Saturday, August 09, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৪৭

১.
কাসেল শহরে প্রচুর অগ্নিকান্ড হয়। অন্তত, অগ্নিকান্ডের রিপোর্ট আসে প্রচুর। রোজই তীব্রস্বরে সাইরেন বাজিয়ে ফয়ারভেয়ার বা দমকলবাহিনী ছুটে যায় বিভিন্ন প্রান্তে।

কাসেল শহর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের অন্যতম আস্তানা ছিলো, এখন যেখানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানেই ছিলো নাৎসি বাহিনীর অস্ত্র তৈরির কারখানা। চিমনিটা এখনো রয়ে গেছে, সেটাকে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তবে চিমনির ওপরে সেলুলার ফোনের বেজ স্টেশন বসানো হয়েছে। মিত্রবাহিনী কাসেল শহরটা মোটামুটি চূর্ণ করে দিয়েছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, তাই এর বেশির ভাগটাই আবার নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। পুরনো শহরাংশ নর্ডষ্টাট (উত্তর শহর)-এ কিছু পুরনো ঢঙের বাড়ি টিকে আছে, যেগুলোতে আগুন লাগার সম্ভাবনা বেশি, সেখান থেকেই রিপোর্ট আসে বেশি। দমকলকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছেই, তাই প্রায় প্রত্যেকদিনই তাদের সশব্দ অভিযান কানে বাজে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভবন, যেটাকে আমরা কাভে-দ্রাই বলি, সেখানে বড় ল্যাবরেটরিগুলো স্বাভাবিকভাবেই হয় নিচতলায় বা মাটির নিচে, সেখান থেকে মাঝে মাঝে ফায়ার অ্যালার্ম চলে যায় দমকলের কাছে, আমাদের তখন রয়েসয়ে ভবন ছেড়ে বাইরে গিয়ে জমা হতে হয়। এদের তড়িৎগতি দেখার মতো, পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভবনের যে অংশ থেকে অ্যালার্ম এসেছে, সেখানে সুশৃঙ্খলভাবে পজিশন নেয় দমকলযোদ্ধারা। দুয়েকবার সঠিক আগুনের খবর এসেছে, বেশিরভাগ সময়ই অন্য কোন ভুলে অ্যালার্ম বেজে ওঠে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়কে জরিমানা গুণতে হয় সাতশো ইউরো।

আমি যে পাড়ায় থাকি, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের না হলেও পুরনো, যাকে বলা হয় আল্টবাউ। সেখানে হিটিং সিস্টেমের ধরনও পুরনো, যার ফলে আগুন লাগার সম্ভাবনা আরেকটু বেশি নতুন বাড়িগুলোর থেকে। আমি ঘরে বসেও তাই সাইরেনের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাই না, হপ্তায় অন্তত তিনদিন শুনতেই হয়।

জার্মানিতে শক্তি খরচ পদ্ধতিকে আরো দক্ষ করে তোলার জন্যে এখন বাড়ি নির্মাণের সময় বেশ কিছু নতুন গাইডলাইন ধরিয়ে দেয়া হয়। বর্গমিটার পিছু বছরে শক্তি খরচ কমিয়ে প্রায় তিনভাগের এক ভাগে নিয়ে আসা সম্ভব, যদি বাড়িঘরের ইনসুলেশন নতুন গবেষণালব্ধ নকশা অনুসরণ করে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে।

২.

রান্নাবান্না করতে ভালো লাগে না বেশিরভাগ সময়ই। সসেজ-রুটি, ফ্রিকাডেলে-রুটি কিংবা পিৎজার ওপর দিয়ে চালিয়ে দিই, নিতান্ত দেশি খাবার খেতে ইচ্ছা করলে হের চৌধুরীর সাথে কোয়ালিশনে রান্না করি। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, গরুর মাংস। আমার বাসায় ডিপ ফ্রিজ নেই বলে গরুর মাংস একবারে কিনে হপ্তা ধরে সংরক্ষণ করতে পারি না, তাই চৌধুরীর বাড়িই ভরসা। পুরনো ঢাকার জনৈক মামার সাগরেদি করে হের চৌধুরী গরুর মাংসে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন, তাই তাঁকে কিছু কাটাকুটি করে এগিয়ে দিলে তিনি দয়াপরবশ হয়ে সেই বেলার খাবারটা তাঁর ওখানেই সেরে যেতে বলেন।

তবে যখন চৌধুরী ব্যস্ত থাকেন, কিংবা আমারই ব্যস্ততার কারণে বাড়ি ছেড়ে বেরোনো সমস্যা হয়ে যায়, তখন নিজেকেই রেঁধে খেতে হয়। আমি কোন রান্নার বই সাথে নিয়ে আসিনি, বিপদে পড়ে দেশে ফোন করেও রেসিপি জেনে নিইনা, অনলাইনেও রান্নার কোন বাতেনি কৌশল খুঁজি না। আমি আবিষ্কারের চেষ্টায় থাকি। বেশিরভাগ সময়ই অখাদ্য হয় সেগুলি, তবে ফাঁকতালে কিছু কিছু জিনিস জিভে বেশ ইতিবাচক হিট করে। উদাহরণ দিই,

1. খিচুড়ি হয়ে ওঠার মিনিট দশেক আগে তাতে পালং শাকের কুচি বা বল ছেড়ে দিয়ে একটা ঘুঁটা মারতে পারলে জিনিসটার রং একটু সবজে মেরে আসে, আর দারুণ একটা স্বাদ হয়। এক্ষেত্রে খিচুড়িকে ভুনা হলে চলবে না, কিঞ্চিৎ ল্যাটকা হতে হবে, আর মুগ-মসুর দুই পদের ডাল মিলিয়ে রান্না হতে হবে। তবে কেউ যদি ডিসকভারি চ্যানেলে গরিলার গু কখনো দেখে থাকেন, তাঁর খেতে একটু অভক্তি লাগতে পারে।

2. একদিনের পুরনো মসুরের ডালকে আরেকটু পানি দিয়ে একেবারে গলিয়ে মারুন। তারপর সয়া সস আর কুচো চিংড়ি দিয়ে ভাজুন। তারপর সেটা ন্যুডলসের সাথে আরেকদফা ভাজুন। একেবারেই অন্য কিসিমের স্বাদ হবে, খেয়ে ভালোই লাগার কথা। পরিমাণ আপনাকে আন্দাজ খাটিয়ে দিতে হবে আর কি।

3. আজ রান্না করলাম মুরগি-মটর। আমি নিশ্চিত, এ নতুন করেই চাকা আবিষ্কার। পেঁয়াজ, গাজর, ক্যাপসিকাম, কাঁচামরিচের ফালি হাঁড়িতে চড়ান, তার ওপর মাখন দিন কিছু, তারপর জিরা দিন সামান্য। মাখন গলার পর ঘুঁটা মেরে চলুন। তারপর যোগ করুন রসুন। তেজপাতা এলাচ দারচিনি গোলমরিচ লবঙ্গ দিয়ে দিন। ঘাঁটুন, ভাজুন কিছুক্ষণ। তারপর হলুদ-মরিচ-ধনিয়া ঢালুন। ঘুঁটা মেরেই চলুন। তারপর মুরগির বুকের মাংসের ফিলে [Fillet] কুচি কুচি করে দিন সেখানে, সাথে কিছু আদাকুচি। আবারও ঘুঁটা মারুন। তারপর যোগ করুন মটরশুঁটি, পরিমাণ আন্দাজমতো। তারপর আবারও ঘুঁটৌষধি প্রয়োগ করুন যতক্ষণ জোশ বজায় থাকে। তারপর আন্দাজমতো পরিমাণ লবণ ছড়িয়ে দিয়ে তাদের গলে জল হবার সুযোগ দিন। পেঁয়াজের পরিমাণের ওপর নির্ভর করবে ঝোলের পরিমাণ। সেদ্ধ হয়ে যাবার পর গরম গরম ভাতের সাথে খাবেন নাকি রুটি দিয়ে খাবেন সেটা আপনার ব্যাপার।

৩.
নানা গ্যাঞ্জামের পর একটু ঝিমানোর ফুরসত পেয়ে সেদিন দেখলাম ফ্র্যাকচার। দুর্দান্ত লেগেছে। অ্যান্থনি হপকিন্স সেই সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস এর ছোঁয়াচ কাটিয়ে উঠছেন না কিছুতেই। ঘাগু বদমায়েশ চরিত্রে তাঁর সমকক্ষ অভিনেতা আছেনও কম। বহু আগে দেখেছিলাম রোড টু ওয়েলভিল, রীতিমতো অশ্লীল কমেডি, সেটা খুঁজলাম নেটে, কিন্তু পেলাম না।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।