Sunday, August 31, 2008

সিয়েন আনিয়োস দে সোলিদাদ

ডয়েচলান্ডে এক বছর কেটে গেলো আমার। এক বছর হয়ে এলো, ছেড়ে এসেছি আমার মা-কে, বন্ধুদের, আমার ঘরটাকে, আমার কম্পিউটার-গীটার-বই-ঝুল-কাগজেরগাদা-ভূমিশয্যাকে, ছেড়ে এসেছি আমার কাজ, আড্ডা আর ইতস্তত ঘোরাফেরা, ছেড়ে এসেছি সর্বশেষ যে মিষ্টি মেয়েটি আমাকে অযথাই ভালোবাসার অঙ্গীকার করেছিলো, তাকে, ছেড়ে এসেছি বারান্দা দিয়ে দেখা কয়েক টুকরো আকাশ, বারান্দার পাশে গাছের ডালে কাকের বাসায় কয়েকটি নীলচে ডিম, ছেড়ে এসেছি উল্টোদিকের বাড়ির আলসেতে শুয়ে থাকা আহত বানর, ছেড়ে এসেছি ডাইনিং হলের সোফায় শুয়ে টিভি দেখা, ছেড়ে এসেছি শহরের বৃষ্টি আর রোদ।

আরো পেছনে চলে যাই। ছেড়ে এসেছি স্কুল থেকে ফিরে রান্নাঘরে বসে আমার মায়ের সাথে স্কুলের গল্প করতে করতে জানালা দিয়ে দেখা এক টুকরো নীল আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ডে শিমুল গাছটাকে, বারান্দার ফ্রেমে উল্টোদিকের বাড়ির বিশাল কৃষ্ণচূড়াকে, আমার শৈশবকৈশোরের প্রিয় বন্ধুরা, যাদের গায়ে এখনো আমার শৈশবের গন্ধ লেগে আছে, ছেড়ে এসেছি ছুটির দিনে আমার বাবার সাথে বসে ক্যারাম খেলা। ছেড়ে এসেছি এক একটি আশ্চর্য সৌরভে ভরা মাতাল দিন, মনে হয় এই তো সেদিন আমার ভাইয়ের বাইসাইকেলের রডে চড়ে বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছি, হাঁটতে বেরিয়েছি আমার বোনের হাত ধরে কৃষ্ণচূড়া গাছে ছাওয়া রাস্তা ধরে, স্কুল থেকে ফেরার পথে ঝগড়া করছি বন্ধুর সাথে।

আবারও সামনে আসি। ছেড়ে এসেছি প্রথম প্রেম, প্রথম বিচ্ছেদ, প্রথম সঙ্গম, প্রথম চুম্বন, প্রথম প্রত্যাখ্যান, প্রথম সাক্ষাৎ, প্রথম দায়িত্ব, প্রথম গর্জন। যাবতীয় প্রথমকে হারিয়ে অপ্রথমের পেছনে ছুটে চলি কেবল।

মাঝে মাঝে এদের জন্যে কাতর হয়ে থাকি। চলে আসার কিছুদিন আগে খুব মনে পড়ছিলো শৈশবের জীবনকে, যেখানে আমরা কয়েকজন একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে পরম স্বস্তির সাথে অনেকগুলো বছর বেঁচে ছিলাম, আমরা ভাইবোনবাবামা, যাঁদের কেউ এখন মৃত, বাকিরা ছড়িয়ে পড়েছি পৃথিবীর মহাদেশগুলোয়। আমার মায়ের হাঁটু জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম খুব, “কোথায়, আম্মা, কোথায় গেলো দিনগুলি?” আমার রুগ্না দুর্বল ছোট্ট মা সেদিন সবলা হয়ে ওঠেন শৈশবের দিনগুলির মতো, তিনি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলেন, “চলে গেছে বাবা, দিনগুলি চলে গেছে। ঐ দিনগুলি আবার আসবে, তোমার বাচ্চাদের জন্য। তাদের বোলো, তোমার বাবা, তোমার মা, তোমার ভাই তোমার বোনরা কেমন সুন্দর ছিলে, কত ভালো ছিলে একসাথে। তোমার স্কুলের কথা বোলো তাদের, বোলো তোমার বইগুলির কথা, তোমার বন্ধুদের কথা, তোমার সবকিছুর কথা ... কাঁদে না, আমার বাজান, কাঁদে না ...।“ আমি কাঁদি শুধু।

মায়ের সাথে কথা হয় না দীর্ঘদিন। এই দীর্ঘ নিঃসঙ্গ প্রবাসে প্রতি রাতেই নিজের বুকের ভেতরে তাঁর অশ্রুপাতের শব্দ শুনি। অনাগত সন্তানদের অভাবে গল্পগুলি বলি সচলের অদেখা বন্ধুদের, যাঁরা সন্তানের মতোই আপন হয়ে কাছে থাকেন। আর এই এক বছরেই কাটিয়ে চলি শত শত বছরের নিঃসঙ্গতা। জমতে জমতে আমার ঘরে নিঃসঙ্গতাই হয় সবচেয়ে শরীরী, সবচেয়ে আপন, সে হয় আমার মা, আমি হই তার কোলের শিশু, আর স্মৃতির স্তন্যপান করে চলি।

[]

1 comment:

  1. অনন্যা13 November, 2014

    আমারো প্রবাসের এক বছর পূর্ণ হলো , একদমই এরকম অনুভুতি হয়, খুবই খুবই অসাধারণ লাগলো নিজের অনুভুতির এমন আশ্চর্য লিখিত রূপ দেখে

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।