Saturday, June 14, 2008

কাথারিনের গোমড়ামুখ রহস্য

হের চৌধুরীর ষ্টুডেন্টেনভোনহাইম (ছাত্রাবাস) পাঁচজনের। চৌধুরীর পড়শিরা হচ্ছে বেহালাবাদিকা স্ফেয়া, "হাসিখুশি" সেবাস্তিয়ান, গোবদা সিগিতা আর কিছুদিন আগ পর্যন্ত গোমড়ামুখী কাথারিন।

কাথারিনের গোমড়ামুখই আমাদের তদন্তব্য বিষয়।

জার্মানরা কথা কম বলে, কিন্তু স্বাভাবিক সৌজন্যের অভাব সবার মধ্যে নেই। কাথারিনের মধ্যে সৌজন্যের লেশমাত্র নেই। সে বাইরে থেকে হলে ফিরে সৌজন্যসূচক হ্যালোৎকারের ধার ধারে না, সোজা নিজের ঘরে গিয়ে গদাম করে দরজা লাগিয়ে দেয়।

প্রথম এই ঘটনার মুখোমুখি হবার পর আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। অভদ্রতার টোটকা অভদ্রতা, কাজেই আমিও চৌধুরীর বাড়িতে গেলে আর কাথারিনকে দেখলে হাই-হ্যালোর ধার ধারি না। বাকি পড়শিরা সবাই বেশ ভদ্র, তাদের সাথে গল্পসল্প চলে সবসময়। একা কাথারিনই হংসমধ্যে বকো যথা।

কয়েকদিন পর লক্ষ্য করলাম, শুধু আমাদের সাথে না, এই অসৌজন্যের শিকার বাকিরাও। কাথারিন কারো সাথেই বাক্যবিনিময়ের ধার ধারে না, বাড়িতে তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায় শুধু তার নিজের ঘরের আর টয়লেট-বাথরুমের দরজা লাগানোর শব্দে।

সেবাস্তিয়ান একদিন কথাচ্ছলে স্পষ্ট করেই বললো, কাথারিন মহা অভদ্র। সে কথা তো বলেই না, ভোনহাইমের কাজকর্মও ঠিকমতো করে না।

একদিন হের চৌধুরীর বাড়িতে রান্না করতে করতে শুনি, বিটকেলে পোঁ পোঁ শব্দ হচ্ছে। চৌধুরী জানালেন, এর উৎস কাথারিন। সে মাঝে মাঝে ক্ল্যারিওনেট বাজায়।

ব্যাপারটা খুবই রহস্যময় ঠেকলো। যে বর্বর কাথারিন মানুষের সাথে স্বাভাবিক সৌজন্য বজায়ের তোয়াক্কা রাখে না, সে ঘরের দরজা বন্ধ করে ক্ল্যারিওনেট কেন বাজায়? কেন তার মনে এতো ফূর্তি হঠাৎ?

রহস্য সমাধানের জন্যে প্রয়োজন পর্যবেক্ষণ। তাই আমি আর চৌধুরী কাথারিনের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা শুরু করলাম।

আমাদের প্রথম পর্যবেক্ষণে দেখা গেলো, কাথারিন প্রচুর দুধ খায়। একটু পর পরই সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ফ্রিজ খুলে দুধের প্যাকেট বার করে গ্লাসে দুধ ঢেলে গটগটিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।

ক্লু পেয়ে রহস্য আরো ঘোরালো হয়ে উঠলো।

রহস্যকে আরো ঘোরালো করার জন্যে কাথারিন দুধের সাথে দইও খাওয়া শুরু করলো।

পর পর দু'টো ক্লু পেয়ে যখন আমরা একটু চিন্তিত, তখন দেখলাম, কাথারিন শসা, গাজর ইত্যাদি সব্জি প্রচুর পরিমাণে কেনে। কলাও কেনে অনেকগুলি একসাথে। ওর একাকী গোমড়া জীবনের সাথে সব্জিগুলো মানিয়ে যায়, কিন্তু চৌধুরী জানালেন, কাথারিন ওগুলো সালাদ বানিয়ে খায়। নিজের খাইষ্টা মনকে ধমক দিয়ে আবার পর্যবেক্ষণে মনোনিবেশ করলাম।

কয়েকদিন বাদে হের চৌধুরী জানালেন এক নিবিড় গোপন পর্যবেক্ষণের কথা। কাথারিন একটু পর পরই টয়লেটে যায়।

এতগুলো ক্লু পেয়ে আমাদের রহস্যের পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়ে পড়েছে ততক্ষণে। তাই হঠাৎ একদিন যখন কাথারিনকে উল্লসিত মুখে টয়লেট থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকতে দেখলাম, সেদিন অনেক কিছু দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেলো। হের চৌধুরীকে বুঝিয়ে বলতে যাবো, তখন শুনি আবার পোঁ পোঁ করে আওয়াজ হচ্ছে।

সমাধান পেয়ে গেলাম আমরা। কাথারিনের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে।

ওর সব অভদ্রতার রহস্য মূহুর্তেই জল হয়ে গেলো। আহারে বেচারি, হাগু হয় না ভালোমতো। কদাচিৎ একদিন সুষ্ঠ নিষ্কাশন হলে সেই আনন্দে সে ক্ল্যারিওনেট বাজায়। আহা, আহা!

কাথারিন হপ্তাদুয়েক আগে ভোনহাইম ছেড়ে চলে গেছে। গতকাল সপ্তাহান্তের কেনাকাটা করতে গিয়ে ওর সাথে দেখা। এক ডজন কলা, তিনটা শসা, এক প্যাকেট গাজর, চার কৌটা দই, আপেল আর বিশাল এক প্যাকেট টয়লেট পেপার নিয়ে আমাদেরই সামনে কিউতে সে দাঁড়িয়ে। দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে মনে হলো, খুব জলদি বাসায় ফেরা জরুরি ওর জন্যে।

রহস্য সমাধান করা সহজ, সমস্যা সমাধান করা কঠিন। কাথারিনের প্রতি রইলো গভীর সমবেদনা।

[]

1 comment:

  1. কেমনসুর31 May, 2010

    হা হা হা

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।