Sunday, July 27, 2008

বাংলাদেশ কি ডুববে?

প্রথম আলোতে এই লেখাটা মনোযোগ দিয়ে পড়লাম।

আমি ভূতত্ত্ব, জলতত্ত্ব বা জলভূতত্ত্বের ছাত্র নই, আবহাওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কেও আমার জ্ঞান নগণ্য। এম. এইচ. খান স্যারের সাথে তাই তর্ক করার স্পর্ধাও আমার নেই। তবে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করতে গিয়ে আমাদের শক্তি ব্যবস্থার সাথে আবহাওয়া এবং জলবায়ুর সম্পর্ক নিয়ে দুটি সেমিস্টারে কিছু কিছু পড়তে হয়েছে। আইপিসিসির রিপোর্টটি নিয়ে সেখানে আমাদের প্রফেসররা একাধিকবার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। কার্বন নিঃসরণের সাথে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্পর্ক খুবই নিবিড় (মুদ্রার অন্য পিঠে হলেও), তাই এ প্রসঙ্গ উঠতে বাধ্য।

আমি যতদূর জানি, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির যে সব সিনারিও ও মডেল রয়েছে, তা খুবই জটিল (কমপ্লেক্স)। এক একটি সিনারিওতে বেশ কিছু ব্যাপার ধরে নেয়া হয়, তাতে চলক ও প্যারামিটারের সংখ্যা প্রচুর। ব্যবস্থাকৌশল পড়তে গিয়ে আমরা দেখেছি, এ ধরনের জটিল ব্যবস্থায় এই প্যারামিটারগুলোর মানে সামান্য পরিবর্তন হলেই গোটা ব্যবস্থার উলটপুরাণ হতে সময় লাগে না। ফেজ স্পেস বিশ্লেষণ করে এ ধরনের জটিল ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা পরখ করা যায়। একটি ছোট উদাহরণ দিই, তিনটি সমান ভর যদি পরস্পর সমান দূরত্বে অবস্থান করে, তাহলে তাদের মধ্যে কার্যকর মহাকর্ষীয় বল পরিমাপের জন্যে কোন সরল গাণিতিক পদ্ধতি নেই। ব্যবস্থাটির জটিলত্ব সাধারণ ধারণার অতীত।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির ব্যাপারটিও এর চলকগুলোর ভেতরের সম্পর্কের কারণে জটিল। কার্বণ নিঃসরণ এর অনেকগুলি চলকের মধ্যে একটি। পৃথিবী মূলত সূর্যের পাল্লায় পড়ে গরম হয়, কিন্তু খুব বেশি গরম হতে পারে না, কারণ সেই তাপ আবার মহাশূন্যে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও পৃথিবীতে চলমান। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এ কারণেই পনেরো ডিগ্রী সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কিন্তু যে হারে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসৃত হচ্ছে, তাতে করে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের উপস্থিতি মহাশূন্যে তাপ ফেরত পাঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়াটিকে ব্যাহত করছে, ফলে পৃথিবী তাপ না হারিয়ে তা একটু একটু করে জমিয়ে গরম হচ্ছে।

এই ব্যাপারটি যথেষ্ঠ সরল, একে কয়েকটি চলক ও প্রক্রিয়া দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু এর সাথে আরো অনেক বিষয় জড়িত। পৃথিবী তাপ ফিরিয়ে দেয় মূলত দুই প্রক্রিয়ায়, প্রতিফলন ও বিকিরণ। এই প্রতিফলন নির্ভর করে পৃথিবীপৃষ্ঠের ওপর কিছুটা, আর বায়ুমন্ডলের গঠন ও মেঘের প্রকৃতির ওপর বাকিটা। বালি বেশ ভালোভাবে তাপ প্রতিফলিত করতে পারে, সদ্য পড়া বরফ খুব ভালোভাবে, পুরনো বা জমাট বরফ এই দুইয়ের মাঝামাঝি, পানি তেমন একটা না। এখন, যদি সামান্য তাপমাত্রা বাড়ে, পৃথিবীর কিছু এলাকার বরফ গলে যাবে। ফলে তাপ ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতাও পৃথিবীর সামান্য কমে যাবে। এর ফলে বাড়তি তাপ জমবে, তাপমাত্রা আরেকটু বাড়বে, আরো বরফ গলবে, আরো তাপ জমবে, তাপমাত্রা আরেকটু বাড়বে ... যেটাকে আমরা পজিটিভ ফিডব্যাক বলি, তা-ই ঘটবে। দ্রুত, আরো দ্রুত গলতে থাকবে বরফ।

ওদিকে আমরা কিন্তু কার্বন ডাই অক্সাইড আর অন্যান্য অ্যারোসলও সমানে ছাড়ছি বায়ুমন্ডলে। এগুলিও তাপ ধারণ করে রাখে, এবং মহাকাশে তাপ ফেরত পাঠাতে বাধা দেয়। তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে একে নিয়ন্ত্রণের জন্যে, অর্থাৎ কুলিঙের জন্যে আমরা আরো বেশি শক্তি ক্ষয় করবো, ফ্যান বেশি ঘুরবে, এসি বেশি চলবে, এবং তা জ্বলবে ফসিলভিত্তিক জ্বালানি পুড়িয়ে পাওয়া শক্তি দিয়ে, অর্থাৎ আরো কার্বন ডাই অক্সাইড, অর্থাৎ আরো গরম ... আবারো পজিটিভ ফিডব্যাক।

কোন এলাকায় বরফ হঠাৎ যদি গলতে শুরু করে, তাহলে তার আবহাওয়ার পরিবর্তন নির্ভর করে আরো শ'খানেক ফ্যাক্টরের ওপর। আজ যদি উত্তর মেরুর বরফ গলে, তাহলে সেই পানি নিচে নেমে আসবে, মিশবে উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের সাথে, এবং তাকে ব্যাহত করবে পানির লবণাক্ততার ভিন্নতার কারণে। এর ফলে উত্তর ইয়োরোপে হুট করে বরফ যুগ শুরু হয়ে যেতে পারে। তা যদি হয়, তাহলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আবার উল্টোবাগে মুখ ঘোরাতে পারে।

এরকম অসংখ্য ফ্যাক্টর আছে গোটা ব্যবস্থাটিতে। হাজারের কাছাকাছি চলক ও প্রক্রিয়া। গত সেমিস্টারে আমরা ঈস্টার দ্বীপে সভ্যতা ধ্বংসের ব্যবস্থাটিকে পাঁচটি চলক ও গোটা তিরিশেক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পেরেছিলাম (যদিও অনেক সরলীকরণকে গুঁজে দিয়ে), আর এমন একটা সিরিয়াস ব্যাপারে ব্যবস্থা-বিশ্লেষণ যে তার চেয়ে বহুগুণে জটিল হবে, তাতে আশ্চর্য কী?

অনেক প্যাচালের পর আসি আসল প্রসঙ্গে। উত্তর মেরুর বরফ ভাসমান বরফ। তা পুরোটা গলে পানি হলেও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা সেই গলে যাওয়া বাড়তি পানির কারণে খুব একটা বাড়বে না। সমস্যা হচ্ছে গ্রীনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকা আর অন্যান্য সব হিমশৈল নিয়ে। সেখানে মজুদ আটকে পড়া পানির পরিমাণ অনেক। উত্তর মেরুর বরফ গললে আশঙ্কা হচ্ছে সেই প্রতিফলনক্ষমতা কমে গিয়ে তাপ ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে পৃথিবীর পারফরম্যান্স কমে আসা, এবং ফলত তাপমাত্রার বৃদ্ধির কারণে সেই গ্রীনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকা আর হিমশৈলগুলির বরফ গলার আশঙ্কা।

শ্রদ্ধেয় ডঃ খান যেভাবে পলি সঞ্চয় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধিকে ইকুয়েট করছেন, সেই দুটি হার কিন্তু সমান না-ও হতে পারে। এ অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত যদি কোন কারণে ব্যাহত হয়, তাহলে হিমালয়ভিত্তিক নদীগুলির মৃত্যু ঘটতে পারে। তখন পলিসঞ্চয় হার মানতে পারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির কাছে। তাছাড়া বছরে কয়েক মিলিমিটার করে বর্তমানে বাড়লেও, হঠাৎ এই স্থিত ব্যবস্থা কোন একটি চলকের কোন একটি মান অতিক্রমের কারণে হঠাৎ পাল্টে যেতে পারে, কয়েক বছরের মধ্যেই গণেশ উল্টে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ প্রক্রিয়াকেই লরেন্টজ বলেছিলেন, প্রজাপতির পাখার ঝাপটায় ঘূর্ণিঝড়। কোথাও, কোন একটি চলক চুপচাপ বসে সবকিছু দেখছে। তার মানটি নির্দিষ্ট একটি মান অতিক্রম করার সাথে সাথে সে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়িয়ে ইস্রাফিলের শিঙায় পোঁ বাজিয়ে দিতে পারে। এটি যে সম্ভব, তা প্রমাণ করে পৃথিবীর অতীত ইতিহাস। যদিও আরো ধীরগতিতে হয়েছে ব্যাপারটি, কিন্তু একসময় পাপুয়া নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া আর তাসমানিয়া একই মহাভূখন্ড সাহুলের অন্তর্গত ছিলো। ফলে একই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী এই তিনটি ভূখন্ডে বসত করেছে। পরবর্তীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে তারা একে অপরের হাত ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে কত লক্ষবার ওঠা নামা করেছে, তার কোন হিসেব নেই। আমরা এ-ও জানি না, হঠাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যে এমনটি ঘটেছে কি না। গত সেমেস্টারে ডঃ লাঙ্গে আর ডঃ রোরিগের সাথে আলাপের সময় এর একটি ব্যাখ্যা শুনেছিলাম, বর্তমানে যে জলবায়ুর মডেলটি নিয়ে তাঁরা বায়ুশক্তির পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করছেন, সেখানে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট স্তর অতিক্রম করলে গোটা ব্যবস্থাটির স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ে। তখন কী ঘটে, আর ব্যাখ্যা করা আর সম্ভব হবে না, পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্যে মডেলটিকে নতুন করে না সাজানো হলে।

আর ভয়ঙ্কর যে ব্যাপারটি, সেটি সমুদ্রের কাছে ভূমি হারানোর ব্যাপার নয়। সমুদ্রের পানি লোনা, তাকে ঠেকিয়ে রাখে নদীর বিপুল মিষ্টি পানি। নদীতে স্রোত কমলে সমুদ্রের লোনা পানি উজিয়ে চলে আসে জমিতে। মাটি একবার লবণাক্ত হলে তাকে আবার মিষ্টি করা অসম্ভব নয়, তবে সুদীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে যদি নদীতে বাহিত পানির পরিমাণ হ্রাস পায়, তাহলে স্যালিনেশন ইকুইলিব্রিয়াম লাইন খুব দ্রুত গতিতে কুষ্টিয়া আর চাঁদপুরে পৌঁছে যেতে পারে। এর একটি সহজ অর্থ হচ্ছে, যতদূর জানি, এর দক্ষিণে আর ধান চাষ চলবে না।

তবে আমরা যদি নিজেদের কাছে প্রশ্ন করি, বাংলাদেশ অচিরেই ডুববে কি না, দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দ্বিধা হবে না। খবরের কাগজে পড়লাম, মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর নামে খাল বরাদ্দ হয়ে যায়। বাংলাদেশকে সমুদ্র ডোবানোর আগে আমরাই ডুবিয়ে ছাড়ি কি না, কে জানে?




সচলায়তনে পূর্ব প্রকাশিত এই পোস্টটিতে বেশ প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছে। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।