Friday, December 05, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৫৫

কাজের লোড ঘাড়ে চাপতে পেরেছে আমারই ফাঁকিবাজির কারণে। মাঝখানে কিছুদিন ঢিল দেবার কারণে একটু একটু করে কাজের স্তুপ জমছে মাথার ওপর, সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে আবার অকাজে তনোমনোধনোনিবেশ করেছি। শেষমেশ ব্যাপারটা দাঁড়ালো খাটো কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমানোর মতো, মাথা ঢাকতে গেলে পা বেরিয়ে যায়, আর পা ঢাকতে গেলে মাথা। সমাধান হচ্ছে কুন্ডলী পাকিয়ে শোয়া, তাই অবদমিত কাজের চাপে আমিও কুন্ডলী পাকিয়ে ছিলাম কয়েক হপ্তা।

তো যাই হোক, শেষপর্যন্ত রফা হলো, উল্ম যাবো। ধূসর গোধূলি নিখোঁজ, শোনা যায় কোন এক মাফিয়া ডনের কুড়ি ইউরো মেরে গা ঢাকা দিয়েছ সে, ডনবাবাজি এখন বার্ষিক সুদ ১০% আর সার্ভিস চার্জ ২ ইউরো, একুনে চব্বিশ ইউরোর হুলিয়া জারি করেছে গোধূলির নামে।

শুক্কুরবার ভোরবেলা আমি আর চৌধুরী ট্রেনে চেপে বসলাম। গন্তব্য উল্ম শহরটি জার্মানির দক্ষিণে, বাডেনভুয়র্টেমবুর্গ আর বায়ার্ন (বাভারিয়া) এর সীমান্ত অঞ্চলে, দানিয়ুব নদীর পাশে। উল্মে আছে দু'টি দানব, যথাক্রমে উল্মারমুয়নস্টার এবং সচল হাসিব।

রেলযাত্রার বর্ণনা দিতে কখনোই ভালো লাগে না, কিন্তু ব্যাপক ভুগতে হয়েছে। হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছো মহান। বুলেট ট্রেন সার্ভিস ইসেএ (ICE) এর টিকেট কাটতে না পেরে গরীববান্ধব রেগিওনালবান-ই আমাদের সম্বল, তাই কাসেল থেকে প্রথমে ঘন্টা দুয়েক ঝুক্কুর ঝুক্কুরের পর ফ্রাঙ্কফুর্টে নেমে মুতে আর খেয়ে চড়া হলো হাইডেলবার্গগামী আরেক রেগিওনালবানে, সেখানে মৃদু বিয়ারপানের পর ষ্টুটগার্ট, ষ্টুটগার্ট থেকে উল্ম। পাক্কা সোয়া আটঘন্টার জার্নি, ঘেডিঘুডি ব্যথা।

ভুক্তভোগীরাই জানে হাসিব ভাই কী চীজ। কিন্তু লোহার হৃদয়ের পাশাপাশি তাঁর একটি কোমল হৃদয়ও আছে, টের পেলাম তাঁর রান্না মুরগি খেয়ে। একটু টাটকা হয়ে আমার নতুন ক্যামেরা বার করলাম, যাত্রাপথে আর সেটাকে এস্তেমাল করা হয়নি ক্লান্তিজনিত নিভু নিভু মুডের কারণে। তারপর আমাদের ছোট সচলকাফেলা বেরিয়ে পড়লো উল্মের ভাইনাখটসমার্কট দেখতে।

যীশু ও যোসেফ
[center]উল্মের ভাইনাখটসমার্কটে যীশু ও জোসেফ[/center]


পরী
[center]পরীর পুতুল[/center]

উল্মের ভাইনাখটসমার্কট উল্মের বিখ্যাত ক্যাথেড্রাল, উল্মারমুয়নস্টারের গোড়াতেই বসে। আয়তন এবং আয়োজনেও সেটি কাসেলের ভাইনাখটসমার্কটগুলির তুলনায় জমজমাট। একটি কুঁড়েতে আলোকিত যীশু, মেরি আর যোসেফের মূর্তি দাঁড় করানো। বেথেলহামের সেই খোঁয়াড়ের ভাব ফুটিয়ে তোলার জন্যে সেখানে খড়ের গাদায় শুয়ে ঝিমাচ্ছে গাধা, চড়ে বেড়াচ্ছে ভেড়া। আপসোস, ছাগু ছিলো না।

রাতের উল্ম নিরিবিলি। কেপলারের সৌরঘড়ি আর উল্মারমুয়নস্টারের বিভিন্ন দিক দেখে আমরা আবার ডেরায় ফেরত গেলাম। রাতে হাসিব ভাইয়ের দক্ষিণজার্মানীখ্যাত বিরিয়ানি রান্না হবে, উল্মের অন্যান্য বিচ্ছুদের সাথেও আড্ডা হবে।

পরদিন ভোরে উঠে খেয়েদেয়ে বেরোলাম সকালের শহর দেখতে। উল্ম শহরটি অপূর্ব। পাহাড় আর এর পাদদেশে বিস্তৃত, বাড়িঘর সবই রঙিন, মানুষজনও হাসিখুশি। উত্তর হেসেনের লোকজন সব গোমড়ামুখো, ভাল্লাগেনা। দানিয়ুবের পাশে উল্মের প্রাচীর, নদীর ওপারে বাভারিয়ার শহর নয়উল্ম (নতুন উল্ম)। এই দুই নগরীর মানুষজনের সংস্কৃতিও ভাগ করে দু'দিকে ঠেলে দিয়েছে দানিয়ুব। বনাবনি নেই খুব একটা। শহরে এক চক্কর মেরে আমরা ঢুকলাম ক্যাথেড্রালে।

পুরনো বাড়ি
[center]উল্মে সবচেয়ে দামী পাড়ায় সব বাড়ি পুরনো এবং খান্দানি। ছয় থেকে সাড়ে ছয়শো বছর বয়স এক একটার। এ বাড়িতে ছয় শতাব্দী ধরে বাস করে আসছে একটি জেলে বংশের কয়েক পরিবার।[/center]

কেপলার ছিলেন এ ভবনে
[center]কেপলার ছিলেন উল্মে। ভবনের দেয়ালে লেখাঃ ইয়োহানেস কেপলার, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জন্ম ১৫৭১, মৃত্যু ১৬৩০। ১৬২৭ এ কেপলার রুডলফিনিয়ান সারণী প্রকাশ করেন।[/center]

ছয় শতাব্দী প্রাচীন বাড়ি
[center]ছয় শতাব্দী প্রাচীন বাড়ি[/center]

উল্মারমুয়নস্টার এক কথায় প্রকান্ড। ভেতরটা বিশাল তো বটেই, বাইরে থেকেও একে দেখতে গেলে ঘাড় ব্যথা হয়ে যায়। শঙ্খপাক টাওয়ারে সাতশো আটষট্টিটা ধাপ, তবে শুনতে পেলাম বরফের কারণে দ্বিতীয় স্তরটা বন্ধ, আমাদের আধাআধি উঠেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে এ যাত্রা। কী আর করা, ঢুকলাম আগে নিচটা ঘুরে দেখতে।

উল্মারমুয়নস্টারের ভেতরে
[center]ক্যাথেড্রালের ভেতরে রঙিন কাঁচে আঁকা নানা ছবি[/center]


উল্মারমুয়নস্টারের ভেতরে
[center]ক্যাথেড্রালের ভেতরে আবছায়া[/center]


উল্মারমুয়নস্টারের ভেতরে
[center]ঘুলঘুলির আলোয় উল্মারমুনস্টার[/center]


প্রার্থনা
[center]"প্রিয় ঈশ্বর,

দয়া করে আমার নাতি আলেকজান্ডারকে সাহায্য করো।

ধন্যবাদ।"

ক্যাথেড্রালের ভেতরে একটি বোর্ডে শতশত প্রার্থনার চিরকুট লেখা। তার মাঝে একটি।[/center]


উল্মারমুয়নস্টারের ভেতরে
[center]তোরণের ওপরে মূর্তি[/center]

ভেতরটা বিশাল। একটু স্পৃষ্ট হলাম প্রার্থনার বোর্ড দেখে। সেখানে চিরকুটে করে ঈশ্বরের কাছে নানা আবেদন নিবেদন রেখে গেছে লোকে। ঈশ্বরকে সব জায়গায় পাওয়া যায় না, গির্জা-মন্দির-মসজিদ-সিনাগগে গিয়ে খুঁজতে হয়, এ-ই এক গেরো। ভদ্রলোক যে কবে একটু খোলা হাওয়ায় বেরিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেবেন, ভাবি।

শিশু আর ছাত্রদের জন্যে টাওয়ারের ওপর চড়ার ফি কম। আমাদের ছাত্রপরিচয়পত্র দেখে প্রৌড়া টিকেটবিক্রয়ব্যবস্থাপিকা ছেড়ে দিলেন। সেইসাথে টাওয়ারে আদ্ধেক না উঠতে পারার জন্যে কনসেশন।

টাওয়ারের সিঁড়ি খুবই সরু, খাড়া এবং কিছুটা বিপজ্জনক। কিছুক্ষণ পরপরই ওপর থেকে কেউ না কেউ নামে, তখন মোচড়ামুচড়ি করে জায়গা করতে হয়। সিঁড়ির দেয়ালে নানারকম মাণিক্যখচিত বাক্যসম্ভার খোদিত। বাংলাদেশে প্রণয়ভারাক্রান্ত যুবকেরা যেমন বাসের সীটের পেছন থেকে শুরু করে প্রাচীন প্রত্ননিদর্শনে "খোকন + সুমি" লিখতে সর্বদা তৎপর থাকেন, জার্মানীও তার ব্যতিক্রম নয় বোধজয়, এখানেও বাসের সীটের পেছনে "আমি অমুককে ছাড়া বাঁচবো না", "তমুকের সাথে সঙ্গম করি" হরহামেশাই দেখা যায়। উল্মারমুয়নস্টারের টাওয়ারে ওঠার সিঁড়িতেও পৃথিবীর তাবৎ হরফে নানা কথাবার্তা লেখা। জার্মান, ইংরেজি, ফরাসী, স্প্যানিশ আর ইতালীয় বক্তব্যগুলি ১০০% থেকে ৫০% শনাক্ত করতে পারলাম, সিরিলিক আর গ্রীক হরফের মাথামুন্ডু বোঝার প্রশ্নই আসে না। তবে মুগ্ধ হলাম এক জায়গায় এসে, সেখানে কোন এক বেরসিক হাঁপিয়ে গিয়ে দেয়ালে লিখে রেখেছে, "ফাক ত্রেপেন।" কাঁচা বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়, "সিঁড়িকে চুদি।"

ফাক ত্রেপেন
[center]ক্যাপশন না দিলে হয় না?[/center]

ওপরে উঠে কুয়াশাঘেরা উল্ম দেখে ভাল্লাগলো। ছবি কিছু তুলেছিলাম, ভালো আসেনি। কেবল ভেতরে ট্রফি রুমের একটা ছবিই দিচ্ছি। ওখানে একটা কপিকল ঝুলছে, আগে নাকি নিচ থেকে আপেলভর্তি ঝুড়ি তোলা হতো ওটা দিয়ে। কপিকলের নিচেই একটা গোল পোর্ট, তার কাঁচে চোখ ঠেকিয়ে দেখি নিচে মেরামতের স্ক্যাফোল্ড ফিট করা। বলতে ভুলে গেছি, উল্মারমুয়নস্টারের সংস্কার কাজ চলছে। এক একটা পুরনো পাথরের টুকরো সরিয়ে সরিয়ে অবিকল সেইরকম আরেকটা টুকরো বসানো হচ্ছে, একই উপাদানে তৈরি, একই রকম নকশায়। পুরোটাই হাতে বানানো। নিচে একটা ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে, পাঁচটা পাথরের ব্লক তৈরিতে দেখলাম সময় লেগেছে ২৭০ ঘন্টা। এরকম হাজার পাঁচেক ব্লক আছে সম্ভবত সব মিলিয়ে।

উল্মারমুয়নস্টারের ওপরে ট্রফি রুমে
[center]ট্রফি রুমে[/center]

ক্যাথেড্রাল থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম উল্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। পথে পড়লো একটা ফলক, আলবার্ট আইনষ্টাইন যে বাড়িতে জন্মেছিলেন, সেখানে বাড়িটা আর নেই, ফলকটা রয়ে গেছে। দূর থেকে উল্মারমুয়নস্টারের একটা ছবি তুলে বাসে চড়ে বসলাম আমরা।

উল্ম বিশ্ববিদ্যালয়টিও শহরের মতোই রঙিন, পাহাড়ের ওপর এবং জঙ্গলের মাঝখানে। অনেকখানি জায়গা নিয়ে এক একটা ভবন, স্থাপত্যরীতি দেখে মুগ্ধ হবার মতো। আমার লেন্স সিগমা ২৮-৭০, ক্রপ ফ্যাক্টরের কল্যাণে তা ৩৫ মিমির হিসাবে ৪২-১১২তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই সেসব ছবি ঠিক জুতমতো তুলতে পারবো না বুঝে দেখায় মন দিলাম।

দূর থেকে উল্মারমুয়নস্টার
[center]দূর থেকে উল্মারমুয়নস্টার[/center]


উল্ম বিশ্ববিদ্যালয়
[center]উল্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ[/center]


লাল ফল, নীল আকাশ

লাল ফল, নীল আকাশ
[center]লাল ফল, নীল আকাশ[/center]


উল্ম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে পাহাড়ের পাকদন্ডী বেয়ে শহরে নামলো বাস। শহরের পাহাড়ি অংশটি এক কথায় অপূর্ব।

নিচে নেমে আর দেরি করলাম না আমরা। ঊর্ধ্বশ্বাসে হাসিব ভাইয়ের আস্তানায় ফিরে তাঁরই রান্না দারুণ পাঙ্গাশ মাছ গান্ডেপিন্ডে গিলে ছুট দিলাম স্টেশনের দিকে। গন্তব্য দুই ঘন্টা দূরের মুয়নশেন, যে শহরে আমাদের জন্যে সপরিবারে অপেক্ষা করছেন সচল তীরন্দাজ আর পুতুল। মুয়নশেন, জার্মানিতে আমার দেখা প্রথম শহর, স্মৃতির কারণে খুব প্রিয়। তবে তার গল্প থাকবে পরের পর্বে, সেখানে ২০০৮ এর পাশাপাশি ২০০৩ ও উঁকি দেবে মাঝে মাঝে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।