Friday, January 30, 2009

ফার্স্ট বেঞ্চে বইতে না দিলে বাইত যামুগা

বিরোধী দলকে সংসদে স্পিকারের বাম দিকের প্রথম সারিতে সিট কম দেয়া হয়েছে। সংখ্যার আনুপাতিক হারে নাকি সেখানে সিট বন্টন করা হয়েছে। এতে বিরোধী দল নাখোশ হয়েছে, প্রতিবাদস্বরূপ বিধিসিদ্ধ, চর্চিত ওয়াকআউট করেছে।

এই খবর পড়ে অনেক স্মৃতি মাথায় ভিড় করলো। প্রাইমারী স্কুলে যখন পড়তাম, চোখের সমস্যার কারণে ফার্স্টবেঞ্চে বসতে হতো। কোন শয়তানিই করতে পারতাম না, ম্যাডামরা গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে থাকতেন আর একটু পর পর পেছনের সারির কাউকে কোন না কোন অপরাধের কারণে শাস্তি দিতেন।

পরিস্থিতির অনেক উন্নয়ন ঘটে হাই স্কুলে গিয়ে। সেখানে মাঝামাঝি বসতাম, নতুন বন্ধুদের সাথে নানারকম নবআবিষ্কৃত শয়তানি পরখ করে দেখতাম। কদাচিৎ ধরা পড়ে গেলে সাধু সাজতাম, মোটা চশমার কারণেই হোক বা ছোট্টখাট্টো ডেক্সটার-টাইপ ছিলাম বলেই হোক, স্যার-ম্যাডামরা অল্পের ওপর দিয়ে ছেড়ে দিতেন। কদাচিৎ কান মলা, বা বিভিন্ন পর্যায়ের সতর্কতা সংকেত দিয়ে ছেড়ে দেয়া হোত।

আমাদের এই সুখী স্কুলজীবনে দুর্যোগের ঘনঘটা আসে যখন ক্লাস এইটে উঠে ক্লাসে রোলনম্বর অনুযায়ী আসনবিন্যাসের ব্যবস্থা করেন আমাদের দোর্দন্ডপ্রতাপ ক্লাসশিক্ষক। স্যার মারা গেছেন অনেকদিন হলো, অনেক অম্লমধুর স্মৃতি তাঁকে নিয়ে, তখন মনে মনে অনেক অভিশাপবাক্য উচ্চারণ করলেও তাঁকে নিঃশর্তে ক্ষমা করে দিয়েছি সবকিছুর জন্য। তবে একটি ব্যত্যয় তিনিও করতেন, ক্লাসের বাম পাশে প্রথম সারির পনেরোজনকে বসানো নিয়েই তাঁর মাথাব্যথা সীমাবদ্ধ ছিলো। ক্লাসের বাকি তিরিশপঁয়তিরিশজন কে কিভাবে বসলো তা নিয়ে তাঁর তেমন আগ্রহ ছিলো না। ফলে বিভিন্ন দল উপদলে ভাগ হয়ে সেখানে চ্রম খ্রাপখ্রাপ মজা করতো বাকিরা, আমরা বিরসমুখে প্রথম সারির আসনে বসে লেখাপড়া করতাম।

যে কোন নিয়ম তৈরি করলে প্রথম দিকে তা পালনের ব্যাপারে কঠোরতা বেশি থাকে, পরে নানাকারণে তা একটু ফিকে হয়ে আসে। ফলে প্রথম পিরিয়ডটা সবাই সুবোধ ও সুশীল সেজে পার করে পরবর্তী পিরিয়ডেই যে যার মতো করে আসনবিন্যাস করে নিতাম, পরবর্তী ক্লাসের শিক্ষকরা রোলনম্বরানুগ আসনবিন্যাসের ব্যাপারে কোন আগ্রহই দেখাননি। তাই প্রথম সারি থেকে আমি চলে যেতাম তৃতীয় সারিতে, কারণ সেখানেই মূলত শয়তানি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। শেষ বেঞ্চে বসলে পড়া ধরা হয় খামাখা, তাছাড়া অযথা ড়্যানডম কিলচড় খাবার সম্ভাবনাও বেশি ছিলো। ক্লাসের পঞ্চাশজনের সবাই চিৎকার করতাম, কিন্তু অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডস্যার এসে সোজা শেষ সারির ভদ্রলোকদেরই পেটাতেন।

স্কুল শেষে কলেজে উঠে কিছুটা নিরাপদ বোধ করলাম। নটরডেমে একজন ছাত্রের জন্যে আসন নির্ধারিত থাকে চার্টার অনুযায়ী। নির্দিষ্ট সময় পর পর ছাত্রের বিভিন্ন পারফরম্যান্স বিচার করে তাকে এগিয়ে বা পিছিয়ে আনা হয়। নটরডেমে রোল কল করার কোন ঝামেলা নেই, স্যাররা রোস্ট্রাম থেকে এক নজর চোখ বুলিয়ে দেখতেন কোন আসনটি ফাঁকা, এবং সেই মোতাবেক একটি লালদাগ দিয়ে রাখতেন সেই ছাত্রের জন্য। কুইজে ডাব্বা আর বিভিন্ন ক্লাসে বাং মেরে মেরে আমি সাফল্যের সাথে পিছিয়ে যেতে সমর্থ হই, এবং একটু আধটু শয়তানি যা করতাম তা পেছন বসে নিরাপদে করতাম। আমাদের প্রিয় কালক্ষেপণক্রীড়া ছিলো, সামনে আসীন কোন অভাগার পিঠে প্রচন্ড এক চাপড় মেরে বলা, "পাস!" সে ব্যথায় বাঁকা হয়ে গেলেও তার সামনে যে আছে, তাকে তৎক্ষণাৎ সেই কিলখানি "পাস" করে দেয়া। বেশ দ্রুততার সাথে একটা কিল শেষ সারি থেকে প্রথম সারি পর্যন্ত চলে যেতো। প্রথম সারির অভাগার হাতে অপশন ছিলো, তুই পারলে স্যারকে একটা কিল মেরে আয়, স্যার তারপর ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে দেয়ালের ওপাশে বসা কেমিস্ট্রি ল্যাবের কোন ব্রাদারকে কিলিয়ে আসবেন। বিভিন্ন ফ্যাক্টর বিচার করে এই গণতান্ত্রিক চর্চাটি থেকে প্রথম সারির পোলাপাইন বিরত থাকতো। তাদের অনেকে এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। এই যে অনেকেই আমরা গুনগুন করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের ওপর অকারণে হম্বিতম্বি করেন, হ্যান করেন ত্যান করেন, কখনো কি ভেবে দেখেছি যে তারা আসলে ছাত্রাবস্থায় সহপাঠীদের ধোলাই খেয়ে খেয়েই "ছাত্র"দের ওপর এমন চটা কিনা?

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি সাফল্যের সঙ্গে ব্যাকবেঞ্চ দখলে রাখতে পেরেছি, প্রথম সারি ক্লাসের হবু স্যার আর মেয়েদের জন্য বরাদ্দ ছিলো। ক্লাসে দেরিতে এসে চুরি করে ঢুকতাম বলে সেটিই সঙ্গত ছিলো। শেষ বেঞ্চে বসে তাস খেলা, ঘুমানো, গল্পের বই পড়া, বিভিন্ন বিষয়ে বন্ধুদের সাথে জোরালো আলোচনা, সবই সম্ভব ছিলো।

এত ইতিহাস ফ্যানানোর একটিই কারণ, আমি বলতে চাইছি যে প্রথম সারিতে বসা নিয়ে আমার কোন আগ্রহ ছিলো না, এখনও নেই। আমাকে প্রথম সারিতে বসতে না দিলে আমি বাসায় চলে যাবো না।

এবং এই কারণেই আমি কখনও বিরোধীদলীয় সাংসদ হতে পারবো না।

কিন্তু বিরোধীদল এমন করেন কেন? প্রথমসারিতে বসতে না দিলে কান্দেন কেন?

কারণ, প্রথম সারিতে বসলে, ফ্লোর না দিলেও খালি গলায় অনেক কিছু অনেক জোরে বলা যায়। যেটা ক্লাসে বসে স্যারকে বলা যায় না। সাংসদদের তো আর মাইরের ভয় নাই। আর মাইর যদি দেয়ার ব্যবস্থাও থাকতো, তাহলে সেই অজুহাতে আবার ওয়াকআউট, সমস্যা কই?

বিরোধী দল তো জানে, স্পীকার ফ্লোর দেয়ার ব্যাপারে কেমন কঠোর হতে পারেন। জমিরুদ্দিন সরকারের কার্যকলাপ তো অনেকেই দেখেছেন। আর ইতিহাস তো পুনরাবৃত্তই হয়। আর যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ নয়তো বিভীষণ।

গত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ কী কী পয়েন্টে ওয়াকআউট করেছিলো, তার একটা তালিকা খুঁজছি। জানি না পাওয়া সম্ভব হবে কি না। হয়তো এবার বিরোধী দল সেই চোথা নিয়েই তৈরি। আর তা না হলে ওয়াকআউটের জন্য সম্ভাব্য কিছু পয়েন্ট তৈরি করে দিই আসেন।

1. আজকে আকাশে মেঘ ক্যা? প্রতিবাদে ওয়াকআউট।

2. আজকে এত রইদ ক্যা? প্রতিবাদে ওয়াকআউট।

3. গতকাল সোমবার ছিলো, আগামীকাল আবার বুধবার হইলো ক্যা? প্রতিবাদে ওয়াকআউট।

4. ...

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।