Wednesday, December 03, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৫৪

১.
কী যে অসম্ভব উদ্বিগ্ন ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে গেলো ক'টা হপ্তা! আক্ষরিক অর্থেই নাওয়াখাওয়া ভুলে কাজে ডুবে ছিলাম, হাওয়াখাওয়া তো দূরের কথা।

ক্যালেন্ডারে কাজের ডেডলাইন টুকতে টুকতে খেয়াল হলো, এক বিশাল ইয়েমারার সামনে আমি জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে। লিডল থেকে প্রচুর খাবারদাবার কিনে এনে ফ্রিজ বোঝাই করে বসলাম কাজে। তারপর ডুব।

এরপর দাড়ি কামানো হয় না, গোসল করা হয় না। কাজ-খাওয়া-হাগা-ঘুম-কাজ। অ্যাকদম ইয়ে যাকে বলে।

২.
ফ্ল্যাটমেট সৈয়দ মোটামুটি ভালো লোক বলেই মনে হয়েছে। প্যাঁচঘোঁচ নাই। সেদিন পিৎজা গরম করে খাচ্ছি, সে এসে উঁকি দিয়ে বললো, এগুলোর দাম কেমন?

সৈয়দ রান্না করতে জানে না, তাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রান্নার ওপর লেকচার দিয়ে কিছু একেবারেই সাদাসিধা খাবার তৈরি দেখিয়েছি, ওগুলোই সে ঘুরেফিরে রাঁধে, তাই ফ্রোজেন পিৎজার প্রতি একটা টান জন্মানো তার পক্ষে নেহায়েত অস্বাভাবিক নয়। আমি গম্ভীর মুখে তাকে সমস্যাটার কথা জানালাম। "এটাতে পর্ক আছে।"

সৈয়দের মুখ পুরোপুরি রক্তশূন্য হয়ে গেলো। সে তুর্কি দোকান থেকেও মাংস কিনে খায় না, কাসেলের সব পাকিস্তানী নাকি জনৈক পাকিস্তানীর নেতৃত্বে ছাগল আর মুরগি জবাই করে ছুটির দিনে, সেখান থেকে সে ড্রেসড মুরগি কিনে আনে মাঝে মাঝে।

আমি তাকে পিৎজার ওপর আরো কিছু জ্ঞান দিলাম। "তুমি খুব দেখেশুনে খেও। কারণ এরা অনেকসময় পিৎজায় ষ্পেক (শুকরের চর্বি) ছিটিয়ে দেয় স্বাদের জন্যে। প্যাকেটের লেখা মন দিয়ে পড়ে দেখবে, কী আছে কী নেই। সবচেয়ে ভালো হয় কোন তুর্কি পিৎজেরিয়াতে গিয়ে তোমার সমস্যা খুলে বলে হালাল কোনকিছু খাওয়া, সব্জি বা টুনা, এমন কিছু।"

সৈয়দ বিড়বিড় করে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলো। পরদিন সন্ধ্যায় সে ক্লাস থেকে ফিরে আরো এক দফা ধন্যবাদ জানালো, তাকে সাবধান করে দিয়েছি বলে। নাহলে সে হয়তো ভুল করে পিৎজা খেয়েই ফেলতো একদিন।

৩.
কাজে ডুবে ছিলাম সারারাত, ভোরে মনে হলো, একটু হেঁটে আসি পাশের পাহাড় থেকে। জানালার পর্দা সরিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম, অবিশ্রান্ত তুষারপাত চলছে। সামনে রাস্তায় পার্ক করে রাখা গাড়ি কমসে কম নয়ইঞ্চি পুরু তুষারে ঢেকে গেছে। বাহিরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার পর এমন স্ট্রোবোস্কোপিক ভিউ পেলে মাঝে মাঝে মন্দ লাগে না।

৪.
অবশেষে, দীর্ঘদিন প্রতীক্ষা, সংযম, মিতব্যয়, সঞ্চয় আর টিপস সংগ্রহের পর কিনলাম আমার ডিজিটাল ক্যামেরা। সবচেয়ে সস্তা, ক্যানন ইওএস ১০০০ডি। কেবল গেহয়জে কিনেছি, আগের ইএফ লেন্স ব্যবহার করছি এর সাথে। সিগমা ২৮-৭০, ৩.৫-৫.৬ সেটা। আমার পুরনো ম্যানুয়াল ১০০০এফএনটা যত্ন করে প্যাক করে রেখে দিলাম বাক্সের ভেতরে। সেটাও এমনি দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর সংযমের পর কেনা, জার্মানী থেকেই, ২০০৩ সালে। পুরনো জিনিসগুলোর ওপর যে কী অবর্ণণীয় মায়া পড়ে যায় মাঝে মাঝে! ২০০৫ এ একবার বান্দরবানে থানচি থেকে রুমা পর্যন্ত এক অদ্ভুত নৌযাত্রার সুযোগ হয়েছিলো সাঙ্গুনদী বেয়ে, সেখানে ক্যামেরাটার শাটার অয়েল লিক করে একটা কান্ড ঘটেছিলো, খুব মন খারাপ ছিলো অনেকদিন, কারণ ক্যামেরা ঠিক করার টাকা হাতে আসতে সময় লেগেছে। বহু ছবি ডেভেলপ করে রেখে দিয়েছি, প্রিন্ট করার পয়সা ছিলো না হাতে। এইসব ছোট ছোট না পারার, না ঘটার, না হবার স্মৃতিকে সেই ক্যামেরার সাথেই বাক্সে গুঁজে রাখি। ডিজিটাল ক্যামেরা এসেছে হাতে, এইবার ফাটিয়ে ফেলবো ছবি তুলে। আইতাছি খাড়া!

৫.
গেলো হপ্তায় কাজের শ্বাসরুদ্ধকর চাপ মাথায় নিয়েই বেরিয়ে পড়েছিলাম অতিষ্ঠ হয়ে, একটু বাতাসের খোঁজে। আমি আর হের চৌধুরীই কাফেলায়, বলাই মহাব্যস্ত, ধূসর গোধূলি কী এক মাফিয়াচক্রের কারবারে ফেঁসে (মনে হয় কাকে লাইড়তে গিয়ে কোন ডনের শালিকে লাইড়ে বসেছিলো ব্যাটা) বাডেনভুয়র্টেমবুর্গের এর এক শহরে আত্মগোপন করেছে। আমাদের গন্তব্য উল্ম, সেখান থেকে মুয়নশেন। দুই শহরে আমাদের জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন তিন সচল, হাসিব-তীরন্দাজ-পুতুল। সে গল্প থাকবে পরের পর্বে, যদি আয়ু থাকে ততদিন পর্যন্ত। আমার নতুন ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবি অন্যত্র আপলোড করেছি কিছু, সংশ্লিষ্ট পর্বে সচলদের জন্যেও তুলে দেবো।

৬.
ছোট্ট ঘটনা, তবু না বললে খচখচ করবে মনের মধ্যে। মুয়নশেন থেকে রাতে ফেরার পর সৈয়দ একটা বস্তা হাতে হাজির। সেটাতে অচেনা এক ধরনের বাদাম বোঝাই। সে জানালো, তার বাবাকে সে জানিয়েছে আমার বিভিন্ন সময়ে করা উপকারের কথা, তাই তার বাবা আমার জন্যে আলাদা করে পাঠিয়েছে কোয়েট্টা থেকে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভাবলাম, মুখের ওপর না করে দিই। কিন্তু বয়স্ক একজন মানুষ তার ছেলেকে সাহায্য করে, এমন একটা লোকের জন্যে আলাদা করে বাদাম প্যাক করে পাঠাচ্ছে দূর দেশে, এই ছবিটা মাথায় আসার পর চুপ করে গেলাম।

[]

2 comments:

  1. বাহ ক্যামেরা কিনছেন!!দারুণ।কত দাম নিলো??আমারও ইচ্ছা একটা DSLR কেনার।টাকা আর জমানো হয়ে ওঠে না :(

    ReplyDelete
  2. গতকাল ডিজিটাল পাসপোর্ট করাতে গেলাম, ওরা ছবি তুললো ক্যানন ই.ও.এস. ১০০০ D দিয়ে ...

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।