Saturday, August 30, 2008

যব ছোড় চলে ঢাকা নগরী

শতরঞ্জ কি খিলাড়িতে লখনৌ এর নওয়াব ওয়াজির আলি শাহ বৃটিশ দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে লখনৌ পরিত্যাগ করেছিলেন। কথিত আছে, কবি ও সুরকার, গায়ক ও ভাবুক নওয়াব সেদিন একটি গীত রচনা করেন, যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী, তব হাল আদম পর কেয়া গুজরি? মানুষ যখন লখনৌ শহর পরিত্যাগ করে চলে যায়, তখন তার অবস্থা কী দাঁড়ায়?

ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথাটা বলা যায় ঢাকা সম্পর্কেও। ঢাকা ছেড়ে মানুষ যখন চলে যায়, তখন তার অবস্থা কেমন দাঁড়ায়?

বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত সুযোগসুবিধা প্রায় একপেশেভাবে ঢাকাকে ঘিরে বেড়ে উঠেছে। ঢাকার বাইরে থাকা মানে বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া। আর কোন নগরীই, এমন কি এককালের সবচেয়ে পরিকল্পিত আর পরিচ্ছন্ন চট্টগ্রামও এখন আর ঢাকার মতো নেই। আমরা বাড়ছি রাজধানীকে ঘিরে, রাজধানীর সীমাটুকু অতিক্রম করলেই এক অচেনা, অনুন্নত বাংলাদেশ ঘিরে ধরছে আমাদের।

ঢাকা নাকি এককালে ওপর থেকে একটা বাগানের মতো দেখাতো। কথাটা যার কাছ থেকে শুনেছি, তাঁর পিতা নাকি পাকিস্তান আমলে কীটনাশকবাহী বিমানের বৈমানিক ছিলেন। হয়তো সত্যিই তেমন হবে। আমি গোটা ঢাকা শহর উঁচু সব ইমারতের ওপর থেকে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বেশির ভাগ এলাকাতেই দৃশ্যটি অতি কুৎসিত। প্ল্যানার্স টাওয়ারের ওপর থেকে কেউ উত্তরপশ্চিম দিকে তাকালে অসুস্থ বোধ করতে পারেন। ঘিঞ্জি ধূসর কংক্রীটের এক একটা বিল্ডিং, যতদূরে চোখ যায়।

ঢাকার মূল সমস্যা দু'টি, এর অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও সামান্য রাস্তাঘাট। যত সহজে একটা শহরে লোক বাড়ে, সেই বাড়তি লোকের জন্যে আবাসন তৈরি হয়, তত সহজে তার রাস্তাঘাট বাড়ে না। ফলে ঢাকায় এখন তেরো মিলিয়ন মানুষ বাস করেন, এবং তাঁরা সেই আঠারো বছর আগে শেষ রাস্তা নির্মাণের কাজটি দেখেছেন পান্থপথে। এখন শুনছি বিজয়সরণীকে তেজগাঁওয়ের কোলে তুলে দেয়ার কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। ঢাকাবাসী এতে নিঃসন্দেহে উপকৃত হবেন।

কিন্তু তারপরও ঢাকার হৃতরূপ ফিরে আসা এত সহজ নয়। যাঁরা সকালে গুলশান এলাকায় শহরের দক্ষিণপশ্চিমাংশ থেকে অফিস করতে যান, তাঁরা জানেন, সেটি কী বীভৎস একটি অভিজ্ঞতা। রাস্তাভর্তি জ্যাম, বাহন পাওয়া মুশকিল, জঘন্য শোরগোল আর ধোঁয়া। আমি বেড়ে উঠেছি ঢাকার বাইরে, যখন অফিসে যেতাম, মনে পড়ে যেতো, আমি আর আমার বাল্যবন্ধু কিভাবে রিকশায় চড়ে আমার শৈশবের নিরিবিলি ছায়াছন্ন অপূর্ব সেই শহরের রাস্তা ধরে স্কুলে যেতাম। চোখ ফেটে পানি আসতো। স্মৃতিকাতর হয়ে নয়, ধোঁয়ায়। একটি কথাই মনের মধ্যে ঘুরেফিরে অনুচ্চারিত থেকে ... বালের জ্যাম!

ঘুরেফিরে কেবল যানচলাচলব্যবস্থারই নিন্দা করছি। তার সাথে যোগ করুন বাতাসের অবস্থা। ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় ফেরার সময় একটা পর্যায়ে এসে ফুসফুস পরিষ্কার টের পায়, সে ঢাকায় ঢুকছে। আমি ঢাকার বাইরে যতবারই গিয়েছি, বাতাসের গুণের এই পার্থক্যটি একেবারে রগে রগে উপলব্ধি করেছি।

যোগ করুন খেলার মাঠের অভাব। ঢাকায় মাঠ বড় কম। বাচ্চারা খেলবে কোথায়? রাস্তায়, অবশ্যই। নয়তো ঘরে খেলবে। নয়তো ছাদে। হায়রে। বড় হয়েছি বিশাল সব মাঠে খেলে খেলে। আমার এক বন্ধুর একটা নিজস্ব ক্রিকেট মাঠই ছিলো (সেটিও ২০০২ সালে গিয়ে দেখেছি, অর্ধেক গায়েব হয়ে গেছে)। স্কুলের পাশে ছিলো বিশাল মাঠ, বাড়ির পেছনে ছিলো বিশাল মাঠ। ঢাকায় হাতেগোণা কয়েকটি মাঠ, সেগুলিতেও শিশুদের অ্যাকসেস সামান্য।

এবার ভাবুন, ঢাকায় আছেটা কী। ঢাকায় আসলে সবই পাওয়া যায়। লোডশেডিং নিয়ে ফোঁপাচ্ছেন? ঢাকার বাইরে যান। কেঁদে কূল পাবেন না। পানি? গ্যাস? স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল? লাইব্রেরি? সিনেমা হল? বিদেশী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র? দূতাবাস? সরকারি প্রতিষ্ঠানের সদরদপ্তর? ভালো ব্যাঙ্কিং সুবিধা? ভালো শপিং মল? সবই আছে ঢাকায়। শুধু একটু শ্বাস ফেলে নড়েচড়ে বাঁচার সমস্যা।

আসুন এবার ভাবি, আমরা ঢাকা ছেড়ে চলে যাবো অন্য কোথাও। বাংলাদেশের অন্য কোন শহরে। কোন নিরিবিলি, মৃদু শহর, যেখানে রাধাচূড়া গাছ আছে, যে গাছে লেজঝোলা পাখি বসে, যেখানে বাড়ির পাশের পুকুরে চালতা পড়লে ঝুপুস করে শব্দ শোনা যায় অপরাহ্নে। যেখানে আপনি নিশ্চিন্তে সাইকেলে চড়ে চলতে ফিরতে পারেন, যেখানে চকিতহরিণপ্রেক্ষণা তন্বী তরুণীরা আপনার জুলজুলে চোখের চাহনির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে একটু জলদি করে পথ পাড়ি দেয় ... হেঁ হেঁ হেঁ, যাই হোক, যা বলছিলাম। ধরে নিই আমাদের সেই কাল্পনিক শহরের নাম ঝোলপাতিয়া। এখন বলুন, কী কী নাগরিক সুবিধা পেলে ঢাকা ছেড়ে ঝোলপাতিয়ায় বসবাস শুরু করবেন? হাল আপ পর কেয়া গুজরে?

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।