Friday, June 20, 2008

শ্বাসরূদ্ধকর তুর্ক-ক্রোয়াট ফাইন্যাল

আজকে এ খেলা যারা মিস করলেন, তাদের জন্যে দুঃখই হচ্ছে।

থাকি তুর্কি পাড়ায়, চলতে ফিরতে রোজই তুর্কিদের সাথে দেখা। তুর্কি তরুণীরা বেশ শ্বাসরুদ্ধকর একটা ব্যাপার হলেও, ওদের মধ্যে এমন একটা রুক্ষতা আছে যে ভালো লাগে না শেষ পর্যন্ত। তুর্কি তরুণদের কথা বলার নেই কিছু, চরম অভদ্র আর উগ্র মনে হয়েছে বেশিরভাগকেই।

ক্রোয়াটদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই খুব একটা। যতগুলো ক্রোয়াট দেখেছি এই স্বল্প প্রবাসজীবনে, সবক'টাই অভদ্র, জাতিবিদ্বেষী ও দুর্মুখ। তবে ক্রোয়াট মেয়েগুলি দারুণ!

কিন্তু তুর্কি আর ক্রোয়াট ফুটবল অনন্য! খেলার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রাণপণে খেলে দুই দল। গতি আর পায়ের কাজ চমৎকার, মাঝমাঠ থেকে হঠাৎ বল টেনে ত্বরিৎ আক্রমণে সিদ্ধপদ দুই দলই, অযথা মেরে খেলার প্রবণতাও তেমন একটা নেই।

কিন্তু তুলনাহীন একজনই, তুর্কি গোলকিপার রুশতু। সময় কিভাবে যায় টের পাওয়া মুশকিল, ২০০৮ এ এসে চমকে উঠি রুশতুকে দেখে। বুড়ো হয়ে পড়েছে তুর্কি বাঘ। কিন্তু সেই বুড়ো হাড়েই ভেলকি দেখিয়ে চলেছে ১১৯ মিনিট ধরে। ক্রোয়াট মিডফিল্ডার দানিয়েল স্রনা আর তুর্কি গোলরক্ষক রুশতুর মধ্যে ঠান্ডা লড়াই চলেছে গোটা ম্যাচ ধরে, স্রনার দর্শনীয় সব আক্রমণ চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতা নিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছে রুশতু, স্রনা আবার ঠান্ডা চোখে গোলকিপার আর মাঠ মেপে এগিয়ে আসছে হঠাৎ, পায়ে বল। ওদিকে সফট পাসে অভ্যস্ত তুর্কি মিডফিল্ডারদের কোন তোয়াক্কাই করছে না ক্রোয়াট ব্যাক সিমোনিচ, তুর্কিদের প্রত্যেকটা আক্রমণের মুখে সে একাই একশোজন হয়ে দেয়াল তুলে দাঁড়াচ্ছে।

১১৯ মিনিট ধরে এমনই চলছিলো। কখনো তুর্কিরা শিথিল হয়ে পড়ছে, বিদ্যুতের মতো এগিয়ে যাচ্ছে ক্রোয়াটরা, ভরসা তখন শুধুই রুশতু। মাঠের এক পাশ নিশ্চুপ হয়ে প্রার্থনা করছে, আরেক পাশ লাল সাদা চেক ঝান্ডা তুলে চেঁচাচ্ছে সমানে। চকিতে ঝলসে উঠছে রুশতুর গ্লাভস, বল আবার নিরাপদ দূরত্বে, নিরাপদ পায়ে, মাঠের অন্যপাশে লালে লাল তুর্কিরা শুরু করেছে চেঁচানো, ক্রোয়াটদের মুখ গোমড়া। এরই মধ্যে হঠাৎ মাঠ কাঁপিয়ে সামনে ছুটছে তুর্কি মিডফিল্ডাররা, চোখের পলকে পাঁচছয়জনের একটা দেয়াল তুলে দাঁড়াচ্ছে ক্রোয়াটরা। এমনই চলছে প্রত্যেকটা মিনিট।

কিডনি ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করা, ফাইবার গ্লাসের রক্ষাবরণ পরা ক্রোয়াট স্কোরার ক্লাসনিচ নেমেছেই গোল দেয়ার পণ করে। ১১৯ মিনিটের মাথায় প্রৌঢ় রুশতুর ছোট্ট একটা গাণিতিক ভুলের সুযোগ নিয়ে নিলো ক্রোয়াট বাহিনী, ক্লাসনিচের হেড মাঠের অর্ধেককে বিষন্ন করে দিয়ে জালে ঢুকে গেলো। রুশতু যেন কয়েক মাইল দূর থেকে ছুটে আসছিলো বল ঠেকানোর জন্যে, বলের সাথে সাথে সেও মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ক্লান্ত, হতাশ, বৃদ্ধ রুশতু।

কমেন্টেটররা পারলে তখনই রুশতুর ব্যাগ গুছিয়ে দেয়। আহা বেচারা, এ-ই ছিলো তার শেষ টুর্নামেন্ট। বাড়ি ফিরতে হচ্ছে রুশতুকে ভিয়েনা ছেড়ে। আহা, আহা।

যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ কথাটার মর্ম টের পাওয়া গেলো তুর্কি মিডফিল্ডারদের আচরণে। ১২১ মিনিটের মাথায় সামিহ প্রথম সুযোগেই বল জালে পাঠিয়ে দিলো, ছয়জন ক্রোয়াটের দেয়ালকে হতভম্ব করে দিয়ে। সারাটা খেলা জুড়ে মাঠে তড়পে বেড়ানো ক্রোয়াট কোচ বোধ করি টের পেয়েছিলেন এমন কোন অশনি সংকেত, প্রাথমিক হুড়োহুড়ি কেটে যাবার পর তিনি হাত পা ছুঁড়ে সাবধান করছিলেন খেলোয়াড়দের, কিন্তু গরিবের কথা কেবল বাসি হলেই ফলে।

১২০ মিনিটের খেলা শেষ হলে পেনাল্টি শুটআউট। এই একটা জায়গায় তুর্কিরা আত্মবিশ্বাসী। পুরনো চাল ভাতে বাড়ে, পুরনো বাঘও চালে বাড়ে। রুশতু হতাশ করেনি তুরস্ককে। ক্রোয়াটরা হেরে গেছে।

পাড়ার তুর্কি হারামজাদারা মনে হচ্ছে না আজ রাতে দু'টার আগে ঘুমাতে দেবে। পটকা ফুটছে, জঘন্য সব তুর্কি গান বেজে চলছে আশপাশে, হর্ন বাজিয়ে চলছে গাড়ির মিছিল। তবে তুরস্কের কপালে দুঃখ আছে, সেমিফাইন্যালে সেরা তিনজন খেলোয়াড়ই বাদ পড়ছে হলুদ কার্ডে নাম তুলে। সুইৎজারল্যান্ডের বাজেলে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে ঠান্ডা, হিসাবী, মারমুখো জার্মানরা। এই খেলার দিন ঘরে বন্দী হয়ে থাকতে হবে। মারপিট না হয়েই যায় না।

এই খেলা দেখার সময় খুব মিস করছি ঢাকাকে। সবাই মিলে হইহট্টগোল করে খেলা দেখবো, একটু পর পর মুড়িমাখা আসবে, চা আসবে, প্রতিবেশীরা আসবে হৈচৈ শুনে হৈচৈ বাড়াতে, হাফ টাইমে ফোন করে ধমকাবো অন্য দলের সাপোর্টার বন্ধুদের ... তা না, একা একা চুপচাপ বসে বসে দেখলাম ম্যাচ। বাল বলে চিৎকার দিতে খুব ইচ্ছা করছে। বাল বলা ভালো নয় বলে দিচ্ছি না।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।