Thursday, July 03, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৪৩

আমি জীবনে প্রথম অ্যালকোহল চেখে দেখেছি আট বছর বয়সে। দোষটা আমার ভাইয়ের। তারও তখন ঠিক আইনসিদ্ধ উপায়ে মাল খাবার বয়স হয়নি। সবজে একটা বোতল হাতে নিয়ে বড় ভাই চোরের মতো মুখ করে সন্ধ্যেবেলা চুপিচুপি ছাদের দিকে গেলে ছোট ভাইয়ের অনুসন্ধিৎসু মনে কিছুটা দোলা লাগা স্বাভাবিক। আমি অচিরেই বড় ভাইদের সেই বিয়ারের নিষিদ্ধ আড্ডায় হানা দিলাম। প্রাচীন ভারতের কূটনীতির তৃতীয় পদ্ধতি প্রয়োগের প্রস্তাব দিয়ে বসেছিলো উপস্থিত এক পামর। কিন্তু আমার বড় ভাইয়েরা খুব স্নেহ করেছেন আমাকে সারা জীবন, মদের বোতল হাতে দন্ডনীতি প্রয়োগের চিন্তা তাঁরা করেননি। তাছাড়া মার খেয়ে আমি তো সোজা গিয়ে আমার বাবাকে বলে দিতে পারি। সেক্ষেত্রে ছাদ থেকে পাইপ বেয়ে নামতে হতে পারে সবাইকে, সিঁড়ি দিয়ে নামার সাহস কেউ করবে না। প্রাচীন ভারতীয় কূটনীতির প্রথম তরিকায় তাঁরা কিছুক্ষণ চেষ্টা করলেন। "না না ভাইয়া, যাও ঘরে যাও, আমরা পরে আসবো, এসে বাগাডুলি খেলবো", এই গোছের সামনৈতিক মিষ্টবাক্য প্রয়োগে আমার মন ভজানোর চেষ্টা করলেন তাঁরা। আমি শিশু ছিলাম, কৌতূহলী ছিলাম, তাই অসততা নয়, কৌতূহলের বশেই ঘুষ দাবি করে বসলাম, "তোমরা কী খাও? আমিও খাবো!"

বড় ভাইয়েরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেদের মধ্যে ম্লেচ্ছ ভাষায় কী যেন মত বিনিময় করে শেষে একটা গ্লাসে অল্প একটু তরল ঢেলে আমাকে দিলেন। দাননীতির সাথে আরও কিছু সামনীতির পাশাপাশি দন্ডনীতির দিকে আবছা একটা ইঙ্গিতও করলেন একজন। আমি সন্তুষ্ট হয়ে গবগব করে সেই তরলে চুমুক দিলাম।

বিচ্ছিরি, অতি বিচ্ছিরি স্বাদ ছিলো সেই বিয়ারের। এতই বিচ্ছিরি যে তার পরবর্তী পাঁচবছর আমি আর বিয়ার খাইনি। খেতে চাইওনি।

কিন্তু পাঁচবছরে কত কিছু ঘটে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র দিয়ে কত জল গড়ায়, কত নিরীহ ভালোমানুষ বিয়েশাদি করে মারা পড়ে, এ ওর সাথে ভেগে যায়, প্রেমিকার নতুন প্রেমিকের ছোটবোনের সাথে প্রেম হয়, আর একটা ফালতু বিয়ারের স্বাদ জিভ থেকে মুছে যেতে এমন আর কী সমস্যা? আমি তেরো বছর বয়সে আবার বিয়ারপানের সুযোগ পেয়ে সেটার সদ্ব্যবহার করলাম। এবারও ভিক্টিম আমার ভাই। তিনি মহাবিরক্ত। প্রথমে বলার চেষ্টা করলেন, "সেইদিন না দিলাম?"

আমি ইউরি গ্যাগারিনকে হার মানিয়ে নভোমন্ডল থেকে আছড়ে পড়লাম মাটিতে। "সেইদিন মানে? পাঁআঁআঁআঁচ বচ্ছর আগে একবার দিসো!"

ভাই ভুরু কুঁচকে কী যেন ভেবে ম্লেচ্ছ ভাষায় কী যেন বললেন গোঁ গোঁ করে। তখনও ভাষাটা তেমন ভালো জানি না। মনে হলো তিনি খুব একটা সন্তুষ্ট না। আমি পাত্তা দিলাম না, বড় দেখে একটা বৃটিশ আমলের গ্লাস নিয়ে এসে পাতলাম বোতলের নিচে। ভাই গ্লাসের আকার দেখে চোখ পাকালেন। আমি নির্বিকার। ব্ল্যাকমেইল যখন করছি, তখন এত লজ্জা করলে চলে না।

সেদিন বিয়ার খেয়ে ভালোই লেগেছিলো। সময়ের সাথে এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন সেদিন টের পাইনি, ভেবেছিলাম, এবার হয়তো জিনিস ভালো, কিন্তু এখন মনে হয়, সেবার আমার রসনা কিছুটা পরিপক্ক হয়েছিলো।

মাল খাবার সময়গুলো কেন পাঁচ বছর পর পর ফিরে আসে, কে জানে? তারও পাঁচবছর পর আবার আমার সুযোগ আসে। এবার আর ভাইকে হুমকি দিয়ে নয়, বন্ধুদের নিয়ে গ্যালাক্সিতে হানা। গাঁটের পয়সা খরচ করে রীতিমতো কিনে বিয়ার খাওয়া।

পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লভ্য বিয়ার, ভদকা, জিন আর হুইস্কি পান করার সুযোগ এসেছিলো। আমার ব্ল্যাকমেইলের শিকার সেই বড় ভাই একবার স্বল্পকালীন প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার সময় আমার জন্যে জনি ওয়াকারের এক অপূর্ব বোতল উপহার নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু অতীত নিগৃহা স্মরণ করেই কি না কে জানে, সেই উপহারের সিংহভাগ তিনিই গলাধঃকরণ করেছিলেন। তখনও আমরা গা ঢাকা দিয়ে মদ্যপান করতাম। আমাদের বাড়ির কাজের মেয়ে একবার আমার ওয়ার্ডরোব সাফ করতে গিয়ে একটি সুদৃশ্য বোতল খুঁজে পেয়ে তৎক্ষণাৎ আমার মায়ের কাছে রিপোর্ট করে, এবং তিনি সেটিকে বার করে ধুয়ে মুছে আমার পড়ার টেবিলের ওপর রেখে দেন। বাড়ি ফিরেই সেদিন তোপের মুখে পড়েছিলাম।

আমি ততদিনে বিয়ারের ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছি। বাংলাদেশে আমার পছন্দের বিয়ার ছিলো কার্লসবার্গ। সেটা পাওয়া না গেলে ফস্টারস। একদমই পছন্দ করতাম না হাইনিক্কেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ টার্মের চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয়ার কয়েকমাস আগে জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে মিউনিখে কয়েক হপ্তার জন্যে একটা ভাষাশিক্ষার কোর্স করার সুযোগ হস্তগত হয়েছিলো। সেই বাহান্ন দিন আমি হাতের নাগালে বাভারিয়ার যতো রকমের বিয়ার ছিলো, সবই চেখে দেখেছি। ফ্রানৎসিস্কানার, এরডিঙ্গার, আউগুস্টিনার, পাউলানার, লোয়ভেনব্রয়, হাকার-প্শর, আর নাম মনে পড়ছে না। এদের মধ্যে আউগুস্টিনার আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো। পরে এসে দেখেছি, এগুলো খুবই ছোট ছোট স্থানীয় ভাঁটির বিয়ার, মিউনিখের আশপাশ ছাড়া নাকি পাওয়া যায় না। কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের প্রথম মনমরা পার্টিতে বিয়াররসিকদের সাথে আলাপ করে জানতে পারলাম, বামবার্গ এর আশেপাশে নাকি দুর্ধর্ষ সব বিয়ারের ভাঁটি আছে, এবং সেসব বিয়ার কেবল বামবার্গ শহরেই পেয়, অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। বামবার্গে তাই একটা ঢুঁ মারার পরিকল্পনা মনের মধ্যে ঘুরছে।

দেশে ফিরে আমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে বিয়ার পানে ক্ষান্তি দিই। বাভারিয়ার সেইসব বিয়ারের সাথে ফস্টার্সের কোন তুলনাই হয় না। পানের জন্যে আমি আরো গুরুতর জিনিস বেছে নিই।

এর পরবর্তী চার বছরের পেশাজীবী জীবনে আমি গাঁটের পয়সা খরচ করে, লোকজনকে হুমকি দিয়ে, ভালোবাসা ও স্নেহজনিত উপহার এবং সবশেষে ঘুষ হিসেবে নিয়মিত ভদকার বোতল বগলস্থ করেছি। বোতলে মনোনিবেশ করার সময় আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিলো আমার সেই বড় ভাইয়ের মুখ। উঁহু, ঠিক স্মৃতিতে নয়, তিনি আমার ঘরে টোকা দিয়ে ঢুকে বাতাস শুঁকে বলেছিলেন, "হোয়াটস আপ?"

পৃথিবী গোল, এ কথা শুনেছি, বইয়ে পড়েছি, টিভিতে দেখেছি, কিন্তু উপলব্ধি করতে পারি সেইদিন। হোয়াট গোউজ অ্যারাউন্ড, কামজ অ্যারাউন্ড। আমার সেই বড় ভাই, যাকে মোটে কয়েকবার ব্ল্যাকমেইল করে সবমিলিয়ে হয়তো আধ লিটার বিয়ার খেয়েছিলাম, তিনি রাহুর মূর্তি ধরে আমার সাধের ভদকার বোতল গ্রাস করতে এসেছেন! এ হতে দেয়া যায় না। আমি বোতলের কিছু ভদকা সারেন্ডার করে সারারাত চিন্তা করে শেষে ভোরে আমার মায়ের কাছে গিয়ে ভদ্রভাবে ঘরে বসে মদ্যপানের অনুমতি চাই। তিনি ছাত্রাবস্থায় আমাকে বমাল গ্রেফতারের কথা স্মরণ করেই হয়তো কিছুক্ষণ চিন্তা করে অনুমতি দেন, শর্ত একটিই, খেলে একা খেতে হবে, আর কাউকে সাথে নিয়ে নয়। আমি আমার দুর্বৃত্ত বড় ভাইয়ের কবল থেকে বোতলটিকে উদ্ধার করে তখনকার মতো ফ্রিজে রেখে দিলাম। পরবর্তীতে সেভাবেই রাখতাম।

আমি দীর্ঘদিন বাড়িতে বসে একা একা মদ খেয়েছি। আমার বন্ধুদের সাথে খেয়েছি অন্যত্র বসে, কারণ সবান্ধব পানের অনুমতি বাসায় ছিলো না। মদ খাবার পর যে দুটো সাধারণ অবস্থা হয়, হ্যাপি আর হাই, বাংলা করা যেতে পারে তুষ্ট আর দুষ্ট, তার মধ্যে হ্যাপিতেই ছিলাম বেশিরভাগ সময়। বমি বা শোরগোল করে উৎপাত বাড়াইনি কখনো। সাধারণত ফূর্তি ফূর্তি ভাব একটু বেড়ে গেলে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতাম অনেক, কখনো কখনো ফোনে একে ওকে গান শুনিয়ে জ্বালাতন করতাম। মাল খেয়ে একবারই বেসামাল হুল্লোড় করেছিলাম মীরপুরে আমাদের এক বন্ধুর বাড়ির ছাদে, যতটা না মদের ঘোরে, তারচেয়ে বেশি আড্ডার আনন্দে।

কাসেলে এসে আমার মদ্যপানের সম্ভাবনা বেড়েছে, কিন্তু সুযোগ বাড়েনি। এখানে কোন লুকোছাপার ব্যাপার নেই, পয়সা দিয়ে বোতল কিনে খাও যত খুশি। কিন্তু সপ্তাহভর নানা ভ্যাজালে থাকি বলে সেভাবে মন খুলে টানা যায় না। কাসেলবাসী বাঙালিদের মধ্যে আমি আর হের চৌধুরীই মদ্যপ, বাকিরা কেউই স্পর্শ করেন না। অতএব মাঝে মাঝে চৌধুরীর সাথে বসেই মদ খাওয়া হয়। এ ব্যাপারে তিনি যথেষ্ঠ উৎসাহী, প্রায়ই এক বসায় এক বোতল ভদকা খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে লম্বাচওড়া বক্তৃতা দেন। বহু কষ্টে ভদকা থেকে তাকে ওয়াইনের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে হয়। বরফ পড়তে দেখলেই তিনি ভদকা আবহাওয়ার কথা বলেন, বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব দেখলেই হুইস্কির প্রস্তাব করেন। গেত্রেঙ্কেমার্কট (পানীয়ের দোকান) এ গেলে আমরা দুইজনই দীর্ঘসময় ধরে বোতলের শেলফের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে দেখি। প্রায়ই দেখা যায়, কোন একটা কাজ "পরে করা যাবে" এমন হিসেব করে দুই বোতল ওয়াইন কিনে বসে পড়ছি, কিংবা গোটা ছয়েক বিয়ার।

আজ "দুনিয়ার মালখোর এক হও" পোস্টে জাহিদ হোসেনের এক কৌতূহলী মন্তব্যের সূত্র ধরে এই স্মৃতিচারণ আর দিনপঞ্জি লিখলাম। মদ আমাকে খাওয়া শুরু করেনি এখনো, আমিই মদকে খাই। ভালো লাগে। মদ খেলে আমার মনে আনন্দময় স্মৃতিগুলোই ভেসে ওঠে, ঠিক যেভাবে প্রায়ই রাতে ঘুম ভেঙে যায় দুঃস্বপ্ন দেখে। মালের ঘোরে আমার সব কিছু খুব সুখপ্রদ মনে হয়। অনেক হাসি তখন। ভুলে যাই, যে দুনিয়াজুড়া পচুর গিয়ানজাম।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।