Monday, September 08, 2008

বনবাসের স্মৃতি

ধূসর গোধূলির বড় ভাই শ্রদ্ধেয় গম্ভীর গোধূলি সেদিন ফোন করেছিলেন এক দূরদেশ থেকে। অভিযোগ, ধূসর দিনকেদিন বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা তার নিকটতম গার্জিয়ান ও গুরুজন, তারা যেন তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আবার লাইনে আনি। মিষ্টি কথায় কাজ না হলে পোঁদে লাথি মারার অনুরোধ জানালেন। গোধূলি বংশের মুখে নাকি ধূসর কালিমা লেপন করে চলছে প্রতি পলে পলে। এর একটা আশু বিহিত করা জরুরি।

মুসিবতেই পড়লাম। হাজার হোক গোধূলি বন্ধু মানুষ, হোক অর্বাচীন, তাকে কি কথা না শুনলেই পোঁদে লাথি মারা উচিত? কিন্তু গম্ভীরদা কোন সুযোগ দিলেন না প্রতিবাদের, আমাদের গার্জেনগিরির ওপর গভীর প্রত্যয় ব্যক্ত করে ফোন রেখে দিলেন।

চৌধুরীকে এরপর জানালাম, জানালাম বলাইকেও। কী করা যায় গোধূলির জন্যে। বলাই রমজানে রোজা রেখে কিছুটা কাহিল, তিনি দুটার বেশি লাথি মারতে পারবেন না জানালেন। চৌধুরীর প্যান্টে নাজুক জায়গায় সেলাইগুলি আরো নাজুক, লাথি মারতে গেলে ছিঁড়ে যেতে পারে। কিসমতকে গালি দিতে দিতে ফোন্দিলাম ধূসরকে। কেন আমাকেই বার বার এগিয়ে যেতে হবে গোধূলিকে প্যাঁদানোর জন্যে?

আসল কথা জানলে গোধূলি পিছলে যেতে পারে জেনেই প্রস্তাব দিলাম, বন শহরে আমাদের প্রিয় বড়ভাই লিটন ভায়ের ওখান থেকে একটা চক্কর মেরে আসার। রমজান উপলক্ষে বলাই আর যাচ্ছেন না, আমি চৌধুরী গোধূলিই শেষমেশ গেলাম বনে।

যাত্রা করলাম ভোরবেলা। এদিক থেকে আমি আর চৌধুরী, আর ওদিক থেকে গোধূলি। জার্মানিতে মোটামুটি শস্তায় রেলযাত্রা সম্ভব সপ্তাহান্তে, আগেই বলেছি, সেই সপ্তাহান্তের টিকেট আবার শহরের ট্রামেবাসেও খাটে। তাই ওরকম একটা টিকেট কেটে চড়ে বসেছি আমরা। গিসেনে নেমে ট্রেন বদলাতে হয় একবার, তারপর কোয়ল্নে আরেকবার। খুব বেশি অপেক্ষার হ্যাপাও তাই নেই। বেশ আরামসেই সীট দখল করে ঝিমাতে ঝিমাতে একসময় বনে এসে পৌঁছুলাম আমরা।

গোধূলি আরো আগেই এসে পৌঁছে গেছে বনে, স্টেশনে নেমেই দেখি সে গোমড়ামুখে দাঁড়িয়ে, চোরের মতো হাবভাব। বুঝলাম, গম্ভীর ভাইয়ের উদ্বেগের পেছনে যথাযথ কারণ আছে। চৌধুরীকে বললাম, আগে মিষ্টি কথা শুরু করবো, নাকি কড়াটা দিয়েই শুরু করবো? চৌধুরী বললেন, কথাবার্তাই উত্তম। কিছু মিষ্টি কথা আর হালকা চড়চাপড়ে কাজ হয়ে গেলে আর মাইর না-ও দেয়া লাগতে পারে।

তিনজনে স্টেশন থেকে বার হয়ে হাল্টেষ্টেলেতে যাবার পথে যার দেখা পেলাম, তাকে দেখতে পাবো এমনটা আশা করিনি। তিনি এক মহাজন, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও ব্লগিঙের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, যাঁর পরিচয় জানলে লোকে মূত্রত্যাগেরও অবসর পায় না, এমনই কাবিল তিনি। হাতে একটি ঝুড়ি নিয়ে অলস স্মার্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, গেঞ্জিতে লেখা, হাবিব'স।

মহাজনের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা নিয়ে গুজুর গুজুর আলাপ করছিলাম, আলাপ শেষে দেখি সিনেমার মতোই বাস চলে যাবার পর তিনিও অদৃশ্য। কী আর করা, এমন মহারথীর সাথে আলাপ না হওয়ার বেদনাকে বুকে পুষেই বাসে চড়ে চললাম লিটন ভায়ের বাসায়।

লিটন ভাই বেশ খাতিরযত্ন করলেন আমাদের। খিচুড়ি খেয়ে তিনজনে বেরোলাম শহরে এক চক্কর হাঁটতে, লিটন ভাই কী একটা কাজে বেরিয়ে গেলেন। ব্যস্ত মানুষ, একটা না একটা কাজ লেগেই আছে তাঁর।

রাইন নদীর পার ধরে হাঁটতে হাঁটতে গোধূলিকে কিছু সবক দিলাম। আচারব্যবহার, ন্যায়নীতি, ধর্মাধর্ম প্রভৃতি নিয়ে কয়েক পশলা লেকচারের পর মনে হলো, এ যাত্রা আর লাথি না মারলেও চলবে। সে তার অনেক ভুল বুঝতে পেরেছে। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে এক দফা কফিও খাওয়ালো ব্যাটা।

কফিপানের পর জানা গেলো, রাইনাউতে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মেলা বসেছে, বিভিন্ন দেশের লোক সেখানে স্টল খুলে বসেছে। পুরো পার্কটাই অপূর্ব সুন্দর ও ছিমছাম, হাঁটা বা সাইকেল চালানোর জন্যে আদর্শ, হাঁটতে হাঁটতেই মেলায় গিয়ে হাজির হলাম আমরা। মেক্সিকোর স্টলে মায়া আর আজটেক নাচ দেখে অন্যদিকে পা বাড়াতেই দেখি পোলিশ স্টল থেকে এক হৃষ্টপুষ্ট যুবতী হাতছানি দিয়ে গোধূলিকে ডাকছে। গোধূলি সবিনয়ে হাত নেড়ে জানালো, সে পোলিশ নয়, বাংলাদেশের যুবক, পোল্যান্ডের তরুণীরা যেন তার গুলাবি গায়ের রং দেখে বিভ্রান্তা না হয়। ওদিকে কিনিয়ার স্টলের বাইরে কয়েকজন আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গ কাঠের ড্রাম বাজাচ্ছিলো মন দিয়ে, আমরা কাছাকাছি যেতেই একজন ড্রাম বাড়িয়ে ধরলো আমার দিকে, দেশোয়ালি ভাই ভেবে। আমিও কম বিনয়ী নই, জানালাম, আমার পূর্বপুরুষ আফ্রিকা ত্যাগ করেছেন বহুবছর হলো, সেই লক্ষাধিক বছর আগের গ্রেট মাইগ্রেশনের সময়, তাই ড্রাম বাজানোর অভ্যাস প্রায় বিস্মৃত হয়েছি।

মিশরের কুক্ষিনৃত্যের স্টল দেখে গোধূলিকে আর আটকে রাখা গেলো না। যত বলি চল বাড়ি ফিরি ক্ষুধা লাগসে, সে ততই তেড়েফুঁড়ে যায় ওদিকে। কী আর করা, ভুঁড়ি কাঁপানো মিশরী নাচ আর বলিভিয়ার কিছু বিদঘুটে নাচ দেখে আমরা আবার উল্টোদিকে হাঁটা শুরু করলাম। বেশিরভাগ স্টলেই শুধু খাবারদাবারের ব্যবস্থা। বাংলাদেশের কোন স্টল চোখে পড়েনি, ভারত আর শ্রীলঙ্কার স্টলে ভাজাভুজি বিক্রি চলছে সমানে। ফিলিপাইন্সের স্টলে অনেক ফিলিপিনো মহিলা ব্রাজিলীয় গানের সুরে নেচে চলছেন, কিরগিজিস্তানের স্টলটা একটা কিরগিজ তাঁবু, বুলগেরিয়ার স্টলের সামনে কিছু বুলগেরিয় ওয়াইনের বোতল আর গ্লাস রাখা, এমনকি একুয়াডর আর বেনিনের স্টল পর্যন্ত চোখে পড়লো, কিন্তু বাংলাদেশের স্টল নেই। গোধূলি প্রস্তাব দিলো, তিনজন মিলে একটা টাওয়েল নিয়ে বসে পড়ি। এর আগে ফ্রাঙ্কফুর্টে গোধূলির সঙ্গীতপ্রতিভার সাথে পরিচয় হয়েছে, তাই টেনেহিঁচড়ে তাকে বার করে নিয়ে এলাম মেলা এলাকা থেকে।

এরপরের ঘটনা সামান্যই। বনের পথে চলতে গিয়ে পথ হারিয়ে একটা তুর্কি দোকান থেকে খানিক মাংস আর আলদি থেকে টুকিটাকি কেনাকাটা করে আবার লিটন ভায়ের ডেরায় হামলা করলাম আমরা। চৌধুরীর তেহারি খেয়ে লিটন ভাই বাকরুদ্ধ। আমি বাকরুদ্ধ লিটন ভাইয়ের ভোনগেমাইনশাফটের জনৈকা চৈনিকা তরুণীকে দেখে। ধূসর বাকরুদ্ধ আমরা মোটে একটি ভোদকার বোতল সঙ্গে নিয়ে এসেছি বলে। আর চৌধুরী কথা বলার ফুরসৎ পাচ্ছিলেন না তেহারি খাওয়ার ব্যস্ততায়।

খাওয়াদাওয়ার আগে ও পরে তিনজনের উদ্যোগের মস্কোভস্কায়ার ক্ষুদে বোতলটা শেষ হবার পর আমাদের মনে কিছুটা ফূর্তির উর্দ্রেক হলো। গোধূলি জড়ানো গলায় ভূপেন হাজারিকার গানের প্যারোডি ধরলো, "পকেট যেন মেরো না আমার, পোঁদ মেরে দাও বরং পোঁদ মেরে দাও, হো মালিক, সারাজীবন কাঁদালে যখন ...।" বহুকষ্টে তাকে শান্ত করে লিটন ভায়ের ঘরে গিয়ে এদিকে সেদিকে ভূমিশয্যায় আশ্রয় নিলাম আমরা। পরদিন আবার বনে এক চক্কর মেরে কোয়ল্ন হয়ে ঘরের ছেলেদের ঘরে ফিরতে হবে।

ঘুমানোর আগে সচল খুলে দেখি কার্ল মার্ক্স আলুথালু বেশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন হাপুশ নয়নে, তাঁর লুঙ্গির একদিক ধরে আছেন অভিজিৎদা আর সুবিনয়, অন্যদিক চেপে আছেন ফারুক ওয়াসিফ আর জনৈক অতিথি মুনশি। মার্ক্সের জন্যে গভীর উদ্বেগ আর সমবেদনা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম সবাই। দুনিয়াটা দিনকেদিন বড় কঠিন হয়ে যাচ্ছে, মুখ খুললেই বিপদ।

মেক্সিকোর সেই নাচের অনুষ্ঠানের মোবাইলধৃত ভিডিওটা আছে। থ্রিজিপি থেকে অন্য কোন চলেবল ফরম্যাটে নেবার কায়দাটা শিখতে পাল্লেই সচলদের জন্যে তুলে দেবো।

[]

1 comment:

  1. এহসান25 September, 2008

    আপনি এই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন, ফ্রি-ওয়্যার - http://www.download.com/FormatFactory/3000-2194_4-10819418.html?tag=mncol&cdlPid=10882915

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।