ক, কেবল রাজপরিবারের বাড়ির ভেতরে টয়লেট আছে, আর বাকিরা জীবিকা নির্বাহ করে ভেড়া চড়িয়ে। মিপোসে জীবন অন্যরকম, মেষপালক বাল্কিও তাই অন্যরকম। ল্যারি আর বাল্কি একজন আরেকজনের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ, ল্যারি অল্পতে নার্ভাস হয়ে পড়ে, সবকিছু খুব সিরিয়াসভাবে নেয়, আর বাল্কি কোনকিছুতেই সহজে কাবু হয় না, কেবল তার সিরিয়াসনেস এমন সব প্রসঙ্গে, যেখানে আমেরিকায় যৌথপরিবারে বেড়ে ওঠা ল্যারির প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। ল্যারির কাছে যা কিছু খুব গুরুত্বপূর্ণ আর স্পর্শকাতর, বাল্কি সেগুলোকে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়, এবং উল্টোটাও সত্যি। নিজভূমে ল্যারিও এক আগন্তুক, তার অস্থিরতা আর উদ্বেগের কারণে।

এভাবেই একের পর এক পর্ব সামনে এগোয়। দু'জনে কাজ করে একই জায়গায়, একই সমস্যায় পড়ে দু'জনে, কিন্তু সমাধানের চিন্তা করে দু'টি পরস্পর বিপরীত অবস্থান থেকে। শেষ পর্যন্ত প্রতি পর্বেই তাদের সমস্যার সমাধান হয়, ছোট ছোট মোরাল থাকে প্রত্যেক পর্বের শেষে, যেখানে ল্যারি আর বাল্কি দু'জনেই দু'জনের কাছ থেকে কিছু না কিছু শেখে। আর বাকিটা সময় কাটে দমফাটানো হাসির ওপর। চরিত্রগুলোর সংলাপ আর কাজকর্ম সূক্ষ্ম হাস্যরসের খোরাক।

হাস্যরসের মূল উপাদানই নাকি বেদনা। পারফেক্ট স্ট্রেইঞ্জার্সে এই উপাদান বার বার ঘুরে ফিরে আসে, নিরীহ ছেলেমানুষ বাল্কি যখন কোন কিছুতে হতাশ হয়, তখন একটি শিশুর চোখ দিয়ে যেন হঠাৎ কঠোর পৃথিবীটাকে দেখা যায়। ভুল প্রেমে কাতর বাল্কির কান্নাকে খুব চেনা মনে হয়, ক্রিসমাসের আগে সোফায় বসে ফেলে আসা ঘরের গল্প করতে থাকা বাল্কির চেহারায় নিজের ছায়া দেখতে পাই, বিচার ব্যবস্থার ত্রুটি নির্দেশ করে বাল্কি যখন জাজের কাছে অনুযোগ করে শুনতে পায়, "ইট হ্যাপেনস", তখন যেন ধাক্কা খেয়ে দর্শক ফিরে আসে শক্ত মাটিতে। বাল্কি একটি শিশুর চোখ যেন চশমার মতো পরিয়ে দেয় দর্শকের চোখে, যার ভেতর দিয়ে সমস্ত পৃথিবীটাই যেন ছোট্ট মিপোসের মতো হয়ে উঠতে চায়, যেখানে প্রত্যেক ক্রিসমাসে একটা কচ্ছপ সাগর থেকে সাঁতরে ফিরে আসে বাল্কির পরিবারের কাছে, যেখানে কোন ক্যামেরা নেই বলে আগুন লাগলে নিকোলাই নামের প্রখর স্মৃতিধরকে সবাই আগে রক্ষা করে, যেখানে মানুষ সবার আগে মানুষকে নিয়ে ভাবে। পারফেক্ট স্ট্রেইঞ্জার্সের সরু দাগের উঁচুমানের হাস্যরসের মূলে নিহিত যেন ঐ কাল্পনিক মিপোসের বাস্তব অস্তিত্বহীনতার বেদনাটুকুই। যাকে ঘিরে শুধু শিশু হয়ে থাকা যায়, যাকে মনে করে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলা চলে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।