Wednesday, November 05, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৫৩

১.
অনেক কিছু লেখার জমে গেছে এ ক'দিনে, তবে সর্বশেষ ঘটনা নিয়েই বরং কথা বলি।

আমার তাজিক পড়শী বাহুদুর বিদায় নিয়েছে। লাথি মেরে দরজা ভেঙে কয়েকদিন খুব মনমরা ছিলো সে। কফি বানাচ্ছিলাম এক সকালে, আমাকে এসে তার সেই দুঃখের কাহিনী বিশদ বর্ণনা করলো। বাহুদুর জার্মান জানে না তেমন, ইংরেজি-জার্মান মিশেল একটা প্রোগ্রামে এসেছে সে, আমার সাথে বাতচিত ইংরেজিতেই হয়, এ ভাষাটা বেশ ভালোই বলে সে।

"আমার দোষ ছিলো না।" শুরুতেই সে রায় দিলো। "চিন্তা করো, আমি বাথরুম থেকে বের হয়েছি একটা জাইঙ্গা পরে, সারা গা ভিজা, টাওয়েলটা পর্যন্ত ঘরের মধ্যে, দরজা খুলতে গিয়ে দেখি দরজা আর খোলে না। তখন আমি আর কী করতে পারি?"

আমি সমবেদনা জানালাম। বললাম, যে সে ঠিক কাজটাই করেছে।

"তুমিই বলো, আমি এই শীতের রাতে আর কোথায় যাবো? আমার সারা গা ভিজা। পরনে খালি একটা জাইঙ্গা।"

আমি আবারও সমবেদনা জানালাম। শীতের রাতে ভেজা গায়ে জাঙ্গিয়া পরে যে কোথাও বের হওয়া উচিত না, এ ব্যাপারে জোর নৈতিক সমর্থন দিলাম।

"দরজা না ভাঙলে আমার ঠান্ডা লাগতে পারতো।"

আমি জানালাম, দরজা একটা গেলে আরেকটা আসবে। জীবন একটাই। সেটাকে সামলেসুমলে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

এরপর বাহুদুর উৎসাহ পেয়ে গেলো। সে ঘ্যানর ঘ্যানর করেই চললো। সে মোটেও এই ভোনহাইমে থাকতে চায় না। সে অয়রোপাহাউস নামের চমকদার ভোনহাইমে থাকার জন্যে ছয় মাসের ভাড়া আগাম শোধ করে তবে এসেছে। এই যে এখানে তাকে রাখা হয়েছে, সেটা এক প্রকারের অবিচার।

আমি জানতে চাইলাম, অয়রোপাহাউসে ঘর বরাদ্দ না করে ষ্টুডেন্টেনভেয়ার্ক কেন তাকে আমার প্রতিবেশী বানানোর হীন চক্রান্তে লিপ্ত হলো?

বাহুদুর গনগনে মুখে বললো, "আর বইলো না, ঐ রুমে আগে যেই ব্যাটা থাকতো সে যাওয়ার আগে সব ভাইঙ্গা রাইখা গেসে!"

আমার কফি মাথায় উঠতো আরেকটু হলেই। বাহুদুর ক্ষেপে গেলো। "হাসো কেন?"

আমি আবার গম্ভীর হয়ে গেলাম। যে ছোকরা লাথি মেরে এই মজবুত পার্টিকেল বোর্ডের দরজা ফ্রেম থেকে খসিয়ে দিতে পারে, তাকে না চটানোই ভালো। বললাম, "তুমি ঐদিন গোসলে গেসো, খামাকা দরজায় তালা মারসিলা ক্যান?"

বাহুদুর থতমত খেয়ে গেলো। "আমি মারবুর্গে বড় একটা ভিগি (ভোনগেমাইনশাফটের সংক্ষিপ্ত রূপ, মানে কয়েকজন মিলে একত্রে এক অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস)-তে ছিলাম, বুঝছো, ঐখানে আমাদের বলে দিসিলো দরজায় তালা না মাইরা কোথাও না যাইতে। আমার অভ্যাস হয়ে গেসে।"

তবে বাহুদুরের কপাল ভালো, অয়রোপাহাউসের পূর্বতন শক্তিমানের কীর্তি কর্তৃপক্ষ মেরামত করেছে শিগগীরই। চাড্ডিগাঁটরি গুটিয়ে সে ভাগলো। কয়েকদিন পর ট্রামে তার সাথে দেখা, বিশালদেহী এক মধ্যএশীয় মেয়ের সাথে। বললাম, তোমার নতুন ভোনহাইমের তালাগুলি ঠিকাছে তো? সে দেখলাম আবার গম্ভীর হয়ে গেলো।

২.
কয়েকদিন তারপর একাই অ্যাপার্টমেন্টে বাস করছি। একা থাকলে যা হয়, কোন কিছু পরিষ্কার করার তাড়া থাকে না সহজে। আমি প্রকৃত অলস, ফলে বাসনকোসন ডাঁই হয়ে যায়, মেঝেতে হালকা ধূলো জমে।

একদিন সারারাত কী যেন বালছাল কাজে ব্যয় করে সকালে ঘুমাতে গিয়েছি, দুপুরে কলিং বেল বেজে উঠলো। উঠে গিয়ে রান্নাঘরের জানালা খুলে নিচে তাকিয়ে যা দেখলাম তাতে মাথায় বাজ পড়লো।

কাসেলে পাকিস্তানী কিছু ছাত্র আছে, যাদের নানা কারণে এড়িয়ে চলি, তাদেরই একজন এক নতুনমুখো ছোকরাকে নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে আছে।

ইংরেজিতে অনুরোধ ভেসে এলো, আমরা ঘর দেখতে এসেছি। তোমার সময় হবে?

মনে মনে বললাম, ব্যাটা বেওকুফ, চাবি ছাড়া তুমি ঘর দেখবা কিভাবে? পরক্ষণেই মনে হলো, আরে, বাহুদুর তো দরজাই ভেঙে রেখে গেছে।

দরজা খুলে ঢুকতে দিলাম ব্যাটাদের। এদের মধ্যে একজনকে আগে দেখেছি ক্রিকেটের মাঠে, ভালো বোলিং করে, আর আরেকজন নবাগত, বোঝা যায়।

দরজার অবস্থা দেখে চিন্তিত হলেও ঘর দেখে খুশি দুইজনেই। ঐ ঘরটা বেশ বড়। সাথে কমন বারান্দাও আছে।

পুরনো পাকি ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলো, আমি কোথাকার লোক। আমি লৌকিক ভদ্রতা করে হাত বাড়িয়ে দিলাম। "আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।"

বাংলাদেশ শুনে একটা উল্লসিত ভাব দেখা গেলো পুরনো পাকির মুখে। "উর্দু সমঝতে হো?"

সদ্য ঘুম থেকে না উঠলে আমি নিশ্চিতভাবেই কোন খারাপ কথা বলতাম, কিন্তু মেজাজ সামলে রেখে বললাম, না।

এবার প্রশ্ন, "হিন্দি?"

কেমন লাগে? আমি বাংলাদেশের লোক, হিন্দি কেন বুঝতে হবে আমাকে? আমি কর্কশ গলায় বললাম, তোমার যদি ইংরেজিতে সমস্যা থাকে, জার্মানে কথা বলতে পারি আমরা, সমস্যা নেই।

পুরনো পাকি চুপ করে গেলো এবার। নতুন পাকি ছোকরার সাথে পরিচিত হলাম। এই ঘরটি তার প্রাপ্য ছিলো, কিন্তু বাহুদুরের অয়রোপাহাউসপ্রাপ্তিতে দেরি হচ্ছিলো বলে তাকে একেবারে অন্য শহরের এক ভোনহাইমে নিয়ে ফেলেছে ষ্টুডেন্টেনভেয়ার্ক।

রান্নাঘর টয়লেট দেখে দুইজনেই বিদায় নিলো। আমি রক্তলাল চোখ নিয়ে কড়া এক কাপ চা বানাতে বসলাম। এই ছিলো ললাটলিখন। পাকি মশলা খাই না, পাকি চাল খাওয়া বাদ দিলাম, পাকি দোকানের ছায়া মাড়াই না, আর এখন এক ছাদের নিচে এক পাকির সাথে বাস করতে হবে। কোথায় এক নির্বান্ধব চেক সুন্দরী এসে উঠবে পাশের ঘরে, আধো আধো জার্মানে এটা সেটা জানতে চাইবে, তাকে সব রগে রগে বুঝিয়ে দেবো ক্যাম্নেকী, তা না। স্পষ্টই এ সৃষ্টিকর্তার চুথিয়ামি। আমাকে প্যাঁচে ফেলে দেখছে শালা।

৩.
নতুন পাকি পড়শী সৈয়দ বাবাজি কয়েকদিন আগে এসে উঠেছে। বয়স বেশি নয় তার।

কয়েকদিন আগে সচলে হয়ে যাওয়া আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলাম, দেখি কী হয়। আগ বাড়িয়ে ভ্যাজাল পাকানো আমার স্বভাব না, কাজেই সদ্ব্যবহারের পথই বেছে নিলাম।

সৈয়দ সাহেবের ইংরেজি মোটামুটি, আর প্রথম দিন উর্দু হিন্দিকে রুল আউট করে দেবার পর তিনি উর্দুতে বাতচিতের চেষ্টা করেননি। মনে মনে একটা প্লাস পয়েন্ট দিলাম তাকে।

রাতের বেলা বসে কাজ করছি, এমন সময় দরজায় টোকা। সৈয়দ সাহেব কুণ্ঠিত মুখে জানতে চাইলেন, আমার কাছে অ্যালার্ম ঘড়ি হবে নাকি। আমার অ্যালার্ম নষ্ট, মোবাইলের অ্যালার্ম ব্যবহার করি। সৈয়দের মোবাইল নেয়া হয়নি এখনো, ভিসা প্রলম্বিত করার আগে মোবাইল নেয়ার উপায় নেই। আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, ঠিকাছে, আমি ভোরে তোমাকে তুলে দিবো। সৈয়দ ধন্যবাদ জানিয়ে কেটে পড়লো।

পরদিন সন্ধ্যায় তাকে রান্নাঘরের জিনিসপাতি বুঝিয়ে দিলাম। বেশির ভাগ জিনিস আমার কেনা, বাকিগুলি পুরনোদের রেখে যাওয়া জিনিস, নিয়মানুযায়ী ভোনহাইমের সম্পত্তি এখন। বললাম, "তুমি ব্যবহার করতে পারো যে কোন কিছু, তবে ব্যবহার করে ফেলে রেখো না। এখানে সাবান আছে, স্পঞ্জ আছে, ধুয়ে রেখে দিও।" টুকটাক আরো আলাপ হলো। সে এসেছে বালুচিস্তান থেকে, কোয়েটার ছেলে। ওকে দেখে মনে হয় না সে বালুচ, তাই জিজ্ঞেস করলাম, সে এথনিক বালুচ কি না। সৈয়দ সবেগে মাথা নাড়লো, "না! আমি পাখতুন!" তারপর একগাদা তথ্য দিলো পাখতুনদের সম্পর্কে। তারা কোথায় কোথায় থাকে, কোথায় সংখ্যায় কম, কোথায় বেশি। একই সাথে তার জিজ্ঞাসা, কিবলা কোন দিকে।

সৈয়দকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বললাম যে আমি কিবলা সম্পর্কে কেন নিশ্চিত না। আমি মুসলিম পরিবারে বড় হলেও যে ধর্মউদাসীন, এবং অজ্ঞেয়বাদিতার পথের পথিক, শুনে সে ঘাবড়ে গেলো। বললাম, আমরা এখন কা'বার উত্তর পশ্চিমে আছি, তুমি সকালে উঠে দেখে নিও সূর্য কোন দিকে ওঠে, ওদিকে ফিরে নামাজ পড়ে নিও।

আজকে সন্ধ্যায় কাজ করছি, আবার দরজায় টোকা। সৈয়দ লজ্জিত মুখে দাঁড়িয়ে। তার আব্দার আকাশচুম্বি। সে কখনো রান্না করেনি জীবনে, তাকে আমি একটু দেখিয়ে দিতে পারি কি না।

বিরাট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠলাম। আলুর দম খাওয়ার শখ হয়েছে ছোকরার। আলুর দম আমি নিজেও কোনদিন রান্না করিনি, আবছা ধারণা আছে শুধু। নিজে রাঁধতে গিয়ে ইতোমধ্যে মশলার দফারফা করে ছেড়েছে ব্যাটা।

রান্না নিয়ে আর চুলা বন্ধ করা নিয়ে একটা গুরুগম্ভীর লেকচার দিয়ে আলুর দম রান্না দেখালাম সৈয়দকে। নিরামিষাশী কি না জিজ্ঞেস করতে সে মনমরা হয়ে গেলো। জানালো, বালুচিস্তান খুব ঠান্ডা জায়গা। ওখানে মাংসচর্বি না খেলে টেকা যায় না। আরি পাকিস্তানী নিরামিষাশী বলে নাকি কোন কিছু নাই দুনিয়ায়। বুঝলাম, তা কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো। এত কিছু ফেলে সে কেন আলুর দম খেতে চায়, এ প্রশ্নের জবাবে সে জানালো, এই দেশে হালাল তরিকায় কেউ ছাগল কাটে না। মাত্র নাকি একটা দোকানে শুধু শুদ্ধ পদ্ধতিতে কাটা মুরগি পাওয়া যায়।

রাঁধতে রাঁধতে আরো টুকটাক আলাপ হলো। সৈয়দ জানালো, কোয়েটা সম্পর্কে আমি যা জানি, পাকিস্তানীরা তা-ও জানে না। সে একবার ইসলামাবাদে একটা কাজে গিয়ে জানিয়েছিলো, সে কোয়েটা থেকে এসেছে, উত্তরে নাকি তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, কোয়েটা গিলগিটের কাছে কি না। ক্ষুব্ধ গলায় সে বললো, এটা একটা কথা, বলো? গিলগিট হচ্ছে চীনের কাছে।

আমি বললাম, বালুচিস্তান তো সবচেয়ে বড় প্রভিন্স, আর কোয়েটা তো বালুচিস্তানের রাজধানী। এত বড় শহর চেনে না কেন?

সৈয়দ তিক্ত গলায় বললো, চিনবে কিভাবে? কোন নজর দিলে তো? সরকার কিছু করে না কোয়েটার জন্য। করাচী এয়ারপোর্টে তাকে হেনস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ, সে কোয়েটার লোক হয়ে জার্মানি যাচ্ছে শুনে। করাচী গেলেই ওখানকার লোকে তাদের নিয়ে মস্করা করে।

আমি বললাম, কোয়েটাতে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট নাই কেন?

সৈয়দ এবার মুখ কালো করে ফেললো। আস্তে করে শুধু বললো, কিছু নাই। অনেক কিছুই নাই।

আমি খুব শক্ত গলায় বললাম, জানি। এই জিনিস আমরা চিনি। এ জন্যেই আমরা পাকিস্তানকে লাত্থি মেরে আলাদা হয়েছি।

সৈয়দ আমার চেহারা দেখে চোখ নামিয়ে নিলো। তারপর আস্তে করে বললো, খুব অন্যায় হয়েছিলো তখন তোমাদের উপর, আমি জানি।

৪.
পাকি ঘৃণা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে সচলে। সেই আলোচনায় আমি ঘৃণার সপক্ষেই কথা বলেছি, ভবিষ্যতেও বলবো। কোন পাকিস্তানী যতদিন পর্যন্ত স্বীকার না করবে এই অন্যায়ের কথা, ততদিন পর্যন্ত সে মানুষ না, হি অর শি ইজ জাস্ট অ্যানাদার পাকি। এই অন্যায় স্বীকার করুক, আমরাও ঘৃণার পাত্রটুকু ঢেকে রাখবো।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।