Tuesday, November 25, 2008

অন্ধকারে সিগারেট

যতবারই মনে পড়ে তাঁকে, এই অন্ধকারে সিগারেটের ছবিই ভেসে ওঠে মনে। বারান্দায় নিঃশব্দে বসে, কিংবা দাঁড়িয়ে, কিংবা পায়চারি করতে করতে একের পর এক সিগারেট পুড়িয়ে যাচ্ছেন আমার বাবা। দূরের শহর থেকে ঘরে ফিরছে তাঁর কোন সন্তান, রাতের ট্রেনে, যথারীতি ট্রেন লেট। আমার বাবা কোনদিন ঘুম ভেঙে উঠে কাউকে ঘরে ঢুকতে দিয়েছেন বলে মনে পড়ে না, যত রাতই হোক, জেগে অপেক্ষা করেছেন। সেই অপেক্ষার সময়গুলিতে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছে তাঁর সিগারেট আর মশা, আর ঘাপটি মেরে পর্যবেক্ষণে ছিলাম আমি। আমার ভাই বা বোন, যে-ই ফিরুন না কেন, সঙ্গে প্রচুর বই নিয়ে ফিরবেন। তাঁদের ব্যাগ থেকে সেই সব বই বার করে, নেড়েচেড়ে গন্ধ নিয়ে তারপরই আমি ঘুমাতে যাবো, তার আগে নয়। তাই বাইরে নিঝুম শহরের নিস্তব্ধতার বুকে বিলি কেটে যখন কোন রিকশার টুংটাং শোনা যেতো, আমার বাবার পেছন পেছন ছুটে গিয়ে আমিও দরজার পাশে দাঁড়াতাম।

এখন মাঝে মাঝে বিষাদ আর আক্ষেপ নিয়ে ভাবি, সেই সময়ে উঠে কখনো তাঁকে সঙ্গ দেয়া হয়নি। ধমকের ভয়ে নয়, কোন তাগিদই অনুভব করিনি। আমি সারাজীবনে হাতে গোনা কয়েকবার ধমক খেয়েছি আমার বাবার কাছে, মার খাওয়া তো দূরের কথা। তাঁর গম্ভীর, নির্বাক পরিমিতিকেই ভীষণ সমঝে চলতাম, তিনি কোন কারণে রুষ্ট হয়ে শুধু নাম ধরে ডাক দিলে মুড়ির মতো মিইয়ে যেতাম, স্পষ্ট মনে আছে।

কিছুদিন আগে আমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী ছিলো। অনেকগুলি বছর পেরিয়ে গেছে, পিতৃবিয়োগের শোক স্তিমিত হয়ে এসেছে সময়ের ব্যস্তানুপাতে, কিন্তু পেছনে তাকালে আর ভাবলে কেবল অনুশোচনা ছাড়া আর কিছু হয় না।

অনুতপ্ত হয়ে তাই অনুভব করি, আমার বাবাকে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি, তিনি কী চেয়েছিলেন জীবনে। আমার চোখের সামনেই আমার পিতামাতা আমাদের ভাইবোনের জন্যে তাঁদের জীবনকে আক্ষরিক অর্থে বিসর্জন দিয়ে, নিংড়ে শেষ করে দিয়েছেন। আমি জানি না, আমার বাবা সেই বারান্দায় নিঃসঙ্গ রাতগুলিতে কী ভেবেছেন নিজেকে নিয়ে। হয়তো তিনি অবসরের জীবনটাকে অন্যভাবে পেতে চেয়েছিলেন, হয়তো গ্রামে পুকুরে ছিপ হাতে বসে একটা চায়ের ফ্লাস্ক আর দুই প্যাকেট সিগারেট নিয়ে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন এক একটা দিন, হয়তো মেঠো রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে দূরে কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা মারতে যেতে চেয়েছিলেন, হয়তো একদিন কাউকে না জানিয়ে চুপিচুপি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে ঘুরে আসতে চেয়েছিলেন কোন আত্মীয় বা বন্ধুর বাড়ি থেকে, ফিরে এসে জমিয়ে গল্প করার জন্যে।

জানি না। কী যে ছোট হয়ে যাই নিজের কাছে এই অজ্ঞানতার জন্যে! মনে হলো, সারাটা জীবন ধরে তাঁকে আমি, আমরা, ব্যবহার করে গেলাম। যেমন অনায়াসে শ্বাস নিই, তেমন অনায়াসেই তাঁকে পরিবেশের একটি নিত্যব্যবহার্য উপাদানের মতো চিনে নিতে শিখেছিলাম শুধু। অথচ সুযোগ ছিলো আমার অনেক। আমি শুধু বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে তাঁর পাশে বসতে পারতাম, হয়তো প্রশ্নও করতে হতো না, হয়তো তিনি নিজ থেকেই বলতেন তাঁর খুব ভেতরের স্বপ্নগুলোর কথা।

গার্সিয়া মার্কেজের একটি খুব সত্যি বাক্য আছে, মানুষ তখনই বুড়ো হয়, যখন সে দেখতে তার পিতার মতো হতে শুরু করে। আমার চেহারার সাথে আমার বাবার তেমন সাদৃশ্য নেই, তবুও নিজের ভেতরে তাঁকে হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাই, আর আতঙ্কিত হই বার্ধক্যের পদধ্বনির আশঙ্কায়। আর ইতর স্বার্থপরের মতো অনুভব করি, আমি তাঁর মতো হতে চাই না। তিনি যেমন বেঁচেছিলেন আমাদের জন্যে, তাঁর সন্তানদের জন্যে, তেমনটা আমি হতে চাই না। আমাদের জন্যে যে উৎকণ্ঠা তাঁকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত একটু একটু করে খুঁটে খেয়েছে, তার সংক্রমণ আমার কাম্য নয়। আমি আমার জীবনটা স্বার্থপরের মতো নিজের জন্যে বাঁচতে চাই। যা কিছু আমার পিতার ইন্দ্রিয়ের বাইরে রয়ে গেছে আমার পেছনে খাটতে গিয়ে, তার সবই আমি চাই।

তারপরও আমার ভেতরে তাঁর পাশ ফিরে শোয়া অনুভব করি। দূরে অতীতের অন্ধকারে আরেকটা সিগারেটের আলো জ্বলে ওঠে। রিকশার ঘন্টার পর শুনতে পাই তাঁর মন্দ্র স্বস্তিমাখা স্বর, "আসছো?"

নিজেকে ইতর ছাড়া আর কিছু মনে হয় না তখন। আরো তীব্র শূলবিদ্ধি অনুভব করি, যখন দেখি যে মৃত্যুর পরও এই ব্যক্তিকে ব্যবহার করা বন্ধ করতে পারি না, নিজের কষ্টগুলোতে চোখ শুকনো রেখে রেখে অবশেষে উপলক্ষ্য হিসেবে তাঁকে টেনে আনি। হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে হয়তো কাউকে বলি, মন ভালো নেই, অনেক বছর আগে এই দিনে আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন ...। নিজের ওপর এই ক্ষোভ আরো ঘনীভূত হয় এই ভেবে, আমার পিতা আমার কাছে অন্ধকারে সিগারেটের আগুনটুকুই হয়ে রয়ে গেলেন। তাঁর স্বপ্ন, তাঁর গভীরে লালিত সাধ, তাঁর উচ্চাশা, সবটুকুই সেই আগুনের পেছনে অবয়ব হয়ে আমার চোখে অন্ধকারে মিশে রইলো।

হে পিতা, মুক্তি দিন আপনার ছায়া থেকে। আপনার মতো সন্তানবৎসল উৎকণ্ঠাময় জীবনের উদাহরণ থেকে আমাকে মুক্তি দিন। আপনার মতো আমি চাই না স্বার্থপর সন্তানের পিতা হয়ে অন্ধকারে একাকী বসে থাকতে। আমি বরং হই আমার মতন।

[]

1 comment:

  1. Anonymous20 July, 2009

    মিয়া, দিলেন তো মনটা খারাপ কইরা......

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।