Saturday, March 21, 2009

সবাই একটু একটু করে সভ্য হচ্ছে

[justify]আমরা আত্মসমালোচনা খুব ভালোবাসি। নিঃসন্দেহে এটি জরুরি, স্বাস্থ্যকর এবং কখনো কখনো জীবনরক্ষাকারী। কিন্তু জাতি হিসেবে নিজেদের সমালোচনা করতে গিয়ে অযথাই আমরা বাঙালিকে অন্যান্য অনেক জাতির চেয়ে নিচুতে নামিয়ে একটা আত্মপ্রসাদ অনুভব করি। এটি শেষবারের মতো টের পেয়েছিলাম মুজে গিমে যখন বাংলাদেশ থেকে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে কিছু প্রত্ননিদর্শন নিয়ে গিয়েছিলো ফ্রান্সে প্রদর্শনীর জন্যে। আমরা তখন দেখেছি, আমাদের সরকারের ভূমিকা কত ন্যুব্জ, কর্মকর্তাদের দশা কত বেহাল, মিডিয়া আর বোদ্ধাদের মধ্যে মতবিভাজন কত স্পষ্ট। একদল বিনা বাধায় "উন্নততর সংস্কৃতির" ফরাসীদের হাতে এসব প্রত্নসম্পদ "ধার" দিতে উদারতার পক্ষে, আরেকদল যেকোন মূল্যে তা ঠেকাতে প্রস্তুত। এই টানাটানির ফাঁকে চুরি হয় কয়েকটি নিদর্শন, যার একটিকে পরে পাওয়া যায় আস্তাকুঁড়ে। ফরাসীরা ফরাসী ভাষায় আর্তনাদ করে বমি করে দিতে চায় এসব শুনে, আমরা বাংলা ভাষায় হল্লা করি, আর ভেতরের খবর শুনি, আমাদের একজন প্রতিশ্রুতিশীল কূটনীতিক হৃদস্তম্ভনে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, আমাদের কর্তাদের ফ্রান্সে নামার পর পর ভিসা বাতিল করে ঘাড় ধরে বার করে দেয়া হয়, আরো কত কাহিনী।

দুশো বছর ইয়োরোপীয় শাসনের উষ্ণতা আমাদের গা থেকে নামেনি, যেমন বিছানা থেকে উঠে যাবার পরও স্ত্রীলোকের ওম শরীরে কিছুক্ষণ লেগে থাকে। আমরা এখনও তাদের কাজকারবার দেখে হতবাক হই, এবং নিজেদের তাদের তুলনায় ঊন মনে করি। মনে না করার কোন কারণ নেই। নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারে তারা একমত, পরস্পরের পোঁদে আঙুল দেয়ার আগে এই স্বার্থ সংরক্ষণকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেয়। আমরা উল্টোটা করি। কামলা জাতি হয়েও সাকাচৌকে ওআইসির মহাসচিব বানাতে গিয়ে চটিয়ে দিই মালয়েশিয়াকে। বদলে ঠাপ খেতে হলে খাবে গরীবগুর্বো কামলা লোকজন, নীতিনির্ধারকদের কী? বিপদ দেখলে তারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড বা সৌদি আরব গিয়ে পোঁদ পেতে বসে থাকবে।

লক্ষণীয় এটাই যে আমরা গত এক হাজার বছরে নিজেদের ছাড়া কারো পোঁদে আঙুল দিয়ে উঠতে পারিনি। সব জাতির মধ্যমাতেই পুরীষের গন্ধ আছে, তবে তা অন্য জাতির পুরীষের। আমরা ক্ষণজন্মা বাঙালি এ ব্যাপারে স্বয়ংসম্পূর্ণ, আমাদের মধ্যমাতে আমাদেরই গহীনপুরীষের বাস। ফলে ২০০৯ সালে পৃথিবীতে যেসব জাতি এগিয়ে আছে, তারা জানে, কিভাবে অন্যের পেছনে আঙুল দিয়ে নিজে একটু সামনে এগিয়ে যেতে হয়, আমরা জানি না। আমরা এমনকি নিজেদের পেছনে পর্যন্ত আঙুল দেয়ার জন্যে কিউতে অপেক্ষা করি। আর ভাবি, আমরা অসভ্য। অন্যেরা সভ্য।

আমরা ভুলে যাই যে আজ যেসব জাতি সভ্য এবং সভ্যতর হয়ে উঠছে, তারা যথেষ্ঠ বর্বরতার চর্চা করেই অদ্দূর এসেছে। তারা আমাদের চেয়ে পবিত্রতর নয়, আমাদের চেয়ে বেশি সুসংহত।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। ঘানার আশান্তি গোত্রপতি দ্বিতীয় বাদু বনসুর মুন্ডুটি ওলন্দাজরা কর্তন করে ফরমালডিহাইডে চুবিয়ে রেখে দিয়েছিলো লাইডেন যাদুঘরে। বাদু বনসুর অপরাধ ছিলো, দখলদার দুই ওলন্দাজের মুন্ডুও সে ছেদ করেছিলো। লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারে সেটি দীর্ঘদিন রক্ষিত ছিলো। খোঁজ পেয়ে ঘানা সেটা ফেরত চেয়েছে, যাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তাঁরা ফিরিয়ে দেবেন, যাতে রাজার মুন্ডুটি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে সমাহিত হয়। সূত্র বিবিসি

এমন উদাহরণ আরো আছে। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয় নয়টি উল্কিচিহ্নিত মাওরি-মস্তক ফিরিয়ে দিয়েছে নিউজিল্যান্ডে। সেগুলি কর্তন ও সংগ্রহ করেছিলো তৎকালীন ব্রিটিশ অভিযাত্রীরা। সূত্র বিবিসি

এমন উদাহরণ আরো অনেক দেয়া যাবে। তাসমানিয়ায়, পেরুতে, প্রায় প্রতিটি উপনিবেশে। অতদূরে আর পেছনে না গিয়ে আমাদের প্রফুল্ল চাকীর কথা মনে করা যায়, তাঁর মস্তকটি কেটে পার্সেল করে মহামহিম বৃটিশ রাজ তাঁর মা-কে উপহার দিয়েছিলেন।

আমরা হয়তো খুব খারাপ জাতি। কিন্তু বাকি সবাই খুব ভালো নয়। আজ যারা আমাদের নানা অপকর্ম দেখে নাক সিঁটকায়, শুধু দুটি কারণেই তাদের তা করার অধিকার আছে, হয় তারা ওসব অপকর্ম করা ছেড়ে দিয়েছে বহুদ্দিন হলো, অথবা ওসবের প্রতিবাদের সামর্থ্য পৃথিবীতে আর কারো নেই। পরিস্থিতি খারাপ হলে, কাড়াকাড়ি শুরু হলে, সকলেরই মধ্যমাই ব্যস্ত ছিলো, আছে, থাকবে।

[/justify]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।