Monday, September 15, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৪৯

১.
সিনেমায় মাঝে মাঝে দেখা যায়, নায়িকার রূপ দেখে নায়কের ভোলাভালা বন্ধুর চশমা ফেটে গেছে। সেদিন বাংলা ব্লগোস্ফিয়ারের এক বিশিষ্ট গুণীজনের ব্লগ পড়তে গিয়ে আমারও চশমার কাঁচ ফেটে দুই টুকরা।

দোষটা তার বক্তব্যের ঘাড়ে চাপাবো, নাকি চশমার স্ক্রুয়ের অপর্যাপ্ত টর্ক আর মাধ্যাকর্ষণের সমন্বয়ের ওপর, বুঝে উঠতে পারছি না। তবে বিপদটা ঘটেছে হের চৌধুরীর বাড়িতে। ফলে বিনা চশমায় কোনমতে বাসে চড়ে আবার বাড়ি ফিরে শেষ স্পেয়ারটাকে নাকে আঁটাতে হলো। সেটা আবার উপহার পাওয়া, উপহার যিনি দিয়েছেন তিনি সম্ভবত হাতির নাকে মেপে কিনেছেন জিনিসটা। বিশাল সেই চশমা পড়ে মনে হলো একটা উইন্ডশিল্ড নাকে নিয়ে ঘুরছি। ওয়াইপারের অভাবে কিছুটা খালি খালি লাগছিলো যদিও।

তবে একটা ভালো দিকও পাওয়া গেলো। দেশ থেকে শেষ কেনা ফ্যাশনদুরস্ত যে ফ্রেমটা বেশ কয়েকমাস আগে একইরকম স্ক্রুশৈথিল্যের কারণে বিকল হয়ে পড়েছিলো, সেটাকে মেরামত করলাম এই ভাঙা চশমার স্ক্রু খুলে নিয়ে। অনেকে মাঝে পরামর্শ দিয়েছিলেন, অপটিকার (চশমানির্মাতা) এর কাছে গিয়ে চশমা ঠিক করিয়ে আনতে, কিন্তু সামান্য একটা ১.৮ মিলিমিটার স্ক্রু এর জন্য কারো দ্বারস্থ হবো, এই চিন্তাটাই পীড়া দিচ্ছিলো বলে স্পেয়ার দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলাম। আবার ঐ মাপের স্ক্রু কোন হার্ডঅয়্যারের দোকানে খুঁজে পাইনি। আজকে আইনঅয়রোগেশেফট থেকে (যা কিনবেন এক টাকা) সূক্ষাতিসূক্ষ্ম স্ক্রু-ড্রাইভারের সেট কিনে এনে পুরনো ফ্রেমটাকে যাকে বলে ইসকুরু টাইট দিলাম। ফলাফল ইতিবাচক।

২.
সেদিন আমার প্রতিবেশিনী ও নতুন বন্ধু উজবেকিস্তানের মেয়ে গুলিয়ার বাসায় পোলাও খাওয়ার দাওয়াত ছিলো। গুলিয়া ভোনহাইম ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তার বাসা পাল্টানোর কাজে আমি এবং তার বন্ধুনি ইরিনা তাকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা করেছি বলেই আমরা আমন্ত্রিত।

উজবেকরা ভালো পোলাও রান্না করে, এমনটা আমিও শুনেছি। গুলিয়া আমার সাথেই বেরিয়ে বাজার করতে এসেছে, কেনাকাটার সময় তার চিন্তামগ্ন হাবভাব দেখে মনে হলো আজকে আর কপালে পোলাও জুটবে না। তুর্কি দোকান থেকে মাংস আর জার্মান দোকান থেকে চাল ও গাজর কেনার পর আফগান দোকানের শরণাপন্ন হতে হলো কোন এক রহস্যময় মশলার খোঁজে, যেটা ছাড়া "পিলো" রান্না করা যাবে না। সমস্যা একটাই, এই মশলার জার্মান নাম সে জানে না। আফগান দোকানি ভদ্রলোক দারি-পশতু-উর্দু-হিন্দি-জার্মানে সমান পারদর্শী, কিন্তু উজবেক ভাষার ব্যাপারে তিনি মাফও চান দোয়াও চান। মশলার ভিড়ে হারিয়ে গিয়ে শেষমেশ বললাম, তোমরা এই মশলাকে কী নামে ডাকো?

গুলিয়ার উত্তর শুনে কাজটা সহজ হলো, জিরাহ। এই জ হচ্ছে সেই Zানতি পারো না'র Z। জিরা ওরফে কিউমিনের প্যাকেট খুঁজে বের করে জিজ্ঞেস করলাম, এই জিরা সেই িZরাহ নাকি। তারপর জানলাম, এই সেই মহার্ঘ্য মশলা, যা ছাড়া "পিলো" অচল।

যারা উজবেক "পিলো"র সরলতম সংস্করণ রান্না করে খেতে চান, তাদের জন্য রেসিপিটা বলি। তিনজনের মাপে রান্না করা হয়েছিলো, তিনটা নাজমুলহুদা সাইজের পেঁয়াজ আর পাঁচশো গ্রাম গাজর কুচি করুন। ওদিকে পাঁচশো গ্রাম গরুর মাংস টুকরো টুকরো করে একগাদা জিরা দিয়ে কষে মাখান। তারপর তেলে পেঁয়াজ আর গাজর ভাজতে শুরু করুন। কিছুক্ষণ পর মাখানো মাংস দিন। তারপর ঘুঁটতে থাকুন। আমি অবশ্য ঘোঁটার কাজটা গুলিয়ার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তার ছিপছিপে ইউক্রেনিয় বান্ধবী (সন্ন্যাসী আসলেই বড় সুখে আছেন) ইরিনার সাথে গুজুর গুজুর খোশগল্প করছিলাম, চারিত্রিক সমস্যা থাকলে যা হয় আর কি। এক পর্যায়ে লবণ দিয়ে আরেক দফা ঘুঁটে আন্দাজমতো চাল বসিয়ে ঢেকে দিন।

জিনিসটা খেতে খারাপ হয় না। আমরা যদিও নানারকম সুগন্ধী মশলা দিয়ে থাকি পোলাওয়ে আলাদা গন্ধ আনার জন্যে, ওদিকে মাংসেও হলুদ-মরিচ-ধনিয়া-আদা-রসুন দিয়ে থাকি, কিন্তু ওসব ছাড়াও বেশ স্বাদু হয় পোলাও, হয়তো জিরার কারণেই।

পোলাও আমরা উজবেকদের কাছ থেকেই পেয়েছি কি না জানি না। ইরিনা দেখলাম জিরার প্রেমে মশগুল, সে নোট করে নিলো, অমুক দিন সে অমুক জায়গায় গিয়ে এই জিনিস কিনে পরীক্ষা করে দেখবে। মনে মনে বললাম, হায়রে ছেরি, চৌধুরীর তেহারি খেলে তো তুই একটা হপ্তা শুধু চামচ শুঁকবি!

৩.
ইরিনা একটা ডিস্কোঠেকেতে কাজ করে সপ্তাহান্তে, তার আমন্ত্রণে এক রাতে আতিথ্য নিয়ে গিয়েছিলাম সেখানে, মধ্যযুগীয় গানবাজনার সাথে মধ্যযুগীয় কস্টিউম পরা লোকজনের মধ্যযুগীয় নাচ দেখতে। তবে আজকে তা নিয়ে লেখার দম পাচ্ছি না, পরবর্তী কোন পর্বে আয়ু-স্বাস্থ্য-ইচ্ছার ত্রিবেণীসঙ্গম ঘটলে লিখে ফেলবো।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।