Monday, October 13, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৫১

১.
ভালো যাচ্ছে না দিনগুলি। আগামী পরশু একটা বড়সড় পরীক্ষা আছে। কয়েকটা জায়গা থেকে ঝাড়ি খাওয়ার আশঙ্কা বুকে নিয়ে হেলেদুলে পড়ে যাচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ বন্ধের কারণে ঘুমের চক্র কিছুটা কেৎরে গিয়ে আবার আমাকে নিশাচর বানিয়ে ছেড়েছে। প্রায় ভোর পর্যন্ত জেগে থেকে দুপুরের দিকে উঠি, ওঠার পর বিশ্বজগৎ বিরস লাগে। এলাচ দিয়ে চা বানিয়ে খাই, মাঝে মাঝে বিস্কুট দিয়ে। সেইসব বিস্কুট, যেগুলি এক সেকেন্ডের চেয়ে এক মাইক্রোসেকেন্ড বেশি পরিমাণ সময় চায়ে চুবিয়ে রাখলে মনের দুঃখে গলে জল হয়ে যায়। সেটাকে তৎক্ষণাৎ আরেকটা বিস্কুট দিয়ে উদ্ধার করার চেষ্টা করলে সেটার পরিণতিও আগেরটার মতোই হয়। এই রাহু সেই শৈশব থেকে পিছে লেগে আছে আমার। বিস্কুটনির্মাতাদের কাছে আকুল আবেদন, আপনাদের বিস্কুটগুলি আরেকটু শক্ত করে বানান। চায়ে চুবাইয়া চুবাইয়া খাইতে দ্যান এই গরীবকে। পিলিজ।

২.
বিস্কুট শক্ত করার প্রসঙ্গেই আরেক কিচ্ছা মনে পড়লো। সেদিন আমার বিভিন্ন তড়িৎডাক ঠিকানায় জমে থাকা স্প্যামবার্তাগুলি খুঁটিয়ে দেখছিলাম। পৃথিবীতে বহু লোককে মনে হলো আমার পুরুষাঙ্গের দৈর্ঘ্য (এবং প্রস্থ) নিয়ে চিন্তিত। তারা অসংখ্য স্প্যাম মেইলে তাদের সেই উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মেইলের শিরোনামে তাদের বক্তব্যগুলো কয়েকটা ক্যাটেগরিতে পড়ে, অনেকটা এমন,

1. আমার দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই, কারণ তাদের শরণাপন্ন হলেই আমি আমার বেচারা প্রত্যঙ্গকে (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলের মতোই) দীর্ঘায়িত করতে পারবো। বিভিন্ন মেইলে বিভিন্ন বৃদ্ধির আশ্বাস, কেউ চার ইঞ্চি, কেউ তিন ইঞ্চি, কেউ দুই ইঞ্চি।

2. আমার দুশ্চিন্তার অবশ্যই কারণ আছে, কারণ আমার বান্ধবীর সন্তুষ্টির কথা আমি মোটেও ভাবছি না, এবং এখনও পর্যন্ত তাদের শরণাপন্ন হইনি। আমি যেন অবিলম্বে তাদের শরণাপন্ন হই।

3. এখনই, এই মূহুর্তেই আমার উচিত একটি প্রত্যঙ্গদীর্ঘায়ক যন্ত্র কিনে কাজে নেমে পড়া, এবং আমার স্ত্রীকে জন্মদিনে চমকে দেয়া (কার জন্মদিন তা স্পষ্ট নয়)।

4. আমি যেন অনুগ্রহ করে একটি বিশেষ বড়ি সেবন করে আমার বিস্কুট দীর্ঘকালযাবৎ শক্ত রাখি। তা না হলে চরম পস্তান পস্তাবো।

5. আমি কি জানি, মেয়েরা কী চায়? জানি না। জানলে প্রত্যঙ্গদীর্ঘায়ক কিনতে এতো দেরি করতাম না।

6. ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ছাড়ে একটি বিশেষ প্যাকেজ অফার করা হচ্ছে। দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ, উভয়ই দরাজ হবে। আমি যেন জ্ঞানী হই, বান্ধবীর মুখে যেন তৃপ্তির হাসি ফোটাই।

স্ত্রীদের ও বান্ধবীদের প্রতি এতদিন ধরে চর্চিত আমার এই অবহেলা ও অনীহার কারণে লজ্জাই লাগলো একটু। আমি কেমন আছি, কী খেয়ে কী পরে কী করে বেঁচে আছি, এই জিজ্ঞাসা নিয়ে সারা জীবনে মনে হয় সব মিলিয়ে অঙ্গুলিমেয়সংখ্যক মেইল পেয়েছি, আর অজানা অচেনা সব ঠিকানা থেকে এমন আহ্বান ভেসে আসছে, কেমন কেমন যেন লাগে। যদিও "নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা" টাইপ একটা ফুটানগিরির আভাস রয়েছে এই প্রস্তাবে, তারপরও স্প্যাম মেইল ট্র্যাশে পাঠাই। সবকিছুর সাথে মাস্তানি ভালো নয়।

৩.
আমার নতুন পড়শী তাজিকিস্তানের ছেলে, নাম বাহুদুর। আসলেই বাহাদুর ছেলে, ফ্ল্যাটে আসার কয়েকদিনের মাথায় সে তার ঘরের দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলেছে। বিষ্যুদবার রাতে বাসায় ফিরে দেখি তার দরজা ফ্রেম থেকে খোলা, সে লাপাত্তা। উঁকিঝুঁকি মেরে দেখলাম খুনখারাবা হলো কি না, তারপর থতমত খেয়ে নিজের ঘরে ফিরে গেলাম। আজ সে এসে জানালো, সেদিন সে ঘরে ঢুকতে গিয়ে চাবি দিয়ে অনেক চেষ্টা করেছে, তালা খুলতে পারেনি। রাত হয়ে গেছে দেখে সে বাধ্য হয়ে অনেক কষ্টে দরজা ভেঙে ঢুকে নিজের জিনিসপত্র আর টাকাপয়সা নিয়ে চলে গেছে বোখুম। আগামীকাল কর্তৃপক্ষকে জানাবে ঘটনা কী।

বাহাদুর মারবুর্গে ছিলো, তার দেশোয়ালি বন্ধুবান্ধবরাও থাকে নর্ডরাইন ভেস্টফালেনের দিকে। ওদিককার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে, কাসেলে এসে তার কিছুই ভাল্লাগছে না। আমি মনে মনে ভাবলাম, সর্বনাশ, কাসেলের লোকজনের কপালে দুঃখই আছে তাহলে।

৪.
মূলত গরু আর ভেড়ার মাংসই খাই আমরা এখানে। মুরগি কদাচিৎ। আমি বরাহমাংস মাঝে মাঝে খাই, যখন রান্নার ইচ্ছা কম থাকে, তখন স্টেক ভেজে খেয়ে ফেলি চটপট। জিনিসটার স্বাদ খুব একটা সুবিধার না, কোনমতে চলে আর কি। বছরে দুয়েকদিন সুপারমার্কেটে হরিণের মাংস মেলে। খরগোশের মাংস ভুনা খাবার ইচ্ছে অনেকদিনের, কিন্তু শেষমেশ আর কেনা হয় না।

এরইমাঝে কয়েকদিন আগে বলাই জানালেন, খাসির মাংস খাওয়া হবে। পরিচিত আরেক ভদ্রলোকের সহকর্মী একটা কসাইখানা থেকে ছাগল কাটিয়ে আনতে পারবে, আমরা শুধু তার কাছ থেকে জবাই করা ছাগলটা নিয়ে এলেই হবে।

আমি আর হের চৌধুরী শহর থেকে একটু বাইরে সেই লোকের কর্মস্থল থেকে প্যাকেট করা ছাগল নিয়ে এলাম। আস্ত ছাগল ঘরে কাটার মতো যন্ত্রপাতি কারোই নেই, তাই সেটাকে ঘাড়ে করে নিয়ে যেতে হলো আমাদের তুর্কি দোকানে। তুর্কি মাংসবিক্রেতার সাথে গত কয়েক মাসে হৃদ্যতা হয়ে গেছে মাংস কেনার সুবাদে, সে কোন চার্জ না রেখেই নিপুণভাবে ত্রিভুজটাকে কেটেকুটে সাইজ করে দিলো। মাংস কাটাও একটা শিল্প হতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। দুই মিনিটের মধ্যে একটা আস্তছাগল কেটেকুটে ছোট একটা পোঁটলায় ভরে নিয়ে এলাম। সেদিন বলাই ও হের মুনশির সৌজন্যে প্রায় বছরখানেক পর আবার কাচ্চি বিরিয়ানি খেলাম।

৫.
খই ভাজার ফাঁকে ফাঁকে সেদিন ইউটিউবে দেখলাম মাইকেল মুরের বাউলিং ফর কলাম্বাইন আর সিকো। লোকটাকে ফারেনহাইট ৯/১১ দেখার পর পরই খুব পছন্দ করি, তার মাত্রা আরো দুই পর্দা চড়ে গেলো এই দু'টো দেখে। অনবদ্য।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।