Sunday, December 30, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০২৫

০১.
এ বছরটা হু হু করে কেটে গেলো, চুলের ভেতর দিয়ে দমকা বাতাসের মতো। অর্ধেকটা কেটে গেলো যাত্রার ওপর, কাজের সূত্রে কমসে কম চল্লিশ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছি জুন মাস পর্যন্ত। বাংলাদেশের অনেক জায়গা দেখার বাকি রয়ে গিয়েছিলো, কাজের ঠ্যালায় দেখা হয়ে গেছে অনেকখানি। হেমন্ত, শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম, এই চার ঋতুতে ঘুরে ঘুরে দেখলাম বাংলাদেশকে। খুব, খুব ভালো লেগেছে এই সময়টুকু, যাত্রাপথের ক্লান্তি কেটে গেছে দেশদেখার মুগ্ধতায়। হয়তো জানা হতো না কখনো, ভোলার চওড়া সুন্দর হাইওয়ের দু'পাশটা এমন অরণ্যশাসিত, হয়তো কখনো দেখতাম না, কীর্তনখোলা আর সন্ধ্যা নদী কী অপূর্ব দুরন্ত, গভীর রাতে যশোর যাবার পথে রাস্তার দু'পাশে কয়েকশো বছরের পুরনো গাছগুলিকে কেমন ভুতুড়ে লাগে, কিংবা কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের ভেতরে মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু সরিষার ক্ষেত, মেঘলা দিনে নলকা-বনপাড়া হাইওয়েতে কোন এক আদিবাসী যুবক একাই তাড়িয়ে নিয়ে চলছে শ'য়ে শ'য়ে শূকর, কিংবা কিশোরগঞ্জে পথ হারিয়ে মাইলের পর মাইল জনশূন্য পথে দু'পাশে শুধু ক্ষেত আর বৃক্ষ পেছনে ফেলে ভাবা, এত মানুষ এই দেশে থাকে কোথায়? ঢাকার বিষাক্ত বাতাস থেকে দূরে বাংলাদেশ এতো সুন্দর বলেই হয়তো ঈদের ছুটিতে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শহর ছেড়ে।

বছরের বাকি অর্ধেকটা কেটেছে এই খুঁটিয়ে দেখা দেশত্যাগের প্রস্তুতি আর প্রবাসে। এক কথায় বলা যায়, দৌড়ের ওপর থাকলাম ২০০৭ এ।

এ বছরে পেলাম অল্পস্বল্প, হারালাম অনেক কিছুই (দশ কেজি ওজন সহ, কেউ বলছেন এটা আশীর্বাদ, কেউ বলছেন কসকি?)। ২০০৩ যেমন আমার জন্যে ছিলো দারুণ এক প্রাপ্তির বছর, একে একে ভরে উঠছিলো আমার পলকা সিন্দুক, ২০০৪ তেমনি আবার হারানোর বছর, সেই একই সিন্দুকে এসে একের পর এক ভর করছে শূন্যতা, অপ্রাপ্তি, ক্ষতি, বিয়োগ। আসলেই হাতে কী থাকে এক একটা বছর শেষে? যোগবিয়োগ করে আমার রুক্ষ হাতে একটা পেনসিলই রয়ে যায় শুধু।

০২.
বড়দিন উপলক্ষে বেশ বড়সড় ছুটি পেয়েছি, কিন্তু অবসন্ন লাগছে খুব। পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছি, নয়তো সিনেমা দেখছি, কাজের কাজ এগোচ্ছে না। অনেক খেটেখুটে সিস্টেমটেখনিকের একটা সিমুলেশন দাঁড় করিয়েছি এক্সেলে, এ নিয়ে একটা মৃদু সন্তোষ কাজ করছে যদিও, কিন্তু জমে থাকা পড়ার স্তুপ দেখে ভয়ই লাগছে।

ভাইনাখটেন [বড়দিন] উপলক্ষে কাসেলবাসী দোকান উজাড় করে কেনাকাটা করেছে, বাজার থেকে হাওয়া হয়ে গেছে অনেক কিছু। উদাহরণ, ডিম। শুধু তা-ই না, তার আগেই জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে বেড়ে গেছে অনেক জায়গায়। চালের দাম প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ বেড়েছে রেভে-তে, আলদিতে ডিমের দাম বেড়েছে পঁচিশ শতাংশ, ইত্যাদি ইত্যাদি। দাম বাড়ানোর ব্যাপারে এখানকার লোকজন সম্ভবত বাংলাদেশ থেকে কনসালট্যান্ট ধরে এনেছে, কোন রকম কারণ ছাড়াই হঠাৎ একদিন সকালে আপনাকে দেড়গুণ বেশি দামে কেনাকাটা করতে হবে। সাপ্লাই-ডিমান্ডের টানাহ্যাঁচড়ার কারণে নয়, এই বর্ধিতমূল্যই পোক্ত হয়ে যাবে আগামী বছরের জন্য।

কাল সিলভেস্টার, বছর শেষের দিন, গত দু'দিন ধরেই দেখছি তুর্কি ছোকরার দল সমানে এলোপাথাড়ি বাজিপটকা ফোটাচ্ছে। বছর শেষের দিন কাসেলের আয়োজন কেমন সে সম্পর্কে ধারণা নেই, ঘুরে ফিরে দেখবো। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে এসেছে বেশ কিছুদিন ধরেই, তা নিয়ে আমার আপত্তিও নেই, কিন্তু মেঘলা আকাশটা দেখলে ধরে একটা থাপ্পড় মারতে ইচ্ছা করে।

২০০৭ এর একটা গল্পই ২০০৮ এ গিয়ে বিশদ লেখার ইচ্ছে আছে, তাই আর লিখলাম না এখন।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।