Monday, October 20, 2008

সেতু সঙ্কট

দেশটির নাম মনে পড়ছে না, তবে তাকে চিরে যে নদীটি বয়ে চলছে, তার নাম ঝিনুক।

মস্ত সেই নদী। বর্ষায় প্রমত্তা, শীতে স্নিগ্ধা। সে নদীতে জাহাজ চলে, চলে ছোট ছোট ডিঙিও। সেদিনও দেখলাম দু'টি শিশু আদুল গায়ে একটা ডিঙি বাইতে বাইতে চলছে তীর ঘেঁষে, আর হাঁ করে দেখছে দূরে বড় ইস্টিমারের ডেকে লোকজনের কান্ডবান্ড। ইস্টিমারটাও বুঝি তাদের ভয় দেখানোর জন্যে একবার ভোঁ করে হাঁক দেয়।

ঝিনুক চিরে রেখে গেছে দেশটার অনেকখানি। তাকে পার হতে না পারলে ব্যবসাবাণিজ্য চলে না, আমদানিরপ্তানি সব মাটিতে গড়াগড়ি খায়।

লোকজন একদিন কথা বলাবলি শুরু করলো, ঝিনুক নদীর ওপর দিয়ে সেতু বানাতে হবে।

বাজারে, দোকানে, খেলার মাঠে, বর্ষার দিনে ছাতা মাথায় করে ছিপ ফেলে মাছ ধরার নিস্তব্ধ নিষ্ঠুর খেলা ভেঙে সব জায়গায় লোকের মুখে কেবল সেতুর আলাপ। ঝিনুকের ওপর সেতু হবে? তা-ও কি সম্ভব? এ তো সেই নদী, যাতে জাহাজ ডুবলে তার হদিশ মেলে না, মিললেও তাকে টেনে তোলার সাধ্যি নেই কারো! মানুষের কি এমনই আস্পদ্ধা, যে ঝিনুকের ওপর সেতু বানিয়ে পেরিয়ে যাবে? এ কি মাদারটুলির খালের ওপর সাঁকো বানানো? এ কি ছেলেখেলা?

তারপরেও লোকে চায়ের কাপ থেকে ঠোঁট তুলে ঝিনুক আর সেতু শব্দদু'টো দুর্বিনীত আগ্রহ নিয়ে একই দমে একই বাক্যে ব'কে যায়। কতবড় আস্পদ্ধা ঐ নাম-ভুলে-যাওয়া দেশের লোকের, অ্যাঁ!

এই গুঞ্জন চলতে থাকে আকাশে বাতাসে। মৌমাছি ফুলের ওপর বসে বিরক্ত মুখে সেই গুঞ্জন শুনতে শুনতে মধু খায়, অলস গ্রীষ্মের রাতে একটা ঝিঁঝিঁ আচমকা চুপ করে যায় তার বাড়ির পাশে পঁচার মায়ের কুটিরে পঁচাকে শোনানো পঁচার মা-র ঝিনুকের বুকে সেতুর গল্প শুনে। ঝিনুকের এপারে দাঁড়িয়ে ঢেউ গোণে বেকার যুবকেরা, অন্য পার তো চোখে দেখা যায় না।

ঝিনুকের এ পারে ও পারে দুইপারেই যখন সবার মুখে একই গুঞ্জন, ছিপনৌকার মাঝি থেকে ইস্টিমারের সারেং সবাই যখন চিন্তিত সেতুর আকার, আকৃতি ও প্রকৃতি নিয়ে, তখন রাজনীতিকরা তাঁদের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরূমে বসে নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে ঠিক করলেন, এখন একটা কিছু করা দরকার।

কিন্তু সেই দেশের যা দস্তুর, টুনিসচিবের কাঁধে দায়িত্ব পড়লো এই ঝিনুক সেতু নির্মাণের উপযোগিতা মাপার দায়।

টুনিসচিব যখন হন্তদন্ত হয়ে সেই মাপামাপিতে ব্যস্ত, তখন উল্টোদলের রাজনীতিকরা ময়দানে গলা খাঁকরে বললেন, সেতু হচ্ছে ভালো কথা, কিন্তু এর নাম সোজাদলের নেতা মরহুম মধু ঢালির নামে কিছুতেই রাখা যাবে না। রাখলে ঘরে ঘরে আগুন জ্বলবে।

টুনিসচিব সবকিছু মেপে জানালেন, ঠিকাছে। সেতু না বানালে সামনে কঠিন দুর্দিন আছে। বানাতে হবে যত জলদি সম্ভব। লোকজনের গুঞ্জন মিথ্যে নয়।

সোজাদলের মন্ত্রী বললেন, মরহুম মধু ঢালি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সোজাদল। দেশ এতে অশেষ উপকৃত হবে।

টুনিসচিবের কাজকর্মের দোষগুণ মাপার দায় চাপলো পাতিসচিবের কাঁধে। তিনিও হন্তদন্ত হয়ে কাজে নেমে গেলেন।

উল্টোদলের নেতারা বললেন, সেতুর নাম মধু ঢালির নামে রেখে জাতির ঘাড়ে একটা কলঙ্কই চাপানো হচ্ছে। মধু ঢালি ছিলো একটি দুষ্টলোক। সে পাশের বাড়ির জামগাছ থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলো। কেন সে জামগাছে চড়েছিলো?

পাতিসচিব জানালেন, টুনিসচিবের কাজ ঘ্যাম ভালো হয়েছে। এমন টুনিসচিব গত কুড়িবছরে একটাই ছিলো, যখন তিনি নিজে টুনিসচিব ছিলেন।

সোজাদলের নেতারা বললেন, আসছেবার আমরা ক্ষমতায় এলে মরহুম মধু ঢালি সেতু বানিয়ে আমরা ঝিনুককে বশ করবো।

পাতিসচিবের কাজের দোষগুণ মাপার দায় চাপলো পুরোসচিবের কাঁধে। তিনিও হন্তদন্ত হয়ে কাজে নামলেন।

উল্টোদলের নেতারা বললেন, জাতি মধু ঢালির নামে সেতু মেনে নেবে না। সেতুর নাম রাখতে হবে অত্র অঞ্চলের বিখ্যাত রসগোল্লা নির্মাতা আবুল ময়রার নামে। নাহলে আমরণ হরতাল চলবে।

পুরোসচিব জানালেন, পাতিসচিব বেড়ে খেটে কাজ করেছে। লোকটা ভালো।

সোজাদলের নেতারা বললেন, প্রিয় জনগণ, মধু ঢালি সেতু আপনাদের জন্যে আমাদের উপহার।

এবার পুরোসচিবের পরামর্শ নিয়ে মন্ত্রীসভায় প্রকল্পের প্রস্তাব উঠলো। কেউ বললো দাতাদের পয়সায় সেতু হোক, কেউ বললো জনতার পকেট থেকে ট্যাক্স খসানো হোক, কেউ বললেন দুটোই হোক। সেতুর ইনজিনিয়াররা ক্যালকুলেটর বার করে হিসেব করতে লাগলেন, কোন কনট্র্যাকটরের কাছ থেকে কত খাবেন।

উল্টোদলের নেতারা মানববন্ধন করলেন। আবুল ময়রার ছেলে টিভির সামনে কেঁদে বললো, সব লোকে আব্বার রসগোল্লা খাইছে মাগার নাম লইবার চায়না। পত্রিকায় কয়েকজন বুদ্ধিজীবী আবুলচরিত লিখলেন। সোজাদলের কয়েকজন বুদ্ধিজীবী লিখলেন মধু ঢালির খাবনামা। লিস্টির দুই নম্বরেই ঝিনুকের ওপর সেতুর কথা। এক নম্বরে জামগাছের স্বপ্ন।

দাতারা এসে নানা কাঠি দিতে লাগলো। কেউ বললো সেতু চারগলির হোক। কেউ বললো ছয় গলির হোক। কেউ বললো সেতুর ওপর রেল চড়াও, কেউ বললো সেতুর পাশে ছাপড়া ঘরে দোকান দাও।

তুমুল হট্টগোল বাঁধলো সারা দেশ জুড়ে।

কিন্তু সব বুড়োখোকাছেলেমেয়ে, ময়দানের মোমাছি আর রাতের ঝিঁঝিঁদের তাক লাগিয়ে একদিন ঝিনুকের ওপর সেতুর খাম্বা বসে গেলো। পেল্লায় সে খাম্বা।

প্রধান এসে দেখে গেলেন। তিনি আবার সেনা সমর্থিত, তাই সেনাপতিও এলেন সাথে।

সকলেই খুশি।

হঠাৎ ঘটলো বজ্রপাত। সেতুর সেই খাম্বার চারদিকে একদিন উঠলো অনেক ফিসফাস। আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে লোকজন ফিসফিসিয়ে উঠলো, "আবুল লেইছ", "আবুল লেইছ", "আবুল লেইছ" ...।

মাদ্রাসার কামিল পাশ ছাত্র আবুল লেইছ এসে চিৎকার করে উঠলো, "এইখানে খাম্বা গাড়ছে কে?"

সবাই চুপ। চুপ জনতা, চুপ ফুলের ওপর মৌমাছি, চুপ গর্তের ঝিঁঝিঁ, চুপ উল্টোদল, চুপ সোজাদল, চুপ টুনিসচিব-পাতিসচিব-পুরোসচিব। চুপ প্রধান আর তার সমর্থক সেনা।

আবুল লেইছ একটা দড়ি বেঁধে খাম্বা টেনে শুইয়ে ফেললো। তারপর ঝিনুকের পানি তুলে সহিহ কায়দায় কিছুটা খেয়ে বাকিটা কুলকুচি করে ফেললো ঝিনুকের ওপরেই। ঝিনুক সবকিছু আগের মতোই ভাসিয়ে নিয়ে বইতে লাগলো চুপচাপ, কিছু বললো না।

[সমাপ্ত]

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।